শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ভীমপলশ্রী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
পান্নালাল ভট্টাচার্যের গাওয়া “আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল” গানটা খুবই সাদামাঠা। কিন্তু কে যেন আছে গানটার মধ্যে। যারা গান ভালো বাসেন, তাদের জীবনে কোন একদিন হলেও অবচেতনভাবে মনে হয়েছে এই গানটি। এটাই হল ভীমপলশ্রীর যাদু।

রাগ ভীমপলশ্রী বা ভীমপলাশি
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুমধুর রাগ হলো ভীমপলশ্রী। এটি মূলত অপরাহ্ণের (বিকেলের) রাগ। এই রাগের প্রকৃতি গম্ভীর হলেও এর চলনের মধ্যে এক ধরণের চপলতা ও আকুলতা বিদ্যমান। ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং এর শিকড় লুকিয়ে আছে মধ্যযুগীয় সংগীতে। অনেকের মতে, এটি ‘ভীম’ এবং ‘পলশ্রী’ নামক দুটি রাগের সংমিশ্রণে তৈরি, যদিও আধুনিক কালে এটি একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ হিসেবেই স্বীকৃত।
ভীমপলশ্রী রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহণে দুটি স্বর বর্জিত থাকা, যা একে এক ধরণের বিশেষ গতিশীলতা দান করে। এই রাগের কোমল গান্ধার (গা) এবং কোমল নিষাদ (না) মনের মধ্যে এক গভীর আর্তি ও ভক্তির উদ্রেক করে। এটি এমন এক রাগ যা বিরহ, প্রেম এবং শান্ত—সব রসই সমানভাবে প্রকাশ করতে পারে। উচ্চাঙ্গ সংগীত থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র ও ভজনেও এই রাগের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠা্ট: কাফি।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: নৃ সা জ্ঞা মা পা ণা র্সা (এখানে না নিচু বা মন্দ্র সপ্তকের)।
- অবরোহ: র্সা ণা ধা পা মা জ্ঞা রা সা
- বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (মা)
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)
- বর্জিত স্বর: আরোহণে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (দা) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: গান্ধার ও নিষাদ—এই দুটি স্বর কোমল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর শুদ্ধ।
- সময়: অপরাহ্ণ বা বিকেলের রাগ (দিনের চতুর্থ প্রহর)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, করুণ ও শান্ত রসাত্মক।
- পাকাড়: নি সা মা গা মা পা মা, মা গা রে সা
চলন: ণ# স ম ম প ণ ধ প ম প জ্ঞ ম জ্ঞ র স
এই রাগটিতে “কোমল নি” এবং “কোমল গা” ব্যবহৃত হয়। এটি একটি ঔড়ব-সম্পূর্ণ রাগ, অর্থাৎ, এর আরোহণে ৫ টি স্বর এবং অবরোহণে ৭ টি স্বর ব্যবহৃত হয়।
রিলেটেড বা সম্পর্কিত রাগসমূহ
- রাগ কাফি: ভীমপলশ্রীর আশ্রয়ী ঠাট হলো কাফি, তবে কাফিতে ঋষভ ও ধৈবত বর্জিত নয়।
- রাগ বাগেশ্রী: এই রাগের সাথে ভীমপলশ্রীর স্বরগত মিল থাকলেও বাগেশ্রীর বাদী স্বর কোমল নিষাদ এবং এটি রাতের রাগ।
- রাগ ধনশ্রী: ভীমপলশ্রীর সাথে এই রাগের অনেক মিল পাওয়া যায়, তাই অনেকে একে ভীমপলশ্রীর কাছাকাছি মনে করেন।
- রাগ আভোগী: আরোহণের চলনে আভোগীর সাথে কিছুটা সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।
- রাগ পিলু: মিশ্র ভীমপলশ্রী গাওয়ার সময় অনেক সময় পিলু রাগের ছোঁয়া পাওয়া যায়।

রাগ ভীমপলশ্রী ভারতীয় সংগীতের এক অনন্য সম্পদ। গোধূলি বেলার বিষণ্ণতা আর আধ্যাত্মিক প্রশান্তিকে এটি যেভাবে ফুটিয়ে তোলে, তা অন্য রাগে বিরল। এই রাগের গঠন ও মিড় অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় হওয়ায় এটি শিক্ষার্থীদের কাছেও অত্যন্ত প্রিয়। শুদ্ধ মধ্যমের ওপর বারবার অবস্থান এবং কোমল গান্ধারের সেই বিশেষ আন্দোলন শ্রোতাকে এক অপার্থিব অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। ওস্তাদ আমীর খাঁ বা পণ্ডিত ভীমসেন জোশীর কণ্ঠে এই রাগের বিস্তার শুনলে এর আসল আভিজাত্য অনুধাবন করা যায়।
রাগের বেসিক শিখে নিতে পারেন নিচের ভিডিওটি থেকে:
কাজী নজরুল ইসলামের ভীমপলশ্রী:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. কানন গিরি সিন্ধু–পার ফির্নু পথিক দেশ–বিদেশ।
২. হৃদয় কেন চাহে হৃদয়।
৩. কেন আনো ফুল ডোর আজি বিদায়ো বেলা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে ভীমপলশ্রী:
কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
১. বিপুল তরঙ্গ রে
২. আমার ব্যথা যখন আনে আমায় তোমার দ্বারে
আধুনিক গানে ভীমপলশ্রী:
১.আকাশ প্রদীপে জ্বলে — শিল্পী: সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। এটি আধুনিক বাংলা গানে ভীমপলশ্রীর একটি সার্থক উদাহরণ। গানের সুরের গাম্ভীর্য ও ‘নি সা গা মা’ (আরোহণের অংশ) প্রয়োগটি এই রাগের পরিচয় বহন করে।
২. কত যে আঁধারে পথ চেয়ে বসে আছি — শিল্পী: সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। এই গানটিতে ভীমপলশ্রীর বিরহী মেজাজটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। সুরকার এখানে রাগের কাঠামোগত শুদ্ধতা বজায় রেখেছেন।
গজলে ভীমপলশ্রী:
গজলে রাগ ভীমপলশ্রী-র প্রয়োগ অত্যন্ত মাধুর্যপূর্ণ। এই রাগের শান্ত এবং গম্ভীর প্রকৃতি গজলের কাব্যিক বিরহ ও আর্তিকে এক অনন্য উচ্চতা দান করে। আপনার দেওয়া দুটি উদাহরণই অত্যন্ত প্রামাণ্য এবং শাস্ত্রীয় বিচারে সঠিক।
১. জিন্দগী মেঁ তো সভি প্যায়ার কিয়া করতে হ্যায় — শিল্পী: ওস্তাদ মেহেদী হাসান : এটি গজলের জগতে রাগ ভীমপলশ্রী-র সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আদর্শ উদাহরণ। শাহেনশাহ-এ-গজল মেহেদী হাসান এই গজলটিতে ভীমপলশ্রীর শুদ্ধ স্বরবিন্যাস (আরোহণে $রে$ ও $দা$ বর্জিত এবং অবরোহণে সাত স্বর) ব্যবহার করেছেন। গজলের প্রতিটি অন্তরায় ভীমপলশ্রীর ‘নি-সা-গা-মা-পা’ চলনটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই গজলে রাগের করুণ ও রোমান্টিক রসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
২. ইয়ে না থি হামারি কিসমত — শিল্পী: ওস্তাদ আমানত আলী খান (পাতিয়ালা ঘরানা) : মির্জা গালিবের এই অমর গজলটি ওস্তাদ আমানত আলী খান রাগ ভীমপলশ্রী-র আধারে গেয়েছিলেন। পাতিয়ালা ঘরানার গায়কিতে ভীমপলশ্রীর গাম্ভীর্য ও ‘তান’-এর কাজ এই গজলটিকে এক ধ্রুপদী রূপ দিয়েছে। গজলের স্থায়ী ও অন্তরা জুড়েই ভীমপলশ্রীর কোমল গান্ধার ($গা$) ও কোমল নিষাদ ($না$)-এর প্রয়োগ অত্যন্ত নিখুঁত। গালিবের বিরহী কাব্যের সাথে ভীমপলশ্রীর সুর এখানে একাত্ম হয়ে গেছে।
ভজনে ভীমপলশ্রী:
ভজনে রাগ ভীমপলশ্রী-র প্রয়োগ অত্যন্ত গভীর এবং ভক্তিমূলক। এই রাগের শান্ত গাম্ভীর্য এবং কোমল গান্ধার ($গা$) ও কোমল নিষাদ ($না$)-এর বিনয়পূর্ণ চলন ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা ও আত্মসমর্পণ প্রকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
১. ম্যায়নে চাতক পিয়া তেরি — শিল্পী: পন্ডিত ডি. ভি. পলুস্কর : এটি ভীমপলশ্রী রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও প্রামাণ্য ভজন। পন্ডিত ডি. ভি. পলুস্কর তাঁর বিশুদ্ধ ও সুললিত কণ্ঠে এই ভজনটিতে ভীমপলশ্রীর ‘নি সা গা মা পা’ আরোহণ এবং অবরোহণের শান্ত রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ভজনটিতে ভক্তের আর্তিকে প্রকাশ করতে ভীমপলশ্রীর কোমল স্বরগুলো জাদুর মতো কাজ করে। এটি শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষার্থীদের কাছে এই রাগের ভজন-অঙ্গ বোঝার জন্য একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
২. হরি তুম হরো জন কী পীর — শিল্পী: এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী : মীরাবাঈয়ের এই বিখ্যাত ভজনটি কর্ণাটকী ও হিন্দুস্তানি—উভয় পদ্ধতিতেই গাওয়া হয়। অনেক শিল্পী একে ভীমপলশ্রী বা এর কাছাকাছি রাগ আভোগী-তে গেয়ে থাকেন। যখন এটি ভীমপলশ্রীতে গাওয়া হয়, তখন এর কোমল গান্ধারের প্রয়োগ ভক্তের হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। বিশেষ করে এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠে এই ভজনটিতে ভীমপলশ্রীর শুদ্ধতা ও ভক্তি রস অত্যন্ত প্রবল।
৩. জ্যায়সে সূরজ কী কিরণ — চলচ্চিত্র: নীল কমল (১৯৬৮), শিল্পী: আশা ভোঁসলে : এটি একটি চলচ্চিত্রীয় ভজন যা পুরোপুরি রাগ ভীমপলশ্রী-র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সুরকার রবি এই গানটিতে ভীমপলশ্রীর ‘রে’ ও ‘দা’ বর্জিত আরোহণকে খুব স্পষ্টভাবে ব্যবহার করেছেন। সকালের আলোয় ঈশ্বরের মহিমা গাওয়ার জন্য ভীমপলশ্রীর এই প্রয়োগটি অত্যন্ত সার্থক।
ঠুমরিতে ভীমপলশ্রী:
ঠুমরিতে রাগ ভীমপলশ্রী-র প্রয়োগ অত্যন্ত শৌখিন এবং রঞ্জক। যদিও ভীমপলশ্রী মূলত একটি গম্ভীর ও শুদ্ধ শাস্ত্রীয় রাগ, কিন্তু ঠুমরি গায়কিতে এর চলন কিছুটা চঞ্চল এবং অলঙ্কারবহুল হয়ে ওঠে। ঠুমরিতে এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘শৃঙ্গার রস’ বা বিরহী প্রেমের আকুলতা।
১. অবে গুলাল লাল ভৈল রে — শিল্পী: বিদুষী গিরিজা দেবী (বেনারস ঘরানা) : বেনারস ঘরানার ‘ঠুমরি কুইন’ গিরিজা দেবীর কণ্ঠে এটি রাগ ভীমপলশ্রীর একটি অতি পরিচিত এবং কালজয়ী ঠুমরি। এই ঠুমরিতে হোলির আবহে কৃষ্ণের সাথে প্রেমের খুনসুটি বর্ণনা করা হয়েছে। গিরিজা দেবী ভীমপলশ্রীর কোমল গান্ধার ($গা$) এবং কোমল নিষাদ ($না$)-এর ওপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ‘খটকা’ ও ‘মুরকি’ ব্যবহার করে এই রাগের শাস্ত্রীয় রূপটিকে উপ-শাস্ত্রীয় বা ঠুমরি অঙ্গে রূপান্তরিত করেছেন। এতে ভীমপলশ্রীর গাম্ভীর্যের চেয়ে ‘চপলতা’ ও ‘মাধুর্য’ বেশি প্রকাশ পায়।
২. সইয়াঁ বিন ঘর সূনা — শিল্পী: ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ (পাতিয়ালা ঘরানা) : পাতিয়ালা ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ভীমপলশ্রী রাগকে ঠুমরি এবং দাদরা অঙ্গে গাইতে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। বিরহের এই ঠুমরিটিতে তিনি ভীমপলশ্রীর ‘টোঁড়’ ও ‘তান’-এর বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন। ঠুমরি হওয়ার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে রাগের ব্যাকরণ কিছুটা শিথিল করে অন্যান্য স্বরের (যেমন শুদ্ধ নিষাদ বা শুদ্ধ গান্ধারের সূক্ষ্ম ছোঁয়া) প্রয়োগ ঘটিয়ে একে আরও শ্রুতিমধুর করে তুলেছেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রে রাগ ভীমপলশ্রী:
হিন্দি চলচ্চিত্রে রাগ ভীমপলশ্রী-র প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক এবং সফল। এর কারণ এই রাগের বিষণ্ণ অথচ মধুর আবেদন বিরহ, প্রেম এবং ভক্তি—সব রসেই খুব সহজে মিশে যায়। নিচে হিন্দি ছায়াছবির গানে ভীমপলশ্রীর একটি দীর্ঘ ও প্রামাণ্য তালিকা দেওয়া হলো:
১. স্বর্ণযুগের কালজয়ী গান (১৯৫০-১৯৭০):
- ন্যায়না বরসে রিমঝিম রিমঝিম — চলচ্চিত্র: ওহ কৌন থি (১৯৬৪), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: মদন মোহন। (এটি ভীমপলশ্রীর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর রহস্যময় চলন রাগের গাম্ভীর্যকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে)।
- বিণা কুছ কাহে বিণা কুছ सुने (হে নীলকণ্ঠ) — চলচ্চিত্র: নীল কমল (১৯৬৮), শিল্পী: আশা ভোঁসলে, সুরকার: রবি। (এটি একটি ভক্তিমূলক গান বা ভজন যেখানে ভীমপলশ্রীর শুদ্ধ রূপ ব্যবহৃত হয়েছে)।
- নগমা ও শের কী সওগাত কিসে পেশ করুঁ — চলচ্চিত্র: গজল (১৯৬৪), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: মদন মোহন।
- খিলি রে খিলি রে লতা — চলচ্চিত্র: তেরে মেরে সপনে (১৯৭১), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: এস. ডি. বর্মন।
- সমে কা ইয়ে কারবাঁ — চলচ্চিত্র: মেরে হামদম মেরে দোস্ত (১৯৬৮), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল।
২. ধ্রুপদী ঢঙের জনপ্রিয় গান:
- ও বেকরার দিল — চলচ্চিত্র: কোহরা (১৯৬৪), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
- ইয়ে আয়ন তেরে ঘর কা — চলচ্চিত্র: ছত্রপতি শিবাজী (১৯৫২), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: সি. রামচন্দ্র।
- তেরে প্যায়ার মেঁ দিলদার — চলচ্চিত্র: মেরে মেহবুব (১৯৬৩), শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর, সুরকার: নওশাদ।
৩. আধুনিক ও সমকালীন গান (১৯৯০-বর্তমান):
- বিনা কুছ কাহে, বিনা কুছ শুনে — চলচ্চিত্র: খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬), শিল্পী: হরিহরণ, সুরকার: যতীন-ললিত। (আধুনিক গানে ভীমপলশ্রীর স্নিগ্ধতা বোঝার জন্য এটি একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান)।
- কিসমত সে তুম হামকো মিলে হো — চলচ্চিত্র: পুকার (২০০০), শিল্পী: সোনু নিগম ও অনুরাধা পৌডওয়াল, সুরকার: এ. আর. রহমান। (ভীমপলশ্রীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রোমান্টিক ডুয়েট গান)।
- তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত — চলচ্চিত্র: মোহরা (১৯৯৪), শিল্পী: উদিত নারায়ণ ও কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, সুরকার: বিজু শাহ।
৪. গজল ও সেমি-ক্লাসিক্যাল ঢঙের গান:
- দিল কে ঝরোখে মেঁ তুঝকো বিঠাকর — চলচ্চিত্র: ব্রহ্মচারী (১৯৬৮), শিল্পী: মহম্মদ রফি, সুরকার: শঙ্কর-জয়কিশান। (এই গানটির অন্তরায় ভীমপলশ্রীর স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়)।
- ম্যায়নে চাতক পিয়া তেরি — যদিও এটি চলচ্চিত্র নয়, তবে এর ছায়াছবিধর্মী আবেদন আকাশবাণীতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
খেয়ালে ভীমপলশ্রী:
রাগ ভীমপলশ্রী খেয়াল গায়কির একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং জনপ্রিয় রাগ। এই রাগের শান্ত, গম্ভীর এবং মধুর প্রকৃতি খেয়ালের ‘বিলম্বিত’ এবং ‘দ্রুত’—উভয় অংশেই এক অপূর্ব শৈল্পিক ব্যঞ্জনা তৈরি করে। আপনার ‘কান তৈরি’র জন্য খেয়াল গায়কির সবচেয়ে প্রামাণ্য এবং ঘরানাদার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা) : এটি ভীমপলশ্রী রাগের সবচেয়ে তেজোদীপ্ত এবং প্রামাণ্য রূপায়ণগুলোর একটি। কিরানা ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ভীমপলশ্রীর মন্দ্র সপ্তকের কাজ এবং তার স্বর-বিস্তারে এক অদ্ভুত স্থৈর্য দেখাতেন। তাঁর বিখ্যাত বন্দিশ ‘অব তো শুন লো’ বা ‘এ রি মাই আজ শুভ দিন’-এ ভীমপলশ্রীর কোমল গান্ধার ($গা$) এবং কোমল নিষাদ ($না$)-এর প্রয়োগ অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর ভরাট গলায় ভীমপলশ্রীর সেই বিকালের গোধূলি বেলার আর্তি এক অন্য উচ্চতা পায়।
২. ওস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা) : ইন্দোর ঘরানার স্রষ্টা আমীর খাঁ সাহেবের কণ্ঠে ভীমপলশ্রী রাগের ‘বিলম্বিত’ খেয়াল এক ধ্যানের স্তরে নিয়ে যায়। তিনি অত্যন্ত মন্থর গতিতে রাগের বিস্তার করতেন। তাঁর বাজনায় ‘অতি-বিলম্বিত’ লয়ের চলন ভীমপলশ্রীর শান্ত ও গম্ভীর রসকে পূর্ণতা দেয়। তিনি ভীমপলশ্রীর বিশুদ্ধতা বজায় রেখে আরোহণে ঋষভ ($রে$) ও ধৈবত ($দা$) বর্জিত রেখে এর ‘ঔড়ব’ রূপটি খুব নিখুঁতভাবে দেখাতেন।
৩. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা) : জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর ভীমপলশ্রী ছিল জটিল এবং বক্র তানের কারুকাজে ঠাসা। কিশোরী তাই-এর গায়কিতে ভীমপলশ্রীর প্রতিটি স্বর যেন কথা বলত। তিনি এই রাগের কোমল স্বরগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ‘শ্রুতি’র (Microtones) কারুকাজে ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর কণ্ঠে ভীমপলশ্রী রাগের একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ললিত রূপ পাওয়া যায়।
যন্ত্রে ভীমপলশ্রী:
সেতারে রাগ ভীমপলশ্রী এক অনন্য মাধুর্য ও চপলতার রূপ পায়। এই রাগের গম্ভীর প্রকৃতি সেতারের মিড় ও তানের দ্রুততায় এক আধুনিক ও আকর্ষণীয় মাত্রা যোগ করে। আপনার দেওয়া উদাহরণটি অত্যন্ত প্রামাণ্য এবং ঘরানাদার বাজনার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
১. ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী/ইটাওয়া ঘরানা) : ইমদাদখানী ঘরানার এই দিকপাল শিল্পীর সেতারে ভীমপলশ্রী রাগের ‘গায়ন-অঙ্গ’ এবং ‘তন্ত্ৰকারী’-র এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। শহীদ পারভেজ খাঁ তাঁর বিশেষ গায়ন-অঙ্গ শৈলীর মাধ্যমে সেতারে ভীমপলশ্রীর কোমল গান্ধার (গা) ও কোমল নিষাদ (না)-এর সূক্ষ্ম কাজগুলো ঠিক মানুষের কণ্ঠের মতো ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর দ্রুত লয়ের ‘ঝালা’ এবং জটিল ছন্দের ‘তান’ ভীমপলশ্রীকে এক তেজোদীপ্ত ও উজ্জ্বল রূপ দান করে। তাঁর বাজনায় এই রাগের প্রথাগত গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এক ধরণের আধুনিক অলংকরণও পাওয়া যায়।
২. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা) : সেতারে ভীমপলশ্রীর সবচেয়ে ধ্যানমগ্ন ও শান্ত রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আলাপ ও জোড় অংশে ভীমপলশ্রীর মন্দ্র সপ্তকের কাজগুলো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করতেন। তিনি রাগের আরোহণে ঋষভ ($রে$) ও ধৈবত ($দা$) বর্জিত রেখে এর ‘ঔড়ব’ প্রকৃতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বজায় রাখতেন। তাঁর সেতারে এই রাগের বিকালের গোধূলি বেলার বিষণ্ণতা ও প্রশান্তি খুব প্রামাণ্যভাবে ধরা দেয়।
সরদে ভীমপলশ্রী :
সরদে রাগ ভীমপলশ্রী এক বিশেষ গাম্ভীর্য ও গভীরতা লাভ করে। সরদের ধাতব প্রতিধ্বনি এবং এর ‘ঘষিট’ ও ‘মিড়’ প্রয়োগের ক্ষমতা ভীমপলশ্রীর সেই শান্ত অথচ আর্তিভরা মেজাজকে ফুটিয়ে তোলার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আপনার দেওয়া দুটি নামই সরদ বাজনা ও ভীমপলশ্রী রাগের শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য উদাহরণ।
১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা) : সরদে ভীমপলশ্রীর সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ও মরমী রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। আলী আকবর খাঁ সাহেবকে ‘সরদ সম্রাট’ বলা হয়। তাঁর বাজনায় ভীমপলশ্রীর কোমল গান্ধার ($গা$) এবং কোমল নিষাদ ($না$)-এর প্রয়োগ এক অন্য মাত্রার প্রশান্তি তৈরি করে। তিনি আরোহণে ঋষভ ($রে$) ও ধৈবত ($দা$) বর্জিত রেখে রাগের শুদ্ধতা বজায় রাখতেন এবং অবরোহণে যখন ধীর লয়ে সরদের তার টেনে নিচে নামতেন, তখন ভীমপলশ্রীর বিষণ্ণ মাধুর্য পূর্ণতা পেত।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা) তাঁর সরদে ভীমপলশ্রীর গাণিতিক স্পষ্টতা ও রাগের ব্যাকরণগত সৌন্দর্য অতুলনীয়। শাহজাহানপুর ঘরানার এই দিকপাল শিল্পী ভীমপলশ্রীর আরোহ-অবরোহের চলন এবং এর ‘তন্ত্ৰকারী’ (দ্রুত আঙুলের কাজ) খুব নিপুণভাবে দেখাতেন। তাঁর বাজানো ভীমপলশ্রীর ‘গৎ’ (বন্দিশ)-এর ছন্দ এবং জটিল তানের কারুকাজ এই রাগের এক উজ্জ্বল ও আধুনিক রূপ প্রকাশ করে। বিশেষ করে মধ্য লয় ও দ্রুত লয়ের কাজে তিনি এই রাগের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতেন।
টিউটোরিয়াল:
আপনার এই সংযোজনটি রাগ ভীমপলশ্রী বোঝার ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষামূলক রূপরেখা তৈরি করেছে। স্বর-মালিকা এবং লক্ষণ-গীত হলো যে কোনো রাগের ব্যাকরণগত কাঠামো এবং তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ‘লক্ষণ’ চেনার প্রাথমিক সোপান।
নিচে আপনার দেওয়া পয়েন্টগুলোর আলোকে একটি গোছানো গাইডলাইন দেওয়া হলো:
১. স্বর-মালিকা (Sargam Greet) কেন শুনবেন?
স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত হলো রাগের এমন একটি রচনা যেখানে কোনো কাব্য বা লিরিক থাকে না, কেবল রাগের স্বরগুলো (সা, রে, গা, মা) তালের ছন্দে গাওয়া হয়। এটি শুনলে ভীমপলশ্রীর আরোহণে যে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (দা) বর্জিত থাকে (সা গা মা পা না র্সা) এবং অবরোহণে সাতটি স্বরই ফিরে আসে, তা কানে গেঁথে যায়। ভীমপলশ্রীর স্বর-মালিকায় কোমল গান্ধার (গা) এবং কোমল নিষাদ (না)-এর সঠিক স্থান নির্ণয় করা সহজ হয়।
২. লক্ষণ-গীত (Lakshan Geet) কেন শুনবেন?
লক্ষণ-গীত হলো এমন একটি গান যার লিরিক বা কথার মধ্যেই ওই রাগের পরিচয় (যেমন— ঠাট, জাতি, বাদী-সমবাদী স্বর এবং সময়) লুকিয়ে থাকে। এটি শুনলে মুখস্থ না করেই রাগের শাস্ত্রীয় নিয়মগুলো মনে রাখা যায়। “কাফি ঠাট মানত ভীমপলশ্রী, বাদী ম সমবাদী সা…” — অর্থাৎ গানটির সুরেই বলা থাকছে এটি কাফি ঠাটের রাগ এবং এর বাদী স্বর মধ্যম (মা), সমবাদী স্বর ষড়জ (সা)।
৩. এনসিইআরটি (NCERT) ও প্রামাণ্য টিউটোরিয়াল
আপনার উল্লিখিত এনসিইআরটির টিউটোরিয়াল এই রাগের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।
আরও দেখুন:
