রাগ ভূপালী (বা ভোপালী) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, প্রাচীন এবং সর্বজনবিদিত রাগ। এটি তার সরলতা এবং গম্ভীর মাধুর্যের জন্য সংগীত শিক্ষার্থী ও রসিকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
রাগ ভূপালী মূলত কল্যাণ ঠাট থেকে উদ্ভূত একটি রাগ। এটি একটি অতি প্রাচীন রাগ এবং মনে করা হয় যে এর সুর লোকসংগীতের গভীর থেকে এসেছে। দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সংগীতে এই রাগের সমগোত্রীয় রাগের নাম হলো ‘মোহনম্’। বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মেও এই রাগের সুরের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এটি প্রধানত সন্ধ্যার প্রথম প্রহর বা প্রদোষকালের রাগ।
ভূপালী একটি ‘ঔড়ব-ঔড়ব’ জাতির রাগ। এতে মধ্যম (মা) এবং নিষাদ (নি) সম্পূর্ণ বর্জিত। এর বিশেষত্ব হলো এটি সম্পূর্ণ শুদ্ধ স্বরের দ্বারা গঠিত এবং এর চলন অত্যন্ত মিড় ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। এর গায়কিতে ‘গান্ধার’ (গা) স্বরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা একে শান্তি ও ভক্তির আবেশ দান করে। এটি মূলত ‘শান্ত’ ও ‘শৃঙ্গার’ রসের রাগ।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: কল্যাণ।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৫ স্বর)।
- আরোহ: সা রে গা পা ধা সা।
- অবরোহ: সা ধা পা গা রে সা।
- বাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
- সমবাদী স্বর: ধৈবত (ধা)।
- বর্জিত স্বর: মধ্যম (মা) এবং নিষাদ (নি) আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), পঞ্চম (পা) এবং শুদ্ধ ধৈবত (ধা)।
- সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তিপ্রধান।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- দেশকার: দেশকারের স্বর ভূপালীর মতোই, কিন্তু দেশকারের ঠাট ‘বিলাবল’ এবং এর বাদী স্বর ‘ধা’, যার ফলে এটি চঞ্চল প্রকৃতির হয়।
- শুদ্ধ কল্যাণ: এর আরোহে ভূপালীর ছায়া থাকে, তবে অবরোহে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ নিষাদের বক্র প্রয়োগ দেখা যায়।
- পাহাড়ী: পাহাড়ি রাগে ভূপালীর স্বর থাকলেও এতে কোমল স্বরের সামান্য স্পর্শ এবং চলন লোকজ ধাঁচের হয়।
- মোহনম্: এটি ভূপালীর দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতের হুবহু রূপ।
- জৈৎ: স্বরগত মিল থাকলেও জৈৎ রাগের চলন ও প্রয়োগ ভিন্ন এবং এতে ঋষভ ও ধৈবত অল্প ব্যবহৃত হয়।
রাগ ভূপালী তার সরল স্বরবিন্যাস সত্ত্বেও শিল্পীর দক্ষতার পরীক্ষায় এক অনন্য মাপকাঠি। এর শুদ্ধ স্বরগুলোর মধ্য দিয়ে যে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি তৈরি হয়, তা শ্রোতাকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে দূরে নিয়ে যায়। বিশেষ করে ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কিতে ভূপালীর বিস্তার এক রাজকীয় গাম্ভীর্য তৈরি করে। শুদ্ধ ও স্বচ্ছ সংগীতের প্রতীক হিসেবে ভূপালী রাগটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের আকাশে এক ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল।
তথ্যসূত্র (Sources)
১. রাগ পরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।
৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।
৪. ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ।
৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann.