রাগ ভূপাল তোড়ী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতকালীন ভাণ্ডারে তোড়ী পরিবারের যে বৈচিত্র্যময় রূপগুলো রয়েছে, তার মধ্যে অত্যন্ত সরল, সংহত এবং অনন্য এক আধ্যাত্মিক সুষমার নাম ‘রাগ ভূপাল তোড়ী’ (বা সংক্ষেপে ভূপাল তোড়ী)। নামটিতে ‘ভূপাল’ এবং ‘তোড়ী’—দুটি অঙ্গের উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায় এর সাঙ্গীতিক চরিত্র। কল্যাণ ঠাটের অতি পরিচিত জনপ্রিয় রাগ ‘ভূপালী’-র মতোই এটি একটি ঔড়ব জাতির (পাঁচ স্বরের) রাগ, কিন্তু এতে ব্যবহৃত স্বরগুলো একেবারেই তোড়ী অঙ্গের। তোড়ী পরিবারের মূল আকর্ষণ যেখানে জটিল ও বক্র স্বরপ্রক্ষেপণ, সেখানে ভূপাল তোড়ী কেবল পাঁচটি নির্দিষ্ট স্বরের ঋজু প্রক্ষেপণে এক অদ্ভুত নীরবতা, ভক্তি এবং বৈরাগ্য রস ফুটিয়ে তোলে।

সঙ্গীত শাস্ত্রের বিভিন্ন ঘরানায় ও প্রাচীন গ্রন্থে এটি ‘ভূপাল তোড়ী’, ‘ভূপাল-তোড়ী’ কিংবা কেবল ‘ভূপালী তোড়ী’ নামেও পরিচিত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

সাঙ্গীতিক বিচারে রাগ ভূপাল তোড়ীকে তোড়ী ঠাটের অন্তর্গত একটি পেন্টাটোনিক (Pentatonic) বা ঔড়ব-ঔড়ব রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। দক্ষিণ ভারতীয় কর্নাটকী সঙ্গীতে এই রাগের সমতুল্য রূপটিকে ‘শুভপন্তুবরালী’ বা ‘ভূপালম’ রাগের কাছাকাছি ভাবকাঠামোয় বিশ্লেষণ করা হয়।

ভূপাল তোড়ীর বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তোড়ী অঙ্গের অন্যান্য ভারী রাগের মতো এতে তীব্র মধ্যম (হ্ম) কিংবা শুদ্ধ নিখাদ (নি) স্বর ব্যবহৃত হয় না। আরোহণ ও অবরোহণ উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যম ও নিখাদ সম্পূর্ণ বর্জিত হওয়ার ফলে তোড়ীর প্রথাগত ব্যাকুল গাম্ভীর্য এখানে এক স্থির, প্রশান্ত ও ধ্যায়নমগ্ন আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তরিত হয়। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে এই রাগের সুরতরঙ্গ শ্রোতার মনে জাগতিক মোহ দূর করে এক পরম বৈরাগ্য এনে দেয়।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: তোড়ী ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: গ (কোমল গান্ধার)।
  • বর্জিত স্বর: মধ্যম (ম) এবং নিখাদ (ন) স্বর দুটি আরোহণ ও অবরোহণ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (গ), পঞ্চম (প), কোমল ধৈবত (দ) এবং ষড়্‌জ (স)।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত, বৈরাগ্যময়, ব্যাকুল ও ভক্তিভাবাপন্ন।
আরোহণ: স র গ প ধ র্স
অবরোহণ: র্স ধ প গ র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র গ, র স, গ প ধ, প গ, র গ র স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

ভূপাল তোড়ীর গায়কি সরল মনে হলেও এর কারিগরি প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে তোড়ী অঙ্গের কোমল স্বরগুলোর সঠিক শ্রুতি ও আন্দোলনের ওপর।

১. তোড়ী অঙ্গের মিড় ও আন্দোলন: ভূপাল রাগের (কল্যাণ ঠাট) স্বরকাঠামো (স র গ প ধ র্স) এবং ভূপাল তোড়ীর স্বরকাঠামো একই, কিন্তু পার্থক্য হলো ভূপাল তোড়ীতে ঋষভ, গান্ধার ও ধৈবত—তিনটি স্বরই কোমল। বিশেষ করে র গ র স চরণে কোমল ঋষভ ও কোমল গান্ধারের অতি সূক্ষ্ম আন্দোলন তোড়ী অঙ্গের স্পষ্ট পরিচয় ফুটিয়ে তোলে।

২. পঞ্চম ও ধৈবতের সংগতি: বাদী স্বর কোমল ধৈবত এবং সমবাদী কোমল গান্ধার হওয়ায় সুরের কাজ প্রধানত মধ্য ও তারা সপ্তককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। গ প ধ, প গ সংগতিতে পঞ্চমের ওপর কিছুক্ষণ স্থির থাকা রাগের সৌন্দর্য বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

৩. মধ্যম ও নিখাদ বর্জনের প্রভাব: তীব্র মধ্যম না থাকার কারণে এতে মিঞাঁ কি তোড়ী বা গুর্জরী তোড়ীর মতো তীব্র তীক্ষ্ণতা থাকে না; বরং পাঁচটি স্বরের পরিষ্কার যাতায়াত সুরকে অনেক বেশি প্রশান্ত ও সংহত রূপ দান করে।

ধ্রুপদ, ধামার এবং প্রথাগত খেয়াল বন্দিশে ভূপাল তোড়ীর আসল গাম্ভীর্য ধরা পড়ে। সেতার, সরোদ, রবাব কিংবা রুদ্রবীণায় ভোরের স্নিগ্ধ প্রহরে মন্দ্র সপ্তকে এই রাগের আলাপ পরিবেশন মেহফিলে এক অপার্থিব ধ্যানমগ্ন নীরবতা ছড়িয়ে দেয়।

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভোরের প্রহরে ভূপাল তোড়ী রাগের পেন্টাটোনিক কোমল স্বরতরঙ্গ মানুষের অতি-উত্তেজিত মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শান্ত করতে অসাধারণ কাজ করে। পঞ্চমের স্থায়িত্ব এবং কোমল স্বরগুলোর মন্থর আন্দোলন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, মানসিক বিষাদ দূর করতে এবং ইতিবাচক আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ মিঞাঁ কি তোড়ী: তোড়ী পরিবারের জনক রূপ; ভূপাল তোড়ীর চেয়ে এটি অনেক বেশি ভারী, এতে সাতটি স্বর এবং তীব্র মধ্যম ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ গুর্জরী তোড়ী: তোড়ী পরিবারের আরেক সদস্য; এতেও পঞ্চম বর্জিত, তবে তীব্র মধ্যম ও নিখাদের উপস্থিতি একে ভূপাল তোড়ী থেকে আলাদা করে।
  • রাগ বিলাসখানী তোড়ী: ভৈরী ঠাটের আশ্রয়ে গীত তোড়ী অঙ্গের রাগ; এর কোমল স্বরের প্রয়োগ অনেক বেশি সজল ও ব্যাকুল।
  • রাগ ভূপালী: কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত পেন্টাটোনিক রাগ; স্বরচলন ভূপাল তোড়ীর মতো হলেও এতে সব স্বরই শুদ্ধ ব্যবহৃত হয় এবং এটি সন্ধ্যার রাগ।

উপসংহার

রাগ ভূপাল তোড়ী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভোরের প্রহরে গীত এক অনাড়ম্বর অথচ পরম আধ্যাত্মিক সুরছবি। কোনো জটিল স্বরবিন্যাস বা অলঙ্কারের বাহুল্য ছাড়াই কেবল পাঁচটি কোমল স্বরের খাঁটি প্রক্ষেপণে এটি মনের সমস্ত কলুষতা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়। ভোরের স্তব্ধতায় যখন এই রাগের ‘গ প ধ, প গ, র গ র স’-র সুরতরঙ্গ বাতাসে ডানা মেলে, তখন তা অনায়াসেই শ্রোতার হৃদয়কে এক স্নিগ্ধ, পবিত্র ও আত্মমগ্ন সুরলোকে নিয়ে যায়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — তোড়ী ঠাট ও ঔড়ব তোড়ী রূপ বিশ্লেষণ।
আরও দেখুন: