শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ-ভৈরবী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে রাগ ভৈরবী একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং জনপ্রিয় রাগ। একে অনেক সময় ‘সদাকালীন রাগ’ বা ‘সব সময়ের রাগ’ বলা হয়। ভৈরবী শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ভয়ংকরী’ বা ‘দেবী দুর্গার এক রূপ’, তবে সংগীতে এই রাগের প্রকাশ অত্যন্ত কোমল, ভক্তিপূর্ণ এবং আকুলতায় ভরা।

রাগ ভৈরবী
ঐতিহাসিকভাবে, ভৈরবী একটি অত্যন্ত প্রাচীন রাগ। প্রাচীন সংগীত গ্রন্থগুলোতে একে ‘ভৈরব’ রাগের পত্নী বা রাগিণী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মধ্যযুগে যখন রাগের শ্রেণীবিন্যাস (রাগমালিকা পদ্ধতি) প্রচলিত ছিল, তখন থেকেই ভৈরবীর স্থান ছিল প্রথম সারিতে। আধুনিক ঠাট পদ্ধতিতে এটি ভৈরবী ঠাটের আশ্রয়ী রাগ। এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, শাস্ত্রীয় সংগীতে যেকোনো জলসা বা কনসার্ট সাধারণত ভৈরবী পরিবেশনের মাধ্যমেই সমাপ্ত করা হয়। এটি যেন সংগীতের পূর্ণতা ও বিদায়ের এক শান্ত সুর।

ভৈরবীর প্রধান বিশেষত্ব হলো এর ১২টি স্বরের ব্যবহারযোগ্যতা। যদিও শুদ্ধ ও শাস্ত্রীয় ভৈরবীতে ৪টি স্বর কোমল থাকে, তবে উপ-শাস্ত্রীয় সংগীত (ঠুমরি, দাদরা, গজল) গাওয়ার সময় শিল্পীরা অত্যন্ত কুশলতার সাথে ১২টি স্বরই ব্যবহার করেন, যাকে ‘মিশ্র ভৈরবী’ বলা হয়। এটি এমন এক রাগ যা ভক্তি, শৃঙ্গার (প্রেম) এবং করুণ—সব ধরণের রস প্রকাশে সমানভাবে সক্ষম।
রাগের শাস্ত্র
- ঠা্ট: ভৈরবী।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে ৭টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা ঋা গা মা পা দ্া না র্সা
- অবরোহ: র্সা না দ্া পা মা গা ঋা সা
- বাদী স্বর: কোমল মধ্যম (মা) [তবে অনেক ঘরানায় কোমল ধৈবত (দ্া)-কেও বাদী হিসেবে ধরা হয়]।
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা) বা কোমল ঋষভ (ঋা)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত ও নিষাদ—এই চারটি স্বরই কোমল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মধ্যম, পঞ্চম ও ষড়জ শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোরবেলা)। তবে প্রথা অনুযায়ী যেকোনো সংগীত অনুষ্ঠানের শেষে (তা যেকোনো সময়েই হোক না কেন) ভৈরবী গাওয়ার নিয়ম আছে।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত করুণ, শান্ত, গভীর এবং ভক্তিমূলক।
আধুনিক গানে রাগ ভৈরবী :
রাগ ভৈরবী বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। বিরহ, আকুতি কিংবা শাশ্বত প্রেমের সুর ফুটিয়ে তুলতে সুরকাররা বারবার এই রাগের আশ্রয় নিয়েছেন। নিচে আপনার উল্লেখ করা গানগুলোর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:
- তুমি নিজের মুখেই বললে যেদিন – এই গানটি মান্না দের কণ্ঠে এক বিষণ্ণ প্রেমের আখ্যান। ভৈরবী রাগের কোমল স্বরগুলো এখানে হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। শিল্পী: মান্না দে, সুরকার: প্রভাস দে, গীতিকার: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়
- কতকাল দেখিনি তোমায় – ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত এই গানটি প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এক কালজয়ী সৃষ্টি। প্রিয়জনকে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ভৈরবীর সুরে এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। শিল্পী: প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরকার: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গীতিকার: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশকাল: ১৯৭৪
- আশায় আশায় বসে আছি : বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের ইতিহাসে রাগ ভৈরবীর এক অনন্য ও আধুনিক প্রয়োগ দেখা যায় এই গানে। মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ড প্রথাগত ভৈরবীকে নাগরিক জীবনের প্রেক্ষাপটে নতুন রূপ দিয়েছে। ব্যান্ড: মহীনের ঘোড়াগুলি, অ্যালবাম: মায়া (১৯৯৭), কথা ও সুর: গৌতম চট্টোপাধ্যায়
আধুনিক গানে রাগ ভৈরবী :
১. যারে বলছ মাগি মাগি (লালন সাঁই)
নজরুল সঙ্গীতে রাগ ভৈরবী :
নজরুলের ৬০ টির বেশি গান রয়েছে ভৈরবী রাগে। তার কয়েকটি তুলে দিলাম।
- মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম (হিন্দু-মুসলমান)
- আল্লাহ্ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
- নিশীথ নিঝুম ঘুমে ঝিমায়
- না মিটিতে সাধ মোর নিশি পোহায়
- এ কুঞ্জে পথ ভুলি কোন বুলবুলি আজ গাইতে এলে গান
- তিমির বিদারী অলখ-বিহারী কৃষ্ণ মুরারি আগত ঐ
- ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন
- ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ
- তুমি চ’লে যাবে দূরে লায়লী
- নাচে সুনীল দরিয়া আজি
- জাগো জাগো রে মুসাফির
- বকুল ছায়ে ছিনু ঘুমায়ে
- মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি পরমেশ্বরী কালিকা

রিলেটেড বা সম্পর্কিত রাগসমূহ
- রাগ বিলাসখানি টোড়ী: ভৈরবীর সবকটি স্বর ব্যবহৃত হলেও এর চলন ও মীড় টোড়ী অঙ্গের গাম্ভীর্য বহন করে।
- রাগ আশাবরী: ভৈরবীর সাথে এর সামঞ্জস্য থাকলেও আশাবরীতে ঋষভ শুদ্ধ হয়।
- রাগ মালকোশ: ভৈরবীর ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত করলে মালকোশের কাঠামো পাওয়া যায়।
- রাগ ভূপাল টোড়ী: ভৈরবীর আরোহণে মধ্যম ও নিষাদ বর্জিত করলে এই রাগের আভাস পাওয়া যায়।
- রাগ বসন্ত মুখারী: আরোহণে ভৈরব এবং অবরোহণে ভৈরবীর মিশ্রণে এই রাগটি তৈরি।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
