হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ মঙ্গল ভৈরব । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ওস্তাদ বাহাদুর খান, মাইহার ঘরানা

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল প্রাঙ্গণে রাগ মঙ্গল ভৈরব (Mangal Bhairav) একটি অত্যন্ত গম্ভীর, পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক রাগ। নাম থেকেই অনুমেয় যে এটি ‘ভৈরব’ অঙ্গের একটি রাগ। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থ কল্যাণ বা শুভ, আর ভৈরব হলো আদি ও গম্ভীর রাগ। এই দুইয়ের সংমিশ্রণে রাগ মঙ্গল ভৈরব শ্রোতার মনে এক ধরণের প্রশান্তি ও শুভ্রতার উদ্রেক করে।

রাগ মঙ্গল ভৈরব

রাগ মঙ্গল ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ মঙ্গল ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি মিশ্র বা সংকর রাগ। এটি মূলত ‘ভৈরব’ এবং ‘আহির ভৈরব’-এর এক অপূর্ব শৈল্পিক সংমিশ্রণ। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের চলন, যা একে শুদ্ধ ভৈরব থেকে পৃথক করে। ভৈরব রাগের গম্ভীর প্রকৃতির সাথে যখন কিছুটা কোমল ও মিষ্ট স্বরবিন্যাস যুক্ত হয়, তখনই মঙ্গল ভৈরবের রূপটি ফুটে ওঠে।

ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি খুব প্রাচীন না হলেও আধুনিক হিন্দুস্তানি সংগীতের প্রসারের সাথে সাথে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক সংগীতজ্ঞ মনে করেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পণ্ডিত ও ওস্তাদদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে এই রাগের জন্ম। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের সময় গীত হয়। এই রাগে ভক্তির সাথে সাথে এক ধরণের ‘আর্তি’ বা সমর্পণের ভাব থাকে, যা একে ভজন বা খেয়াল গায়কির জন্য অত্যন্ত উপযোগী করে তুলেছে। বিশেষ করে মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে এই রাগের বিস্তার অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ শোনায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাটে: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
  • বাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ R কোমল এবং নিষাদ n কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, ধা) শুদ্ধ। (উল্লেখ্য যে, শুদ্ধ ভৈরবে ধৈবত কোমল হয়, কিন্তু মঙ্গল ভৈরবে ধৈবত শুদ্ধ রাখা হয়—এটিই এর প্রধান চাবিকাঠি)।
  • সময়: প্রাতঃকাল বা দিনের প্রথম প্রহর (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং অত্যন্ত ভক্তি রসপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: মঙ্গল ভৈরবের মূল ভিত্তি; তবে ভৈরবে ধৈবত কোমল হয়, যা এখানে শুদ্ধ।
  • রাগ আহির ভৈরব: এই রাগের সাথে মঙ্গল ভৈরবের গভীর মিল রয়েছে, কারণ উভয় রাগে কোমল ঋষভ ও কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ নট ভৈরব: স্বরবিন্যাসের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য থাকলেও নট ভৈরবে নিষাদ শুদ্ধ ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ বসন্ত মুখরি: এই রাগে ধৈবত কোমল হয়, যা মঙ্গল ভৈরব থেকে একে আলাদা করে।
  • রাগ কলিঙ্গড়া: চলন ও মেজাজের দিক থেকে মিল থাকলেও কলিঙ্গড়াতে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়।

রাগ মঙ্গল ভৈরব হলো ভারতীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক কল্যাণময় আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। এর কোমল ঋষভ এবং শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার গায়কিতে এক বিশেষ আভিজাত্য এনে দেয়। শুদ্ধ চিত্তে এই রাগের আলাপ শুনলে বা গাইলে তা শিল্পী ও শ্রোতা উভয়কেই এক অপার্থিব শান্তির জগতে নিয়ে যায়। আধ্যাত্মিক সাধনা ও সংগীতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে এই রাগের চর্চা আজও উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরগুলোতে স্বগৌরবে টিকে আছে।

তথ্যসূত্র:

১/ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ২ ও ৩): ভৈরব অঙ্গের রাগসমূহের ব্যাকরণগত ভিত্তির জন্য।

২/ বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের প্রামাণ্য উৎস।

৩/ বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪/ Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।

৫/ পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের চলন ও সূক্ষ্ম স্বর প্রয়োগের তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য।

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।