রাগ মন্ড ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল ভৈরব পরিবারে রাগ মন্ড ভৈরব (Mand Bhairav) একটি অত্যন্ত শ্রুতিমধুর, আধুনিক এবং শৈল্পিক মিশ্র রাগ। এটি মূলত দুটি ভিন্ন প্রকৃতির সুরের এক অপূর্ব সমন্বয়—রাজস্থানি লোকসংগীতের প্রাণ ‘মাণ্ড’ (বা মন্ড) এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের আদি গম্ভীর রাগ ‘ভৈরব’। এই দুই রাগের মিলনে এমন এক সুরমূর্তির সৃষ্টি হয় যা একইসাথে ভৈরবের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য এবং মাণ্ড রাগের চপল মিষ্টতাকে ধারণ করে।

রাগ মন্ড ভৈরব

রাগ মন্ড ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ মন্ড ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত একটি মিশ্র রাগ। এটি একটি ‘আধুনিক’ রাগ হিসেবে পরিচিত, যার প্রসারে বিংশ শতাব্দীর প্রথিতযশা সংগীতজ্ঞদের বিশেষ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা এই ধরণের মিশ্র রাগগুলোকে বিশ্বদরবারে জনপ্রিয় করেছেন। এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর চলনে ভৈরব রাগের কোমল ঋষভ (রে) এবং কোমল ধৈবত (ধা)-এর গম্ভীর মেজাজ বজায় থাকলেও, মাণ্ড রাগের বিশেষ ঢঙের কারণে এতে একটি লোকজ মিষ্টতা ও প্রসন্নতা ফুটে ওঠে।

এই রাগের গায়নশৈলী অত্যন্ত নমনীয়। সাধারণত ভৈরব রাগের আলাপ ও বিস্তার অত্যন্ত গম্ভীর হয়, কিন্তু মন্ড ভৈরবে স্বরের বিন্যাস কিছুটা বক্র এবং ললিত প্রকৃতির। এতে ভৈরবের বৈরাগ্য যেমন আছে, তেমনি একটি উৎসবমুখর প্রভাতের আনন্দও বিদ্যমান। এটি মূলত একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের সময় গীত হয়। হালকা খেয়াল, চতুরঙ্গ এবং বিশেষ করে ভজন গায়কির জন্য এই রাগটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে গা মা পা ধা নি সা।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা মা গা রে সা।
  • বাদী স্বর: ধা (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: রে (কোমল ঋষভ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ এবং ধৈবত কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা, নি) শুদ্ধ। (দ্রষ্টব্য: মাণ্ড অঙ্গের কারণে অনেক সময় কোমল নিষাদ ও তীব্র মধ্যমের সূক্ষ্ম ছোঁয়া বক্রভাবে ব্যবহৃত হতে পারে)।
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: প্রসন্ন, শান্ত এবং ভক্তি রসপ্রধান।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: এই রাগের মূল আধার এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
  • রাগ মাণ্ড (Mand): এই রাগের বিশেষ চলন ও লোকজ মিষ্টতা মন্ড ভৈরবের প্রাণ।
  • রাগ কলিঙ্গড়া: কলিঙ্গড়ার চপলতা ও মন্ড ভৈরবের প্রসন্ন মেজাজের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
  • রাগ নট ভৈরব: নট ভৈরবে শুদ্ধ ঋষভ ব্যবহৃত হয়, যা মন্ড ভৈরব থেকে একে আলাদা করে।
  • রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও অহির্ ভৈরবে কোমল নিষাদ প্রধান স্বর হিসেবে কাজ করে।

 

রাগ মন্ড ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক উজ্জ্বল ও আনন্দময় আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর মাণ্ড রাগের লোকজ লাবণ্য—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। সঠিক আন্দোলন ও বিশেষ চলনের মাধ্যমে এই রাগটি যখন পরিবেশিত হয়, তখন তা শ্রোতা ও শিল্পী উভয়কেই এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতের সন্ধান দেয়। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে মন্ড ভৈরব আজও তার স্বকীয় আভিজাত্য ও শ্রুতিমাধুর্য নিয়ে স্বগৌরবে টিকে আছে।

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (ক্রমিক পুস্তক মালিকা, খণ্ড ৩): ভৈরব অঙ্গের মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (সংগীত কার্যালয়, হাতরস): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও নামকরণের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪. পণ্ডিত রবিশঙ্কর — ‘মাই মিউজিক, মাই লাইফ’: আধুনিক মিশ্র রাগসমূহের সৃষ্টি ও প্রয়োগ পদ্ধতি বোঝার জন্য।

৫. জোপ বোর — ‘দ্য রাগ গাইড’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও নোটেশন যাচাইয়ের জন্য।

আরও দেখুন: