রাগ মুলতানি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ মুলতানি (যা অনেক সময় মুলতানি তোড়ি নামেও পরিচিত) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম গভীর, গম্ভীর এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রাগ।

রাগ মুলতানি

রাগ মুলতানি: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ মুলতানি তোড়ি ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। এর নামের সাথে ‘মুলতান’ (বর্তমান পাকিস্তানের একটি প্রাচীন শহর) শহরের যোগসূত্র থাকায় ধারণা করা হয় যে, এর আদি উৎস ওই অঞ্চলের লোকসংগীত। এটি একটি অপরাহ্ণকালীন বা বিকেলের রাগ। এই রাগটি তোড়ি রাগের স্বরবিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও এর চলন এবং তানের কাজ একে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ দান করে।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) বর্জিত থাকে, কিন্তু অবরোহে সেগুলো অত্যন্ত করুণভাবে ব্যবহৃত হয়। কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, কড়ি মধ্যম এবং কোমল ধৈবতের সংমিশ্রণ এই রাগে এক প্রকার তপ্ত বা দহনময় অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এটি মূলত বৈরাগ্য ও শান্ত রসের রাগ।

রাগের শাস্ত্র

রাগ মুলতানির শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: তোড়ি।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: নি সা গ্‌ ম্ প নি সঁ (এখানে ‘গ’ কোমল এবং ‘ম’ কড়ি। আরোহে রে ও ধ বর্জিত)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ্ প ম্ গ্‌ র্রে সা (এখানে রে, গ, ধ—কোমল এবং ম—কড়ি)।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), গান্ধার (গ) ও ধৈবত (ধ) হলো কোমল; মধ্যম (ম) হলো কড়ি বা তীব্র; এবং নিষাদ (নি) ও ষড়জ (সা) হলো শুদ্ধ
  • সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা অপরাহ্ণ (বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ এবং শান্ত।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

মুলতানি রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ তোড়ি: তোড়ি এবং মুলতানির স্বর একই হলেও তোড়ি সকালে গাওয়া হয় এবং এর চলনে ঋষভ ও ধৈবতের প্রাধান্য বেশি থাকে।
  • রাগ মধুবন্তী: মধুবন্তীতে শুদ্ধ ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মুলতানিতে এই দুটি স্বরই কোমল।
  • রাগ গুর্জরী তোড়ি: গুর্জরী তোড়িতে পঞ্চম (প) বর্জিত, কিন্তু মুলতানিতে পঞ্চম হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা বাদী স্বর।
  • রাগ মিয়াঁ কি তোড়ি: এটি সকালে গাওয়া হয় এবং এর আরোহে ঋষভ বর্জিত থাকে না, যা একে মুলতানি থেকে পৃথক করে।

 

রাগ মুলতানি তার সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং বিকেলের বিষণ্ণতাকে সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার জন্য সংগীত জগতে অনন্য। এই রাগটি গাওয়ার সময় কড়ি মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়ার যে চলন, তা শ্রোতার মনে এক ধরণের অপার্থিব ব্যাকুলতা তৈরি করে। এটি এমন একটি রাগ যা আয়ত্ত করতে গায়ককে প্রচুর ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশালতা ও গভীরতা বুঝতে মুলতানি রাগের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত।

৪. রাগ তত্ত্ব ও রূপায়ন — বিভিন্ন প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় সংগীত পাঠ্যক্রম।

আরও দেখুন: