ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে যে কটি রাগ মানুষের মনে গভীর ভক্তি ও প্রশান্তি জাগিয়ে তোলে, তাদের মধ্যে রাগ ললিত অন্যতম। এটি একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। ললিত রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর সময়কাল এবং স্বর প্রয়োগের বৈচিত্র্য। এটি মূলত শেষ রাত্রি বা সূর্যোদয়ের ঠিক আগের সময়কার (সন্ধিপ্রকাশ কালীন) রাগ। যখন প্রকৃতির অন্ধকার কেটে আলোর রেখা দেখা দেয়, সেই মুহূর্তের একাকিত্ব এবং পরমাত্মার প্রতি ব্যাকুলতা এই রাগের প্রতিটি স্বরে ধ্বনিত হয়।
রাত্রি যত শেষের দিকে যায়, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তত উত্তরঙ্গ (সপ্তকের উপরের অংশ) প্রধান হতে থাকে। ললিত রাগের চলনও সেভাবেই সপ্তকের উপরের দিকে দানা বাঁধে। এই রাগের তার সপ্তকের ষড়জ (সা) ও কোমল ঋষভ (রে) যখন প্রস্ফুটিত হয়, তখন তা শ্রোতার হৃদয়কে এক গভীর আর্তিতে স্পর্শ করে। এছাড়া ধৈবত ও মধ্যমের বিশেষ সংযোগ ললিতের মাধুর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রাগ ললিত
রাগের শাস্ত্র (ললিত)
ললিত রাগের শাস্ত্রীয় পরিচয় নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে, যা একে আরও রহস্যময় ও সমৃদ্ধ করেছে।
- ঠাট: বর্তমানে এটি মূলত পূরবী ঠাটের অন্তর্গত বলে ধরা হয় (কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবতের ব্যবহারের কারণে)। তবে এর আদি রূপ ছিল মারোয়া ঠাটের (কোমল ঋষভ ও শুদ্ধ ধৈবত)। আবার অনেক বিশেষজ্ঞ একে ভৈরব ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করারও যুক্তি দেন।
- জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে ৬টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স, ঋ (কোমল), গ, ম (শুদ্ধ), ম (কড়ি), ম (শুদ্ধ), গ, ম (কড়ি), ধ (কোমল), ন, স।
- অবরোহ: স, ন, ধ (কোমল), ম (কড়ি), ম (শুদ্ধ), গ, ম (শুদ্ধ), ঋ (কোমল), স।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (ম)।
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (স)।
- বর্জিত স্বর: পঞ্চম (প)—আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ), শুদ্ধ গান্ধার (গ), দুইটি মধ্যম (শুদ্ধ ও কড়ি), কোমল ধৈবত (ধ) এবং শুদ্ধ নিষাদ (ন)।
- সময়: শেষ প্রহর ও দিনের প্রথম প্রহরের সন্ধিক্ষণ (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৬টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং আধ্যাত্মিক রসপ্রধান।
ললিতের চলন:
১. মধ্যম-প্রধান চলন (ললিতের প্রাণ)
এই চলনটি ললিত রাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে দুই মধ্যমের খেলা দেখা যায়:
নি সা, রে (কোমল) গা, মা মা, মে মা, গা মা, রে (কোমল) সা
এখানে ‘মা মা, মে মা’ অংশটি ললিতের সিগনেচার। শুদ্ধ মধ্যম থেকে কড়ি মধ্যমে গিয়ে পুনরায় শুদ্ধ মধ্যমে ফিরে আসা এই রাগের প্রধান পরিচয়।
২. উত্তরঙ্গ বা তার সপ্তকের চলন
আপনি যেমনটি বলেছিলেন, ললিত তার সপ্তকের দিকে এগিয়ে গিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে যায়:
মা ধা নি সা (তার), রে (কোমল তার) নি সা (তার), ধা নি ধা মা, মে মা
এই অংশে তার সপ্তকের সা ও রে (কোমল)-এর অবস্থান শ্রোতার মনে এক ধরণের আকুলতা তৈরি করে।
৩. ধৈবত ও মধ্যমের সংযোগ
ধৈবত থেকে মধ্যমে নেমে আসার এই ভঙ্গিটি ললিতের গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তোলে:
সা, নি ধা, মা মে মা, গা মা, রে (কোমল) সা
এখানে ‘নি ধা, মা’—এই স্বরসংগতিটি ললিতের বিশেষ মাধুর্য সৃষ্টি করে।
ললিতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো দুইটি মধ্যমের পরপর ব্যবহার। শুদ্ধ মধ্যম থেকে কড়ি মধ্যমে গিয়ে আবার শুদ্ধ মধ্যমে ফিরে আসার এই চলন এবং তার সাথে ধৈবতের মেলবন্ধনই ললিতকে অনন্য করে তোলে। পঞ্চমহীন এই রাগের শূন্যতা কড়ি ও শুদ্ধ মধ্যমের সংমিশ্রণে এক অলৌকিক পূর্ণতা পায়। ভোরের আলোর সাথে এই রাগের মিলন আত্মার মুক্তির এক আবাহন হিসেবে কাজ করে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে ললিতের সুরলহরী যখন তার সপ্তকের ঋষভে গিয়ে স্থির হয়, তখন তা জাগতিক কোলাহল ছাপিয়ে এক পরম শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়।
সহজ ললিত পরিচিতি:
যেকোনো রাগের ব্যাকরণগত জটিলতা এড়িয়ে এর মূল ‘ছাঁচ’ বা অবয়বটি মস্তিষ্কে গেঁথে নেওয়ার জন্য রাগাশ্রয়ী হালকা গান বা আধুনিক গান শোনা অত্যন্ত কার্যকর কৌশল; কারণ শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের আলাপ বা বিস্তারের গাম্ভীর্য অনেক সময় সাধারণ কানে ধরা কঠিন হলেও, আধুনিক বা নজরুল সংগীতের মতো গানে রাগের প্রধান চলনগুলো একটি সংক্ষিপ্ত ও সুমধুর কাঠামোর মধ্যে পরিবেশিত হয়। এই গানগুলোতে রাগের জটিল মারপ্যাঁচের চেয়ে তার ‘ভাব’ ও ‘মুখ্য স্বরসংগতি’ (যেমন ললিতের দুই মধ্যম বা মল্লারের আন্দোলিত গান্ধার) বারবার ফিরে আসে, যা শ্রোতার অবচেতন মনে রাগের একটি স্থায়ী মানচিত্র তৈরি করে দেয়। ফলে পরবর্তীতে যখন সেই একই রাগের ভারী খেয়াল বা ধ্রুপদ শোনা হয়, তখন মস্তিষ্ক দ্রুত সেই পরিচিত সুরের ছাঁচটিকে শনাক্ত করতে পারে, যা মূলত একজন শিক্ষার্থীর ‘কান তৈরি’ করার প্রাথমিক ও সবচেয়ে সহজ ধাপ।
এবার শাস্ত্র কপচানো বাদ দিয়ে কিছু গান বাজনা শোনা যাক ..
কণ্ঠে ললিত:
কাজী নজরুল ইসলামের গানে ললিত:
কাজী নজরুল ইসলামের অসংখ্য গান নিবিড়ভাবে রাগাশ্রয়ী। নজরুলের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যখন কোনো নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে সুরারোপ করেছেন, তখন সেই রাগের মূল চলন ও গাম্ভীর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর গানগুলো খুব একটা রাগভ্রষ্ট হয় না বলেই শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষার্থী বা সাধারণ শ্রোতাদের ‘কান তৈরি’ করার ক্ষেত্রে এগুলো অসামান্য ভূমিকা রাখে। রাগের শুদ্ধ রূপটি চেনার জন্য নজরুলের গানগুলো তাই একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
১. পিউ পিউ বিরহী পাপিয়া বলে: জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী (এবং পরবর্তীতে আরও অনেকে)। এই গানটিতে রাগ ললিতের সেই ভোরের বিষণ্ণতা এবং আধ্যাত্মিক আর্তি হুবহু ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে গানের প্রসারে ও তানের কাজে ললিতের দুই মধ্যমের সূক্ষ্ম প্রয়োগ এবং কোমল ঋষভ ও ধৈবতের কারুকাজ অত্যন্ত নিখুঁত। জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামীর দরাজ কণ্ঠে এই গানটি ললিত রাগের একটি আদর্শ ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে ললিত:
কবিগুরু অনেক সময় শাস্ত্রীয় রাগের কাঠামোকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেও সুরের প্রয়োজনে প্রায়ই রাগের ধরাবাঁধা ব্যাকরণ অতিক্রম করে গেছেন, যার ফলে তাঁর গানগুলো অনেক সময় বিশুদ্ধ ‘রাগাশ্রয়ী’ উদাহরণের নয়।
১. ডুবি অমৃতপাথারে (যাই ভুলে চরাচর): ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে (১২৯১ বঙ্গাব্দ) রচিত এবং ইন্দিরা দেবী কর্তৃক স্বরলিপিকৃত এই গানটি রাগ ললিত ও চৌতালের আশ্রয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক আর্তি প্রকাশ করে।
২. বর্ষ গেল, বৃথা গেল, কিছুই করি নি হায়: ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে (১২৯৩ বঙ্গাব্দ) রচিত এই গানটিতে ললিত রাগের বিষণ্ণ সুরকাঠামো ব্যবহার করে সময়ের অপচয় ও আত্মলানির এক করুণ আর্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
৩. প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে: ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৭ বঙ্গাব্দ) রচিত এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক স্বরলিপিকৃত এই গানটি আড়াঠেকা তালে নিবদ্ধ ললিত রাগের এক প্রশান্ত ও ভক্তিভরা রূপ।
আধুনিক বাংলা গানে ললিত:
আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে রাগ ললিতের প্রয়োগ মূলত নাগরিক একাকীত্ব, ভোরের নিস্তব্ধতা বা গভীর কোনো জীবনবোধ ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে।
১. জাগে জাগে রাত (শিল্পী ও সুরকার: কবীর সুমন): কবীর সুমনের এই গানটিতে রাগ ললিতের আধুনিক ও নাগরিক এক অবয়ব ফুটে উঠেছে, যেখানে ভোরের আলোর অপেক্ষায় থাকা এক নির্ঘুম রাতের হাহাকারকে ললিতের সেই ‘দুই মধ্যম’ ও ‘কোমল ঋষভ’-এর চলন দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধরা হয়েছে।
২. ভোর হল যেই এল কি সেই (শিল্পী: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়): মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের এই রাগাশ্রয়ী আধুনিক গানটি ললিত রাগের একটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং শ্রুতিমধুর উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।
৩. নিশি অবসান হল (শিল্পী: পান্নালাল ভট্টাচার্য): শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতিতে ললিত রাগের এক অসামান্য প্রয়োগ এই গানে পাওয়া যায়, যেখানে ভোরের প্রার্থনার সাথে রাগের গম্ভীর প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
৪. স্বপনে যদি আসে (শিল্পী: সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়): রাগ ললিতের আধারে তৈরি এই আধুনিক গানটিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গায়কী রাগের সেই আর্তি ও কোমল স্বরের কারুকাজকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ললিতের উপরে প্লেব্যাক:
চলচ্চিত্রের গানে রাগ ললিতের প্রয়োগ মূলত গভীর বিষাদ, আধ্যাত্মিক আর্তি অথবা কোনো ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে।
১. বাড়ি ধীরে জালি র্যায়না (চলচ্চিত্র: ইশকিয়া, ২০১০): বিশাল ভরদ্বাজের সুরারোপিত এবং রেখা ভরদ্বাজের গাওয়া এই গানটি আধুনিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাগ ললিতের এক অনন্য প্রয়োগ। গানের প্রারম্ভেই ললিতের সেই ‘দুই মধ্যম’-এর খেলা এবং রেখা ভরদ্বাজের সুফিয়ানা গায়কী ভোরের নির্জনতাকে এক গভীর একাকীত্বের রূপ দিয়েছে।
২. এক শ্যাহেনশাহ নে বানওয়ায়া (চলচ্চিত্র: লিডার, ১৯৬৪): নওশাদ আলীর কালজয়ী সুরে লতা মঙ্গেশকর ও মোহাম্মদ রফির গাওয়া এই গানটি তাজমহলের অমর প্রেমের প্রতীক হিসেবে ললিত রাগের রাজকীয় ও গম্ভীর রূপটি তুলে ধরে। লতা জির কণ্ঠে তার সপ্তকের ঋষভের কাজগুলো ললিতের সেই ‘হৃদয় খামচে ধরা’ ভাবটি হুবহু ফুটিয়ে তোলে।
৩. প্রীতম দরশ দেখাও (চলচ্চিত্র: চাচা জিন্দাবাদ, ১৯৫৯): মদন মোহনের সুরে মান্না দে-র গাওয়া এই গানটি ললিত রাগের একটি শাস্ত্রীয় ঘরানার সার্থক প্রয়োগ। মান্না দে-র দরাজ কণ্ঠে ললিতের আরোহ-অবরোহ এবং জটিল তানগুলো এত নিখুঁতভাবে ফুটেছে যে, এটি রাগ শেখার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।
গজলে ললিত:
গজলের ভাব বা মেজাজ ফুটিয়ে তুলতে রাগ ললিতের ‘কোমল ঋষভ’ ও ‘দুই মধ্যমের’ ব্যবহার এক গভীর আর্তি ও একাকীত্বের আবহ তৈরি করে। ললিতের বিষণ্ণ প্রকৃতি ভোরের বিরহী মেজাজের সাথে মিশে গজলকে এক নতুন উচ্চতা দেয়।
১. কোই পাস আয়া সওয়েরে সওয়েরে (শিল্পী ও সুরকার: জগজিৎ সিং): অ্যালবাম: প্যাশন / মিরাজ (The Miraj)। জগজিৎ সিং তাঁর স্বভাবসুলভ ধীর ও গম্ভীর গায়কীতে এই গজলে ললিত রাগের এক অত্যন্ত প্রশান্ত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। গজলের কথাগুলো যখন ভোরের (সওয়েরে) আবাহন জানায়, তখন ললিতের সেই ‘শুদ্ধ ও কড়ি মধ্যমের’ খেলা শ্রোতার মনে ভোরের আলো-আঁধারির এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ করে ‘সওয়েরে সওয়েরে’ শব্দ দুটিতে ললিতের যে চলন ব্যবহৃত হয়েছে, তা এই রাগের শুদ্ধ রূপটিকেই তুলে ধরে।
ভজনে ললিত:
ভজন গায়কীতে রাগ ললিত-এর প্রয়োগ মূলত পরমাত্মার প্রতি একাত্মতা এবং ভোরের প্রার্থনার আকুলতা ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়। ভজনে ললিতের শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতি ভক্তের হৃদয়ে এক অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি তৈরি করে।
১. তু দয়ালু দীন হঁউ (সন্তু তুলসীদাসের ভজন – বিভিন্ন শিল্পী): তুলসীদাসের এই কালজয়ী ভজনটি অনেক গুণী শিল্পী রাগ ললিতের আধারে পরিবেশন করেছেন। ভোরের নিস্তব্ধতায় যখন এই ভজনটি গাওয়া হয়, তখন ললিতের ‘কোমল ঋষভ’ ও ‘ধৈবত’ ঈশ্বরের চরণে আত্মসমর্পণ বা শরণাগতির এক অলৌকিক আবহ তৈরি করে।
খেয়ালে ললিত:
খেয়াল গায়কীতে রাগ ললিত-এর বিস্তার সবচেয়ে গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক। এই রাগের সেই ‘হৃদয় খামচে ধরা’ আর্তি এবং দুই মধ্যমের সূক্ষ্ম কাজগুলো খেয়ালিয়াদের কণ্ঠে এক অনন্য মাত্রা পায়।
১. ওস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা): অতি বিলম্বিত লয়ে তাঁর গমকপ্রধান বিস্তার এবং মেরুখণ্ডের মতো স্বরপ্রয়োগে ললিতের সেই অতলান্ত গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আর্তি এই রাগের ইতিহাসে এক শ্রেষ্ঠ মাইলফলক।
২. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র ঘরানা): তাঁর প্রগাঢ় আবেগীয় গায়কীতে ললিতের ‘কোমল ঋষভ’ ও ‘ধৈবত’-এর আন্দোলন যখন আর্তনাদের মতো ধ্বনিত হয়, তখন তা শ্রোতার অন্তরাত্মাকে নাড়া দিয়ে যায়।
৩. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা): কিরানা ঘরানার তান ও সরগমের জাদুকরী প্রয়োগে ললিতের বিষণ্ণতা ও ভোরের শুদ্ধতাকে তিনি এক প্রবল তেজস্বী ও ভক্তিভরা রূপে উপস্থাপন করেছেন।
৪. ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা): তাঁর দরাজ ও উদাত্ত কণ্ঠে ললিতের নোম-তোম আলাপ এবং ধ্রুপদী অঙ্গের বিস্তার রাগটির আদি ও বীরত্বব্যঞ্জক আভিজাত্যকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে।
৫. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): তাঁর অতি সূক্ষ্ম ও মখমলি গায়কীতে ললিতের দুই মধ্যমের কারুকাজ এবং তার সপ্তকের ঋষভে স্থিতি ভোরের একাকীত্ব ও পরমাত্মার প্রতি ব্যাকুলতাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
যন্ত্রে ললিত:
সেতারে ললিত:
সেতারে রাগ ললিত-এর মাধুর্য ও গাম্ভীর্য অনুধাবনের জন্য নিচে ৫টি কালজয়ী ও প্রামাণ্য রেকর্ডিংয়ের তালিকা দেওয়া হলো।
১. ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): গায়কী অঙ্গের অপূর্ব কারুকাজে সাজানো এই রেকর্ডিংটিতে ললিতের ‘শুদ্ধ ও কড়ি মধ্যম’-এর সূক্ষ্ম মীড় এবং দ্রুত তানের কাজ রাগটির আধুনিক ও বলিষ্ঠ রূপকে তুলে ধরে।
২. ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারের তারে ললিতের কোমল স্বরগুলোর আন্দোলন এতটাই মায়াবী যে মনে হয় কোনো দক্ষ কণ্ঠশিল্পী ভোরের করুণ আর্তি গাইছেন, যা এই রাগের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল।
৩. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): মন্টেরি পপ ফেস্টিভ্যাল বা তাঁর বিভিন্ন লাইভ কনসার্টে বাজানো এই ললিতের আলাপে ভোরের ধীরস্থির প্রশান্তি এবং মাইহার ঘরানার বিশেষ ‘জোড়’ ও ‘ঝালা’র কাজ ললিতকে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য দিয়েছে।
৪. ওস্তাদ নিখিল ব্যানার্জী (মাইহার ঘরানা): অত্যন্ত পরিশীলিত ও আধ্যাত্মিক এই বাদনে ললিতের বিষণ্ণতা ও শুদ্ধতা হুবহু বজায় রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্বর ভোরের আলোর মতো ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়।
৫. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জী (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর অতি দ্রুত ও নিখুঁত তানের কাজের মধ্যেও ললিতের গাম্ভীর্য ও ‘কোমল ঋষভ’-এর প্রয়োগ এতটাই প্রামাণ্য যে এটি উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পাঠ্যপুস্তক সদৃশ রেকর্ডিং।
সরদে ললিত:
সরোদের গম্ভীর ও অনুরণিত (Resonant) আওয়াজ রাগ ললিতের আধ্যাত্মিক এবং অন্তর্মুখী মেজাজ ফুটিয়ে তোলার জন্য আদর্শ।
১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): মাইহার ঘরানার এই খলিফার সরোদে ললিতের আলাপ ও ধীর গতির কাজগুলোতে ভোরের নিস্তব্ধতা এবং ‘কোমল ঋষভ’-এর যে মায়াবী মীড় ফুটে ওঠে, তা শ্রোতাকে এক গভীর ধ্যানমগ্নতায় নিয়ে যায়।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর প্রখর রাধিকামোহন মৈত্রীয় ঘরানার বাদনশৈলীতে ললিতের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং ‘শুদ্ধ ও কড়ি মধ্যম’-এর নির্ভুল প্রয়োগ রাগটির ব্যাকরণগত সৌন্দর্যকে এক অনন্য উচ্চতায় দান করেছে।
৩. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর আঙুলের দ্রুত কাজ এবং সরোদের তারে ললিতের সেই ‘হৃদয় খামচে ধরা’ আর্তি আধুনিক সরোদ বাদনের ইতিহাসে এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শ্রুতিমধুর উদাহরণ।
৪. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের পিতার এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংয়ে ললিতের অত্যন্ত প্রাচীন ও গম্ভীর এক অবয়ব পাওয়া যায়, যা রাগের আদি রূপটি বুঝতে সাহায্য করে।
৫. পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ ও অভিষেক লাহিড়ী (যুগলবন্দী): সরোদের সমকালীন এই মেলবন্ধনে ললিতের সেই ভোরের বিষণ্ণতা এবং তালের বৈচিত্র্য এক নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।
ললিতের টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং স্বরের চলাফেরা গভীরভাবে বোঝার জন্য শুধুমাত্র গান শোনা যথেষ্ট নয়, বরং এর ব্যাকরণগত কাঠামোটি অনুধাবন করা জরুরি; তাই রাগ ললিত-এর মতো গম্ভীর রাগকে চেনার জন্য শুরুতেই অন্তত ২-৫টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা প্রয়োজন, যা রাগের আরোহ-অবরোহের গাণিতিক রূপ এবং বিশেষ করে ‘দুই মধ্যমের’ প্রয়োগটি স্পষ্ট করে। এর পাশাপাশি লক্ষণ গীত শোনা অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এই পরিচয়মূলক গানের বাণীর মধ্যেই রাগের ঠাট, জাতি, বাদী-সমবাদী এবং বর্জিত স্বরের (ললিতের ক্ষেত্রে পঞ্চম) উল্লেখ থাকে, যা রাগের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকগুলো সহজে আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। এছাড়া ছোট খেয়াল ও লক্ষণ গীত প্রায় একই উদ্দেশ্য সাধন করে, যার দ্রুত লয় এবং তানের কাজগুলো শুনলে ললিত রাগের ‘গাম্ভীর্য’ ও ‘আর্তি’—উভয়ের এক অনন্য সংমিশ্রণ সহজেই অনুধাবন করা যায়।
১. রাগ ললিতের স্বর-মালিকা: রাগের স্বরস্থানের শুদ্ধতা এবং আরোহী-অবরোহী চলন বোঝার জন্য এটি প্রাথমিক ভিত্তি (যেমন: রাগ পুরিয়া বা ললিতের স্বর-প্রয়োগের ভিডিওগুলো)।
২. এনসিইআরটি (NCERT) টিউটোরিয়াল: রাগের শাস্ত্রীয় পরিচয় এবং মৌলিক স্বরপ্রয়োগ শেখার জন্য এটি অত্যন্ত প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রিসোর্স।
৩. Tanarang.com প্রজেক্ট: এই পোর্টালের আর্টিকেল এবং অডিও স্যাম্পলগুলো রাগের আরোহ, অবরোহ, পাকড় এবং বিভিন্ন বন্দিশের গাণিতিক কাঠামো বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক।
ললিত রাগ সম্পর্কিত রাগসমূহ:
- রাগ হিল্লোল: ললিত রাগের চলনের সাথে এর কিছুটা সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।
- রাগ বসন্ত: এই রাগেও দুই মধ্যম ব্যবহৃত হয়, তবে ললিতের সাথে এর প্রধান পার্থক্য হলো পঞ্চমের ব্যবহার ও সময়ের তফাত।
- রাগ সোহিনী: ললিতের মতো সোহিনীও সন্ধিপ্রকাশ রাগ, তবে সোহিনী অনেক বেশি চঞ্চল ও তার সপ্তক প্রধান।
- রাগ শুদ্ধ ললিত: এটি ললিত রাগেরই একটি প্রকারভেদ যেখানে প্রয়োগশৈলী আরও ধ্রুপদী হয়।

সোর্স ও তথ্যসূত্র:
১. রাগ-বিশারদ — হারুনুর রশীদ (নজরুল ইনস্টিটিউট)।
২. ভারতীয় সংগীতের রাগ-রূপাবলী — শান্তিদেব ঘোষ।
৩. Swarganga Music Foundation — রাগ ললিতের তাত্ত্বিক ও ঠাট সংক্রান্ত বিশ্লেষণ।
৪. সংগীত তত্ত্ব — পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর।
৫. ITC Sangeet Research Academy (SRA) — ললিত রাগের চলন ও সময় বিষয়ক আর্কাইভ।
৬. “রাগাশ্রয়ী বাংলা গান” — বিমান মুখোপাধ্যায় (মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানের রাগ বিশ্লেষণের জন্য প্রামাণ্য গ্রন্থ)।
৭. “কবীরের গান: সুমন চট্টোপাধ্যায়” — (সুমনের গানের স্বরলিপি ও রাগ বিশ্লেষণ)।
৮. সারেগামা (Saregama/HMV) ডিজিটাল আর্কাইভ — অরিজিনাল রেকর্ডিং ক্রেডিট ও তথ্যের জন্য।
৯. “বাংলার গান” — সুধীর চক্রবর্তী (আধুনিক গানের বিবর্তন ও রাগ প্রয়োগ বিষয়ক)।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ললিত। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:
