ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল আকাশতলে রাগ শিবমত ভৈরব (Shivmat Bhairav) একটি অত্যন্ত গম্ভীর, আধ্যাত্মিক এবং দুর্লভ মিশ্র রাগ। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি ‘ভৈরব’ এবং ‘শিবরঞ্জনী’—এই দুটি প্রভাবশালী রাগের একটি শৈল্পিক সংমিশ্রণ। প্রাতঃকালীন শান্ত পরিবেশে এই রাগের সুরলহরী শ্রোতার মনে এক গভীর বৈরাগ্য এবং মহাদেবের আরাধনার মতো এক পবিত্র আবেশ তৈরি করে।
রাগ শিবমত ভৈরব
রাগ শিবমত ভৈরব-এর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস
রাগ শিবমত ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি উচ্চাঙ্গের মিশ্র রাগ। এটি মূলত ‘জোড় রাগ’ হিসেবে পরিচিত। এই রাগের উদ্ভাবন এবং জনপ্রিয়তার পেছনে বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের অবদান রয়েছে। এটি গাওয়ার সময় ভৈরব রাগের গম্ভীর মেজাজের সাথে শিবরঞ্জনী রাগের করুণ ও মরমী সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের বৈচিত্র্যময় স্বর প্রয়োগ। বিশেষ করে কোমল গান্ধার (গ) এবং কোমল নিষাদ (ণ)-এর উপস্থিতি একে শুদ্ধ ভৈরব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক চরিত্র দান করে। এই রাগে ভৈরবের মতো কোমল ঋষভ এবং কোমল ধৈবতের আন্দোলন থাকলেও, শিবরঞ্জনী অঙ্গের ছোঁয়ায় এতে এক ধরণের ‘আর্তি’ বা ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা ভোরের আলো ফোটার সময় গীত হয়। ধ্রুপদ ও খেয়াল গায়কির পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ভজনেও এই রাগের প্রয়োগ অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: ভৈরব।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
- অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স [এখানে গান্ধার ও নিষাদ কোমল হওয়ায় শিবরঞ্জনীর আবেশ তৈরি হয়]।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত এবং নিষাদ — এই চারটি স্বরই কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সব স্বর (সা, মা, পা) শুদ্ধ।
- সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বা দিনের প্রথম প্রহর)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, মরমী এবং ভক্তি রসপ্রধান।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ ভৈরব: শিবমত ভৈরবের মূল আধার এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
- রাগ শিবরঞ্জনী: এই রাগের কোমল গান্ধার এবং চলনের করুণ রস শিবমত ভৈরবে বিদ্যমান।
- রাগ কৌশি ভৈরব: স্বর বিন্যাসের দিক থেকে মিল থাকলেও কৌশি ভৈরবে মালকোষের ছায়া থাকে।
- রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও অহির্ ভৈরবে গান্ধার শুদ্ধ থাকে।
- রাগ বসন্ত মুখরি: এই রাগেও কোমল ঋষভ, কোমল ধৈবত ও কোমল নিষাদ থাকে, তবে গান্ধার শুদ্ধ ব্যবহৃত হয়।
রাগ শিবমত ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই মায়াবী সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক পবিত্র আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর শিবরঞ্জনীর করুণ আবেদন—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। এটি গাওয়ার জন্য গায়কের কণ্ঠে অসামান্য নিয়ন্ত্রণ এবং মিড়-গমকের সূক্ষ্ম জ্ঞান প্রয়োজন। যদিও বর্তমান সময়ের সাধারণ আসরগুলোতে এই রাগের প্রচলন কিছুটা সীমিত, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গভীরতা সংগীতের গবেষক ও প্রকৃত সাধকদের কাছে অপরিসীম। শুদ্ধ চিত্তে এই রাগের আলাপ শুনলে তা শ্রোতাকে এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতের সন্ধান দেয়।
তথ্যসূত্র:
১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ৪): বিরল এবং জটিল মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।
২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য উৎস।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।
৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার প্রামাণ্য গ্রন্থ।
আরও দেখুন: