রাগ সাহানা বা সাহানা কানাড়া । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ সাহানা বা সাহানা কানাড়া।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

রাগ সাহানা

 

রাগটি কাফি ঠাটের সম্পূর্ণ রাগ। সাহানা নামের অর্থের মধ্যে আছে রাজকীয়তা। বিতর্ক আছে যে সাহানা ও সাহানা কানাড়া ভিন্ন রাগ। একদল বলেন সাহানার খাম্বাজের মতো একটি স্বাতন্ত্র্য রূপ আছে, যেটায় কানাড়া অঙ্গের এত প্রভাব নেই এবং সেটাই আসল সাহানা। আরেকদলের কাছে কানাড়া অঙ্গ প্রভাবিত কানাড়া পরিবারের রাগই আসল সাহানা বা যেটা আসলে সাহানা কানাড়া। তবে প্রাথমিক শ্রোতা হিসেবে সেই বিতর্কে মনোযোগ না দেয়াই ভাল হবে।

এই রাগটি কর্নাটিক (28th Melakarta, Harikamboji) এবং হিন্দুস্থানি দুই সিস্টেমেই আছে, তবে চরিত্র এক নয়। দুটি শুনলে খুব কমই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।

সাহানা রাগটি বক্র। অর্থাৎ এর আরোহ-আবরোহ সোজা নয়, বরং আঁকাবাঁকা বা Zigzag। এই রাগটা চিনতে স্কেলের চেয়ে সুর প্রয়োগের দিকে বেশি নজর দিতে হবে।  এই রাগটির মুখ্য পরিচয় হচ্ছে এর বিশিষ্ট “ধৈবত”। আরোহ এবং আবরোহ দু সময়েই এই রাগে তীব্র ধৈবতের ব্যবহার হয়।  ধৈবতের প্রয়োগ দেখেই চট করে সাহানা চেনা যায়।

বাগেশ্রী রাগটি সাহানার কাছাকাছি রাগ। রাগের আংশিক শুনে বাগেশ্রী বলে যেই ভ্রম হবে, অমনি এই ধৈবত এসে সেটা ভাঙ্গিয়ে সাহানা প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। রাগ আড়ানার সাথেও মিল আছে সাহানার। সেখানেও আলাদা হয়ে যায় আড়ানার কোমল ধৈবত এর উপরে সাহানার তীব্র ধৈবতের প্রভাবে। সাহানার সাথে রাগ বাহারেরও  কিছুটা মিল আছে।

সাহানা উত্তরঙ্গের রাগ। রাতের ৩য় প্রহরের পরে গাওয়া বা বাজালে ভালো ফেটে। আমাদের সময়ে রাত ১২ টা থেকে ৩ টা বলা যায়। সাহানারা জাতি সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ(বক্র)।

 

আরোহ: ,n S ; R g m P ; m g m ; D n P ; m P D n S’
অবরোহ: S’ D n P ; m P g m R S
পাকাড়: P m g m D ; D n P ; S’ D n P ; D m P g m R S;

 

রাগ সাহানা সম্পর্কে ধারণা নিতে নিচের ভিডিওটি দেখুন:

 

 

রাগ শাহানা

কণ্ঠ সঙ্গীতে সাহানা:

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ সাহানা:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. বিরহের নিশি কিছুতে আর চাহে না পোহাতে ওগো প্রিয় (একতাল)

২. অয়ি চঞ্চল-লীলায়িত-দেহা চির-চেনা (রাগঃ সাহানা-বাহার, তালঃ কাহার্‌বা)

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ সাহানা:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়। তবে কবিগুরুর প্রচুর গান সাহানায় কম্পোজ করা। আমার তো মনে হয়, ভৈরবী টাইপ খুব কমন রাগ বাদ দিয়ে একক রাগ ধরলে, তাঁর সবচেয়ে বেশি গান কম্পোজ করা হয়েছে যেসব রাগে, সাহানা তার মধ্যে একটি।

১. দুটি প্রাণ এক ঠাঁই তুমি তো এনেছ ডাকি (আনুষ্ঠানিক পর্বের এই গানটি ঝাঁপতালে বাঁধা। রচনাকাল বঙ্গাব্দ ১২৯১, খৃষ্টাব্দ ১৮৮৫। গানটির স্বরলিপিকার ইন্দিরা দেবী।)

২. আমি জ্বালবো না মোর বাতায়নে (পূজা পর্বের এই গানটি দাদরা তালে নিবদ্ধ। গানটির রচনা কাল ১৩২৬ (বঙ্গাব্দ), ১৯১৯ (খৃষ্টাব্দ)। গানটির স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।)

৩. মম মন উপবনে চলে অভিসারে (প্রকৃতি পর্বের এই গানটি কাহারবা তালে নিবদ্ধ। গানটির রচনা কাল কার্তিক, ১৩৪১ (বঙ্গাব্দ), ১৯৩৪ (খৃষ্টাব্দ)। গানটির স্বরলিপিকার শৈলজারঞ্জন মজুমদার।)

৪. শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু (পূজা পর্যায়ের ঝাঁপতালে বাঁধা এই গানটির রচনাকাল ১৮ ভাদ্র, ১৩২১ (বঙ্গাব্দ) ১৯১৪ (খৃষ্টাব্দ), রচনাস্থান শান্তিনিকেতন। গানটির স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইন্দিরা দেবী।)

৫. হার-মানা হার পরাব তোমার গলে ( পূজা পর্বের এই গানটি দাদরা তালে নিবদ্ধ। গানটির রচনা কাল ৭ বৈশাখ, ১৩১৯ (বঙ্গাব্দ), ১৯১২ (খৃষ্টাব্দ)। গানটির স্বরলিপিকার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভীমরাও শাস্ত্রী।

৬. অকারণে অকালে মোর পড়ল যখন ডাক ( পূজা পর্বের এই গানটি দাদরা তালে নিবদ্ধ। গানটির রচনা কাল ১৩২৫ (বঙ্গাব্দ))

৭. ডেকেছেন প্রিয়তম, কে রহিবে ঘরে।

৮. নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা।

৯. মেঘের ‘পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে (মিশ্র সাহানা)

১০. অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন ক’রে!

১১. আজ বুঝি আইল প্রিয়তম,   চরণে সকলে আকুল ধাইল।।

১২. আজি মর্মরধ্বনি কেন জাগিল রে!

১৩. আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে

১৪. আমার আপন গান আমার অগোচরে   আমার মন হরণ করে,

১৫. আমি জ্বালব না মোর বাতায়নে প্রদীপ আনি

১৬. আমি শ্রাবণ-আকাশে ওই দিয়েছি পাতি

১৭. একবার বলো, সখী, ভালোবাস মোরে–

১৮. কমলবনের মধুপরাজি,   এসো হে কমলভবনে।

১৯. কী গাব আমি, কী শুনাব, আজি আনন্দধামে।

২০. কেমনে রাখিবি তোরা তাঁরে লুকায়ে

২১. ঘন কালো মেঘ তাঁর পিছনে,

২২. জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই

২৩. জীবনে আমার যত আনন্দ পেয়েছি দিবস-রাত

২৪. তাঁহার অসীম মঙ্গললোক হতে

২৫. তুমি যে চেয়ে আছ আকাশ ভ’রে,

২৬. দুই হৃদয়ের নদী একত্র মিলিল যদি

২৭. দুই হৃদয়ের নদী একত্র মিলিল যদি

২৮. দুইটি হৃদয়ে একটি আসন পাতিয়া বসো হে হৃদয়নাথ।

২৯. দোষী করিব না, করিব না তোমারে

৩০. ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়

৩১. নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া,

৩২. বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে।

৩৩. বসন্ত তার গান লিখে যায় ধূলির ‘পরে   কী আদরে॥

৩৪. ভুবন হইতে ভুবনবাসী এসো আপন হৃদয়ে।

৩৫. মম অন্তর উদাসে

৩৬. মুখপানে চেয়ে দেখি, ভয় হয় মনে–

৩৭. যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা–

৩৮. যদি প্রেম দিলে না প্রাণে

৩৯. যারা কাছে আছে তারা কাছে থাক্‌, তারা তো পারে না জানিতে–

৪০. যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে

৪১. রাজরাজেন্দ্র জয়   জয়তু জয় হে।

৪২. শুভদিনে শুভক্ষণে  পৃথিবী আনন্দমনে

৪৩. সকল হৃদয় দিয়ে ভালো বেসেছি যারে,

৪৪. সকল হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি যারে    সে কি ফিরাতে পারে, সখী।

৪৫. সকলকলুষতামসহর, জয় হোক তব জয়–

৪৬. সফল করো হে প্রভু আজি সভা, এ রজনী হোক মহোৎসবা ॥

৪৭. সে কোন্‌ পাগল যায় যায় পথে তোর, যায় চলে ওই-একলা রাতে–

৪৮. স্বর্ণবর্ণে সমুজ্জ্বল নব চম্পাদলে

৪৮. হে মহাজীবন, হে মহামরণ,    লইনু শরণ, লইনু শরণ ॥

৪৯. হেরি অহরহ তোমারি বিরহ ভুবনে ভুবনে রাজে হে।

 

ফিল্মের গানে রাগ সাহানা:

১. Jhuka Jhuka Ke Nigahen (Miss Coca Cola) – Mukesh, Asha Bhosle ( ঝলক পাওয়া যাবে)

 

ভজনে রাগ সাহানা:

১. (লিংক পরে দেয়া হবে)

 

সাহানা রাগে খেয়াল:

১. কিরানা/ইন্দোর ঘরানার ওস্তাদ আমীর খান সাহেব এর- সাহানা ১, সাহানা ২

২. পাতিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ আমানত আলি খান ও বড় ফাতেহ আলী খান এর – সাহানা তারানা। বড় ফাতেহ আলী খান এর – সাহানা

৩. শ্রীমতী মালবিকা কানন এর – সাহানা

৪. জয়পুর ঘরানার শিল্পী কিশোরী আমনকারের গলায় – সাহানা

৫. রামপুর সহসওয়ান ঘরানার ওস্তাদ রশিদ খানের – সাহানা

৬. শ্যাম চৌরাসিয়া (শ্যামচুরাসি) ঘরানার ওস্তাদ সালামত আলী খান এর – সাহানা

৭. শ্যাম চৌরাসিয়া (শ্যামচুরাসি) ঘরানার ওস্তাদ মুবারক আলী খান এর – সাহানা

৮. পণ্ডিত ভেঙ্কটেশ কুমার এর – সাহানা

 

অন্যান্য:

১. বড় ফাতেহ আলী খাঁ সাহেবের (সাহানা তারানা)

 

 

 

 

যন্ত্রে সাহানা:

সেতারে সাহানা:

১. ইমদাদখানী-ইটাওয়া ঘরানার ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের – সাহানা

২. ইমদাদখানী-ইটাওয়া ঘরানার ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – সাহানা

৩. ইমদাদখানী-ইটাওয়া ঘরানার পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায় সেতারে – সাহানা

 

সরদে সাহানা:

১.মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরদে- সাহানা (লিংক পরে দেয়া হবে)।

২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরদে- সাহানা (লিংক পরে দেয়া হবে)।

3. ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের সাহানা (আলাপ, জোড় ও ঝালা)

 

 

রাগ-সাহানা

 

টিউটোরিয়াল:

যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি  লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।

১. রাগ সাহানার স্বরমল্লিকা (লিংক পরে দেয়া হবে)।

২. এনিসিআরটির টিউটোরিয়াল (লিংক পরে দেয়া হবে)।

 

রিলেটেড রাগ:

 

সা সম্পর্কে আরও জানার জন্য:

১. উইকি আর্টিকেল

২. অটোমেটেড ট্রান্সক্রিপশন প্রজেক্ট এর সাহানা

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ সাহানা বা সাহানা কানাড়া । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:

  • গান খেকো সিরিজ- সূচি

Leave a Comment