রাগ সুখিয়া বিলাবল (বা সুহিয়া বিলাবল) বিলাবল অঙ্গের একটি অত্যন্ত দুর্লভ এবং অপ্রচলিত রাগ। এটি মূলত বিলাবল রাগের একটি প্রকারভেদ, যা গায়কিতে এক বিশেষ ধরণের বৈচিত্র্য ও আভিজাত্য তৈরি করে।
সুখিয়া বিলাবল বিলাবল ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি ‘সংকীর্ণ’ বা মিশ্র রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতে বিলাবল রাগের অনেকগুলো রূপ প্রচলিত (যেমন—আলহিয়া, দেবগিরি, শুক্ল বিলাবল ইত্যাদি), যার মধ্যে ‘সুখিয়া’ অত্যন্ত বিরল। এই রাগটি মূলত বিলাবল এবং সুহা (কানাড়া অঙ্গ)-এর মিশ্রণে তৈরি বলে অনেক সংগীতজ্ঞ মনে করেন। এর চলন অত্যন্ত মার্জিত এবং এটি প্রধানত ধ্রুপদ ও খেয়াল অঙ্গে পরিবেশিত হয়।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর অবরোহে ‘কোমল নিষাদ’ (নি)-এর প্রয়োগ এবং ‘কানাড়া’ অঙ্গের আধিপত্য। শুদ্ধ বিলাবলের উজ্জ্বলতার সাথে কানাড়া অঙ্গের গাম্ভীর্য মিশে এই রাগে এক ধরণের গূঢ় আনন্দ বা ‘সুখ’-এর অনুভূতি তৈরি করে, যা থেকেই সম্ভবত এর নাম ‘সুখিয়া’ হয়েছে। এতে শুদ্ধ গান্ধারের (গা) প্রয়োগ অত্যন্ত নিপুণভাবে করা হয়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: বিলাবল।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
- আরোহ: সা রে গা মা পা, ধা নি সা।
- অবরোহ: সা নি(কোমল) ধা পা, মা গা, রে গা মা রে সা।
- বাদী স্বর: ধৈবত (ধা)।
- সমবাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
- বর্জিত স্বর: বর্জিত স্বর নেই, তবে আরোহে মধ্যম (মা) অনেক সময় লঙঘন করা হয়।
- ব্যবহৃত স্বর: আরোহে সব শুদ্ধ স্বর; অবরোহে শুদ্ধ স্বরের পাশাপাশি কোমল নিষাদ (নি) ব্যবহৃত হয়।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ধীরস্থির এবং প্রসন্ন।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- আলহিয়া বিলাবল: এর সাথে স্বরগত মিল থাকলেও সুখিয়া বিলাবলে কানাড়া অঙ্গের চলন বেশি স্পষ্ট।
- সুহা কানাড়া: অবরোহে কোমল নিষাদ ও পঞ্চম-মধ্যমের ব্যবহারে সুহা কানাড়ার ছায়া পাওয়া যায়।
- শুক্ল বিলাবল: এটিও বিলাবলের একটি প্রকার, তবে এতে শুদ্ধ নিষাদের প্রাধান্য বেশি থাকে।
- দেবগিরি বিলাবল: আরোহের চলন অনেক সময় দেবগিরির মতো মনে হয়, তবে অবরোহের কাজ একে আলাদা করে।
রাগ সুখিয়া বিলাবল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই সকল রত্নের মতো যা বর্তমানে কেবল গুণী শিল্পীদের সংগ্রহে টিকে আছে। এর গঠনশৈলীতে বিলাবলের শুদ্ধতা এবং কানাড়া অঙ্গের বক্র চলনের যে অপূর্ব মিলন ঘটেছে, তা সংগীতের রসিকদের কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় এই রাগের গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রকাশ শ্রোতাকে এক শান্তিময় ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. রাগ পরিচয় (পঞ্চম খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।
৩. Sangeetanjali – পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর।
৪. Kramik Pustak Malika – V. N. Bhatkhande (Classical Reference).