রাগ হামীর (Hamir) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, উজ্জ্বল এবং বীর রস প্রধান রাগ। এটি তার ঋজু চলন এবং গম্ভীর প্রকৃতির জন্য সংগীত জগতে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

রাগ হাম্বীর বা হামীর
রাগ হামীর
রাগ হামীর মূলত কল্যাণ ঠাট-এর একটি রাগ। এর নাম শুনলেই এক ধরণের রাজকীয় বা বীরত্বপূর্ণ আবেশ তৈরি হয়। লোককথা অনুযায়ী, এই রাগের নামকরণ করা হয়েছে চৌহান বংশীয় বীর রাজা হামীর দেবের নামানুসারে। এটি একটি অতি প্রাচীন রাগ এবং ধ্রুপদ গায়কির যুগেও এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। মধ্যযুগীয় অনেক সংগীত গ্রন্থে হামীরকে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী রাগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হামীর রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ধৈবত (ধা) স্বরের প্রাবল্য এবং তীব্র মধ্যমের (ক্ষা) বিশেষ প্রয়োগ। এই রাগে শুদ্ধ ও তীব্র—উভয় মধ্যমই ব্যবহৃত হয়। আরোহে ‘পা’ থেকে সরাসরি ‘সা’ (তার সপ্তক)-এ যাওয়ার প্রবণতা এবং অবরোহে ‘ধা নি পা’ বা ‘গা মা রে সা’ সংগতিগুলো এই রাগের মূল চাবিকাঠি। এটি মূলত বীর রস এবং শৃঙ্গার রসের মিশ্রণে তৈরি এক অনন্য অনুভূতির রাগ।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: কল্যাণ।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে গা মা, পা ধা নি সা।
- অবরোহ: সা নি ধা পা, মা(তীব্র) পা ধা পা, গা মা(শুদ্ধ) রে সা।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ ধৈবত (ধা)।
- সমবাদী স্বর: শুদ্ধ গান্ধার (গা)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
- সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: বীর রস প্রধান, গম্ভীর এবং ওজস্বী।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- কেদার: কেদারে শুদ্ধ মধ্যম প্রধান এবং হামীরে ধৈবত প্রধান; তবে উভয় রাগের অবরোহে কিছু মিল লক্ষ্য করা যায়।
- কামোদ: কামোদে ‘রে পা’ সংগতি প্রধান, যেখানে হামীরে ‘সা রে গা মা’ এবং ‘পা ধা’ অঙ্গের কাজ বেশি থাকে।
- ছায়ানট: ছায়ানটে ‘পা রে’ সংগতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু হামীরে ‘পা ধা’ এবং তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ একে আলাদা করে।
- যমন: যমনের মতো এতেও তীব্র মধ্যম থাকে, তবে হামীরের চলন অনেক বেশি বক্র এবং এতে শুদ্ধ মধ্যমেরও বিশেষ স্থান আছে।
রাগ হামীর তার গাম্ভীর্য ও তেজস্বী স্বভাবের জন্য শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অনন্য সম্পদ। এই রাগের বিস্তারে যখন তীব্র মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়া হয় এবং ধৈবতের ওপর স্থির হওয়া হয়, তখন এক রাজকীয় গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে। হামীর যেমন কঠিন ধ্রুপদী বন্দিশে সমৃদ্ধ, তেমনি লঘু শাস্ত্রীয় সংগীতেও এর মাধুর্য অপরিসীম। এই রাগটি গায়কের কণ্ঠের ক্ষমতা এবং রাগের শুদ্ধতা—উভয়ই পরীক্ষার জন্য এক আদর্শ মাধ্যম।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. রাগ পরিচয় (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।
৩. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (৩য় ও ৪থ ভাগ) – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।
৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann.
সবসময় খেয়াল করবেন এই রাগটিকে এক নজরে চেনা যায় ধৈবতে (ধ) এর বিশেষ ব্যবহার দেখে। গান্ধার ও মধ্যম হয়ে ধৈবতে উঠবার সময় নিষাদ (ন) স্পর্শ করে ধৈবতে এসে আছড়ে পড়ে। এটিও খুব জনপ্রিয় রাগ।
নীরস আলোচনার আগে কিছু গান শুনে আসা যাক ….
নজরুল সঙ্গীত:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. অধীর অম্বর গুরু গর্জন মৃদঙ্গ বাজে।
রবীন্দ্রসঙ্গীত:
কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
১. কত অজানারে জানাইলে তুমি, কত ঘরে দিলে ঠাঁই (রাগ: হাম্বীর, তাল: রূপকড়া, রচনাকাল: ১৩১৩ বঙ্গাব্দ, ১৯০৭ খৃষ্টাব্দ)।
২. অশান্তি আজ হানল এ কী দহনজ্বালা (রাগ: হাম্বীর, তাল: দাদরা, রচনাকাল: ১৩৪২ বঙ্গাব্দ মাঘ, ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দ, স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার)।
৩. তিমির-অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি (রাগ: হাম্বীর, তাল: কাহারবা, রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ১৩ ভাদ্র, ১৩২৮, খৃষ্টাব্দ ১৯২১, রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন, স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)
গজল:
১.
আধুনিক গান:
১.
ফিল্মের গান:
১.
নাট্যসঙ্গীত
১.
যন্ত্রে:
বিভিন্ন যন্ত্রে এই রাগটি বাজানো হয়েছে। তার কিছু লিংক।
সুরবাহার:
১.
সেতার
১.
সারোদ
১.
সারেঙ্গী
১.
বাঁশি
১.
বেহালা
১.
এস্রাজ
১.
দিলরুবা
১.
সান্তর
১.
সাঁনাই
১.
যুগলবন্দী:
এবারে কিছু যুগলবন্দী শোনা যাক:
১.
এবার একটু সিরিয়াস গান বাজনা:
তারানা
১.
খেয়াল
১.
ধ্রুপদ/ধামার:
১.
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষণ গীত মূলত শেখানো হয় রাগের লক্ষণগুলো সহজে ধরতে। লক্ষণ গীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।
১. রাগ হাম্বীর এর স্বরমল্লিকা।
২. এনিসিআরটির টিউটোরিয়াল।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ হাম্বীর বা হামীর। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:
