রাগ হিন্দোল । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ হিন্দোল (Hindol) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে প্রাচীন, মৌলিক এবং প্রভাবশালী রাগগুলোর মধ্যে একটি। এটি একটি অত্যন্ত তেজস্বী এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ, যা শুনলে মনে এক ধরণের বীরত্ব ও আধ্যাত্মিক জাগরণ তৈরি হয়।

রাগ হিন্দোল হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান ছয়টি রাগের একটি (মৌলিক রাগ) হিসেবে প্রাচীন কাল থেকে স্বীকৃত। ‘হিন্দোল’ শব্দের অর্থ হলো ‘দোলনা’। প্রাচীন শাস্ত্রকারদের মতে, এই রাগটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দোলযাত্রা বা বসন্তোৎসবের সাথে গভীরভাবে জড়িত। এটি কল্যাণ ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি রাগ। এর গাম্ভীর্য এবং স্বরবিন্যাস একে অন্যান্য রাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আভিজাত্য দান করেছে।

হিন্দোল একটি ‘ঔড়ব-ঔড়ব’ জাতির রাগ। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত। শুদ্ধ স্বরের মাঝে তীব্র মধ্যম (মা)-এর উজ্জ্বল উপস্থিতি এই রাগকে একটি তীক্ষ্ণ এবং দিব্য রূপ দান করে। এটি মূলত একটি ‘উত্তরাঙ্গ’ প্রধান রাগ, যার বিস্তার সপ্তকের ওপরের দিকে (তার সপ্তকে) বেশি চমৎকার শোনায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৫ স্বর)।
  • আরোহ: সা গা মা(তীব্র) ধা নি সা।
  • অবরোহ: সা নি ধা মা(তীব্র) গা সা।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধা)।
  • সমবাদী স্বর: গান্ধার (গা)।
  • বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ গান্ধার (গা), তীব্র মধ্যম (মা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সূর্যোদয়ের পর সকাল ৬টা থেকে ৯টা)। তবে বসন্তকালে এটি যেকোনো সময় গাওয়া যায়।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, তেজস্বী এবং বীর রসপ্রধান।

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • রাগ সোহিনী: হিন্দোলের সাথে সোহিনীর স্বরগত মিল থাকলেও সোহিনীতে ঋষভ (রে) ব্যবহৃত হয় এবং এর চলন ভিন্ন।
  • রাগ মারোয়া: মারোয়া রাগেও তীব্র মধ্যম ও ধৈবতের প্রাধান্য থাকে, কিন্তু এতে ঋষভ (রে) অত্যাবশ্যক, যা হিন্দোলে বর্জিত।
  • রাগ বসন্ত: বসন্ত রাগে হিন্দোলের অঙ্গ বা ছায়া স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়, তবে বসন্ত একটি মিশ্র রাগ।
  • রাগ মালকোশ: মালকোশ ও হিন্দোল উভয়ই ঔড়ব জাতির এবং গম্ভীর, কিন্তু মালকোশ কোমল স্বরপ্রধান এবং হিন্দোল তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ স্বরপ্রধান।

রাগ হিন্দোল তার সীমিত স্বরবিন্যাস সত্ত্বেও গায়ক ও বাদকের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ঋষভ ও পঞ্চমের মতো শক্তিশালী স্বর ছাড়া কেবল পাঁচটি স্বরের সাহায্যে (যার মধ্যে একটি তীব্র মধ্যম) রাগের রূপ ফুটিয়ে তোলা উচ্চতর সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। বসন্তের ভোরের স্নিগ্ধতায় যখন তীব্র মধ্যমের মিড় সহযোগে হিন্দোল পরিবেশিত হয়, তখন এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। এটি ভারতীয় সংগীতের শুদ্ধতম আভিজাত্যের প্রতীক।

তথ্যসূত্র (Sources)

১. রাগ পরিচয় (প্রথম ও চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।

৪. ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস – স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ।

৫. Sangeet Ratnakara – Sharngadeva (Historical Reference).