রাজনৈতিক ইসলাম কায়েমের আর কত মূল্য দিতে হবে আমাদের ? ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

একবার নিজেকে প্রশ্ন করবেন – রাজনৈতিক ইসলাম কায়েমের আর কত মূল্য দিতে হবে আমাদের? আমরা কি কোনোদিন ভাবব না—এই পথপরিক্রমায় কী পেলাম, আর কতটা হারালাম? এসব কি এ দেশে আদৌ সম্ভব? কিংবা আদৌ কি এর প্রয়োজন আছে?

আমাদের ব্রিটিশ আমলের মুরুব্বিরা ইসলাম ও মুসলিমদের ‘হেফাজত’ করতে বানিয়েছিলেন মুসলিম লীগ; ইসলামকে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পোক্ত করার জন্য (যেন এর আগে ইসলাম বা মুসলিমরা খুব নিরাপত্তাহীন ছিল)।

রাজনৈতিক ইসলামের অগ্নিমূল্য! [ ইসলাম ও মুসলিম ] মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ [ Muhammad Ali Jinnah ]
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ [ Muhammad Ali Jinnah ]

[ রাজনৈতিক ইসলামের অগ্নিমূল্য! [ ইসলাম ও মুসলিম ] ]

 

তার ফলাফল হিসেবে এক বিশেষ ধরনের ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম। এক ধরনের সিনথেটিক ইসলামের ভিত্তিতে গড়া অদ্ভুত এবং অবাস্তব এক রাষ্ট্র। এই অসম্ভব রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য বেঁধে রাখার দড়ির নাম ছিল—ইসলাম।

জাতির ভিত্তি ছিল এক বিশেষ ধরনের ইসলামিক জাতীয়তাবাদ। প্রতিটি বিষয়কে নামসর্বস্ব ইসলামিক করে তোলার এক অদ্ভুত জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। মজার বিষয় হচ্ছে—সেই জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা নিজেই কোনোদিন পশ্চিমদিকে (কিবলামুখী হয়ে) হোঁচট খাননি। পোশাক ছাড়া তাঁর জীবনের কোথাও ইসলাম ধর্মের নামমাত্র প্রভাব ছিল না। বরং উল্টোটিই বলা যায়, কারণ তিনি ছিলেন পশ্চিমা সাহেবদের মতো খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির অনুসারী।

নতুন পয়দা করা জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ক্রমশ পাকিস্তান এবং ইসলামকে একে অপরের পরিপূরক করার চেষ্টা করা হলো। একসময় দেশপ্রেমের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াল—কে কতটা ইসলামিক। তার চেয়ে জরুরি হয়ে উঠল—কে কতটা ইসলামিক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে।

ঈমানে যাই হোক; চলায়, বলায়, খাওয়ায়, পরায় এবং সামাজিকতায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে ইসলাম জাহির করার এক অদ্ভুত ভ্রষ্টাচার। মন্ত্রণালয়ে কাজ ঠিকমতো না করলেও চলত, কিন্তু লোকদেখানো কুলুপ নিয়ে হাঁটাহাঁটি না করলে চেয়ার চলে যেতে পারত। প্রতিটি সভা-সেমিনারে ‘ইসলাম ইসলাম’ করে না চেঁচালে দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করা হতো।

ইসলাম প্রতিষ্ঠা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল যে, দেশের মূল কাজগুলো করার সময় পাওয়া গেল না। মানুষের জীবন, জীবিকা, শান্তি ও স্বস্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল এক বিশেষ ধরনের ইসলাম প্রতিষ্ঠা।

কসাথে স্বাধীন হয়ে মাত্র ২ বছরের মাথায় ভারত ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’ গঠন করে ফেলল এবং ৩ বছরের মধ্যে জাতিকে একটি আধুনিক সংবিধান উপহার দিল। অথচ পাকিস্তান দীর্ঘ ২৫ বছরেও তা পারল না। সংবিধানই যেখানে তৈরি হলো না, সেখানে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন তো ছিল প্রশ্নাতীত। এমনকি পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রীকে ‘ভারতের দালাল’ তকমা সহ্য করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে পালিয়ে ভারতেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। তাঁর পদত্যাগপত্রটি আজও একটি ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে তিনি লিখেছিলেন—”পাকিস্তান সরকার ইসলামকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করছে।”

ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ৯ বছরের ক্যাবিনেট জীবনে যুগান্তকারী শিক্ষানীতি তৈরি করে গেলেন। মাত্র ৫ বছরের মধ্যে ইউজিসিসহ (UGC) সকল পর্যায়ের শিক্ষার জন্য রেগুলেটরি কমিশন স্থাপন করে ফেললেন। ১৯৫০ সালে মাওলানা আজাদের দূরদর্শী নেতৃত্বে খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT) স্থাপিত হলো। ৫ বছরের মধ্যে আরও ৪টি IIT চালুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো।

বিপরীত দিকে, পাকিস্তানের ইউজিসি বানাতে লাগল দীর্ঘ ২৮ বছর (অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের কপালে আর সেটির ফল জুটল না)। যখন ভারত এসব আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ছে, পাকিস্তান তখন ব্যস্ত ছিল ‘অবজেক্টিভ রেজোলিউশন’ বা রাষ্ট্রের ধর্মীয় সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে। সেই অবজেক্টিভ রেজোলিউশনে প্রকৃত ইসলামও হলো না, আর অর্থনীতি তো হলোই না।

 

Maulana Abul Kalam Azad । মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
Maulana Abul Kalam Azad । মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

 

ভারতের প্রথম কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি) রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে স্বাধীনতার পরপরই ‘জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ’ ও ভূমি সংস্কার আইন পাস করালেন। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সামন্ত প্রভুদের হাত থেকে সাধারণ কৃষকদের কাছে যাওয়া শুরু হলো। অপরদিকে পাকিস্তানে লিয়াকত আলী খান থেকে শুরু করে পরবর্তী শাসকরা সবাই ছিলেন বড় বড় জমিদার ও নওয়াব। নিজেদের স্বার্থে তাঁরা ভূমি সংস্কার হতে দিলেন না। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতি আজও সেই সিন্ধি বা পাঞ্জাবি ‘ওয়াদেরা’ বা সামন্ত প্রভুদের পকেটে বন্দি রয়ে গেল।

ভারত ১৯৫০ সালেই একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করে এবং ১৯৫১-৫২ সালেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলল। কিন্তু পাকিস্তান তাদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন (প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে) অনুষ্ঠান করতেই সময় নিয়ে নিল দীর্ঘ ২৩ বছর (১৯৭০ সাল)। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো নির্বাচিত সরকার না থাকায় সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রটাকে চিরতরে কবজা করে নিল।

ভারত ১৯৫০ সালেই ‘প্ল্যানিং কমিশন’ গঠন করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারী শিল্প (যেমন: ইস্পাত কারখানা, বাঁধ নির্মাণ) গড়ে তোলা শুরু করল। পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা রাষ্ট্রকে একটি ‘ইসলামিক দুর্গ’ বানানোর তত্ত্বে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ার দিকে নজরই দেননি। ফলে তারা শুরু থেকেই মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, যার বিষময় ফলাফল আজ সবার সামনে স্পষ্ট।

শিল্প-সংস্কৃতির কথা আর কী বলব! হিন্দুস্তানি সঙ্গীতশিল্পীদের সবচেয়ে বড় এবং সম্মানিত অংশটি ছিলেন মুসলিমরা। ধ্রুপদি সঙ্গীতের প্রায় সবগুলো ঘরানা মুসলিম শিল্পীদেরই তৈরি। দেশভাগের সময় তাঁদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। ওস্তাদ আমানত আলী-ফাতেহ আলী খাঁ, সালামাত আলী-নাজাকাত আলী খাঁ, ছোট ফাতেহ আলী খাঁ, রইস খান—আরও কত শত নাম! কিন্তু ফলাফল কী দাঁড়াল? পাকিস্তানে পৃষ্ঠপোষকতা এবং শ্রোতার অভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আজ মৃতপ্রায়।

অন্যদিকে, ভারত সেই ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করে আজ আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গেছে। এটি এখন ভারতের অন্যতম একটি ‘এক্সপোর্ট আইটেম’; যা থেকে তারা বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করছে, আবার বিশ্বজুড়ে সম্মানও কুড়াচ্ছে। চলচ্চিত্র, রেডিও ও সাহিত্যের অনেক বড় বড় নামও পাকিস্তান গিয়েছিলেন। আজ ফলাফল কী? আর্ট ও কালচার ভারতের বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি। আর পাকিস্তানে ‘ইসলাম ইসলাম’ করতে গিয়ে না হলো প্রকৃত ইসলাম, না টিকল সংস্কৃতি। আজ পাকিস্তানের শিল্পীদের চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হয়—কবে ভারত থেকে তাঁদের ডাক পড়বে!

 

একবার ভেবে দেখুন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম আনতে গিয়ে আমাদের সব কাজে দেরি হয়ে গেল। কিন্তু সেই বিশেষ ইসলাম আর এলো না। বিষফল হিসেবে বিভিন্ন সময়ে এলো—দাঙ্গা, হত্যা, গণহত্যা আর অনাচার।

মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর ১০৬ বছরে, বিভিন্ন ব্যানারে আজ পর্যন্ত সেই ইসলামি জাতীয়তাবাদ আনার সংগ্রাম অব্যাহত। এখনও সেই ইসলামিক জাতীয়তাবাদের নামে দাঙ্গা হয়, হত্যা হয়, সকল ধরনের কোরবানি হয়।

কিন্তু এত ত্যাগের পরেও সেই বিশেষ ইসলাম কেন আসে না? বারবার কেন আমাদের সাথে ছিনিমিনি খেলে? আমাদের ঘর কি তার পছন্দ না? নাকি এ আবহাওয়া তার বাঁচার অনুকূলে না?

কী জানি! 🙁

আরও দেখুন:

Leave a Comment