আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা শ্বাস নিই, যে দেশ আমাদের পরিচয় দেয়, সেই দেশের প্রতি ভালোবাসা কি আমাদের ঈমানের পরিপন্থী হতে পারে? গত শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশ ও আরব বিশ্বে ইসলামের এমন এক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা জনপ্রিয় হয়েছে, যেখানে ‘দেশ’ বা ‘রাষ্ট্র’কে দেখা হয়েছে এক নতুন ‘খোদা’ হিসেবে। আল্লামা ইকবালের সেই বিখ্যাত চরণেও যেন সেই সুরই ধ্বনিত হয়—জাতীয়তাবাদ হলো ধর্মের কাফন।
কিন্তু এই দর্শন যখন একজন মানুষের মনে গেঁথে যায়, তখন তার ভেতর এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের জন্ম হয়। বিশেষ করে ১৯২০-এর দশকে মওদুদীর লেখনী থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রক্তঝরা দিনগুলোতে ইসলামের এই ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী’ বয়ানকে যেভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা আজ ইতিহাসের এক নির্মম বিচার্য বিষয়। যদি ‘দেশপ্রেম’ মানেই ‘শিরক’ হয়, তবে একজন মুমিন কি কখনো তার মাটির প্রতি সৎ থাকতে পারে? নাকি তাকে প্রতিনিয়ত অভিনয় করে যেতে হয়?
Urdu (Allama Iqbal):
In taaza khudaon mein bada sub se watan hai
jo pairhan iss ka hai, woh mazhab ka kafan hai
English Translation:
Among these new gods, the greatest is the Nation State!
Its garment is the shroud of Religion.
বাংলা অনুবাদ:
“নতুন খোদা’দের মধ্যে, ‘রাষ্ট্র’ সবচেয়ে বড়,
এই খোদার গায়ের পোশাক মানেই দ্বীনের কাফন!”
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই বিশ্বাস নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া কি আদৌ সম্ভব?
![Muhammad Iqbal রাষ্ট্র যখন 'নতুন খোদা': দেশপ্রেম কি সম্ভব? 2 স্যার মুহাম্মদ ইকবাল [ Muhammad Iqbal ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2014/02/Muhammad-Iqbal.jpg)
পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীদের চিন্তায় জাতীয়তাবাদ
পাকিস্তানের আদর্শিক বুদ্ধিজীবীদের লেখা, তাদের বক্তৃতা ও ফতোয়ার পরতে পরতে লক্ষ্য করা যায়—
- জাতীয়তাবাদের প্রতি এক গভীর ঘৃণা,
- দেশপ্রেমকে শিরকের সমতুল্য গণ্য করার চেষ্টা।
আর যেহেতু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে শিরক মানুষের হত্যার থেকেও বড় অপরাধ, তাই তাদের যুক্তি অনুযায়ী জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ফরজ হয়ে যায়।
১৯৭১: ইসলামের নামে হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা, নারীদের উপর অকথ্য নির্যাতন, আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন—সবই পাকিস্তানিরা ইসলামের নামেই করেছে। তাদের ওলামারা বলেছিল—
- এটা ফরজ কাজ,
- আমরা (বাংলাদেশিরা) কাফের,
- আমাদের মা-বোন-সম্পদ তাদের জন্য গণিমত।
এই ব্যাখ্যা একজন মুসলিম হিসেবে আমাকে বছরের পর বছর তীব্র যন্ত্রণায় রেখেছে—কিভাবে একজন মুসলিমকে কাফের বলা হলো? কিভাবে আমাদের সম্পদ গণিমত গণ্য করা হলো?
ইকবাল, মৌদুদি ও আকীদার অনুসন্ধান
আল্লামা ইকবাল, আবুল আ’লা মৌদুদি ও ড. ইয়াসিরের লেখা পড়তে গিয়ে বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়। সম্প্রতি মৌদুদীর ১৯২০-এর দশকে রচিত তুর্কির জাতীয়তাবাদ নিয়ে দুইটি পুস্তিকা আমাকে আরও পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে।
সেখান থেকে আমি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি তা হলো—
- এদের আক্বিদার অনুসারীরা কখনো প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি হতে পারবে না।
- আর প্রকৃত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা এদের চোখে কখনোই সত্যিকারের মুসলিম হতে পারবে না।
অভিনয়ের দেশপ্রেম
এই আক্বিদার অনুসারী কারও মুখে যখন দেশপ্রেমের কথা শোনা যায়, তা আসলে নিছক অভিনয়। আর এই অভিনয়কেও তারা শরিয়তসম্মত প্রমাণ করার চেষ্টা করে এভাবে—
- যুদ্ধকালীন কাফেরের হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রতারণা করা অনুমোদিত।
- তাই দেশপ্রেমের অভিনয়ও বৈধ।
এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি গভীর আদর্শিক ও ধর্মতাত্ত্বিক। তাই পাকিস্তানি চিন্তাধারার অনুসারীদের কাছে দেশপ্রেম ও মুসলমানিত্ব একই সাথে ধারণ করা অসম্ভব।
আরও দেখুন: