সঙ্গীতে লয় | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

গান মানেই তো শুধু সুর আর তালের কাটাকুটি নয়, এর আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে থাকে তার গতির ভেতর। আমরা যাকে গানের স্পিড বা গতি বলি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিভাষায় সেটাই হলো ‘লয়’। একটু সহজ করে বললে, গান বা বাজনা চলার সময় একটা বিট বা মাত্রার পর ঠিক কতটা সময় পর পরের বিটটা আসছে—সেই মাঝখানের সময়টুকুই হলো লয়। ঘড়ির কাঁটা যেমন টিকটিক করে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ঘোরে, লয়ও তেমনি গানে একটা দারুণ শৃঙ্খলা ধরে রাখে। আর এই শৃঙ্খলার ওপর ভর করেই শ্রোতার মনে নানা রকম অনুভূতির জন্ম হয়।

বিশ্বসঙ্গীতের আঙিনায় এই লয়-কে সবাই ‘টেম্পো’ (Tempo) নামেই চেনে। একটা গানের বিটগুলো আমরা কতটা ধীরে কিংবা কতটা দ্রুত ফেলছি, তার ওপরেই নির্ভর করে গানটার পুরো মুড কেমন হবে। মূলত লয় তিন রকমের হয়—বিলম্বিত (ধীমে তাল), মধ্য (মাঝারি গতি) আর দ্রুত (খুব ফাস্ট)। তবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যারা সত্যিকারের গুণী গুণগ্রাহী, তারা জানেন এর পরিধি আরও কতটা ছড়ানো। সেখানে ‘অতি বিলম্বিত’ থেকে শুরু করে ‘অতি দ্রুত’ লয়েরও অসাধারণ সব কারুকাজ দেখতে পাওয়া যায়।

কাগজে-কলমে লয়ের হিসাব-নিকাশ সহজ মনে হলেও, বাস্তবে এর নিখুঁত প্রয়োগ করা কিন্তু বেশ কঠিন। বিশেষ করে একজন গায়ক যখন গলা ছেড়ে গান ধরেন, আর একজন যন্ত্রী যখন হাতে তবলা বা সেতার তুলে নেন—উভয়ের লয় চেনার ও তালের মাপ দেওয়ার ধরনে সূক্ষ্ম কিছু তফাত থাকে। গাওয়ার ধরন আর বাজানোর এই নিজস্ব স্টাইলই লয়কে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বাজনার স্পিড কতটা কম-বেশি হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে একে কয়েকটি ভাগে চেনা যায়। আজকের আড্ডায় আমরা লয়ের এই চেনা-অচেনা রূপগুলো এবং গানের তালের সাথে এর ভেতরের সম্পর্কটা নিয়েই একটু খুঁটিনাটি আলাপ করব।

 

 

লয়

 

লয়

 

লয়ের মূল তিন রূপ

মোটাদাগে যেকোনো গান বা বাজনার স্পিডকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। সঙ্গীতের গাণিতিক ভাষায় (BPM বা বিটস পার মিনিট) হিসাবটা বুঝলে সুবিধা হবে:

১. বিলম্বিত লয় (Slow tempo): এটা হলো একদম ধীমে তাল। সাধারণত প্রতি মিনিটে ৪০টি বিট বা মাত্রা পড়লে তাকে বিলম্বিত লয় বলা হয়। বুক কাঁপানো শান্ত ও গম্ভীর মেজাজের গানে এর ব্যবহার বেশি।

২. মধ্য লয় (Medium tempo): নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি মাঝারি গতির সুর। এর গতি প্রতি মিনিটে মোটামুটি ৮০ বিটের কাছাকাছি থাকে। আমাদের চেনা বেশিরভাগ গানই এই লয়ে বাঁধা।

৩. দ্রুত লয় (Fast tempo): এটা হলো চনমনে ও ভীষণ ফাস্ট গতি। প্রতি মিনিটে প্রায় ১৬০ বিটের স্পিডে যখন গান বা বাজনা চলে, তখন তাকে দ্রুত লয় বলে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 সঙ্গীতে লয় | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

‘অতি’ লয়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যারা সত্যিকারের গুণী গুণগ্রাহী, তারা জানেন এর পরিধি শুধু এই তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধনার গভীরে গেলে এর আরও কিছু জটিল রূপের দেখা মেলে। যেমন:

  • অতি বিলম্বিত: যেখানে প্রতি মিনিটে মাত্র ২০টি বিট পড়ে।
  • অতি অতি বিলম্বিত: আরও ধীমে, প্রতি মিনিটে মাত্র ১০টি বিট!
  • অতি দ্রুত: প্রতি মিনিটে ৩২০ বিটের ঝড়ো গতি।
  • অতি অতি দ্রুত: যেখানে প্রতি মিনিটে বিটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪০-এ!

খুব স্বাভাবিকভাবেই, এই ‘অতি’ কিংবা ‘অতি অতি’ লয়গুলোর ব্যবহার কিন্তু আমরা সাধারণ গানে সচরাচর শুনতে পাই না। এগুলো মূলত ওস্তাদদের রাগ-সংগীতের খুব উচ্চাঙ্গের সাধনা বা পারফরম্যান্স ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া মেলা ভার।

তালের মারপ্যাঁচ: গায়ক বনাম যন্ত্রী

কাগজে-কলমে লয়ের এই গাণিতিক ফর্মুলা বোঝা মোটামুটি সহজ মনে হলেও, বাস্তবে এর নিখুঁত প্রয়োগ করা কিন্তু ভীষণ কঠিন। লয়ের সবচেয়ে ঝামেলার আর মজার বিষয় হলো—একজন গায়ক এবং একজন যন্ত্রীর তালের মাপার চোখ কিন্তু এক নয়।

আমরা যখন কোনো পারফরম্যান্স দেখি, তখন খেয়াল করলে বুঝব—গায়করা যন্ত্রীদের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় ধরে তালের নিখুঁত হিসাব কষেন। অর্থাৎ, তবলিয়া বা সেতারির তালের মাপ আর গায়কের গলার তালের মাপে সূক্ষ্ম একটা মনস্তাত্ত্বিক তফাত থাকে। গাওয়ার ধরন আর বাজানোর এই নিজস্ব স্টাইলের টোকাটুকিই লয়কে আরও জ্যান্ত আর আকর্ষণীয় করে তোলে।

লয় এবং তালের এই গোলকধাঁধা আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে ও শুনতে চাইলে নিচের এই রিসোর্সগুলোর সাহায্য নিতে পারেন:

লয় ও তালের তত্ত্ব জানতে:

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 সঙ্গীতে লয় | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

সারিতা পাঠক এর তাল বিষয়ক টিউটোরিয়াল:

 

আরও পড়ুন:

Leave a Comment