২৩শে সেপ্টেম্বর—ভারতীয় সাহিত্যের আকাশে জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র ড. রামধারী সিং দিনকরের জন্মদিন। কবি, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ—কত পরিচয়ে যে তাঁর পরিচয় দিতে হয়! হিন্দি সাহিত্যের “রাষ্ট্রীয় কবি” হিসেবে যাঁকে সম্মানিত করা হয়, তিনি শুধু শব্দের কারিগর ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় চেতনার রূপকার, সংস্কৃতির অটল রক্ষাকবচ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক নিবেদিত সাধক।
দিনকরকে স্মরণ করার এই দিনে লালকেল্লার সেই কিংবদন্তি মুশায়রার ঘটনাটি মনে আসে—যা শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাসের এক অমোঘ ঘোষণা।
লালকেল্লার সিঁড়িতে ইতিহাসের নির্মল মুহূর্ত
দিল্লির লালকেল্লায় আয়োজিত এক বিশাল মুশায়রায় দেশের প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা জমায়েত হয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুও। অতিথিরা লালকেল্লার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলেন; নেহেরুর ঠিক পিছনেই ছিলেন ড. রামধারী সিং দিনকর।
হঠাৎ নেহেরু একটি ধাপে পা পিছলে সামান্য ভারসাম্য হারালেন। চোখের পলকে দিনকরজি তাঁকে ধরে সামলে দিলেন। ভারসাম্য ফিরে পেয়ে নেহেরু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
আর তখনই দিনকরজি যে বাক্যটি বলেছিলেন, তা আজও ভারতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির এক কালজয়ী উক্তি:
“পণ্ডিতজি, ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মনে রাখবেন—ভারতের রাজনীতি যখনই ভারসাম্য হারাবে, তার শিল্প ও সংস্কৃতি পিছন থেকে এভাবেই ধরে সামলে নেবে।”
কত গভীর, কত সত্য, কত সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সেই কথা! এখানে শুধু একজন কবির বিনয় নেই; আছে একজন সাংস্কৃতিক প্রহরীর দৃঢ় ঘোষণা—সমাজের নৈতিকতা টিকিয়ে রাখতে শিল্প ও সাহিত্যই শেষ আশ্রয়স্থল।
দিনকরের সাহিত্য: আগুন ও অমৃতের সংমিশ্রণ
দিনকরের রচনা—উर्वশী, পরশুরাম, কুরুক্ষেত্র, রশ্মিরথী—ইত্যাদি শুধু সাহিত্য কীর্তি নয়; এগুলো ভারতীয় ইতিহাস, পুরাণ, সমাজচেতনা এবং মানবিক সংগ্রামের বিশাল আখ্যান। তাঁর ভাষা কখনো অগ্নিঝরা, কখনো নদীর মতো শান্ত; কখনো বিদ্রোহী, কখনো গভীর দার্শনিক।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
শিল্প সমাজকে শুধু সাজায় না, প্রয়োজন পড়লে সমাজকে বাঁচায়ও।
এই বিশ্বাসের বাস্তব রূপই আমরা দেখেছিলাম লালকেল্লার সেই ঘটনার মাধ্যমে।
আজকের প্রশ্ন: আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি?
সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, রাষ্ট্রনীতি বদলায়। কিন্তু শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির দায়িত্ব কি কখনো বদলায়?
দিনকর স্মরণ করিয়ে গিয়েছিলেন—
রাজনীতি যখন হোঁচট খায়, তখন শিল্প-সংস্কৃতিই তাকে টেনে তোলে।
আজ তাই প্রশ্ন জাগে—
ভারতের শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা কি এখনো সেই ভূমিকা পালন করছেন?
বাংলাদেশেও কি আমাদের শিল্পী, লেখক, সংগীতশিল্পী, নাট্যকাররা সমাজকে ভুল পথে ঠেকাতে পারছেন?
সত্য বলতে কী—সংস্কৃতির শক্তি আজও অপরিহার্য। কিন্তু সেই শক্তি কাজে লাগাতে প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক সাহস, এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা—যা দিনকরজি সারাজীবন লালন করেছিলেন।
দিনকরকে স্মরণ মানে দায়িত্বকে স্মরণ
ড. রামধারী সিং দিনকরের জন্মদিনে তাঁকে শুধু শ্রদ্ধা জানানোই নয়; তাঁর কথার অন্তর্নিহিত দায়বদ্ধতাকে গ্রহণ করাও জরুরি। আমরা ভুলে যেতে পারি, কিন্তু ইতিহাস ভুলে না:
জগতের প্রতিটি রাজনৈতিক অস্থিরতার ভিতর দিয়ে শিল্প–সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়।
দিনকরজি আমাদের শিখিয়েছেন—
শিল্পীর কণ্ঠ রুখে দেওয়া যায়, কিন্তু তার আত্মা নয়;
রাজনীতি ভুল পথে গেলে সাহিত্য পথ দেখায়;
এবং সংস্কৃতিই একটি জাতিকে সভ্যতার সীমানায় ধরে রাখে।
২৩শে সেপ্টেম্বর দিনকরের জন্মদিনে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর শক্তিশালী কবিতা, তাঁর মনীষা, তাঁর সাংস্কৃতিক দৃঢ়তা—সবই আজকের দিনে নতুন করে পথ দেখায়।
আপনার চিন্তা, অনুভূতি ও অভিমত জানাতে পারেন।
একসঙ্গে আমরা হয়তো খুঁজে পাব—
একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে শিল্প–সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি কোথায়, এবং কীভাবে আমরা সেই শক্তিকে জাগ্রত করতে পারি।
