বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার জন্য মূলত দুটি মন্ত্রণালয় কাজ করে: শিক্ষা মন্ত্রণালয় (মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, মাদ্রাসা ও কারিগরি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (প্রাথমিক স্তর)। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হলে মূলত তিনটি ধাপে সরকারি অনুমোদন লাগে: ১. স্থাপনের অনুমতি (Establishment Permission), ২. পাঠদানের অনুমতি (Academic Recognition), এবং ৩. এমপিওভুক্তি (Monthly Pay Order) বা আর্থিক অনুদান প্রাপ্তি (বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে)। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি গঠন এবং শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা আলাদা আইন ও বিধিমালা রয়েছে।
নিচে এ বিষয়ক আইন, বিধিমালা ও নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো:
১. বেসরকারি স্কুল ও কলেজ (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক)
বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে:
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২১: এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা। একটি প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষক-কর্মচারী থাকবেন, তাদের যোগ্যতা কী হবে, এবং তারা কখন সরকারি বেতন-ভাতা (MPO) পাবেন, তা এই নীতিমালায় বিস্তারিত বলা আছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদান ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা, ২০২২: নতুন স্কুল বা কলেজ খুলতে হলে জমির পরিমাণ কত হতে হবে, জনসংখ্যা ও দূরত্বের শর্ত কী, এবং কীভাবে বোর্ডের স্বীকৃতি মিলবে—তা এই নীতিমালায় উল্লেখ আছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০০৯ (ও সংশোধনী): প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা ম্যানেজিং কমিটি কীভাবে নির্বাচিত হবে, তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব কী হবে—তা এই প্রবিধানমালায় বর্ণিত।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) আইন, ২০০৫: বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের একমাত্র বৈধ মাধ্যম হলো এনটিআরসিএ-এর সুপারিশ। ম্যানেজিং কমিটি এখন আর সরাসরি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না।
২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (Private Universities)
উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আলাদা আইন রয়েছে:
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০: ট্রাস্টি বোর্ড গঠন, ক্যাম্পাসের জমির পরিমাণ, সিন্ডিকেট সভা, উপাচার্য নিয়োগ এবং ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট কীভাবে হবে, তা এই আইনে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এই আইনের তদারককারী সংস্থা।
৩. ইংলিশ মিডিয়াম বা বিদেশি কারিকুলাম
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর জন্য বিশেষ বিধিমালা রয়েছে:
বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১৭: ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল বা ইন্টারন্যাশনাল বেকালাউরেট (IB) কারিকুলামে পরিচালিত স্কুলগুলোর নিবন্ধন, ফি নির্ধারণ এবং পরিচালনা পর্ষদ গঠনের নিয়মাবলী এখানে রয়েছে।
বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন অধ্যাদেশ, ১৯৬২: এটি পুরনো আইন হলেও কিন্ডারগার্টেন এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের আইনি ভিত্তি হিসেবে এখনো প্রাসঙ্গিক।
৪. প্রাথমিক ও গণশিক্ষা (Primary Education)
প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য:
বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন, ১৯৯০: দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার আইন।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা, ২০১১ (সংশোধিত): কিন্ডারগার্টেন বা নার্সারি স্কুল স্থাপনের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে নিবন্ধন নেওয়ার নিয়মাবলী।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯: সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি।
৫. মাদ্রাসা শিক্ষা (Madrasah Education)
মাদ্রাসাগুলোর জন্য সাধারণ শিক্ষার মতোই সমান্তরাল কিছু বিধিমালা রয়েছে:
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৩: ফাজিল ও কামিল স্তরের মাদ্রাসাগুলোর অধিভুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আইন, ২০২০: ইবতেদায়ী থেকে আলিম পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০১৮ (সংশোধিত): মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও পদমর্যাদা নির্ধারণের জন্য।
৬. কারিগরি ও ভোকেশনাল (Technical Education)
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আইন, ২০১৮: পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বা ভোকেশনাল স্কুল স্থাপনের শর্তাবলী।
বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা: কারিগরি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির নিয়মাবলী।
৭. জাতীয় শিক্ষানীতি (National Policy)
সব আইনের মূল ভিত্তি হলো এই দলিলটি:
জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০: প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন দর্শনে চলবে, তার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’ এবং ‘ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা’ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আইন না মেনে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলে পরবর্তীতে পাঠদানের অনুমতি (Recognition) বাতিল বা এমপিও স্থগিতের মতো জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
Comments are closed.