শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ফাঁদ এড়াবেন!

আমাদের একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে অশিক্ষিত জনগণ মূলত মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পড়েন। তবে আমাদের দেশে বারবার প্রমাণিত হচ্ছে—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। আমরা প্রচুর শিক্ষিত মানুষকে হরহামেশা মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পড়তে দেখছি। যখন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন তারা লজ্জিত হন, কিন্তু কিছুদিন পর আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন।

আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার কাছে কয়েকটি বিষয় এ ক্ষেত্রে মূলত দায়ী বলে মনে হয়েছে—

যেসব কারণে বিপদ হয়:

১. আমাদের শিক্ষা সমালোচনামূলক চিন্তা করতে শেখায়নি:

বেশিরভাগ সময় শিক্ষা আমাদের তথ্য মুখস্থ করতে শেখায়, কিন্তু critical thinking বা তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলে না। ফলে ডিগ্রি থাকলেও মানুষ বিশ্বাসযোগ্য মোড়কে এলে মুহূর্তেই ভুয়া তথ্য বিশ্বাস করে ফেলে। সমালোচনামূলক চিন্তার অভাবে তাদের সামনে কোনো “রেড ফ্ল্যাগ” ধরা পড়ে না।

২. নিশ্চিত বিশ্বাস ও আদর্শগত পক্ষপাত:

মানুষ সাধারণত যা আগে থেকেই বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসকে সমর্থন করে—এমন তথ্যই গ্রহণ করতে চায়। একে বলে confirmation bias। প্রোপাগান্ডা এই দুর্বলতাকে অত্যন্ত কৌশলে ব্যবহার করে।

৩. আবেগ যুক্ত হলে বুদ্ধি পেছনে পড়ে:

ধর্ম, দেশপ্রেম, জাতিগত পরিচয়, ভয় বা ঘৃণার মতো আবেগ জড়ালে শিক্ষিত মানুষও যুক্তিবোধ হারায়। প্রোপাগান্ডা সবসময় আবেগকে লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়।

৪. বিশ্বাসযোগ্য উৎসের ছদ্মবেশ:

ভুয়া তথ্য অনেক সময় “বিশেষজ্ঞ”, “ডাক্তার”, “বিদেশি মিডিয়া” বা পরিচিত মুখের উদ্ধৃতি দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। শিক্ষিত মানুষ উৎস দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু গভীরে যাচাই করে না।

৫. তথ্য-অতিরিক্ততার ক্লান্তি (Information overload):

আজকের দিনে এত বেশি তথ্য আসে যে মানুষ সব যাচাই করার মানসিক শক্তি পায় না। তখন সহজ ব্যাখ্যা বা চটকদার গল্পকেই সত্য ধরে নেয়।

৬. গ্রুপ আইডেন্টিটি ও সামাজিক চাপ:

নিজের বন্ধু, পছন্দের রাজনৈতিক বা আদর্শিক গোষ্ঠী যদি কিছু বিশ্বাস করে, শিক্ষিত মানুষও ‘পিছিয়ে পড়ার’ ভয়ে সেটাই মেনে নেয়।

৭. “আমি তো শিক্ষিত” — এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস:

অনেকে মনে করেন, তারা শিক্ষিত বলেই ধোঁকায় পড়বেন না। এই overconfidence নিজেই সবচেয়ে বড় ফাঁদ।

৮. প্রোপাগান্ডা এখন বিজ্ঞানভিত্তিক:

আধুনিক প্রোপাগান্ডা মনোবিজ্ঞান, ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। তাই শুধু সাধারণ শিক্ষা দিয়ে এর বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন।

 

কীভাবে বাঁচা যায়?

১. নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্য পড়ার অভ্যাস করা

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এমন তথ্য খোঁজে ও গ্রহণ করে যা তার পূর্ববিশ্বাসকে সমর্থন করে। এতে মানসিক স্বস্তি আসে, কিন্তু চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়। নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্য পড়া মানে নিজের অবস্থান ত্যাগ করা নয়; বরং নিজের বিশ্বাস কতটা শক্ত বা দুর্বল—তা যাচাই করা।

যে ব্যক্তি ভিন্নমত পড়তে ভয় পায়, সে আসলে নিজের বিশ্বাস নিয়েই অনিশ্চিত। বিপরীত মত পড়লে আমরা শিখি—কোথায় আমাদের যুক্তি দুর্বল, কোথায় আবেগ কাজ করছে, আর কোথায় তথ্য সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ। এই অভ্যাস না থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে একধরনের echo chamber-এ বন্দি হয়ে পড়ে, যেখানে একই কথা ঘুরে ফিরে শোনা যায়, কিন্তু সত্য যাচাই হয় না।

২. আবেগ জাগানো খবর এলে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার না করা

প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো আবেগ। ভয়, রাগ, ঘৃণা, দেশপ্রেম বা ধর্মীয় অনুভূতি—এই আবেগগুলো সক্রিয় হলেই মানুষের যুক্তিবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই যে খবর আপনাকে হঠাৎ উত্তেজিত, ক্ষুব্ধ বা আবেগাক্রান্ত করে তোলে, সেটিই সবচেয়ে বেশি সন্দেহের দাবি রাখে।

সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করা মানে আপনি অজান্তেই প্রোপাগান্ডার বাহক হয়ে যাচ্ছেন। কয়েক মিনিট থামা, নিজেকে শান্ত করা এবং ভাবা—এই সামান্য বিরতিই অনেক বড় ক্ষতি ঠেকাতে পারে। আবেগ দিয়ে লেখা খবর যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য সাধারণত তত ধীরে আসে।

৩. একাধিক স্বাধীন উৎস থেকে যাচাই করা

একটি উৎস কখনোই যথেষ্ট নয়—সে যতই পরিচিত বা জনপ্রিয় হোক না কেন। সত্য যাচাইয়ের মূলনীতি হলো উৎসের বৈচিত্র্য। একই খবর যদি ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ, দেশ বা রাজনৈতিক অবস্থানের মিডিয়াতে একইভাবে উঠে আসে, তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।

কিন্তু যদি দেখা যায় খবরটি শুধু একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্ল্যাটফর্মেই ঘুরছে, তাহলে প্রশ্ন তোলা জরুরি। স্বাধীন উৎস মানে শুধু আলাদা সংবাদমাধ্যম নয়; বরং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থের উৎস। একাধিক উৎস থেকে যাচাই করা মানে তথ্যের ওপর নয়, তথ্যের প্রেক্ষাপটের ওপর নজর দেওয়া।

৪. “এটা আমাকে কেন বিশ্বাস করাতে চাচ্ছে?”—এই প্রশ্নটি করা

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্ন। প্রতিটি তথ্যের পেছনে একটি উদ্দেশ্য থাকে—কখনো রাজনৈতিক, কখনো অর্থনৈতিক, কখনো আদর্শিক। এই প্রশ্নটি করলে আপনি আর শুধু তথ্যের ভোক্তা থাকেন না; আপনি বিশ্লেষক হয়ে ওঠেন।
আপনি তখন ভাবেন—এই তথ্যটি আমাকে ভয় দেখাতে চায়? ঘৃণা তৈরি করতে চায়? কোনো পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন আদায় করতে চায়? না কি আমাকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করছে? এই প্রশ্নটি প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে দেয়, কারণ প্রোপাগান্ডা কখনোই চায় না আপনি তার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলুন।

এই অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা সহজ নয়, কারণ এগুলো আমাদের স্বাভাবিক স্বস্তি বা আরামের বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু সত্য ও সচেতনতার পথ কখনোই আরামদায়ক নয়।

একটি শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়তে হলে তথ্য গ্রহণের আগে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতেই হবে। নইলে আমরা জেনে না জেনে এমন সব মিথ্যার অংশীদার হয়ে যাব, যার মূল্য একদিন পুরো সমাজকে দিতে হবে।

প্রোপাগান্ডায় পড়া বুদ্ধির অভাব নয়, বরং মানবিক দুর্বলতার ফল। সচেতনতা আর আত্মসমালোচনাই একমাত্র প্রতিরক্ষা।