গত ১৪ মে ২০২৪, মঙ্গলবার রাতের ঘটনা। পাকিস্তানের করাচি থেকে পুলিশ প্রখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী এবং মানবাধিকার কর্মী শিমা কেরমানিকে গ্রেপ্তার করেছে। খাতাকলমে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো অভাব নেই—’১৪৪ ধারা’ অমান্য করা, বেআইনি জনসমাবেশ (ধারা ১৪৭) কিংবা রাস্তা অবরোধ (ধারা ৩৪১)। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তাঁর নামে যে ‘অপরাধ’ নথিভুক্ত করেছে, তা আসলে এক শিল্পীর স্বাধীন ও অকুতোভয় সত্তারই বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। শিমা কেরমানি কেবল একজন বিশ্বখ্যাত ভরতনাট্যম শিল্পীই নন; তিনি দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম মাইলফলক এবং পাকিস্তানে “অউরাত মার্চ”-এর প্রধান কারিগর।

যে রাষ্ট্র নিজের দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি আর সমাজব্যবস্থাকে পঙ্গু করে ফেলেছে, সেই দেউলিয়া পাকিস্তানের কাছে আসলে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা আশা করা যায়! একটি রাষ্ট্র কতটা ভঙ্গুর আর ভীরু হলে ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধার নাচের ছন্দে তার ভিত নড়ে ওঠে? তখনই বোঝা যায়, এই যুগে স্বৈরাচারী আর দেউলিয়া শাসকের কাছে সত্য ও শিল্পের চেয়ে বিপজ্জনক মারণাস্ত্র আর দ্বিতীয়টি নেই। কী অদ্ভুত এই শাসনব্যবস্থা! বন্দুকের গর্জন আর সন্ত্রাসীদের আস্ফালন এখানে সহনীয়, কিন্তু নারীর নূপুরের শব্দে নিষেধাজ্ঞা। অন্যায়ের কাছে মেরুদণ্ড বিকিয়ে দেওয়া এখানে স্বাভাবিক রীতি, আর শিল্পের মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরা এক মস্ত বড় দুঃসাহস।
শিমা কেরমানি শাড়ি পরেন, কপালে বড় একটা লাল টিপ দেন, মঞ্চে উঠে নাচেন। তিনি ঠিক সেটাই করেন যা একজন স্বাধীন মানুষের করা স্বাভাবিক। তাঁর মূল সমস্যাটা কোথায় জানেন?—তিনি কারও ‘অনুমতি’ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনের সেই অন্ধকার সময়েও তিনি শাস্ত্রীয় নৃত্যকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। আর এই ‘অনুমতি না চাওয়া’টাই কট্টরপন্থা আর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ এই দেউলিয়া ব্যবস্থা স্বাধীন মানুষকে সহ্য করতে পারে না; তারা চায় অনুগত, আজ্ঞাবহ আর নিঃশব্দ পুতুল। যে মাথা নোয়ায় না, ক্ষমতার কেন্দ্র তাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। আর সেই ভয় ঢাকতেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় নিয়ম, ধর্ম কিংবা তথাকথিত সংস্কৃতির দোহাই।
ইতিহাস এই দমনাভিযানের সাক্ষী। কখনো মুখ ঢাকার চাপ, কখনো চুল আড়াল করার নির্দেশ, কখনো বা নারীর কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার অপচেষ্টা। আর যখনই কেউ এসব শৃঙ্খল ভাঙতে চায়, তখনই সে হয়ে যায় ব্যবস্থার শত্রু। লাল শাহবাজ কালান্দরের মাজারে যখন সুফি অনুসারীদের ওপর আত্মঘাতী হামলা হয়েছিল, তখন এই শিমা কেরমানিই সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধামাল’ (নৃত্য) পরিবেশন করে গেয়েছিলেন প্রেমের গান। আজ সেই অকুতোভয় কণ্ঠকেই আইনি মারপ্যাঁচে শৃঙ্খলিত করা হয়েছে।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, “ধুর, এটা এত বড় করে দেখার কী আছে? সাধারণ একটা অ্যারেস্টই তো!” তাদের উদ্দেশে বলি—আপনারা আসলে সত্যটা বুঝতে চান না। কারণ সত্যটুকু বুঝতে গেলে নিজেদের যাপিত জীবনের ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থান থেকে বের হতে হয়, যা করার সাহস আপনাদের নেই। সমাজ সবসময়ই চায় নিয়ন্ত্রিত, তথাকথিত ‘ভদ্র’ আর চুপ থাকা নারী। শিমা কেরমানি সেই বিষাক্ত নীরবতা ভেঙেছেন বলেই আজ তিনি কারাগারের ওপারে।
আর আপনারা যারা তথাকথিত সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে এই গ্রেপ্তারের ন্যায্যতা খোঁজেন, আপনারা সেই একই শোষক ও দেউলিয়া মানসিকতার একটা ‘সফট ভার্সন’ মাত্র। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময় যারা “আমাদের কালচার আলাদা” কিংবা “এত রিয়্যাক্ট করার কী আছে” বলে নির্লিপ্ত থাকেন, আপনারা আসলে অপরাধীর পক্ষই অবলম্বন করেন। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেদের যতই প্রগতিশীল ভাবুন না কেন, দিনশেষে আপনারা কেবলই সুবিধাবাদী। একটি নির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে অন্য সমগোত্রীয় অন্যায়ে চুপ থাকা—আর যাই হোক, নারীবাদ নয়।
শিমা কেরমানি যা করেছেন, তা কোনো অলৌকিক বীরত্ব নয়, সেটিই হওয়ার কথা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিক কাজটুকু করার জন্য যে একাকী লড়াই তাঁকে লড়তে হচ্ছে, তাঁর সেই অটল সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানাই। মাশা আমিনিদের রক্ত যখন রাজপথে ঝরে, তখন আমাদের এই নির্লিপ্ততা চরম লজ্জার।
একটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন?—কোনো পুরুষ কি কেবল নিজের শরীর নিজের মতো ব্যবহার করা বা নিজের পছন্দের পোশাক পরার জন্য কখনো গ্রেপ্তার বা লাঞ্ছিত হয়েছে? উত্তরটা আপনারা খুব ভালো করেই জানেন। কিন্তু মুখে স্বীকার করবেন না, কারণ তাতে আপনাদের সাজানো পুরুষতান্ত্রিক তাসের ঘরগুলো ধসে পড়বে।
আপনারা নারীবাদ নিয়ে উপহাস করেন কারণ আপনাদের কখনো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাজপথে নামতে হয়নি। আপনি কখনো নিজের শরীর নিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে থাকেননি। কেউ আপনাকে বেঁধে দেয়নি আপনি কতটা দৃশ্যমান হবেন আর কতটা আড়ালে থাকবেন। এই ‘প্রিভিলেজ’টুকুই আপনাদের বিবেককে অন্ধ করে রেখেছে।
তাই আপনি যদি এখনও নারীবাদকে “ওভার-রিঅ্যাকশন” মনে করেন, তবে জেনে রাখুন—আপনি নিজেই এই বিষাক্ত ব্যবস্থার একটা অংশ। কথাগুলো শুনতে কঠোর মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যকে মোলায়েম ভাষায় পরিবেশন করার সময় অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। শিমা কেরমানি আসলে গ্রেপ্তার হননি, বরং তাঁর এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের চরম ভীরুতা, নগ্নতা আর দেউলিয়াত্ব আরও একবার পুরো বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
