২০০৯ থেকে ২০১৮—এই এক দশক বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে এক বিস্ময়কর অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বমন্দা ও নানামুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুনিপুণ নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিল্প ও বাণিজ্য খাতকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।
এই দশ বছরে কেবল গতানুগতিক উন্নয়নই ঘটেনি, বরং রুগ্ন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (BEPZA) অভূতপূর্ব প্রসার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বিকাশ ঘটেছে। আইন ও নীতিমালার সংস্কার থেকে শুরু করে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ স্থাপন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। একদিকে যেমন নতুন নতুন শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে, অন্যদিকে পাট ও বস্ত্র খাতের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে নেওয়া হয়েছে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

শিল্প মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাসমূহের বিবিধ উন্নয়ন ও সংস্কার।
১. আইন, নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
শিল্পখাতের সার্বিক উন্নয়ন, মান রক্ষা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার গত এক দশকে ব্যাপক আইনি ও নীতিগত সংস্কার করেছে।
- নতুন আইন ও বিধিমালা: বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন-২০১৮, ট্রেডমার্কস আইন ২০০৯ ও বিধি ২০১৫, ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য নিবন্ধন আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৫, এবং ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে।
- নীতিমালা: জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬, শিল্প প্লট বরাদ্দ নীতিমালা ২০১০, লবণ নীতি ২০১১ এবং জাহাজ ভাঙা ও রিসাইক্লিং বিধিমালা ২০১১ প্রণয়ন করা হয়।
- স্বীকৃতি ও পুরস্কার: শিল্পে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রাষ্ট্রপতির শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার নির্দেশনাবলী ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩৩৮ জনকে ‘বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি-শিল্প)’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
২. সার শিল্প ও কৃষি সুরক্ষা
কৃষকদের নিকট নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
- শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি: বার্ষিক ৫ লক্ষ ৮০ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন গ্রানুলার ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানা স্থাপন করে বিসিআইসি-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
- বাফার গুদাম: সার সংরক্ষণে ১৩টি নতুন বাফার গুদাম নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে এবং আরও ৩৪টি বাফার গোডাউন (৫,১০,০০০ মে.টন ধারণক্ষমতা) নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
- সফলতা: গত ৯ বছরে দেশে সারের কোনো সংকট দেখা যায়নি এবং দ্রুততম সময়ে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
৩. চিনি ও খাদ্য শিল্প
চিনিকলগুলোর আধুনিকায়ন এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- আধুনিকায়ন: চিনিকলসমূহে পুরনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন এবং ৭টি চিনিকলে সেন্ট্রিফিউগাল মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও চিনিকলে সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদন এবং নর্থ বেঙ্গল চিনিকলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- সিমেন্ট শিল্প: ছাতক সিমেন্ট কোম্পানিকে লাভজনক করতে এর উৎপাদন পদ্ধতি ‘ওয়েট প্রসেস’ থেকে ‘ড্রাই প্রসেস’-এ রূপান্তরের কাজ চলছে।
- জৈব সার: কেরু সুগার মিলসে ডিস্টিলারি বর্জ্য (প্রেসমাড) থেকে অরগানিক জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
- যন্ত্রপাতি স্থাপন: ফরিদপুর সুগার মিলে ১টি বয়লার, ১টি শ্রেডার ও ১টি ইভাপোরেটর এবং অন্যান্য ৪টি মিলে জেনারেটর ও টারবাইন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয় করছে।
৪. লবণ শিল্প ও আয়োডিন নিশ্চিতকরণ
- আয়োডিন প্ল্যান্ট: গলগণ্ড ও আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগ নির্মূলে দেশের ২৬৭টি লবণ ক্র্যাশিং মিলের সবকটিতে আয়োডিন সংমিশ্রণ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
- লবণ চাষ উন্নয়ন: বিসিক খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে লবণ শিল্পের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর ফলে চাষিরা লবণ মৌসুমের পরে ধান ও চিংড়ি চাষ করে বাড়তি আয় করছেন এবং সুন্দরবনের অবৈধ কাঠ কাটার প্রবণতা কমেছে।
৫. বিসিক (BSCIC) এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে বিসিক নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
- শতরঞ্জি শিল্প: রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি শিল্পের উন্নয়নে ৩০টি কোর্সের মাধ্যমে ৬৬০ জনকে প্রশিক্ষণ এবং ১৫০ জনকে ৪৫ লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে প্রশিক্ষণ শেড ও প্রদর্শনী কেন্দ্র।
- শিল্পনগরী: পাবনার হেমায়েতপুরে ৫০ একর জমিতে শিল্পনগরী স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ৯৭টি প্লটের মাধ্যমে ৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া কুমারখালি, গোপালগঞ্জ, মিরসরাই ও বরগুনায় নতুন শিল্পনগরী এবং ঝালকাঠি, রাজশাহী ও ধামরাই শিল্পনগরী সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
- মৌচাষ: আধুনিক পদ্ধতিতে মধু উৎপাদনের জন্য ৫০০০ জনকে ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়েছে। অচিরেই একটি আধুনিক মৌ-গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। গত ১০ বছরে বিসিকের আওতায় সরকারিভাবে ২৪.৫০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদিত হয়েছে।
- স্থানান্তর: পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ও মুদ্রণ শিল্পকে কেরানীগঞ্জে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জায়গায় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
৬. পরিবেশবান্ধব শিল্প উদ্যোগ
- চামড়া শিল্পনগরী (সাভার): হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের জন্য সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জমিতে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ১১৫টি ট্যানারি উৎপাদন শুরু করেছে। এখানে সিইটিপি (CETP) এবং ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ সমাপ্তির পথে।
- এপিআই (API) শিল্পপার্ক: ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়াতে ২০০ একর জমিতে দেশের প্রথম ‘অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট শিল্পপার্ক’ স্থাপিত হচ্ছে।
৭. বিএসটিআই (BSTI) ও মান নিয়ন্ত্রণ
পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই-এর সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
- ন্যাশনাল মেট্রোলজি ল্যাবরেটরি: ইইউ (EU) ও নোরাড (NORAD)-এর সহায়তায় বিএসটিআইতে ৬টি ল্যাবরেটরি সম্বলিত আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
- আঞ্চলিক বিস্তার: সিলেট ও বরিশাল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক অফিস এবং রংপুর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও ময়মনসিংহে ল্যাবরেটরি কাম অফিস প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
- জ্বালানি সাশ্রয়: এসি, ফ্রিজ, ফ্যান ও মোটরের জন্য ‘Energy Efficiency Standard and Labeling’ মান প্রণয়ন করা হয়েছে।
- সার্ক মান সংস্থা: দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের সুবিধার্থে ঢাকায় SARSO-এর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
- ভেজাল বিরোধী অভিযান: বিএসটিআই কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ৫৪৯.৬৭ লক্ষ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
৮. অটোমোবাইল ও অন্যান্য
- প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ: সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে জাপানের মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্টস জিপ (CR-45), ভারতের মাহিন্দ্রা স্করপিও (Scorpio S10) এবং চীনের ল্যান্ডফোর্ট জিপ সংযোজন ও বাজারজাত করা হচ্ছে।
- জিআই (GI) পণ্য: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য ‘জামদানি’-কে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এর মালিকানা স্বত্ব আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিনিয়োগ উন্নয়ন এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) কর্তৃপক্ষের সাফল্য।
৯. বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে ‘বিনিয়োগ বোর্ড’ ও ‘বেসরকারীকরণ কমিশন’ একীভূত করে বিডা (BIDA) গঠন করা হয়। এর কার্যক্রম ও সাফল্য নিম্নরূপ:
- প্রতিষ্ঠান গঠন ও আইন: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৬ প্রণয়নের পর আন্তর্জাতিক মানের অর্গানোগ্রাম তৈরি করা হয়েছে।
- বিনিয়োগ আকর্ষণ ও লিংকেজ: আন্তর্জাতিক শীর্ষ কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যেমন: জাপানের মিতসুবিশি, সুজুকি, টয়োটা, হোন্ডা; ভারতের রিলায়েন্স, আদানি গ্রুপ। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরির জন্য স্থানীয় ১ লক্ষ নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
- বিনিয়োগ পরিসংখ্যান (নিবন্ধিত প্রকল্প):
- মোট প্রকল্প: ১৫,৮৮৬টি (স্থানীয় ও বিদেশি)।
- মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগ: ৯৫,৯৩,৭৫৩.৫৫২ মিলিয়ন টাকা (১২২,৮২৪.৬০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
- স্থানীয় বিনিয়োগ: ১৪,৩০৬টি প্রকল্পে ৬৫,০২,৬০৬.১১৪ মিলিয়ন টাকা।
- বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগ: ১,৫৮০টি প্রকল্পে ৩০,৯৩,৪৬৩.০৮ মিলিয়ন টাকা (৩৯,৭৬৪.৩৯৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
- কর্মসংস্থান: এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে মোট ৩০,২৮,০৭৩ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
- সেবা প্রদান:
- ওয়ার্ক পারমিট: ৫৪,৪৮৪ জন বিদেশি নাগরিককে শিল্প ও বাণিজ্যিক ওয়ার্ক পারমিট প্রদান।
- অবকাঠামো: শিল্প প্লট, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ ছাড়পত্র বিষয়ে ৪০১টি সুপারিশ প্রদান।
- অফিস অনুমতি: লিয়াজোঁ, ব্রাঞ্চ ও রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিসের অনুকূলে ১৬৬টি অনুমতি প্রদান।
- আমদানি ও ঋণ: ১৫,৪০২টি প্রকল্পের অনুকূলে শিল্প আইআরসি (IRC) সুপারিশ এবং ৮৩৭টি বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন (১২,২০২.৩৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
- সংস্কার ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস: ‘Ease of Doing Business’ সূচকে উন্নয়নের জন্য ৮৮টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ১ বছরে ২২টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ৩৪%-এ উন্নীত করা।
১০. বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (BEPZA)
বেপজার অধীনে ইপিজেডগুলোতে গত ১০ বছরে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
- সামিট ও নতুন জোন:
- ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বেপজা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টরস সামিট ২০১৮’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৭০০ জন বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন।
- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১১৫০ একর জমিতে ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
- তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি (২০০৯-২০১৭ বনাম ২০০১-২০০৮):
- বিনিয়োগ: ৩০০০.৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জিত (প্রবৃদ্ধি ২০০.৯৩%)। পূর্ববর্তী ৯ বছরে ছিল ১৯৯৭.১৮ মিলিয়ন ডলার।
- রপ্তানি: ৪৫,২৪১.৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রবৃদ্ধি ২৪৫.৬৮%)। পূর্ববর্তী ৯ বছরে ছিল ১৩,০৮৭.৬১ মিলিয়ন ডলার।
- কর্মসংস্থান: ২,৮৩,৬২০ জনের নতুন কর্মসংস্থান (প্রবৃদ্ধি ১১৮.৬০%)।
- নতুন শিল্প: ১৭৯টি নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে (প্রবৃদ্ধি ৪৫.৫৩%)। পূর্ববর্তী সময়ে ছিল ১২৩টি।
- অবকাঠামো উন্নয়ন: ইপিজেডগুলোতে ২৯টি নতুন কারখানা ভবন নির্মাণ এবং ৭টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এতে ৩,৩২,৪৮০ বর্গমিটার ফ্লোর স্পেস তৈরি হয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেপজা ও বেজা-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
- শ্রমিক কল্যাণ:
- ২০১০ ও ২০১৩ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি (৬০%-৭০% পর্যন্ত)।
- “The EPZ Workers Welfare Association and Industrial Relations Act, 2010” আইন পাশ।
- শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ৫টি ইপিজেডে ‘বেপজা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’ প্রতিষ্ঠা।
- ২৩৩টি কোম্পানি নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করেছে এবং ১৭৫টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (Day Care) রয়েছে।
- নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
- নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী, আনসার ও শিল্প পুলিশ সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা।
- ৬৫৫টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি (CCTV Surveillance System)।
- প্রতিটি জোনে ফায়ার স্টেশন ও পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন।
- পরিবেশ সুরক্ষা ও গ্রিন ফ্যাক্টরি:
- ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার (CETP) এবং ২টি এনভাইরনমেন্ট ল্যাব চালু। কুমিল্লা ইপিজেডেও CETP চালু।
- বিশ্বের শীর্ষ ১০টি লিড প্লাটিনাম (LEED Platinum) সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে আদমজী ইপিজেডের ‘রেমি হোল্ডিংস লিঃ’ ১ম এবং ঈশ্বরদী ইপিজেডের ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও লিঃ’ ৩য় স্থান অর্জন করেছে।
- চট্টগ্রাম ইপিজেডে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR): রানা প্লাজা ধসে এবং হাওরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রায় ২২ কোটি টাকা দান। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ২৫ লাখ টাকা ও ১ লাখ পোশাক সামগ্রী প্রদান।

বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বস্ত্র ও পাট খাতের পুনর্জাগরণ।
১১. বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
সরকারের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং রপ্তানি আয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
- নিত্যপণ্যের বাজার ও মূল্য স্থিতিশীলতা:
- পবিত্র রমজান মাসসহ সারা বছর দেশে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলাসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
- রপ্তানি আয় ও লক্ষ্যমাত্রা:
- ২০০৭-০৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১৪.১১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বর্তমানে ১৯৯টি দেশে ৭৪৪টি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
- ২০২১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
- প্রণোদনা ও বাণিজ্যিক উইং:
- বর্তমানে ২৭টি পণ্য রপ্তানিতে ২% থেকে ২০% পর্যন্ত নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
- বাণিজ্যিক উইং ১৯টি দেশ থেকে বাড়িয়ে ২১টি দেশে স্থাপন করা হয়েছে।
- তৈরি পোশাক খাত (RMG):
- ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ছিল ১০.৭০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৭-১৮ সালে ৩০.৬১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার।
- নিরাপদ ও কর্মবান্ধব পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং দেশে প্রচুর ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ গড়ে উঠছে।
- নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা ৩% থেকে বাড়িয়ে ৪% করা হয়েছে।
- প্রকল্প ও উন্নয়ন কার্যক্রম:
- জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০১৮ পর্যন্ত ১২টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে (পলিসি, কমপ্লায়েন্স, ফ্যাশন-ডিজাইন ইত্যাদি)।
- চামড়া শিল্প: ২০১৭ সালকে ‘প্রডাক্ট অফ দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়েছে। ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ শীর্ষক ৯৪১ কোটি টাকার প্রকল্প (মেয়াদ ৬ বছর) নেওয়া হয়েছে। হাজারীবাগে ইতালি সরকারের সহায়তায় ‘Bangladesh Leather Services Center’ স্থাপন করা হয়েছে।
- চা শিল্প: ২০০৬ সালে চা উৎপাদন ছিল ৫৩.৪১ মিলিয়ন কেজি, যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫.০৫ মিলিয়ন কেজিতে।
- অবকাঠামো ও মেলা:
- পূর্বাচল উপ-শহরে চীন সরকারের সহায়তায় ১৩০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার’ নির্মাণের কাজ চলছে (২০২০ সালে সমাপ্তির লক্ষ্য)।
- শেরে-বাংলা নগরে ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে রপ্তানি হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে।
- ডিজিটালাইজেশন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি:
- বাংলাদেশ প্রথম দেশ হিসেবে ‘পেপারলেস ট্রেড’ (Paperless Trade) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
- UNESCAP-এর উদ্যোগে ‘Framework Agreement on Facilitation of Cross-Border Paperless Trade in Asia and the Pacific’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
- রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে জিএসপি অটোমেশন (GSP Automation), জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে।
- বিশেষ প্রকল্পসমূহ:
- SPEED প্রকল্প: গাজীপুরের কাশিমপুরে আরএমজি ক্লাস্টারে মিনি ফায়ার ব্রিগেড স্থাপন।
- BWCCI প্রকল্প: সিলেট অঞ্চলে ৩০০ জন ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা তৈরি।
- PSES-I: ২৩৫টি আরএমজি ফ্যাক্টরির সোস্যাল ও এনভায়রনমেন্টাল স্ট্যান্ডার্ড উন্নয়ন।
১২. বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিল চালু এবং পাট পণ্যের বহুমুখীকরণে মন্ত্রণালয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
- বন্ধ মিল চালু ও কর্মসংস্থান:
- বিজেএমসি’র ৫টি জুট মিল (খালিশপুর, জাতীয়, দৌলতপুর, কর্ণফুলি জুট মিলস ও ফোরাত কর্ণফুলি কার্পেট) এবং ৩টি টেক্সটাইল মিল (রাঙ্গামাটি, দারোয়ানী ও সুন্দরবন) পুনরায় চালু করা হয়েছে।
- সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে ৬টি মিলের ৭টি ইউনিট এবং ভাড়ায় ২টি মিল চালু রয়েছে।
- শর্ত ভঙ্গ করায় ১৩টি মিল (৬টি পাটকল ও ৭টি বস্ত্রকল) পুনঃগ্রহণ (Take Back) করা হয়েছে। এর মধ্যে মাগুরা টেক্সটাইল মিলটি পুনরায় চালু করা হয়েছে।
- নতুন কর্মসংস্থান: ২০০৯-১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে ৬২০টি নতুন পদ সৃষ্টি এবং ২৯০৭টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- শ্রমিক কল্যাণ:
- ২০০৭ সালে চাকরিচ্যুত ৩,০২৬ জন শ্রমিককে পুনঃনিয়োগ এবং ৮,৬৬৫ জন বদলি শ্রমিককে স্থায়ী করা হয়েছে। দৈনিক ভিত্তিক ২১,৭০০ জনকে বদলি শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
- শ্রমিকদের মজুরি স্কেল-২০১০ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ:
- বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
- ১০টি নতুন টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে (গাইবান্ধা, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, মানিকগঞ্জ, কক্সবাজার)। বর্তমানে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৪২টি।
- ৪টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটকে কলেজে উন্নীত করা হয়েছে। টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহে নতুন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ৬টি এবং ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ৭টি চালু আছে।
- তাঁতশিল্পে প্রশিক্ষণের জন্য ৬টি এবং পাটকলে ৩টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু আছে।
- আইন ও নীতিমালা:
- পাট আইন-২০১৭, বস্ত্র আইন-২০১৮ (বিল), বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আইন-২০১৩, রেশম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৩, এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে। ৬ মার্চকে ‘জাতীয় পাট দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে।
- পাট পণ্যের ব্যবহার ও রপ্তানি:
- ১৯টি পণ্যে (চাল, ডাল, সার, চিনি, পোল্ট্রি ও ফিস ফিড ইত্যাদি) পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে বছরে ১০০ কোটিরও অধিক পাটের বস্তার চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।
- ২০০৯-২০১৭ সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ৮৫৯০.১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮.৬ শতাংশ এ খাত থেকে আসে।
- ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাত হতে ৩১.৮৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার অর্জিত হয়েছে (উৎস টেক্সট অনুযায়ী)।
- আধুনিকায়ন ও নতুন উদ্যোগ:
- জামালপুরের মাদারগঞ্জে ৫১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শেখ হাসিনা স্পেশালাইজড জুট টেক্সটাইল মিল’ স্থাপন করা হচ্ছে (লক্ষ্যমাত্রা: বছরে ৪,৩২,০০০ ডজন ডেনিম প্যান্ট)।
- বিজেএমসি’র ৩টি পাটকল আধুনিকায়নে (BMRE) ১৭৩.৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প এবং ৩৩.৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ফেল্ট কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে।
- উদ্ভাবন: পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প ‘সোনালি ব্যাগ’, চারকোল এবং পাট পাতার পানীয় উৎপাদন।
- জেডিপিসি (JDPC)-এর সহায়তায় ২৩৫ রকম বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি হচ্ছে। ঢাকা ও রংপুরে কাঁচামাল ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে।

২০০৯ থেকে ২০১৮—এই এক দশক ছিল বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য এক বৈপ্লবিক রূপান্তরের গল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক উদীয়মান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একদিকে যেমন বিডা (BIDA) এবং বেপজা (BEPZA)-এর মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রুগ্ন শিল্পগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাট ও বস্ত্র খাতের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং পণ্য বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা গ্রামীণ ও শহরের অর্থনীতিতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ স্থাপন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া এই উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে। এতে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কেবল স্বপ্ন দেখে না, তা বাস্তবায়নও করে। এই দশ বছরের অর্জিত ভিত্তিই বাংলাদেশকে ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে অবিচল আস্থায় এগিয়ে নিয়ে যাবে।
