হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শুষির বাদ্য ঘরানা (Percussion instrument Gharanas) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল ভাণ্ডারে শুষির বাদ্য বা বায়ুবাদ্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র অধ্যায়। ‘শুষির’ শব্দের অর্থ হলো ফুঁ দিয়ে বা বায়ুর প্রবাহের মাধ্যমে সুর উৎপন্ন করা। এই শ্রেণির যন্ত্রগুলিতে শিল্পীর নিঃশ্বাসই হয়ে ওঠে সুরের উৎস—ফলে এখানে সংগীত কেবল আঙুল বা তারের কারিগরি নয়, বরং শরীর, শ্বাস এবং চেতনার একটি সম্মিলিত প্রকাশ।

এই ধারার প্রধান যন্ত্রগুলির মধ্যে রয়েছে বাঁশি (বাঁসুরি), সানাই (শেহনাই), হারমোনিয়াম এবং শাঁখ। প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব ধ্বনি, ব্যবহার এবং নান্দনিকতা রয়েছে, যা শুষির বাদ্যকে বহুমাত্রিক করে তোলে।

বাঁশি বা বাঁসুরি এই ধারার অন্যতম প্রাচীন ও আধ্যাত্মিক যন্ত্র। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এটি শ্রীকৃষ্ণ-এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, এবং সেই থেকেই বাঁশি এক ধরনের ভক্তিমূলক ও ধ্যানমুখী সংগীতের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আধুনিক হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতে বাঁশিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট যন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন পন্নালাল ঘোষ। তিনি বড় আকারের বাঁশি ব্যবহার, নতুন স্বরব্যবস্থা এবং রাগবিস্তারকে যন্ত্রে উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে “বাঁশি ঘরানা”র এক নতুন ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর পরবর্তীকালে হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া এই ধারাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যান এবং বাঁশির গায়কী আঙ্গকে আরও পরিশীলিত করেন।

সানাই বা শেহনাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে শুভ ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত একটি যন্ত্র। মন্দির, বিয়ে বা রাজদরবার—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যন্ত্রকে কনসার্ট মঞ্চে শাস্ত্রীয় মর্যাদা দেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ। তাঁর হাত ধরেই শেহনাই “লোকায়ত” পরিচয় ছাড়িয়ে উচ্চাঙ্গ সংগীতের অংশ হয়ে ওঠে। তাঁর গায়নধর্মী বাদন, দীর্ঘ আলাপ এবং রাগের গভীর ব্যাখ্যা শেহনাইকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর পরম্পরাকে অনেকেই “বিসমিল্লাহ খাঁ ঘরানা” বলেও উল্লেখ করেন।

দেখুন:

হারমোনিয়াম মূলত একটি পাশ্চাত্য রিড ইনস্ট্রুমেন্ট হলেও ভারতীয় সংগীতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। বিশেষ করে খেয়াল, ঠুমরি, গজল এবং কীর্তনে এটি প্রধান সঙ্গত যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও প্রাথমিকভাবে এর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক ছিল (বিশেষত মীড় ও শ্রুতি প্রকাশের সীমাবদ্ধতার কারণে), তবুও পণ্ডিত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়আপ্পা জালগাঁওকর-এর মতো শিল্পীরা হারমোনিয়ামকে শাস্ত্রীয় সংগীতে একটি স্বীকৃত অবস্থান এনে দেন। আজকের দিনে হারমোনিয়াম ঘরানাও একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাধারা হিসেবে গড়ে উঠেছে।

শাঁখ (Conch) মূলত সংগীত পরিবেশনার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত না হলেও ভারতীয় আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পূজা, যজ্ঞ বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে শাঁখধ্বনি এক ধরনের পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি মূলত ধ্বনির আধ্যাত্মিক শক্তিকে প্রকাশ করে—যা সংগীতের এক প্রাচীন ও মৌলিক রূপের ইঙ্গিত বহন করে।

শুষির বাদ্যের ঘরানা বা পরম্পরাগুলি মূলত নির্দিষ্ট শিল্পী বা শিক্ষকের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, যেমন—পন্নালাল ঘোষের বাঁশি ধারা, বিসমিল্লাহ খাঁর শেহনাই পরম্পরা, বা হারমোনিয়ামের বিভিন্ন শিক্ষাধারা। এগুলো ততটা আনুষ্ঠানিক “ঘরানা” না হলেও বাস্তবে এগুলোই শৈলীর পার্থক্য নির্ধারণ করে।

শুষির বাদ্যের সবচেয়ে বড় নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হলো—শ্বাসের মাধ্যমে সুরের জন্ম। এখানে প্রতিটি স্বর নিঃশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত, ফলে সংগীত হয়ে ওঠে জীবন্ত, স্পন্দিত এবং অত্যন্ত মানবিক। কণ্ঠসংগীতের মতোই এখানে স্বরের ওঠানামা, মীড়, কম্পন—সবকিছুই শ্বাসের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে।

সব মিলিয়ে, শুষির বাদ্য হিন্দুস্থানি সংগীতের এমন এক ধারা, যেখানে যন্ত্র ও মানবশরীরের মধ্যে এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়। নিঃশ্বাস থেকে সুর, আর সুর থেকে অনুভূতি—এই যাত্রাই শুষির বাদ্যের মূল সৌন্দর্য, যা ভারতীয় সংগীতকে দিয়েছে এক অনন্য প্রাণশক্তি।

তালবাদ্যে যেসব নাম করা ঘরানা আছে তা হল- – দিল্লি ঘরানা, আগ্রা ঘরানা ইত্যাদি।