বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশনগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রম আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনি কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা (Safety) বিধান, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, শোভন কাজ (Decent Work) নিশ্চিত করা এবং মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ২০০৬ সালের শ্রম আইন হলো এই কাঠামোর মূল স্তম্ভ, যা পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়েছে।
নিচে শ্রম ও শ্রমিক বিষয়ক আইন, বিধিমালা ও নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো:
১. প্রধান আইনসমূহ (Acts)
শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিয়ন্ত্রণে যে আইনগুলো সরাসরি কার্যকর, সেগুলো হলো:
- বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩): এটিই বাংলাদেশের প্রধান শ্রম আইন। নিয়োগ, মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় এই আইনের আওতাভুক্ত।
- বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৩: শ্রম আইনের সর্বশেষ সংশোধনী যা মাতৃত্বকালীন ছুটি, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ এবং জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে।
- বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯: রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ)-এর শ্রমিকদের জন্য আলাদা এই আইনটি প্রযোজ্য।
- বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩: বিদেশে গমনকারী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য।
- বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬: প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণে তহবিল গঠন ও সহায়তার জন্য।
- অত্যাবশ্যক পরিষেবা (রক্ষণাবেক্ষণ) আইন, ১৯৫২: জরুরি সেবাসমূহে ধর্মঘট বা কর্মবিরতি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত।
- শিশু আইন, ২০১৩: শিশুদের শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধকরণ এবং তাদের সুরক্ষার জন্য।
২. বিধিমালা (Rules & Regulations)
আইনগুলোকে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করার জন্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও কার্যপ্রণালী সম্বলিত বিধিমালা:
- বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ (সংশোধিত ২০২২): শ্রম আইন ২০০৬ বাস্তবায়নের বিস্তারিত নির্দেশিকা। এতে গ্রাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, সেফটি কমিটি এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাওয়ার পদ্ধতি বিস্তারিত বলা আছে।
- বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা, ২০১০: কল্যাণ তহবিল থেকে সাহায্য পাওয়ার নিয়মাবলী।
- ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত): নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে।
৩. জাতীয় নীতিমালা (National Policies)
সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত নীতিসমূহ:
- জাতীয় শ্রম নীতি, ২০১২: একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শ্রম ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার রূপরেখা।
- জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি (OHS) নীতিমালা, ২০১৩: কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা রোধ এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য।
- জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি, ২০১০: দেশ থেকে সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে।
- গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫: বাসাবাড়িতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য (যদিও এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ আইন নয়, তবে একটি গাইডলাইন)।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১১: শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য।
৪. বিশেষায়িত ও অন্যান্য নির্দেশিকা
- নিম্নতম মজুরি বোর্ড গেজেট: তৈরি পোশাক শিল্প (RMG), চা বাগান, ট্যানারি, নির্মাণসহ ৪২টিরও বেশি শিল্প খাতের জন্য সরকার ঘোষিত আলাদা আলাদা নূন্যতম মজুরি কাঠামো।
- কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-এর নির্দেশিকা: বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত সেফটি গাইডলাইন, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ইত্যাদি।
৫. আন্তর্জাতিক কনভেনশন (বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত)
যদিও এগুলো সরাসরি দেশের আইন নয়, তবে দেশের আইন তৈরিতে এগুলোর প্রভাব অপরিসীম:
- আইএলও কনভেনশন ৮৭ (সংগঠন করার স্বাধীনতা)।
- আইএলও কনভেনশন ৯৮ (যৌথ দর কষাকষির অধিকার)।
- আইএলও কনভেনশন ২৯ ও ১০৫ (জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ)।
একজন সচেতন নাগরিক, মালিক বা শ্রমিক হিসেবে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা সবচেয়ে জরুরি। এই আইনগুলো যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
– শেষ আপডেট ১৪/০২/২০২৬

Comments are closed.