শ্রীপুর গ্রাম, ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের একটি শান্ত ও সবুজে ঘেরা জনপদ হলো শ্রীপুর। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং গড়াই নদীর পলি-বিধৌত উর্বর ভূমির কারণে গ্রামটি স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন প্রশাসনিক ডাটাবেইস ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে শ্রীপুর গ্রামের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান

শ্রীপুর গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক বিচারে গ্রামটি ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এর উত্তরে চাঁদপুর (সদর) ও গোবরা গ্রাম, দক্ষিণে নিয়ামতবাড়ী, পূর্বে বরইচারা এবং পশ্চিমে জুঙ্গলী গ্রাম অবস্থিত। গ্রামের সরকারি মৌজা নাম শ্রীপুর। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং অনুযায়ী, এই গ্রামের বসতিগুলো মূলত পরিকল্পিত এবং চারপাশে বিস্তৃত কৃষি জমি বিদ্যমান।

জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ জনশুমারি এবং ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৯৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪৮৪ জন এবং নারীর সংখ্যা ৫০০ জন। জনসংখ্যার লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই গ্রামেও নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। গ্রামে মোট পরিবারের (Household) সংখ্যা প্রায় ২১০টি। ভোটার তালিকার তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬৫০ জন। আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গ্রামটিতে মূলত মজবুত টিনশেড ঘরের প্রাধান্য দেখা যায়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আধুনিক আধা-পাকা ভবনও নির্মিত হয়েছে।

শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র

যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং ব্যানবেইস (BANBEIS)-এর তথ্যমতে, শ্রীপুর গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৬১%। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাশ্ববর্তী চাঁদপুর ও নিয়ামতবাড়ী বিদ্যালয়ের ওপর শিক্ষার্থীরা নির্ভরশীল। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা প্রধানত চাঁদপুর ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কুমারখালী উপজেলা সদরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেয়। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য গ্রামে একটি সুসংগঠিত মক্তব ও জামে মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।

কৃষি ও ভূমি ব্যবহার

শ্রীপুর গ্রামের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, গ্রামের জমি অত্যন্ত উর্বর এবং মূলত তিন-ফসলী জমি। এখানকার প্রধান কৃষি পণ্য হলো ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ এবং তামাক। এছাড়াও রবি শস্যের মধ্যে মসুর ও সরিষার ফলন এখানে বেশ ভালো হয়। গ্রামে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৫০টি। গড়াই নদী সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এখানকার পলিমাটি ফসলের জন্য অত্যন্ত সহায়ক, যা কৃষকদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের রোড নেটওয়ার্ক ডাটাবেইস অনুযায়ী, শ্রীপুর গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। গ্রামটি চাঁদপুর-নিয়ামতবাড়ী প্রধান সড়কের সাথে সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত। গ্রামে পাকা (বিসি) রাস্তার পরিমাণ প্রায় ২.৫ কিলোমিটার এবং সলিং ও কাঁচা রাস্তা রয়েছে প্রায় ৩ কিলোমিটার। যাতায়াত ও পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে ৩টি পাকা কালভার্ট রয়েছে। হাট-বাজারের জন্য গ্রামবাসী প্রধানত চাঁদপুর বাজার ও নিয়ামতবাড়ী মাজার সংলগ্ন বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা

শ্রীপুর গ্রাম ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, গ্রামে ২য়টি জামে মসজিদ ও ১টি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। মসজিদের আধুনিক স্থাপত্য ও ধর্মীয় কার্যক্রম গ্রামের মানুষের আধ্যাত্মিক সচেতনতার পরিচয় দেয়। এখানে মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছেন। গ্রামের মানুষের শেষ বিদায়ের জন্য একটি সামাজিক কবরস্থান সংরক্ষিত রয়েছে।

স্থানীয় নেতৃত্ব ও জননিরাপত্তা

প্রশাসনিকভাবে ৫ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করেন। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন মোঃ আশরাফুল আলম (মোবাইল: ০১৬২৯০৪৫৫৯৬)। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় সাধনে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা এখানে অত্যন্ত সক্রিয়। বিশেষ করে নিয়ামতবাড়ী মাজার সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এখানে নিয়মিত নিরাপত্তা টহল জোরদার থাকে। গ্রামের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিবাদ নিরসনে স্থানীয় মুরুব্বি ও শিক্ষিত যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা

শ্রীপুর গ্রামটি অনেক পরিশ্রমী ও সহজ-সরল মানুষের চারণভূমি। এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীরা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে এই গ্রামের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। গ্রামের প্রধান সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ষাকালে নিচু এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তা সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে গ্রামের মানুষ এখন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে প্রয়োজনীয় অনলাইন সেবা গ্রহণ করছেন।

প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা এবং কৃষি নির্ভর অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে শ্রীপুর গ্রামটি ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের একটি আদর্শ ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

আরও দেখুন: