সঙ্গীতের রেয়াজের চিল্লা কাটানো

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জমকালো আসরে যখন কোনো শিল্পী নিখুঁত তান বা বিস্তারে শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখেন, তখন আমরা কেবল তাঁর তাৎক্ষণিক জাদুটুকু দেখি। কিন্তু এই জাদুর পেছনে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে চলা এক অন্ধকার ঘরের তপস্যা। যাকে আমরা বলি ‘রেয়াজ’। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম যদি বীজ হয়, তবে রেয়াজ হলো সেই জল-হাওয়া, যা ছাড়া সুরের মহীরুহ হওয়া অসম্ভব। এই রেয়াজ কেবল গলা সাধা নয়; এটি একটি কঠোর মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক যুদ্ধ।

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘চিল্লা কাটানো’ (Chilla) অত্যন্ত রহস্যময় ও কঠোর এক রেয়াজ পদ্ধতি। সুফি ঐতিহ্য থেকে আসা এই রেয়াজে একজন সাধক টানা ৪০ দিন একটি অন্ধকার ঘরে বা গুহায় সম্পূর্ণ একা কাটান। বাইরের পৃথিবীর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে, নামমাত্র খেয়ে, দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কেবল সুরের সাধনা করা হয়।

বলা হয়, টানা কয়েক সপ্তাহ অন্ধকার ঘরে একই সুর ভাঁজতে ভাঁজতে একসময় শিল্পীর চোখের সামনে সুরের ‘রাগ-রূপ’ দৃশ্যমান হয়। উস্তাদ আমীর খাঁ বা উস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁর মতো কিংবদন্তিরাও এই কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে গেছেন। এই অন্ধকারের সাধনা আসলে মনের ভেতরের সমস্ত অহংকার ও চঞ্চলতাকে পুড়িয়ে ছাই করে সুরের খাঁটি নির্যাসটুকু বের করে আনার এক প্রক্রিয়া।

রেয়াজের আরেক রোমহর্ষক গল্প হলো রাতের ঘুমকে জয় করা। পুরনো দিনের অনেক উস্তাদ ও পণ্ডিতেরা রাত ২টা বা ৩টায় ঘুম থেকে উঠে রেয়াজে বসতেন। ঘুমের ঘোরে যেন মাথা নিচু হয়ে না যায়, সেজন্য অনেকেই সিলিংয়ের হুকের সাথে নিজেদের মাথার লম্বা চুল দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতেন! একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে মাথা ঝুঁকলেই চুলে টান পড়ত এবং ঘুম ছুটে যেত।

ভোরের আলো ফোটার আগে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন প্রকৃতি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ এক হয়ে যায়। সেই সময়ে ‘খরাজ’ বা খাদের সুর সাধা হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ বলতেন, “যে ভোরবেলার রেয়াজ জয় করতে পেরেছে, সুরের পৃথিবী তার পায়ের নিচে।”

যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে এই রেয়াজের কঠোরতা আরও নির্মম। সরোদ বা সেতারের তারের ঘর্ষণে আঙুলের চামড়া ফেটে রক্ত পড়া ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের ঘটনা। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যখন রামপুরে ওয়াজির খাঁর কাছে শিখতেন, তখন রেয়াজ করতে করতে তাঁর আঙুল দিয়ে রক্ত পড়ত। তিনি সেই রক্তমাখা আঙুলে একটু তেল বা আটা লাগিয়ে আবারও বাজানো শুরু করতেন। বিরতিহীন এই ঘর্ষণেই আঙুলের ডগায় একসময় কড়া পড়ে যেত, যা পরে তারের ওপর মাখনের মতো মসৃণ গতি এনে দিত।

অনেক গুরু তাঁর শিষ্যদের রেয়াজের সময় ঘড়ি দেখতে বারণ করতেন। নিয়ম ছিল—ততক্ষণ বাজাবে, যতক্ষণ না শরীর আর মন এক হয়ে যাচ্ছে। একে বলা হতো ‘সুর লাগনা’। যখন বাদ্যযন্ত্র আর বাদক আলাদা সত্তা থাকে না, যন্ত্রটাই যেন শিল্পীর শরীরের একটি অংশ হয়ে ওঠে।