সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরাম : রোমান্টিক আফসানা ও আধুনিক গদ্যের পথিকৃৎ | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

যদি কখনো অবসন্ন কোনো বিকেলে তাঁর লেখা ‘খেয়ালিস্তান’-এর পাতা উল্টান, কিংবা ‘আমাকে আমার বন্ধুদের থেকে বাঁচাও’ (Mujhe Mere Doston Se Bachao)-এর তীক্ষ্ণ রম্য আর প্রজ্ঞাময় বাক্যগুলোর মুখোমুখি হন—তবে আপনি টের পাবেন আধুনিক উর্দু গদ্যের অবয়বে তিনি কী দারুণ এক রোমান্টিক ও নান্দনিক সুর বেঁধে দিয়েছিলেন। বিধাতা সৈয়দ সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরামকে আয়ু দিয়েছিলেন প্রায় ৬৩ বছর (১৮৮০ – ১৯৪৩)। সেই ছয় দশকের পথচলায় তিনি উর্দু সাহিত্যকে কেবল নতুন এক শৈলীই উপহার দেননি, বরং মধ্যযুগীয় গদ্যের আড়ষ্টতা ভেঙে তাতে সঞ্চার করেছিলেন ইউরোপীয় ও তুর্কি সাহিত্যের সজীব হাওয়াজাল।

তাঁকে সাধারণ কোনো প্রথাগত ছাঁচে ফেলা যায় না। তিনি একাধারে গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ভাষাবিদ, কূটনীতিবিদ এবং প্রাক-প্রগতিশীল যুগের উর্দু আফসানার আদি পুরুষ। প্রেমচন্দ বা মান্টোর বাস্তবতাবাদী সামাজিক ঝোড়ো হাওয়া আসার ঠিক আগেই যে তরুণটি উর্দু গদ্যে রূপকথা, আবেগ আর বাস্তবের এক অপূর্ব রোমান্টিক সাঁকো বুনেছিলেন, তিনি ইয়ালদরাম। শুধু তা-ই নয়, উর্দু কথাসাহিত্যের পরবর্তী সময়ের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র কুররাতুল আইন হায়দারের জন্মও হয়েছিল এই মহান সাহিত্যসাধকেরই কোলে।

আজ এই প্রজ্ঞাবান ও সৌখিন লেখকটির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর সাহিত্যিক ঋণের কথা স্মরণ করে আমাদের এই আয়োজন।

সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরাম

“Agar mujhe koi poochhe ki duniya mein sabse badi musibat kya hai, toh main kahunga—woh dost jo aapki hamdardi ke naam par aapka waqt aur sukoon chheen lete hain… Adab ka maqsad sirf tajziya nahi, balki insani dil ke nazuk jazbaat ko ek khoobsurat shakal dena hai.”

উর্দু সাহিত্যের প্রথাবিরোধী ও রোমান্টিক ধারার রূপকার সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরামের এই সুরভিত ভাবনার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—

“আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় মুসিবত কী, তবে আমি বলব—সেই শত্রু নয়, বরং সেই অপ্রয়োজনীয় বন্ধু, যে সহানুভূতির দোহাই দিয়ে আপনার মূল্যবান সময় আর মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়… সাহিত্যের কাজ কেবল সমাজের আড়ষ্ট বিশ্লেষণ নয়, বরং মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম ও সুকোমল অনুভূতিগুলোকে এক সুন্দর রূপ দেওয়া।”

আজ থেকে এক শতাব্দী আগেই উর্দু গদ্যের অলংকারের অতিরিক্ত বোঝা ঝেড়ে ফেলে গদ্যকে এমন সহজ, রসাত্মক ও কল্পনাপ্রবণ করে তুলেছিলেন সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরাম। সমাজকে কেবল নগ্ন বা রূঢ়ভাবে না দেখিয়ে, মানুষের মনের গভীর অনুরাগ, সৌন্দর্যপিপাসা ও সূক্ষ্ম কৌতুককে তিনি তাঁর সাহিত্যের কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন।

ইয়ালদরামের ছেলেবেলা ও আলিগড় পর্ব

১৮৮০ সালে অবিভক্ত ভারতের উত্তরপ্রদেশের বিজনোর জেলার নেহতৌর গ্রামের এক অভিজাত সৈয়দ পরিবারে জন্ম নেন সজ্জাদ হায়দার। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধা ও অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী। প্রথাগত ধর্মীয় ও ক্লাসিক্যাল শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক পশ্চিমা ভাবধারার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন তৎকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র ‘আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এ (তখনকার এম.এ.ও কলেজ)। ১৯০১ সালে আলিগড় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সময়ই তিনি ইংরেজি, ফারসি ও আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নতুন এক সংস্কৃতির প্রেমে পড়েন—তা হলো তুর্কি সংস্কৃতি ও ভাষা। আলিগড়ের প্রগতিশীল পরিবেশ তরুণ সজ্জাদ হায়দারের ভেতর বৈশ্বিক সাহিত্যের এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছিল।

তুর্কি কানেকশন ও ‘ইয়ালদরাম’ নামের উৎপত্তি

আলিগড় থেকে বের হওয়ার পর সজ্জাদ হায়দার সরকারি কূটনৈতিক চাকরিতে যোগ দেন। প্রেষণে তাঁকে পাঠানো হয় বাগদাদে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেটে। সেখানে অবস্থানকালেই তিনি উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাত, সাহিত্য এবং তুর্কি ভাষার সাথে গভীরভাবে পরিচিত হন। তিনি এতটাই সাবলীলভাবে তুর্কি ভাষা শেখেন যে, পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ব্রিটিশ কূটনৈতিক মিশনে দোভাষী ও পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন।

তুর্কি সাহিত্যের রোমান্টিক ও জাতীয়তাবাদী বিপ্লব তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি নিজের ছদ্মনাম গ্রহণ করেন ‘ইয়ালদরাম’ (Yaldram বা Yildirim)—যার তুর্কি ভাষার আক্ষরিক অর্থ ‘বিদ্যুৎ চমক’ বা ‘তুফান’। উসমানীয় সুলতান বায়োজিদ ইয়ালদরামের নামানুসারে গৃহীত এই ছদ্মনামটিই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি চাকরি শেষে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবেও বেশ কিছু বছর দায়িত্ব পালন করেন।

ইয়ালদরামের সাহিত্য: খেয়ালিস্তান ও রম্য গদ্যের রূপকার

সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরাম উর্দু সাহিত্যকে মধ্যযুগীয় ভারী দাস্তান ও প্রাতিষ্ঠানিক গদ্যের শিকল থেকে বের করে আধুনিক আফসানা ও রম্য প্রবন্ধের সূচনা করেছিলেন।

‘খেয়ালিস্তান’ (Khayalistan):

এটি ইয়ালদরামের কালজয়ী গল্প ও ভাব-কাব্য সংকলন। ১৯১১ সালে প্রকাশিত এই বইটি উর্দু গদ্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এতে কল্পনা, রোমান্টিক প্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যানগুলো গদ্যের এক লালিত্যময় সুরে ফুটে উঠেছে। ‘খেয়ালিস্তান’-এর প্রতিটি রচনায় ইউরোপীয় ও তুর্কি সাহিত্যের এক সূক্ষ্ম প্রভাব রয়েছে, যা তৎকালীন তরুণ পাঠকদের মোহিত করেছিল।

‘আমাকে আমার বন্ধুদের থেকে বাঁচাও’ (Mujhe Mere Doston Se Bachao):

উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্য ও ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ হিসেবে এটি স্বীকৃত। এখানে ইয়ালদরাম অত্যন্ত রসাত্মক ভঙ্গিতে দেখিয়েছেন—কীভাবে অনাহূত ও অতিরিক্ত আড্ডাবাজ বন্ধুরা একজন মানুষের কাজের সময় নষ্ট করে, তার সৃজনশীলতাকে বিঘ্নিত করে এবং সুহৃদ হওয়ার ছলে মানসিক শান্তির বারোটা বাজায়! লেখার ভেতরে এই মৃদু কৌতুক ও গভীর বাস্তবতা পাঠকদের একাধারে হাসায় এবং ভাবায়।

তুর্কি সাহিত্যের অনুবাদ ও সংস্কৃতির সাঁকো:

ইয়ালদরাম কেবল নিজে লেখেননি, অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে উসমানীয় ও পশ্চিমা জগতকে উর্দু পাঠকদের দোরগোড়ায় এনে দিয়েছিলেন। তুর্কি নাট্যকার ও উপন্যাসিকদের কাজ, বিশেষ করে ‘জোোহরা’ (Zuhra) এবং ‘জালালুদ্দিন খোয়ারিজমশাহ’-এর মতো ঐতিহাসিক নাটক ও উপন্যাস অনুবাদ করে তিনি উর্দু ভাষার প্রকাশের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

উত্তরাধিকার ও জীবনের শেষ অধ্যায়

জীবনের শেষভাগে এসে ইয়ালদরাম লখনউয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলটি ছিল শিল্প ও সাহিত্য অনুরাগে ভরপুর। তাঁর স্ত্রী বেগম নজর সাজ্জাদ হায়দার নিজেও ছিলেন উর্দু সাহিত্যের অন্যতম আদি নারী ঔপন্যাসিক। আর তাঁদের ঘরেই জন্ম নেন কালজয়ী ঔপন্যাসিক কুররাতুল আইন হায়দার (যার ‘আগ কা দরিয়া’ উর্দু সাহিত্যের অমূল্য রত্ন)। বলা চলে, ইয়ালদরামের সাহিত্যের আধুনিক সুরটি তাঁর কন্যার মাধ্যমে উপমহাদেশের কথাসাহিত্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল।

১৯৪৩ সালের ১২ এপ্রিল লখনউয়ে এই মহান গদ্যশিল্পী ও ভাষাবিদ চিরতরে বিদায় নেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক ঝড় বা দাঙ্গার নৃশংসতাকে নিজের বিষয় বানাননি, কিন্তু গদ্যের ভাষা যে কতখানি নমনীয়, কাব্যময় ও প্রাঞ্জল হতে পারে—তার এক অবিনাশী ভিত্তিপ্রস্তর তিনি রেখে গেছেন।

আজ ইয়ালদরামের প্রাসঙ্গিকতা

আজ সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরামের প্রয়াণের বহু দশক পার হয়ে গেলেও আধুনিক উর্দু আফসানা ও সুশীল গদ্যের ইতিহাসে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—আবেগ ও রোমান্টিকতা সস্তা কল্পনা নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের সুকোমল দিকগুলোকে জাগিয়ে তোলার এক অসামান্য মাধ্যম।

যতোই ভালোবাসুন, ইয়ালদরামকে যথেষ্ট ভালোবাসা যায় না, তাঁর সুবাসিত কাল্পনিক জগতের গভীরে পুরোপুরি পৌঁছানো যায় না।