সমস্যাটা উর্দু ভাষায় নয়, সমস্যাটা পাকিস্তান সিন্ড্রোমে

ভাষার মাসে এসে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘মজলুম’, ‘জালিম’ কিংবা ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর মতো শব্দগুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। গত দুই বছরে যারা সুকৌশলে এই শব্দগুলোকে জনপরিসরে আনার চেষ্টা করেছে, নির্বাচনের আগে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন নেই। তারা মূলত একাত্তরের পরাজিত শক্তি বা তাদেরই ভিন্ন ঘরানার ছদ্মবেশী অংগ-প্রত্যঙ্গ।  এই বিতর্কের বিপক্ষে যথারীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা আছেন, এবং বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরাও। এই বাহাসটি নানা মতের পথের লোকের মিথস্ক্রিীয়ার মাধ্যমে নিজেদের দিকে তাকাবার সুযোগ হচ্ছে, যা গত দুবছর একেবারে অনুবপস্থিত ছিল। তবে এই রাজনৈতিক বাহাসের গভীরে গিয়ে আমাদের দেখা উচিত এর মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় উর্দুকে আমরা ‘শত্রু’ হিসেবে পেয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের লড়াই কি উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ছিল, নাকি বাংলা ভাষার অধিকারের পক্ষে? উর্দুর পরিবর্তে পাকিস্তান যদি পান্চাবী, পাশতু, সিন্ধি বা সারাইকি আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চাইতো (উর্দুর চেয়ে বেশি লোক এসব ভাষাভাষী ছিল), আমরা কি মেনে নিতাম? অবশ্যই নিতাম না। অবশ্যই না। সুতরাং, শত্রু কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নয়; শত্রুর নাম ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’। উর্দু ছিল সেই সিন্ড্রোম বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র।

১৯৫২ সালের আন্দোলনের আবেগ ভাষার হলেও এর নেপথ্যের বাস্তবতা ছিল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। আমরা চেয়েছি রাষ্ট্রের সাথে আমাদের লেনদেন ও যোগাযোগ হবে মাতৃভাষায়। চাকরির পরীক্ষা, দাপ্তরিক নামফলক কিংবা আইনের ভাষা হবে বাংলা। তাছাড়া আমাদের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতিক পুজির মুনাফা পেতে থাকবো। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাতারাতি রাষ্ট্রের কাছে ‘অশিক্ষিত’ ও ‘অযোগ্য’ হয়ে পড়ত। এটি ছিল একটি সুকৌশলী বঞ্চনা। মজার ব্যাপার হলো, উর্দু তৎকালীন পাকিস্তানের মেজরিটি মানুষের ভাষাও ছিল না। এটি ছিল মূলত লখনউ, এলাহাবাদ, মিরাট, সাহারানপুর, দিল্লি, বিহার, হায়দ্রাবাদ, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থান থেকে হিজরত করে আসা ১০ শতাংশ ‘মোহাজির’দের ভাষা। সেই ১০% পাকিস্তানির বসবাস ছিল মুল পশ্চিম পাকিস্থানে। তাই উদ্যু রাষ্ট্রের ভাষা হলে তাদের লাভ হতো সবচেয়ে বেশি। পাকিস্থানের মেজরিটি জনগন বন্চিত হতো। অর্থাৎ, একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে কুক্ষিগত করাই ছিল সেই ছক। এই সুপরিকল্পিত বৈষম্যের নামই ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’।

পাকিস্থান সেই সময় থেকে উর্দু প্রেম দেখায়। কিন্তু আসলে বাস্তবতা কি? আজও ১০% এর বেশি লোক উর্দুতে কথা বলে না। ভাষাভাষির দিক দিয়ে এখনো উদ্যুর অবস্থান ৫ম। অফিস-মিডিয়াতে তারা উর্দ্যু বললেও বাড়িতে গিয়ে ঠিকই তাদের মাতৃভাষায় কথা বলে। সেই ভাষার সংখ্যা খুব কম হলেও ৮ টি। তারা উর্দুর জন্য প্রাণ দেয়, কিন্তু গত সাত দশকেও পাকিস্তান উর্দুকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি। । এদেশেও দেখবেন, যারা উর্দু নিয়ে লাফালাফি করে, এদের বেশিরভাগ নুন্যতম উর্দু জানে না, জীবনে কোন উর্দু সাহিত্য পড়েনি। মাদ্রাসায় পড়ার কারণে নাস্তালিখ পড়তে পারলেও মওলানা আবুল কালাম আজাদের “গুব্বার এ খাতির” ধরিয়ে দিয়ে পড়ে অর্থ করে দিতে বলুন, দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাবে। চারম উর্দ্যু প্রেমের পাশাপাশি এই এইরকম মোনাফেকির নামই “পাকিস্থান সিন্ড্রম”।

বাস্তবতা হলো, এদের উর্দুর প্রতি কোনো প্রকৃত প্রেম নেই; তাদের এই তথাকথিত প্রেমের উৎস আসলে বাংলার প্রতি ঘৃণা। যখনই বাংলার প্রসঙ্গ আসে, অবধারিতভাবে চলে আসে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এই ইতিহাসগুলো তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বে ফোস্কা ফেলে দেয়। এই ঘৃণা থেকেই তারা বাংলার একটি ‘বিকল্প’ বা ‘অল্টারনেট’ খুঁজতে চায়। বাঙালি পরিচয়ে আমরা যা যা অর্জন করেছি, তারা তার প্রতিস্থাপন চায়। এই অস্থিরতা থেকেই তারা বারবার জনপরিসরে বিভিন্ন ছদ্মবেশী তাত্ত্বিক শব্দ বা ধারণা ছাড়ে এবং ব্যর্থ হয়। ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’ তাদের পিছু ছাড়ে না বলেই তারা এই চক্রাকার ব্যর্থতায় বারবার আবর্তিত হয়।

এদের উর্দু প্রেম যে কতটা নকল, তা প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সেটা প্রমান করতে আপনি পাকিস্থানি লেখক সাদাত হাসান মান্টোর গল্প নিয়ে নাটক বানান। অথবা পাকিস্থানি লেখক ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, হাবিব জালিব, কিশওয়ার নাহিদ, ফাহমিদা রিয়াজ বা আহমদ ফরাজের লেখাগুলো জনপরিসরে নিয়ে আসেন। দেখবেন ওদের জ্বলুনি শুরু হয়ে যাবে। মুহুর্তে উর্দু প্রেম ছুটে যাবে। সেই “পাকিস্থান সিন্ড্রমই” তাকে আবার উর্দুর অল্টারনেট খোঁজাবে।

২১শে ফেব্রুয়ারি আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এটি আমাদের জাতির অন্যতম মহান অর্জন। পৃথিবীর কোনো ভাষার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন আমাদের এই অর্জনকে মহিমান্বিত করে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের লড়াই উর্দুর বিরুদ্ধে নয়; আমাদের লড়াই ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’-এর বিরুদ্ধে। আমাদের দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করতে হবে এবং মুল শত্রুকে চিনতে হবে। এই লড়াই মূলত ধর্মীয় উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা, ছদ্মবেশ আর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে। আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং লিবারেল মূল্যবোধকে এতটাই শক্তিশালী করতে হবে যেন অপশক্তির এই ‘নয়া বন্দোবস্ত’ আলোচনায় আসার আগেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে বিলীন হয়ে যায়।