রাষ্ট্র কিংবা সরকার—এই শব্দগুলো শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সুদূর রাজধানীর কোনো সচিবালয়, বড় বড় সব দাপ্তরিক ভবন, কিংবা দূরবর্তী কোনো নীতিনির্ধারকের মুখ। সাধারণ মানুষের কাছে সরকার মানেই এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। কেমন যেন একটা ‘ওরা’ আর ‘আমরা’ ভাব। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তাই?
আমি “সরকারে দরকার” নামে এই সিরিজটি শুরু করার উদ্যোগ নিলাম কারন – রাষ্ট্র বা সরকার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোন অংশে, কীভাবে জড়িয়ে থাকে এবং আমাদের ওপর তার প্রভাব কতটুকু, তা একদম সহজ ভাবে আমাদের জানা দরকার।
আমরা অনেকেই ভাবি, সরকারের সাথে আমাদের যোগাযোগ বুঝি শুধু ভোট দেওয়া, ট্যাক্স দেওয়া কিংবা কোনো বড় সরকারি অফিসে যাওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ। অথচ সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপে অলক্ষ্যে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র। এই সংযোগটা চেনা এবং বোঝা নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সবচেয়ে বেশি দরকার।
কেন এই সিরিজ?
আজকে খুব অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। আমাদের সমাজের একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী মানুষের সাথে কথা প্রসঙ্গে বুঝলাম—গ্রাম পুলিশের কাজ বা ক্ষমতা সম্পর্কে উনার ন্যূনতম কোনো ধারণাই নেই! অথচ গ্রামীণ জনপদের কোটি কোটি মানুষের জীবনে তারাই সরকারের প্রথম দৃশ্যমান রূপ, প্রথম আশ্রয়।
এর পর আমি আগ্রহ নিয়ে উনার সাথে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ, কোনটা কার সাথে কীভাবে যুক্ত, কীভাবে কাজ করা উচিত আর বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, কেন যেভাবে কাজ করা উচিত তা করতে পারে না, থিওরিটিক্যালি আমরা বইপুস্তকে কী জানি আর আসলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাটা কী—এসব নিয়ে আলোচনা করলাম।
সব শুনে বুঝলাম, সিস্টেমের প্রায় কোনো কিছু সম্পর্কেই তাঁর কোনো বাস্তব ধারণা নেই; যা আছে, তা হলো কেবলই এক ধরণের অন্ধ ক্ষোভ। কিন্তু সেই ক্ষোভের আসল কারণ কী, মূল দায়টা কার বা কিসের—এসবের তিনি কিছুই জানেন না।
তখনই মনে একটা বড় ধাক্কা লাগল। একজন এরকম উচ্চশিক্ষিত, ডিগ্রিধারী মানুষের যদি এই দশা হয়, তাহলে সমাজের বাকি সাধারণ মানুষের অবস্থা আসলে কী? এই প্রশ্নটাই আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করল এবং সেই থেকে এই সিরিজটি লেখার তাগাদা পেলাম।
এই সিরিজে আমরা কী কী বুঝব?
“সরকারে দরকার” কোনো জটিল রাজনৈতিক তত্ত্ব বা কঠিন আইনি মারপ্যাঁচের আলোচনা নয়। এটি মূলত আমাদের চারপাশের সিস্টেমটাকে খুব সহজ করে চেনার একটা চেষ্টা। এই সিরিজে আমরা মূলত দেখব:
- জাতীয় বাজেটের সাথে আমাদের সম্পর্ক: দেশের বাজেট কীভাবে আমাদের পকেটের টাকা, বাজারের সওদা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
- সরকার পরিচালনার আসল সিস্টেম: সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান ঠিক কী কাজ করে এবং কার কাছে কোন কাজের জন্য জবাবদিহিতা চাইতে হয়।
- রাজনীতি ও সরকারের সম্পর্ক: আমাদের দেশের রাজনীতি এবং government ব্যবস্থার মধ্যকার গভীর সম্পর্কটা ঠিক কোথায় এবং কীভাবে তা রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে।
- নাগরিক অধিকার ও তার সীমানা: সংবিধানে আমাদের কী কী মৌলিক অধিকার দেওয়া আছে এবং সেগুলো আমরা কীভাবে চর্চা করব। শুধু অধিকার ভোগ করাই শেষ কথা নয়, অন্যের ক্ষতি না করে নিজের অধিকারের সীমা কতটুকু পর্যন্ত টেনে নেওয়া যায়—তা জানা একজন সচেতন নাগরিকের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি।
- দৈনন্দিন জীবনের চেনা আইনকানুন: প্রতিদিন চলতে ফিরতে আমাদের যে সমস্ত আইন সরাসরি প্রভাবিত করে—যেমন ট্রাফিক আইন, ক্রেতা হিসেবে আমাদের অধিকার রক্ষা করার আইন (ভোক্তা অধিকার), ডিজিটাল নিরাপত্তা বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় নিরাপদে থাকার আইন এবং পারিবারিক সুরক্ষার নানাবিধ নিয়ম-কানুন সম্পর্কে আমরা খুব সহজভাবে জানব।
- পেশাজীবনের আইনি সুরক্ষা ও নিয়ম: আপনি চাকরিজীবী হন, ব্যবসায়ী হন কিংবা ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তা—আপনার পেশাকে কোন কোন আইন নিয়ন্ত্রণ করছে, কীভাবে কর (Tax) দিতে হয়, শ্রম আইন আপনার পক্ষে কী বলছে এবং ব্যবসার লাইসেন্স বা চুক্তি করার সময় কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত, তা জানা দরকার। কারণ এগুলো না জানলে পদে পদে ঠকার বা বিপদে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
রাগ করতে হলেও তো সমস্যাটা জানতে হবে!
আমাদের একটা সহজাত স্বভাব আছে—সিস্টেমের কোনো কিছু পছন্দ না হলেই আমরা চরম রেগে যাই, ফেসবুকে বা চায়ের আড্ডায় ধুমছে গালি দিই। ওই যে বড় ডিগ্রিধারী ভদ্রলোকের কথা বললাম, উনার ভেতরের উন্মত্ত ক্ষোভটাও কিন্তু এ রকমই। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো, রাগ করতে গেলে বা গালি দিতে গেলেও তো মূল সমস্যাটা আগে নিখুঁতভাবে জানতে হবে! কোন টেবিলের গোলমালের কারণে আপনার ফাইলটা আটকে আছে, কোন আইনের মারপ্যাঁচে আপনার অধিকার হাতছাড়া হচ্ছে, কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে আপনার ব্যবসাটা থমকে যাচ্ছে—সেটা না জানলে চিল্লাপাল্লা করে তো আসলে কোনো লাভ নেই। রোগ না চিনে আন্দাজে ওষুধ খাওয়ালে যেমন রোগী মরে, তেমনি মূল সংকট না জানলে সমাধানও কোনোদিন আসবে না।
সরকারকে কেবল অন্ধভাবে গালমন্দ করা কিংবা চোখ বুজে খোশামোদ করা এই সিরিজের লক্ষ্য নয়। এই সিরিজের আসল অন্বেষণ হলো—সরকারকে খুব কাছ থেকে “চেনা”, সচেতনভাবে নিজের অধিকার ও সীমানা “জানা” এবং জীবনের প্রয়োজনে এই পুরো সিস্টেমটাকে নিজের স্বার্থে “ব্যবহার করতে শেখা”। আমরা যখন অন্ধ ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে সত্যি সত্যি সিস্টেমটা বুঝতে শুরু করব, তখনই কেবল সঠিক জায়গায় সঠিক প্রশ্নটা তুলতে পারব। আশা করি, আমাদের এই যাপিত জীবনের চেনা খতিয়ান থেকে রাষ্ট্র, সমাজ আর আমাদের নিজেদের দেখার চোখটা কিছুটা হলেও বদলাবে।
