বলতে কোন দ্বিধা নেই যে সলিল চৌধুরী আমার সবচেয়ে প্রিয় সুরকার।
কেউ শিল্পী হতে জন্মান, কেউ নিজেকে শিল্পী করে গড়ে তোলেন, কেউবা তার বয়ে আনা নতুন কথাগুলো বলার জন্য, শিল্প মাধ্যমকে ব্যবহার করেন। সলিল চৌধুরী সেরকম শিল্পী যিনি তার বয়ে আনা নতুন কথাগুলো বলতে সঙ্গীত, কবিতা, নাটক, পেইন্টিং মাধ্যমে কে ব্যবহার করেছেন। শিশুবেলা থেকে শুরু করে শুষেছেন ভারতবর্ষের সব রূপের-রঙ্গের সঙ্গীত, পাশাপাশি একই ভাবে গ্রহণ করেছেন পাশ্চাত্যের সঙ্গীতকে। সেই সঙ্গীতকে মাধ্যম করে নিজের অভিব্যক্তির প্রকাশ শুরু করেছিলেন গণ মানুষের আন্দোলনের গান বানানোর মধ্য দিয়ে। এরপর আধুনিক বাংলা গান, ভারতের চলচ্চিত্রের গানের খোলনলচে বদলে দিয়েছিলেন তিনি, হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রানের “সলিলদা”। সুর তো বটেই সঙ্গীতআয়োজনে শুরু করেছিলেন এক নতুন যুগের।

জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা তাকে দারুণভাবে বর্ণনা করবে:
কেউ যাহা জানে নাই- কোনো এক বাণী-
আমি বহে আনি;
একদিন শুনেছ যে-সুর-
ফুরায়েছে,- পুরনো তা- কোনও এক নতুন-কিছুর
আছে প্রয়োজন,
তাই আমি আসিয়াছি,- আমার মতন
আর নাই কেহ!
১৯৪৩শের দুর্ভিক্ষ, তেভাগা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম – সহ সমসাময়িক প্রতিটি ঘটনায় তিনি তার কথা বলে গেছেন সঙ্গীত দিয়ে, কবিতা দিয়ে।
সলিল চৌধুরীর আমার সব প্রিয় গান:
- যদি কিছু আমারে শুধাও
- না যেয়ো না
- আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম
- এবার আমি আমার থেকে
- যা রে যারে উড়ে যারে পাখি
- না, মন লাগে না
- কোন এক গাঁয়ের বধু
- রানার
- হেই সামালো
- আজ নয় গুন গুন গঞ্জন প্রেমে
- ও আলোর পথ যাত্রী
- ওগো আর কিছু তো নয়
- ও বাঁশী হায়
- কেন কিছু কথা বলো না
- গাঁয়ের বধু
- গা গা রে পাখী গা
- ঝনন্ ঝনন্ বাজে
- দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক
- না যেও না রজনী এখন বাকী
- পথে এবার নামো সাথী
- বাজে গো বীণা
- বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা
- বুঝবে না কেউ বুঝবে না
- যারে যারে উড়ে যারে পাখী
- সাত ভাই চম্পা জাগোরে জাগোরে
সলিল চৌধুরীর আমার সব প্রিয় কবিতা:
- এই রোকো
- আমি
- আমি কবি নই
- ইউলিসিস
- ইতিহাস
- একগুচ্ছ চাবি
- একটি কবিতার জন্য
- কবিতা
- নিরুপায়
- নিশ্চিন্দিপুরের কাব্য
- প্রেম
- ফাঁদ
- বয়স
- ভাবনা
- মাংসাশীর জন্য বিজ্ঞাপন — ১৯৪৬
- শপথ
- হৈমন্তিক
সলিল চৌধুরীর আমার সব প্রিয় ছড়া:
- অটোগ্রাফ
- কানকাটার ছড়া
- কিসসু হবেনারে দাদা কিসসু হবে না
- চাঁদের ছড়া
- পথিকের ছড়া
- বোমার ছড়া
- ভীমরতি সেন
- লক্ষ্য
- লাগ ঝুমাঝুম বুম
- শিল্পীর ছড়া
- সব পাওয়ার ছড়া
- সিনেমার ছড়া
- সেন বনাম শ্যেন

সলিল চৌধুরীর সকল গানের তালিকা:
শুরু করলাম, কবে শেখ করতে পারবো জানি না।
সলিল চৌধুরীর গণ-জাগরণের গান
খেয়াল করলে দেখা যায়, সলিল চৌধুরীর বেশির ভাগ গণসংগীত রচিত হয়েছে ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই সময়টাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সৃষ্টিশীল সময়। স্কুল শেষ করার পরই তিনি গান লেখা শুরু করেন। তাঁর ছোটবেলার বন্ধুরা—যাঁরা পরে তাঁর সঙ্গে আইপিটিএ (IPTA)-তে যুক্ত হন—বলেছেন যে সলিলের সংগীতে প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পঙ্কজ মল্লিক এবং জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের প্রভাব ছিল। বিশেষ করে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা ২৩টি গানের সংকলন ‘নবজীবনের গান’ তাঁর উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সলিল চৌধুরী নিজের আলাদা পথ তৈরি করে নেন। তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার বিকাশ এবং অসাধারণ সুর ও কথার ক্ষমতা মিলিয়ে তিনি এমন সব গান লিখতে শুরু করেন, যেগুলো আজও আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আছে। এই গানগুলো ছিল তাঁর সময়ের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য—কথা ও সুরে একেবারেই ব্যতিক্রমী।
(পর্ব–১ : ১৯৪৪–১৯৪৮)
এই পর্বে রয়েছে সলিল চৌধুরীর IPTA-পর্বের প্রারম্ভিক ও অগ্নিগর্ভ গান—যেগুলো কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনাকে ধারণ করে।
১. উরু টকা টকা তাঘিনা তাঘিনা (১৯৪৪–৪৫)
গ্রামীণ কৃষকের বপন ও ফসল কাটার আনন্দকে কেন্দ্র করে রচিত সলিলের অন্যতম প্রাচীন IPTA গান।
(হিন্দি রূপ: হরিয়ালি সাঁওয়াঁ ঢোল বাজাতা আয়া – দো বিঘা জমিন)
২. আলোর দেশ থেকে অন্ধকার পার হয়ে (১৯৪৫–৪৬)
স্বপ্নের দেশ গড়ার আহ্বান—ত্যাগ ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। কণ্ঠসংগীতে হারমোনির প্রথম দিককার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ।
৩. গৌরীশৃঙ্গ তুলেছে শির (১৯৪৬)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যুবসমাজের ঐক্যের ডাক।
৪. ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে (২৯ জুলাই ১৯৪৬)
নৌবিদ্রোহের সমর্থনে রচিত এক ঐতিহাসিক গণসংগীত।
বাংলা সংগীতে হারমোনির এক অনন্য মাইলফলক।
৫. কারার দুয়ার ভাঙো, ভাঙো ঐক্যের বজ্র কঠিন হাতে (১৯৪০-এর দশক)
আন্দামান দ্বীপে বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুক্তির আহ্বান।
মূল রেকর্ডিং নেই; পরবর্তীতে IPTA শিল্পীদের কণ্ঠে পুনর্গীত।
৬. আয়রে ও আয়রে (১৯৪৬)
কৃষকের ফসলের ওপর কৃষকের অধিকার—জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী গান।
পরবর্তীতে ঘুম ভাঙার গান অ্যালবামে সলিলের কণ্ঠে রেকর্ড।
৭. আগে চলো, আগে চলো (১৯৪৮)
কলকাতার ছাত্র আন্দোলন ও ধর্মতলার শহিদ রামেশ্বর–কদম রসুলের স্মরণে রচিত।
দীর্ঘদিন সুর অপ্রাপ্ত ছিল; পরে IPTA শিল্পীদের মাধ্যমে উদ্ধার।
৮. ভাঙো ভাঙো ভাঙো ভাঙো কারা (১৯৪০-এর দশক)
মিথ্যা ও ভ্রান্ত আশার কারাগার ভাঙার আহ্বান।
আন্দামান বন্দিদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে রচিত।
৯. বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা (১৯৪৭)
ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রশ্ন।
কীর্তনধর্মী রীতিতে নির্মিত—গীতিকবিতা ও সংগীতের অনন্য সংমিশ্রণ।
১০. নবারুণ রাগে রাঙে রে (১৯৪৮)
সলিল চৌধুরী ও গীতা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রথম দিককার রেকর্ড।
স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সংগ্রামের গান।
১১. নন্দিত নন্দিত দেশ আমার (১৯৪৮)
মাতৃভূমির বন্দনা ও জনগণকে উদ্যাপনের আহ্বান।
গীতিকাঠামোতে অভিনবত্ব লক্ষণীয়।
১২. হে সামালো ধান হো, কষ্টে দাও শান হো (১৯৪৮)
তেভাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গণসংগীত।
কিছু পঙ্ক্তি সেন্সর হয়েছিল তার তীব্রতার কারণে।
১৩. মানব না বাঁধনে (১৯৪৮)
দারিদ্র্য, কালোবাজারি ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্বীকৃতির ঘোষণা।
মান্না দে-র কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড।
১৪. আমার প্রতিবাদের ভাষা (১৯৪৮)
প্রার্থনা ও প্রতিজ্ঞা—শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গান।
দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড।
১৫. তোমার বুকের খুনের চিহ্ন খুঁজি (১৯৪৮)
সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণ ও ১৯৪৮–৪৯-এর আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে রচিত হৃদয়বিদারক গান।
পর্ব–২ : ১৯৪৮–১৯৫১
এই পর্বে স্বাধীনতা-উত্তর বাস্তবতা, খাদ্য আন্দোলন, রাজনৈতিক বন্দিত্ব, শান্তি ও ঐক্যের আহ্বান—এসব বিষয় গভীরভাবে উঠে এসেছে।
১৬. শোনো শোনো ভাইরে (১৯৪৮–৪৯)
স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষের জীবনের তিক্ত বাস্তবতা ও ব্যঙ্গাত্মক সত্যকে সামনে আনা গান।
মন্ত্রী বা কালোবাজারি না হলে সৎভাবে বাঁচা কঠিন—এই নির্মম বক্তব্য এতে প্রকাশ পায়।
১৭. ও মোদের দেশবাসী রে (১৯৪৯)
দেশবাসীকে বিভেদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান।
অসমের বিহু লোকরীতির সুরে গড়া এক ব্যতিক্রমী IPTA গান।
১৮. হাতে মোদের কে দেবে কে দেবে সে ভেরি (১৯৪৯)
গণশক্তির অপরিসীম ক্ষমতার গান।
IPTA শিল্পীদের কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড; পরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে পুনরায় রেকর্ড হয়।
১৯. ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি—এখানে থেমো না
(আহ্বান শোনো আহ্বান) (১৯৪৯)
স্বাধীনতার পর জাতিকে ঘুমিয়ে না পড়ার সতর্কবার্তা।
সলিলের সর্বাধিক জনপ্রিয় গণসংগীতগুলোর একটি।
২০. সেই মেয়ে—হয়তো তাকে ডাকেনি কেউ (১৯৫০)
বাংলার দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী মানবিক বিপর্যয়ের গান।
রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলির সেই মেয়ের জীবনযন্ত্রণার ধারাবাহিকতা।
২১. দুস্তর পারাবার, আয় কে হবি রে পার
(১৯৫০-এর দশক)
নৌকার রূপকে জনগণের সংগ্রাম ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনের প্রতীকী গান।
২২. জন্মভূমি
(ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধুলিতে) (১৯৫১)
মাতৃভূমির প্রতি গর্ব ও শ্রদ্ধার গান।
জন ব্রাউনের “Glory Glory Hallelujah”-এর সৃজনশীল প্রয়োগে অনন্য মাত্রা পেয়েছে।
২৩. আমাদের নানান মতে নানান দলে দলাদলি
(শান্তির গান) (১৯৫১)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান।
সলিল ও সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে IPTA-র গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড।
পর্ব–৩ : ১৯৫৩–১৯৬০
এই পর্বে কৃষিজীবন, যুবসমাজের জাগরণ, অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলার আহ্বান এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
২৪. আয় রে হে পৌষালী বাতাসে (১৯৫৩)
নতুন ফসল ও কৃষিজ জীবনের আনন্দঘন গান।
IPTA-তে নিয়মিত পরিবেশিত হলেও রেকর্ড প্রকাশ পায়নি।
পরবর্তীতে হিন্দি সংস্করণ “নাচ রে ধরতি কে প্যারে” হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২৫. এ যে অন্ধকারে বসে বন্ধ দরেতে শুধু ব্যর্থ ঘাত আনা (১৯৫০-এর দশক)
অন্ধকারে বসে নিষ্ফল আঘাত না করে সচেতন আন্দোলনের আহ্বান।
গভীর দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ গান।
২৬. নওজোয়ান, নওজোয়ান—বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান (১৯৫০-এর দশক)
বিশ্বব্যাপী যুবসমাজের ঐক্য ও জাগরণের ডাক।
আন্তর্জাতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এক শক্তিশালী গণসংগীত।
২৭. নাকের বদলে নরুণ পেলাম—টাক দুমাদুম দুম (১৯৫০-এর দশক)
তীব্র ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক বিদ্রূপে ভরা গান।
ব্রিটিশ শাসন ও স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীনদের প্রতিও কড়া সমালোচনা।
ব্যাপকভাবে সেন্সরকৃত গানগুলোর একটি।
২৮. চলো চলো হে মুক্তিসেনানি—ভেদো সর্পশির দোলি (১৯৫০-এর দশক)
IPTA যুগের অন্যতম উদ্দীপনামূলক বিপ্লবী গান।
মুক্তিসংগ্রামীদের উদ্দেশ্যে আহ্বান ও সাহস জোগানোর সঙ্গীত।
২৯. পথে এবার নামো সাথি, পথেই হবে এ পথ চেনা (১৯৫৪)
শিক্ষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত ঐক্য ও প্রতিবাদের গান।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড।
৩০. ঝংকারো ঝংকাও রুদ্রবীণা (১৯৫৯–৬০)
শান্তি, অগ্রগতি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশার গান।
বোম্বে ইয়ুথ কয়্যারের জন্য রচিত শক্তিশালী কোরাল কম্পোজিশন।
পর্ব–৪ : স্বাধীনতা-উত্তর সময়, জাতীয় ঐক্য ও নতুন চেতনা (১৯৭০–১৯৮৫)
এই পর্যায়ে সলিল চৌধুরীর গানগুলোতে দেখা যায় স্বাধীনতার পরের বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, জাতীয় ঐক্য, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
৩১. এই দেশ এই দেশ আমার এই দেশ (১৯৭২)
ভারতের বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের প্রতি শ্রদ্ধার গান।
২৫ বছর স্বাধীনতা পূর্তিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য রচিত।
দেশপ্রেম ও মানবিক ঐক্যের এক অনন্য প্রকাশ।
৩২. জীবন যখন শুধু দু’দিন (১৯৫৭ / বাংলা কথা ১৯৮২)
জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব স্মরণ করিয়ে মানুষের দায়িত্ববোধ জাগানোর গান।
বাংলা সংস্করণটি রচিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে ‘উত্তরণ’ অ্যালবামের সময়।
৩৩. দূর নয় দূর নয় দিগন্ত দূর নয়—ওই শোনো মুক্তির বারাভয় (১৯৬০-এর দশক)
আশাবাদী ও শক্তিশালী কোরাল গান।
ভবিষ্যতের মুক্ত সমাজ খুব দূরে নয়—এই প্রত্যয়ে রচিত।
৩৪. অধিকার কে কাকে দেয় (১৯৮২)
জরুরি অবস্থার (Emergency) পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রচিত।
মৌলিক অধিকার কারো দানে নয়—সংগ্রাম করেই অর্জন করতে হয়—এই বার্তা বহনকারী গান।
৩৫. একটু চুপ করে শোনো (১৯৮২)
বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবিক আবেদন।
শান্ত স্বরে গভীর প্রতিবাদ—সলিলের পরিণত দর্শনের প্রকাশ।
৩৬. আরও দূরে যেতে হবে (১৯৮২)
যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও বৈষম্যহীন পৃথিবীর স্বপ্নে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
ভেতরের মানুষটাকেই নতুন পৃথিবীর পথিক হিসেবে আবিষ্কারের ডাক।
৩৭. সারাটা দেশ জুড়ে আমার ঘরবাড়ি (১৯৮২)
আঞ্চলিকতা ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ভারতীয় পরিচয়ের গান।
১৯৫১ সালের “আমাদের নানা মতে নানা দলে দলাদলি”-র ভাবধারার উত্তরসূরি।
৩৮. পুরানো দিন পুরানো মন (১৯৮২)
পুরোনো স্থবির মূল্যবোধ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার আহ্বান।
একতা ও সংগ্রামের মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন নির্মাণের গান।
৩৯. যুদ্ধ কেন হয় (১৯৮২)
যুদ্ধবিরোধী এক গভীর মানবিক প্রশ্ন।
হিরোশিমা-নাগাসাকির স্মৃতি থেকে বিশ্ব রাজনীতির নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
৪০. চলেছে আজ চলবে কাল শান্তির এই মিছিল (১৯৮২)
শান্তি আন্দোলনের সময় রচিত সরাসরি আন্দোলনভিত্তিক গান।
মানুষে-মানুষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শান্তির অভিযাত্রার প্রতীক।
৪১. সেদিন আর কত দূরে (১৯৮৫)
ভবিষ্যতের সবুজ, সমৃদ্ধ ও সুখী ভারতের স্বপ্ন।
কোরাল সংগীতের জটিল ছন্দে আশাবাদের অনন্য প্রকাশ।
পর্ব–৫ : ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবিক ঐক্য ও শেষ আহ্বান (১৯৯০–১৯৯৩)
সলিল চৌধুরীর জীবনের শেষ পর্যায়ের গণসংগীতগুলোতে দেখা যায় গভীর মানবিক বেদনা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ এবং একটি ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ভারতের শেষ স্বপ্ন। এই গানগুলো তাঁর রাজনৈতিক-মানবিক চেতনার চূড়ান্ত প্রকাশ।
৪২. এসো আজ এই শুভদিনে অঙ্গীকার করি বন্ধু (১৯৯৩)
সলিল চৌধুরীর রচিত শেষ গণসংগীত। বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রচিত। ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের শপথ গ্রহণের আহ্বান। একটি অসাম্প্রদায়িক ভারতের জন্য তাঁর জরুরি আর্তি এই গানে ধ্বনিত।
৪৩. এসো নববর্ষ (১৯৯০/৯১)
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রচিত এক আশাবাদী ও উদ্দীপনামূলক গান। নতুন বছরের সঙ্গে নতুন মানুষ, নতুন মূল্যবোধ ও নতুন চেতনার আহ্বান। পরিবর্তনের দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার বার্তা বহন করে।
লতা মঙ্গেশকরের জন্য সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা গান:
পর্ব–১ : স্বর্ণযুগের সূচনা (১৯৫৯–১৯৬৩)
সলিল চৌধুরী ও লতা মঙ্গেশকরের যুগলবন্দি বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে। ১৯৫৯ সালে শুরু হওয়া এই যাত্রা বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
১. যা রে যা রে উড়ে যা রে পাখি (১৯৫৯)
সলিল–লতা যুগলবন্দির প্রথম দিককার গান।
স্বপ্ন, মুক্তি ও উড়াল–এই গানের মূল আবহ।
২. না যেও না (১৯৫৯)
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
এই গানেই বাঙালি প্রথম উপলব্ধি করে—লতা পুরোপুরি “আমাদের” হয়ে উঠেছেন।
৩. ও বাঁশি হায় (১৯৬০)
বিরহ ও স্মৃতির মরমি প্রকাশ।
সলিলের সুরে লতার কণ্ঠে অপার্থিব আবেশ।
৪. ওগো আর কিছু তো নাই (১৯৬০)
নিঃশব্দ প্রেম ও আত্মসমর্পণের গান। সংযত অথচ গভীর অনুভবের নিদর্শন।
৫. সাত ভাই চম্পা জাগরে (১৯৬১)
শ্রীলঙ্কান লোকগানের ছায়ায় রচিত। লোকগাথার আবহে আধুনিক সুরের অনবদ্য সংমিশ্রণ।
৬. কী যে করি, দূরে যেতে হয় তাই (১৯৬১)
প্রেম ও বিচ্ছেদের দ্বন্দ্বময় মানসিকতার গান।
৭. কেন কিছু কথা বলো না (১৯৬৩)
নীরবতার মধ্যেও জমে থাকা অনুভূতির আর্তি।
৮. ও তুই নয়নপাখি (১৯৬৩)
চোখের ভাষা, ভালোবাসা আর আকুলতার কাব্যিক রূপ।
পর্ব–২ : প্রেম, অভিমান ও সুরের বিস্তার (১৯৬৭–১৯৭২)
এই পর্বে সলিল–লতা যুগলবন্দি আরও গভীর, আরও পরিণত হয়ে ওঠে। প্রেম, বিরহ, দ্বিধা ও কাব্যিক বেদনা—সব মিলিয়ে এই সময়ের গানগুলো বাংলা আধুনিক গানের এক উচ্চতর স্তর তৈরি করে।
৯. কে যাবি আয় (১৯৬৭)
ডাক, প্রতীক্ষা আর নিঃসঙ্গতার গান।
খুব সংযত সুরে গভীর আবেগের প্রকাশ।
১০. নিশিদিন নিশিদিন বাজে (১৯৬৭)
অন্তরের নিরব সুর, নিরন্তর স্মৃতির ধ্বনি।
সলিলের সূক্ষ্ম সুররচনায় লতার কণ্ঠ অসাধারণ সংযমী।
১১. যদি বারণ করো তবে যাবো না (১৯৬৮)
অভিমানী প্রেমের এক অনন্য প্রকাশ।
লতার কণ্ঠে নারীর আত্মমর্যাদা ও দ্বিধা একসঙ্গে ধরা পড়ে।
১২. ও ঝর ঝর ঝরনা (১৯৬৮)
প্রকৃতি ও প্রেমের মেলবন্ধনের গান।
ঝরনার মতোই সুর বয়ে চলে।
১৩. না মন লাগে না (১৯৬৯)
অস্থির মন, অনিশ্চিত ভালোবাসার কাব্য।
সুর ও কথার মধ্যে নিঃসঙ্গতার মৃদু আর্তি।
১৪. ওরে ও মন ময়না (১৯৬৯)
মনকে সম্বোধন করে বলা প্রেমের গান।
লোকসুরের ছায়ায় আধুনিক আবেগ।
১৫. ও প্রজাপতি, প্রজাপতি (১৯৭১)
রঙিন স্বপ্ন ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দের প্রতীকী গান।
সলিলের কল্পনাশক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৬. পা মা গা রে সা (১৯৭১)
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে একেবারেই ব্যতিক্রমী সৃষ্টি।
স্বরলিপি ও প্রেমকথার অভিনব সংমিশ্রণ—এই গান এক কথায় কিংবদন্তি।
১৭. অন্তবিহীন কাটে না আর যেন (১৯৭২)
শেষ না হওয়া প্রতীক্ষা ও দীর্ঘশ্বাসের গান।
লতার কণ্ঠে ক্লান্ত অথচ গভীর অনুভব।
১৮. কিছু তো চাইনি আমি (১৯৭২)
অপ্রাপ্তির বেদনা ও নিঃশব্দ অভিযোগের গান।
সংযত সুরে আত্মসমর্পণের প্রকাশ।
পর্ব–৩ : পরিণত সুর, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার গান (১৯৭৫–১৯৮০)
এই পর্বে সলিল–লতা যুগলবন্দির গানে আবেগ আরও সংযত, আরও গভীর হয়ে ওঠে। প্রেম এখানে আর উচ্ছ্বাস নয়—স্মৃতি, অভিমান, একাকিত্ব ও আত্মসম্মুখীনতার ভাষা হয়ে ওঠে।
১৯. ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক খুঁজে পেলাম (১৯৭৫)
শৈশবের আনন্দ, কৌতূহল আর জীবনের ক্ষুদ্র সুখের প্রতীকী গান।
সলিলের কল্পনাশক্তি ও লতার কণ্ঠের সরলতা এখানে একাকার।
২০. ও মোরে ময়না গো (১৯৭৫)
ডাক, আকুলতা ও আপনজনকে কাছে পাওয়ার গান।
লোকঘরানার আবহে আধুনিক অনুভবের সংমিশ্রণ।
২১. আজ নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমের (১৯৭৭)
সংযত প্রেমের গান—উচ্ছ্বাস নয়, বরং নীরব উপলব্ধি।
পরিণত প্রেমের এক অনবদ্য প্রকাশ।
২২. আজ তবে এইটুকু থাক (১৯৭৭)
বিদায়ের মুহূর্তে বলা শেষ অনুরোধের গান।
অল্প চাওয়ার মধ্যেই গভীর বেদনা।
২৩. কেন যে কাঁদাও বারে বারে (১৯৮০)
পুনঃপুন আঘাতে ক্লান্ত হৃদয়ের প্রশ্ন।
লতার কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাসের মতো ভেসে আসে গানটি।
২৪. এবার আমি আমার থেকে (১৯৮০)
নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার, আত্মপরিবর্তনের গান।
মানসিক মুক্তির এক অন্তর্মুখী উচ্চারণ।
২৫. ঝিম চিকি চাক (১৯৮০)
হালকা, ছন্দময়, খেলাধুলার মতো গান।
সলিলের সুরে শিশুসুলভ আনন্দের প্রকাশ।
২৬. বড় বিষাদ ভরা এ রজনী (১৯৮০)
রাত, নিঃসঙ্গতা আর গভীর বিষণ্নতার গান।
ক্লান্ত হৃদয়ের নিঃশব্দ আর্তি।
২৭. সূর্য দেখা (১৯৮০)
অন্ধকারের পর আলোর প্রত্যাশা।
নতুন দিনের আশায় তাকিয়ে থাকার গান।
পর্ব–৪ (শেষ পর্ব) : স্মৃতি, বিদায় ও পরিবর্তিত সময় (১৯৮৮)
এই পর্বটি সলিল–লতা যুগলবন্দির শেষ অধ্যায়। সময় বদলেছে, লতার কণ্ঠেও এসেছে বয়সের ছাপ। তবু স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও পরিণত অনুভব মিলিয়ে এই গানগুলো একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে।
২৮. সবার আড়ালে (১৯৮৮)
নিঃশব্দ বেদনা ও গোপন অভিমানের গান।
সলিলের সূক্ষ্ম সুরে লতার সংযত আবেগ।
২৯. ও আমার প্রাণসজনী (১৯৮৮)
আপনজনকে ডাকার গান—মৃদু, শান্ত, পরিণত।
স্মৃতির আবরণে মোড়া ভালোবাসার উচ্চারণ।
৩০. আমি চলতে চলতে থেমে গেছি (১৯৮৮)
জীবনের ক্লান্তি ও থেমে যাওয়ার অনুভব।
সময় ও অভিজ্ঞতার ভারে নুয়ে পড়া কণ্ঠের সত্য উচ্চারণ।
৩১. ভুলো না প্রথম সে দিন (১৯৮৮)
প্রথম প্রেম, প্রথম দেখা—স্মৃতির নস্টালজিয়া।
পুরোনো দিনের দিকে ফিরে তাকানোর গান।
৩২. সাত সকালে মনের দোরে (১৯৮৮)
এই অ্যালবামের একমাত্র একেবারে নতুন সুর।
সকালের আলোয় জীবনের নতুন দরজা খোলার ইঙ্গিত।
৩৩. ধরনীর পথে পথে (১৯৮৮)
(মূল গান: সুবীর সেন)
সলিলের ব্যবস্থাপনায় লতার কণ্ঠে পুনর্নির্মাণ।
তবে মূল সংস্করণের আবেদন ছুঁতে পারেনি—তবু ঐতিহাসিক।
৩৪. এই জীবন কখন মগ্ন (১৯৮৮)
হিন্দি গানের বাংলা রূপান্তর।
দর্শনধর্মী উপলব্ধির গান।
৩৫. রানার (১৯৮৮)
(মূল গান: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
সলিলের অনুরোধে লতার কণ্ঠে নতুন প্রয়াস।
বিতর্কিত হলেও যুগলবন্দির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য।
সবিতা চৌধুরীর জন্য সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা গান:
পর্ব–১ : সূচনা ও উত্থান (১৯৫৮–১৯৬৩)
এই পর্বে সবিতা চৌধুরীর সংগীতজীবনের সূচনা এবং সলিল–সবিতা যুগলবন্দির প্রথম শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়।
১. সুরের এই ঝরঝর ঝরঝরনা (১৯৫৮)
সবিতা চৌধুরীর প্রথম দিকের রেকর্ডকৃত গানগুলোর একটি।
মেলোডি ও কণ্ঠের স্বচ্ছতায় গানটি আজও স্মরণীয়।
২. মরি হায় গো হায় (১৯৫৮)
সলিল–সবিতা যুগলবন্দির প্রথম রেকর্ডকৃত মৌলিক গান।
অনেকের মতে এটি সলিল চৌধুরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
৩. এনে দে এনেদে ঝুমকা (১৯৬২)
এই গান দিয়েই সবিতা চৌধুরী মূলধারার জনপ্রিয়তায় বিস্ফোরণ ঘটান।
বাংলা আধুনিক গানের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।
৪. মনবীণায় এখনই বুঝি (১৯৬২)
আবেগঘন, অন্তর্মুখী এক প্রেমের গান।
সলিলের সূক্ষ্ম সুর আর সবিতার সংবেদনশীল কণ্ঠের নিখুঁত মেলবন্ধন।
৫. ঘুম আয় ঘুম আয় (১৯৬৩)
লোরির আবহে নির্মিত কোমল গান।
সবিতার কণ্ঠে এক অপূর্ব শান্ত আবেশ।
৬. তুমি এখন আমার মনে (১৯৬৩)
(শুধু অল ইন্ডিয়া রেডিওতে পরিবেশিত)
নরম প্রেমিক আবেগে ভরপুর একটি বিরল গান।
৭. ঝিলমিল ঝাউয়ের বনে (১৯৬৩)
প্রকৃতি ও অনুভূতির মেলবন্ধনে নির্মিত গান।
পরবর্তীকালে এয়ারে জনপ্রিয় “Song of the Month” হয়েছিল।
পর্ব–৫ : পরিণতি, স্মৃতি ও আত্মসমর্পণ (১৯৮০–১৯৮৮)
এই পর্বে এসে সলিল–সবিতার গান জীবনের গভীরতর স্তরে প্রবেশ করে। এখানে আর শুধু প্রেম বা বেদনা নয়—আছে সময়ের ভার, অভিজ্ঞতার সার, স্মৃতি ও আত্মসমর্পণের শান্ত স্বর।
৪১. আজ শরতে আলোর বাঁশি বাজলো (১৯৮০)
শরতের আলো–হাওয়া–নীরবতার গান।
AIR–এ প্রথম পরিবেশিত হয়েছিল ভিন্ন কথায়।
সুরে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংযোগ।
৪২. নাও গান ভরে নাও (১৯৮০)
অন্তরা চৌধুরীর সঙ্গে যুগলকণ্ঠে গাওয়া গান।
জীবনকে গানে ভরে নেওয়ার আহ্বান।
৪৩. ঝিলমিল ঝিলমিল ওপারের মঞ্জিল (১৯৮০)
আশা ও স্বপ্নের প্রতীকী গান।
এই গানের AIR সংস্করণে কথা ছিল ভিন্ন।
৪৪. সুর খুঁজছি (১৯৮০)
জীবনের অর্থ ও শিল্পের সন্ধান।
সলিলের সুরভাবনা ও সবিতার গভীর কণ্ঠে এক আত্মজিজ্ঞাসা।
৪৫. আর কিছু নাই মনে (১৯৮০)
শূন্যতার স্বীকারোক্তি।
সব হারানোর পরের নিঃশব্দ অনুভব।
৪৬. দাঁড়াও, আমি ঠিক করিনি (১৯৮১)
দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতার গান।
মানবমনের ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৪৭. মনকে বেঁধে ধরো (১৯৮১)
মনসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আহ্বান।
৪৮. যতদিন ছিলে কাছে (১৯৮১)
স্মৃতি–নির্ভর এক বিষণ্ন প্রেমগীতি।
হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য এক নীরব হাহাকার।
৪৯. আর কিছু নেই বলার (১৯৮১)
সব কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরের গান।
অত্যন্ত সংযত ও গভীর আবেগে ভরা।
৫০. ও সঘন সঘন বাদল (১৯৮১)
দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকা এক বিরল গান।
মেঘ, বর্ষা ও মনের আবেশ একাকার হয়ে গেছে।
৫১. প্রতিদিন প্রতিক্ষণ (১৯৮২)
সময় ও জীবনের অনবরত প্রবাহের গান।
৫২. তোমার বুকের খুনের চিহ্ন খুঁজি (১৯৮২)
একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক আবেগে ভরা গান। মূল গানটি ১৯৪৮ সালে রেকর্ড হলেও সবিতার কণ্ঠে এটি নতুন মাত্রা পায়।
৫৩. ভাঙা ঘরেই (১৯৮২)
ভগ্ন স্বপ্ন ও জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার গান।
৫৪. দু’চোখে আশার নদী ছলছল (১৯৮৭)
AIR–এ ‘Song of the Month’ নির্বাচিত। শেষদিকের এক আশাবাদী অথচ সংযত সৃষ্টি।
৫৫. সবার উপরে (১৯৮৮)
মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গান। এই সময়ের সবিতা–সলিল যুগলের এক পরিণত উচ্চারণ।
হেমন্ত মুখার্জীর গাওয়া আধুনিক বাংলা গান
পর্ব–১ : সূচনা ও গণজাগরণের গান (১৯৪৯–১৯৫৪)
সলিল চৌধুরী ও হেমন্ত মুখার্জীর যুগলবন্দি আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক অধ্যায়। এই পর্বে রয়েছে তাঁদের প্রথম দিকের গান—যেখানে গণসংগীত, প্রতিবাদ, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও কবিতার সুরায়ণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. গাঁয়ের বধূ (১৯৪৯)
সলিল–হেমন্ত যুগলের প্রথম প্রকাশিত গান। এই গানেই হেমন্ত মুখার্জী আধুনিক বাংলা গানে এক শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান এবং সলিল চৌধুরী আত্মপ্রকাশ করেন ব্যতিক্রমী সুরকার–গীতিকার হিসেবে।
২. অবাক পৃথিবী
কথা : সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯৫০)
সুকান্তর বিপ্লবী কবিতাকে গানে রূপ দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই গান বাংলা সংস্কৃতিতে কবিতা ও গানের সীমারেখা ভেঙে দেয়।
৩. বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে
কথা : সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯৫০)
তীব্র প্রতিবাদী চেতনার গান। সময় ও সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি উচ্চারণ।
৪. রানার
কথা : সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯৫১)
দৌড়, গতি ও সংগ্রামের প্রতীকী গান। পরবর্তীকালে এই গানটি অন্য শিল্পীদের কণ্ঠেও আলোচিত হয়।
৫. নৌকা বাওয়ার গান (ও মাঝি বাইও) (১৯৫২)
নদী, মাঝি ও জীবনসংগ্রামের রূপক। লোকগানের ছোঁয়ায় নির্মিত এক চিরসবুজ সৃষ্টি।
৬. ধান কাটার গান (১৯৫২)
কৃষিজীবী মানুষের শ্রম ও উৎসবের গান। গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা ও আনন্দ একসঙ্গে ধরা পড়ে।
৭. পালকির গান
কথা : সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৯৫২)
ছন্দময়তা ও গতিশীলতার অনন্য উদাহরণ। কবিতার ছন্দকে সুরে রূপ দেওয়ার এক দৃষ্টান্তমূলক কাজ।
৮. ঢিটাং ঢিটাং বলে (১৯৫৪)
লোকছন্দে নির্মিত অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। সলিলের রিদমিক দক্ষতা ও হেমন্তের কণ্ঠের প্রাণশক্তি এখানে স্পষ্ট।
৯. পথে এবার নামো সাথী (১৯৫৪)
সংগ্রাম ও ঐক্যের আহ্বান। আইপিটিএ ধারার গণসংগীতের ধারাবাহিকতায় এক গুরুত্বপূর্ণ গান।
পর্ব–২ : আত্মঅনুসন্ধান ও কাব্যিক গান (১৯৫৮–১৯৬১)
এই পর্বে সলিল–হেমন্ত যুগলবন্দি গণসংগীতের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যক্তিমানুষের অনুভব, প্রকৃতি ও অন্তর্লোকের দিকে ধাবিত হয়। সুর আরও সূক্ষ্ম, কথায় গভীর দার্শনিকতা।
১০. দুরন্ত ঘূর্ণির (১৯৫৮)
গতিময় সুরে নির্মিত এক নাটকীয় গান। মানুষের অন্তর্লোকের অস্থিরতা ও সময়ের ঘূর্ণাবর্ত এখানে প্রতীকীভাবে ধরা পড়ে।
১১. পথ হারাবো বলেই এবার (১৯৫৮)
চেনা পথ ছেড়ে অচেনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার গান। এই গান স্বাধীন চিন্তা ও আত্মমুক্তির আহ্বান বহন করে।
১২. আমি ঝড়ের কাছে (১৯৬১)
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংলাপ। সলিলের সুরে প্রকৃতি এখানে আর পটভূমি নয়—সে এক জীবন্ত সত্তা।
১৩. মনের জানালা ধরে (১৯৬১)
বাংলা আধুনিক গানের এক অনন্য মাইলফলক। মানবমনের নিভৃত অনুভূতি, স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষা অপূর্ব কাব্যিকতায় প্রকাশ পেয়েছে।
পর্ব–৩ : দর্শন, প্রশ্ন ও অস্তিত্ববোধ (১৯৬৯–১৯৭০)
এই পর্বের গানগুলোতে সলিল চৌধুরী ও হেমন্ত মুখার্জীর যুগলবন্দি এক গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়। সময়, জীবন, মানুষের অবস্থান ও অস্তিত্ব—সবকিছু নিয়েই এখানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
১৪. আমায় প্রশ্ন করে (১৯৬৯)
আধুনিক বাংলা গানের সবচেয়ে গভীর ও জনপ্রিয় দার্শনিক গানগুলোর একটি। নীল ধ্রুবতারার প্রতীকের মাধ্যমে মানুষের অন্তহীন প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ পেয়েছে।
১৫. শোনো কোনো একদিন (১৯৬৯)
আশা ও প্রত্যাশার গান। এক অনাগত দিনের স্বপ্নে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে—তারই কাব্যিক প্রতিফলন।
১৬. ঠিকানা (১৯৭০)
কথা: সুকান্ত ভট্টাচার্য
মানুষের জীবনের ‘ঠিকানা’ নিয়ে এক তীব্র অনুসন্ধান। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বোধ এখানে একসঙ্গে মিশে গেছে।
পর্ব–৪ : স্মৃতি, দূরত্ব ও অন্তর্মুখিতা (১৯৮১)
দীর্ঘ বিরতির পর আশির দশকে সলিল–হেমন্ত আবার একসঙ্গে কাজ করেন। তবে এই সময়ের গানগুলোতে আগের দীপ্ত আত্মবিশ্বাসের বদলে আসে স্মৃতি, দূরত্ব, আত্মসমালোচনা ও এক ধরনের নিঃশব্দ বেদনা। বয়স ও সময়ের ছাপ এখানে স্পষ্ট।
১৭. ওই দূরে চেনা সুরে (১৯৮১)
অতীতের কোনো পরিচিত সুর যেন দূর থেকে ডেকে ওঠে। স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি এক মৃদু আহ্বান।
১৮. আর দূর নেই দিগন্তের বেশি দূর নেই (১৯৮১)
একটি আশাবাদী গান, যেখানে পথের শেষ নেই—মানুষ এগিয়ে চলতেই থাকে। এই গানটি পরবর্তীতে শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ও গেয়েছেন।
১৯. এখনও আমার মনে (১৯৮১)
কথা: সুকান্ত ভট্টাচার্য
অতীতের স্মৃতি এখনও বর্তমানকে তাড়িত করে—এই বোধই গানের মূল সুর। হেমন্তের কণ্ঠে এক সংযত বিষণ্নতা।
২০. হাতে মোদের কে দেবে (১৯৮১)
সমষ্টিগত শক্তি ও মানুষের হাতে ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান। এর মূল গণসংগীত সংস্করণটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
২১. এ জীবন বেশ চলছে (১৯৮১)
এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার হাসি— সব ঠিক আছে বলা হলেও ভিতরে জমে থাকে প্রশ্ন ও ক্লান্তি।
২২. বেশ তবে ওই কথা থাক (১৯৮১)
অভিমান ও মেনে নেওয়ার গান। কথা না বাড়িয়ে নীরব সম্মতির মধ্যেও গভীর আবেগ লুকিয়ে থাকে।
পর্ব–৫ : বিদায়, আত্মসমালোচনা ও অসম্পূর্ণতার সুর (১৯৮২)
এই পর্বে রয়েছে সলিল–হেমন্ত যুগলবন্দির শেষ অধ্যায়। সময়ের ভার, কণ্ঠের সীমাবদ্ধতা এবং সুরের জটিলতা—সব মিলিয়ে এই গানগুলো এক ধরনের বিদায়বার্তা হয়ে উঠেছে। আবেগ গভীর, কিন্তু উচ্চারণে সংযম; সুরে রয়েছে অন্তর্মুখিতা।
২৩. একটা কথা মনে যেন পরিষ্কার (১৯৮২)
নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার গান। অস্পষ্টতা কাটিয়ে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা— সলিলের চিন্তাশীল সুর ও হেমন্তের সংযত কণ্ঠে আত্মসমালোচনার প্রতিধ্বনি।
২৪. যেতে যেতে পথ ভুলেছি (১৯৮২)
জীবনের পথে চলতে চলতেই দিশা হারানোর গল্প। এই গানটিতে রয়েছে ক্লান্তি, অনুশোচনা ও থেমে দাঁড়ানোর বোধ।
২৫. চুপ করে রইলে কেন (১৯৮২)
নীরবতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন। যেখানে না-বলা কথাগুলোই সবচেয়ে ভারী হয়ে ওঠে।
২৬. আর কিছু না (১৯৮২)
এই গানটিকে অনেকেই সলিল চৌধুরীর আশির দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মনে করেন। অত্যন্ত জটিল সুর ও আবেগপূর্ণ কথা— তবে বয়সের কারণে হেমন্তের পক্ষে এই গান গাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবুও গানটি এক অনন্য দলিল।
দিজেন মুখার্জীর গাওয়া আধুনিক বাংলা গান
পর্ব–১ : সূচনা ও যুগান্তকারী সাফল্য (১৯৫২–১৯৫৭)
দিজেন মুখার্জী ও সলিল চৌধুরীর সহযোগিতা বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আইপিটিএ–সূত্রে পরিচয়, হেমন্তসদৃশ গভীর কণ্ঠ, আর সলিলের অনন্য সুরভাষা—এই মিলনে জন্ম নেয় কিছু কালজয়ী গান।
১. শ্যামল বরনী ওগো কন্যা (১৯৫২)
দিজেন–সলিল যুগলবন্দির প্রথম ও সর্বাধিক আলোচিত গান।
সুরের গঠন, প্রকৃতিনির্ভর কাব্যিক আবহ ও দিজেনের গভীর কণ্ঠ—সব মিলিয়ে এক অনন্য সৃষ্টি।
১৯৫২ সালের এই রেকর্ড বাংলা শ্রোতাদের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে।
২. ক্লান্তি নামে গো (১৯৫২)
গঠনে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটি গান।
প্রথম দুটি পঙ্ক্তির সুর ‘Happy Birthday to You’ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও,
সলিল ছন্দ বদলে (৪/৪ থেকে ৩/৪) এবং প্রতিটি লাইনের জন্য পৃথক সুর তৈরি করে এক স্মরণীয় রূপ দেন।
৩. রেখোমা দাসেরে মনে (১৯৫৭)
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় সুরারোপ।
সলিলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা-সংগীত রূপান্তরের উদাহরণ।
গম্ভীর ভাব, ধ্রুপদী আবহ এবং দিজেনের সংযত পরিবেশনায় গানটি বিশেষ মর্যাদা পায়।
৪. আশার ছলনে ভুলী (১৯৫৭)
মাইকেল মধুসূদন দত্তের আরেকটি কবিতায় সুরারোপ।
আশা, ভ্রম ও আত্মপ্রবঞ্চনার সূক্ষ্ম অনুভূতি সুরে মূর্ত হয়েছে।
এই দুটি কবিতার গান দিজেন–সলিল যুগলবন্দির অন্যতম শিল্পশিখর।
৫. একদিন ফিরে যাবো চলে (১৯৬৩)
এই গানটি দিজেন মুখার্জীর কণ্ঠে গাওয়া সলিল চৌধুরীর সবচেয়ে আবেগঘন ও জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলোর একটি।
ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি আর অনিবার্য বিচ্ছেদের বেদনা—সব মিলিয়ে গানটি আজও শ্রোতার হৃদয়ে অমলিন।
এই গান দিয়েই দিজেন মুখার্জী সাধারণ শ্রোতার কাছে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
৬. পল্লবিনী গো সঞ্চারিণী (১৯৬৩)
প্রকৃতি, ঋতু ও জীবনের গতিময়তার এক অপূর্ব সুররূপ।
সলিল চৌধুরীর সুরে এখানে রয়েছে প্রবাহমানতা ও কাব্যিক বিস্তার, আর দিজেনের কণ্ঠ সেই প্রবাহকে আরও গভীর করে তোলে।
এই গানটি সলিল–দিজেন যুগলবন্দির একটি পরিণত পর্যায়ের নিদর্শন।
৭. সজল সজল মেঘ করেছে (১৯৮০)
এটি সলিল চৌধুরীর শেষ যুগের একটি কোমল ও বিষণ্ণ গান।
প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে মানুষের অন্তর্লোকের একাকিত্ব ও নীরব আকুতি ফুটে উঠেছে এখানে।
দিজেন মুখার্জীর সংযত ও স্থির কণ্ঠ এই গানটিকে গভীর আবেগ দিয়েছে।
৮. মেঘবরণ কালো চুলে (১৯৮০)
এই গানটিতে রয়েছে সলিল চৌধুরীর স্বভাবসিদ্ধ কাব্যিকতা ও প্রকৃতিপ্রেম।
নারীর সৌন্দর্যকে মেঘের রঙ ও প্রকৃতির চিত্রকল্পে রূপ দিয়েছেন সলিল, আর দিজেন সেই সৌন্দর্যকে কণ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন।
৯. এসো আজ এই শুভদিনে (১৯৯৩)
এই গানটি সলিল চৌধুরীর জীবনের শেষ গণসংগীত, যা দূরদর্শনের জন্য ক্যালকাটা কোয়ারের সঙ্গে রেকর্ড করা হয়।
ভারতের সাম্প্রদায়িক অশান্তির প্রেক্ষাপটে লেখা এই গানটি ঐক্য, মানবতা ও শান্তির আহ্বান।
দিজেন মুখার্জীর কণ্ঠে এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলিল।
১০. বাংলা মাগো (AIR-এর জন্য)
(সবিতা চৌধুরীর সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে)
এই গানটি অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য বিশেষভাবে রেকর্ড করা হয়েছিল।
দেশপ্রেম, শিকড়ের টান ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গান হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তরা চৌধুরীর গাওয়া আধুনিক বাংলা গান
১. বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে (১৯৭৭)
বাংলা শিশু সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান।
এই গান দিয়েই অন্তরা ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
২. এক যে ছিল দুষ্টু ছেলে (১৯৭৭)
শিশুদের নৈতিক শিক্ষামূলক গান।
গল্পের মাধ্যমে শাসন ও সংশোধনের বার্তা।
৩. এক যে ছিল মাছি (১৯৭৭)
রসিক ও কৌতুকধর্মী গান।
ছোটদের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেয়।
৪. ও আয়রে ছুটে আয় (১৯৭৭)
খেলার আহ্বানের গান।
শিশুদের চলনশীলতা ও প্রাণশক্তির প্রকাশ।
৫. না দির দির না (১৯৭৮)
ছন্দনির্ভর খেলাধুলার গান।
শব্দের খেলায় নির্মিত সম্পূর্ণ রিদমিক কম্পোজিশন।
৬. কেউ কখনো ঠিক দুপুরে (১৯৭৮)
মজার গল্পভিত্তিক গান।
সময় ও ঘটনার কৌতুকপূর্ণ মিলন।
৭. খুকুমণি গো সোনা (১৯৭৮)
মায়ের আদরের গান।
আবেগী ও স্নিগ্ধ লোরির ধাঁচে।
৮. ও মাগো মা (১৯৭৮)
শুধু শিশু গান নয়—
এটি সমাজের প্রতি এক গভীর প্রশ্নও তোলে।
৯. ব্যাঙেদের গান শেখা (১৯৭৯)
হাস্যরসাত্মক গান।
প্রাণীদের মানবিক আচরণে রূপান্তর।
১০. হবুচন্দ্র রাজা (১৯৭৯)
লোককথাভিত্তিক গান।
গল্প বলার ধারায় রচিত।
১১. ইস্কাবনের দেশে (১৯৭৯)
কল্পনার রাজ্যের গান।
শিশুদের ফ্যান্টাসি জগতের প্রতিচ্ছবি।
১২. তেলের শিশি ভাঙলো বলে (১৯৭৯)
গীতিকবিতা লিখেছেন অন্নদাশঙ্কর রায়।
শিক্ষামূলক সামাজিক বার্তা।
১৩. পুতুল পুতুল (১৯৮০)
খেলনা-পুতুল ঘিরে কল্পনার গান।
১৪. আঁকা নড়ে, কানে কড়ে (১৯৮০)
শব্দনির্ভর ছড়া গান।
শিশুদের উচ্চারণ ও তাল শেখার জন্য আদর্শ।
১৫. না না পুতুল সোনা (১৯৮১)
আদরের নিষেধধর্মী গান।
শাসন আর ভালোবাসার মিশ্রণ।
১৬. এক্কা দোক্কা টেক্কা (১৯৮১)
সংখ্যাভিত্তিক খেলার গান।
ছোটদের গণিত শেখার মজার পদ্ধতি।
১৭. গোরবড়ি সিং (১৯৮১)
গল্পভিত্তিক চরিত্র গান।
১৮. ধরো দেখি ধরতে কি পারবে (১৯৮১)
দৌড়ঝাঁপ ও প্রতিযোগিতার গান।
১৯. সূর্যের আলো এসে ঘাসে পড়ে (১৯৮২)
(সবিতা ও সঞ্চারীর সঙ্গে)
প্রকৃতি ও সৌন্দর্যবোধ শেখানো গান।
২০. দাদখানি চাল (১৯৮৩)
কথা: যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া ও ছন্দে তৈরি এক সামাজিক ব্যঙ্গধর্মী গান।
শিশুদের ভাষায় সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরা।
২১. হারাধনের দশটি ছেলে (১৯৮৩)
কথা: যোগীন্দ্রনাথ সরকার
বাংলা লোকছড়ার আধুনিক সংগীত রূপ।
মজার ছলে পরিবার ও দায়িত্বের ছবি।
২২. এক পো দুধ কিনেছি (১৯৮৩)
লোকগান থেকে রূপান্তরিত।
গ্রামবাংলার সরল জীবন ও হাস্যরস।
২৩. ছি ছি রান্না শিখে নি (১৯৮৩)
কথা: চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
নারী ভূমিকা নিয়ে ব্যঙ্গ ও সচেতনতার গান।
২৪. বাবুরাম সাপুড়ে (১৯৮৩)
কথা: সুকুমার রায়
ননসেন্স সাহিত্যের সংগীত রূপ।
অন্তরার সবচেয়ে প্রাণবন্ত রেকর্ডগুলোর একটি।
২৫. সন্ধ্যারানি সাঁঝের বেলায় (১৯৮৩)
কবিতাধর্মী আবহসংগীত।
প্রকৃতি ও সময়ের রূপান্তর।
২৬. ঝনঝনা ঝনঝনা বাজে (১৯৮৮)
রোমান্টিক আবহে তৈরি এক উজ্জ্বল আধুনিক গান।
সলিলের সুরে পশ্চিমী হারমনি ও ভারতীয় মেলোডির মিশ্রণ।
২৭. বসে বসে কেটে গেল (১৯৯০)
সময়, অপেক্ষা ও একাকীত্বের গান।
অন্তরার কণ্ঠে গভীর বিষণ্নতার রং।
২৮. এমনও সঘন বর্ষায় (১৯৯০)
বর্ষার আবহে প্রেম ও স্মৃতির গান।
স্ট্রিং অর্কেস্ট্রা ও রাগভিত্তিক সুর—
সলিল নিজে এই গানটিকে তাঁর সেরা কাজগুলোর একটি মনে করতেন।
২৯. কোনো ভালো কবিতার দু’টো পঙ্ক্তি দাও (১৯৯০)
শিল্প, প্রেম ও শব্দের সম্পর্ক নিয়ে এক অসাধারণ গান।
আধুনিক বাংলা গানের মধ্যে অন্যতম দার্শনিক রচনা।
৩০. কেন এল না (১৯৯০)
অপেক্ষা ও অভিমান।
সলিলের মিনিমাল অ্যারেঞ্জমেন্টে অন্তরার কণ্ঠ খুব স্বচ্ছ।
৩১. আমি চাইনি তো কিছু (১৯৯০)
ত্যাগ ও আত্মসংযমের গান।
খুব সরল সুরে গভীর মানবিক অনুভব।
৩২. একদিন সন্ধ্যায় (১৯৯০)
রূপান্তরিত গান (মূল হিন্দি থেকে)।
তবে বাংলা সংস্করণে সলিল নতুন অন্তরা সুর যোগ করেছিলেন।
৩৩. ও কি যে করি (১৯৯০)
হালকা রোমান্টিক, playful মুড।
অন্তরার কণ্ঠে স্বাভাবিক তরুণীর আবেগ।
৩৪. ও ভোলা মন (১৯৯০)
সলিলের অন্যতম প্রিয় গান।
৫/৪ তাল ও Suspended chord ব্যবহার—
একেবারেই ভিন্নধর্মী লোক-আধুনিক সংমিশ্রণ।
৩৫. জনম জনমের সাথী (১৯৯০)
চিরন্তন প্রেম ও পুনর্জন্মের ধারণা।
সলিলের শেষ দিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় রোমান্টিক গান।
শ্যামল মিত্রের গাওয়া আধুনিক বাংলা গান
১. আহা ওই আঁকা বাঁকা যে পথ (১৯৬২)
রোমান্টিক ও স্বপ্নময় গান।
শ্যামল মিত্রের কণ্ঠের নরম আবেগ এই গানে পুরোপুরি ফুটে উঠেছে।
২. যা রে যা যা পাখি (১৯৬২)
বিরহ ও মুক্তির প্রতীকী গান।
সলিলের সুরে পাখির উড়ে যাওয়ার রূপক।
৩. যদি কিছু আমাকে শুধাও (১৯৬৩)
শ্যামল–সলিল যুগলের সবচেয়ে বিখ্যাত গান।
বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অনন্য রোমান্টিক সৃষ্টি।
৪. দূর নয় বেশি দূর ওই (১৯৬৩)
আশা ও অপেক্ষার গান।
শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে রহস্যময় আবেগ।
৫. যা যাক ধুয়ে যাক মুছে যাক (১৯৬৯)
অতীত ভুলে সামনে এগোনোর গান।
গভীর মনস্তাত্ত্বিক রচনা।
৬. ধিন তাক ক্রুর ধিন তাক (১৯৬৯)
তালের খেলায় তৈরি এক ব্যতিক্রমী আধুনিক গান।
সলিলের ছন্দ-নিরীক্ষার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৭. চলে যে যায় দিন দিন দিন (AIR) (১৯৭০)
সময় চলে যাওয়ার দর্শন।
পরবর্তীতে হিন্দিতে “Chole je jaay din” → ‘Annadata’ ছবিতে কিশোর কুমারের গলায় সুপারহিট হয়।
৮. ওগো সুরাঙ্গনা (AIR) (বছর অজানা)
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গান।
এই সুরই পরে ব্যবহার করেন সলিল → হিন্দি ছবি ‘Anand’-এর টাইটেল মিউজিকে।
দুঃখজনকভাবে এটি কখনো বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশিত হয়নি।
সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:
- গান খেকো সিরিজ- সূচি
- উইকিপিডিয়া : সলিল চৌধুরী
ঘোষনা:
শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।


২ thoughts on “আমার সলিল চৌধুরী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ”
Comments are closed.