স্ট্রিং কোয়ার্টেট । পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের চেম্বার মিউজিকের আলোচনায় আজ আমরা পা রাখছি পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল, মার্জিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ এক মাধ্যমে, যার নাম স্ট্রিং কোয়ার্টেট (String Quartet)। এখানে বিশাল অর্কেস্ট্রার রাজকীয় আতিশয্য বা শব্দের অতি-কোলাহল নেই, বরং চারটি একক বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম কারিগরিই এর মূল শক্তি। পশ্চিমা সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘স্ট্রিং কোয়ার্টেট’ বলতে একই সাথে একটি বিশেষ চার-মুভমেন্টের সঙ্গীতকর্ম এবং সেই সুর পরিবেশনকারী চারজন শিল্পীর দল—উভয়কেই বোঝায়। কোনো বাড়তি বাদ্যযন্ত্রের কৃত্রিম সাহায্য ছাড়া কেবল একই গোত্রের চারটি তারযন্ত্রের সম্মিলিত ধ্বনি দিয়ে কীভাবে একটি মহাকাব্যিক আবহ তৈরি করা যায়, সুরকারদের জন্য এটি ছিল এক চরম পরীক্ষা।

স্ট্রিং কোয়ার্টেট

 

কারিগরিভাবে একটি আদর্শ স্ট্রিং কোয়ার্টেট মানুষের গলার স্বরের সম্পূর্ণ ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রামকে কভার করার মতো করে সাজানো হয়। এই দলে থাকে দুটি ভায়োলিন, একটি ভায়োলা এবং একটি চেলো। প্রথম ভায়োলিনটি সাধারণত মানুষের উচ্চ স্বরগ্রাম বা সোপরানো (Soprano) রেঞ্জে প্রধান মেলডি লিড করে। দ্বিতীয় ভায়োলিনটি অল্টো (Alto) রেঞ্জে থেকে সুরের ভেতরের টেক্সচার ও হারমোনিক সাপোর্ট তৈরি করে। আকারে কিছুটা বড় এবং গম্ভীর স্বরের ভায়োলাটি তেনোর (Tenor) রেঞ্জের মধ্যম হারমনি প্রদান করে। আর সবচেয়ে ভারী ও নিচু স্বরের চেলোটি বাস (Bass) লাইনের মাধ্যমে পুরো কোয়ার্টেটের গাণিতিক ভিত্তি গড়ে তোলে। পিয়ানোর মতো কোনো ঘাতযন্ত্র ছাড়াই কেবল এই চার সমগোত্রীয় তারযন্ত্রের ঘর্ষণে সুরকারেরা এক অবিস্মরণীয় সাঙ্গীতিক আবহ তৈরি করেন।

ঐতিহাসিক বিবর্তন: হেইডন থেকে বিটোফেনের বিপ্লব

স্ট্রিং কোয়ার্টেটের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি মূলত ১৭startup-এর দশকে অস্ট্রিয়ান সুরকার জোসেফ হেইডনের হাত ধরে পূর্ণতা পায়, যার কারণে তাঁকে এই জনরার জনক বলা হয়। হেইডনের আগে ‘ট্রিও সোনাটা’ (যেখানে পিয়ানো বা হার্পসিকর্ড থাকত) প্রচলিত থাকলেও, ঘটনাচক্রে ১৭৫০-এর দশকে ভিয়েনার এক অভিজাত ব্যক্তির অনুরোধে চারজন সাধারণ বাদকের জন্য সুর বাঁধতে গিয়ে হেইডন প্রথম এই স্বাধীন কোয়ার্টেটের জন্ম দেন। তাঁর ১৭৭২ সালের ‘Opus 20’ কোয়ার্টেটগুলোকে এই ধারার প্রথম সার্থক শিখর ধরা হয়, যেখানে তিনি প্রথম দেখান যে এখানে কোনো যন্ত্রই কারো অনুগামী নয়, বরং প্রত্যেকেই সমমর্যাদার অংশীদার।

পরবর্তীতে লুদভিগ ফন বিটোফেন এই ধারাকে সম্পূর্ণ আমূল বদলে দেন। বিশেষ করে ১৮২০-এর দশকে তাঁর জীবনের শেষ ভাগে বধির অবস্থায় লেখা ‘লেট কোয়ার্টেট’ (Late Quartets) গুলো সুরের ইতিহাসে এক একটি পরম বিস্ময়। তাঁর অত্যন্ত পরীক্ষামূলক ‘Op. 131’ কোয়ার্টেটটি এতটাই গভীর ও মরমী ছিল যে, কিংবদন্তি সুরকার ফ্রাঞ্জ শুবার্ট তাঁর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগেও এই কোয়ার্টেটটি শোনার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

কারিগরি খুঁটিনাটি ও ধ্রুপদী কাঠামো

স্ট্রিং কোয়ার্টেট রচনা করা সুরকারদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রধান কারণ হলো কাউন্টারপয়েন্ট (Counterpoint) বা বহুমাত্রিক সুরের গাণিতিক বিন্যাস। এখানে একটি যন্ত্র সুর বাজালে বাকি তিনটি কেবল তাকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে না, বরং প্রায়ই চারটি যন্ত্র চারটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আলাদা মেলডি বাজাতে থাকে, যা একত্রে মিলে এক নিখুঁত হারমনি তৈরি করে। যেহেতু চারটি যন্ত্রই একই পরিবারের এবং তাদের শব্দের চরিত্র বা টিমব্রা (Timbra) প্রায় এক, তাই পিয়ানো বা বাঁশির মতো ভিন্নধর্মী শব্দের সাহায্য ছাড়াই কেবল তারের প্রয়োগ বদলে বৈচিত্র্য আনতে হয়। একে বলা হয় ‘কনভার্সেশনাল টেক্সচার’—যেখানে মনে হয় চারজন বিজ্ঞ বন্ধু নিজেদের মধ্যে কোনো গভীর বিষয়ে চমৎকার আলাপচারিতা করছেন। এই আলাপচারিতাকে আরও প্রাণবন্ত করতে শিল্পীরা ‘পিৎজিকাটো’ (তার টেনে ছেড়ে দেওয়া), ‘লেগাতো’ (মসৃণ সুর) বা ‘স্টাকাতো’ (ছিন্ন সুর)-র মতো জটিল টেকনিক ব্যবহার করে শব্দের মেজাজ মুহূর্তেই বদলে দেন।

একটি প্রথাগত স্ট্রিং কোয়ার্টেট সাধারণত চারটি সুনির্দিষ্ট মুভমেন্ট বা অংশে সাজানো হয়। প্রথম অংশটি হলো দ্রুত লয়ের ‘অ্যালেগ্রো’, যা সোনাটা ফর্মে রচিত এবং এটি বেশ বুদ্ধিবৃত্তিক ও জটিল হয়। দ্বিতীয় অংশটি হলো ধীর লয়ের ‘আদাজিও’, যা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও লিরিক্যাল হয় এবং এখানে ভায়োলিন বা চেলোর একক সুরগুলো ফুটে ওঠে। তৃতীয় মুভমেন্টটি একটি নাচ-ধর্মী সুরের হয়, যা হয় রাজকীয় ‘মিনুয়েট’ অথবা দ্রুত ও চঞ্চল ছন্দের ‘শেসো’। আর পুরো সৃষ্টির সমাপ্তি ঘটে অত্যন্ত দ্রুত গতির ও উৎসবমুখর ‘ফিনালে’ মুভমেন্টের মাধ্যমে, যা প্রায়ই রন্ডো বা ফুগ ফর্মে শেষ হয়।

আধুনিক যুগে সীমানা অতিক্রম

বিশ শতকে এসে স্ট্রিং কোয়ার্টেট কেবল এই ধ্রুপদী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা চরম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। ক্লদ দেবুসি এবং মরিস রাভেলের মতো ইমপ্রেশনিস্ট সুরকারেরা তাঁদের কোয়ার্টেটে রঙের ছোঁয়া ও অস্পষ্ট হারমনির মায়াজাল তৈরি করেছেন। অন্যদিকে আর্নল্ড শ্যেনবার্গ তাঁর দ্বিতীয় কোয়ার্টেটে প্রথা ভেঙে একজন সোপরানো গায়িকাকে যুক্ত করেন এবং বেলার বার্টোক তাঁর কোয়ার্টেটগুলোতে লোকজ সুর ও আধুনিক জটিল তালের এক অনবদ্য ফিউশন ঘটান।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার চরম সীমানায় গিয়ে সমকালীন সুরকার মর্টন ফেল্ডম্যান প্রায় ৬ ঘণ্টা দীর্ঘ কোয়ার্টেট রচনা করেছেন। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত পরীক্ষাটি করেছিলেন কার্লহেইঞ্জ স্টকম্যান; তাঁর ‘হেলিকপ্টার স্ট্রিং কোয়ার্টেট’-এর চারজন বাদক চারটি আলাদা উড়ন্ত হেলিকপ্টারে চড়ে বাজিয়েছিলেন এবং সেই শব্দ প্রযুক্তির সাহায্যে নিচে মিক্স করে শ্রোতাদের শোনানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে স্ট্রিং কোয়ার্টেট হলো পশ্চিমা সঙ্গীতের সবচেয়ে বিশুদ্ধ, মার্জিত এবং নিরাভরণ রূপ, যেখানে কোনো বাড়তি আড়ম্বর ছাড়াই সুরের মূল কঙ্কালটি দৃশ্যমান থাকে এবং সুরকারেরা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের চূড়ান্ত মাধ্যম হিসেবে আজও এই জনরাটিকে বেছে নেন।

উৎস (Sources) : এই আর্টিকেলের ঐতিহাসিক ও কারিগরি তথ্যসমূহ জোসেফ হেইডনের মূল গীতলিপি নোটস, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন মিউজিক, বিটোফেন হাউসের লেট কোয়ার্টেট আর্কাইভ।