স্বাধীনতার চেতনা মানে কি? । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আমরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে স্বাধীনতার চেতনার কথা বলি। আমরা যেহেতু অর্থ না বুঝে দ্রুত মুখস্থ করার একটি জাতি, তাই বক্তৃতা করার জন্য এটাও খুব দ্রুত মুখস্থ করে নিই। কিন্তু আমরা যেহেতু বিষয়টি বুঝি না, তাই আমাদের পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডে এই চেতনার সত্যিকারের প্রভাব কমই দেখা যায়। দুষ্কৃতকারীরা যেমন ধর্ম, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের মতো শক্তিশালী বিষয়ের মধ্যে ঢুকে এগুলোকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে, স্বাধীনতার চেতনার চাদরও তেমন করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। মনে মনে সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল ও পাকিস্তানপন্থী অনেকেই মুখে মুখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে রাতারাতি হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। এই লোকগুলোর টাকা-পয়সা বা লোকবল যতই থাকুক, এরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি নয়, বরং দুর্বলতা। এরা ভেতর থেকে ক্রমশ স্বাধীনতার চেতনার যে শাশ্বত শক্তি, সেটাকে কুরে কুরে নষ্ট করে ফেলে। এদের যদি বাড়বাড়ন্ত হয়, তবে এমন একটি সময় আসতে পারে যখন তারা “স্বাধীনতার চেতনা” শব্দটিকে আমাদের গর্বের বদলে গালিতে পরিণত করে ফেলতে পারে।

তাই আমাদের বোঝা দরকার—স্বাধীনতার চেতনা আসলে কী। এটা বুঝলে আপনি নিজেকে এই আদর্শের প্রকৃত সৈনিক হিসেবে তৈরি করতে পারবেন। আবার এই চেতনার চাদর গায়ে দিয়ে যেসব উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল ও পাকিস্তানপন্থী আমাদের আশেপাশে লুকিয়ে আছে, তাদেরও চিহ্নিত করতে পারবেন।

স্বাধীনতার চেতনা বলতে আমরা যে কথাগুলো বলি—যেমন জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্ব—এসবই এসেছে পাকিস্তানপন্থার মাধ্যমে আমাদের অতীতের ভোগান্তির শিক্ষা থেকে। আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি যে, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যতই ভালো শোনাক না কেন, এটা আসলে একটা ব্যর্থ থিওরি। এটি কখনো একটি সাম্য ও শান্তির সমাজ নির্মাণ করতে পারে না, বরং বৈষম্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষ নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হয়। তাই এই ভুল আমরা আর করব না। আমরা পাকিস্তানপন্থার ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে আর প্রশ্রয় দেব না, তার বদলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বেছে নেব। এ রকম সবগুলো সিদ্ধান্তের পেছনেই সুনির্দিষ্ট বাস্তব কারণ রয়েছে।

খুব সহজে বললে, আমরা পাকিস্তান আমলে যেসব কারণে ভুগেছি, তার উল্টোটা করাই হলো স্বাধীনতার চেতনা। পাকিস্তানপন্থার বিপরীতে চলাই স্বাধীনতার মূল অর্থ। আমরা কয়েকটি বড় দাগে জানব সেই চেতনা আসলে কী। এই লেখার বিভিন্ন পর্যায়ে আমি সেই সব ‘পাকিস্তানপন্থা’ আপনাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরব।

Table of Contents

পাকিস্তানপন্থা’ আসলে কী জিনিস?

পাকিস্তানপন্থী ধর্মীয় সংখ্যালঘু নীতি

মুসলিমদের পাশাপাশি পাকিস্তান সৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি ছিল শিডিউল কাস্ট বা দলিত হিন্দুরা, যাদের নেতা ছিলেন যোগেন মন্ডল। এই কারণেই যোগেন মন্ডলকে পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী করা হয়। আপনারা সবাই জানেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র হবার পরে শিডিউল কাস্টসহ সকল হিন্দুদের বিষয়ে কী নীতি গ্রহণ করেছিল। চারদিকে ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নির্যাতন যখন সকল সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন যোগেন মন্ডল সেগুলো নিয়ে পাকিস্তানের রুলিং ক্লাসকে (শাসক গোষ্ঠী) বারবার ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়েছিল তা খুব সহজে বোঝা যায়, যখন তিনি সেখানে টিকতে না পেরে নিজেই ভারতে পালিয়ে যান।

পাকিস্তান গঠন হবার পাঁচ বছরও পার হতে পারেনি—যোগেন মন্ডলের ওস্তাদ বি. আর. আম্বেদকর যখন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী হিসেবে সসম্মানে দেশটির সংবিধান রচনা শেষ করেছেন, ঠিক তখন যোগেন মন্ডলকে পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানেরপ্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পালিয়ে ভারতে চলে যেতে হয়।

পাকিস্তান গঠনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে ৩০% হিন্দু ছিল, আর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল মাত্র ২%। আজ কোন অংশে কত পার্সেন্ট আছে? এই হিসেবটা করলেই বুঝতে পারবেন ‘পাকিস্তানপন্থা’ আসলে কী জিনিস। পাকিস্তান হবার পর মাত্র ৮ বছরের মধ্যে ৬% হিন্দু পূর্ব বাংলা থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। চরম নির্যাতন সহ্য করে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল ২২%।

এরপর নিয়মিত পাকিস্তানপন্থার প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের পাশাপাশি—১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর কুখ্যাত “এনিমি প্রপার্টি অ্যাক্ট” (শত্রু সম্পত্তি আইন) করা হয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চালানো হয় ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি। এটাই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানপন্থা—ধর্মের নামে অন্য ধর্মের মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার মাধ্যমে এমন একটি দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা, যেন তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলাদেশপন্থা হলো এর ঠিক উল্টো: বাংলাদেশপন্থা হচ্ছে এমন এক দর্শন, যা রাষ্ট্রের নাগরিকের পরিচয় নির্ধারণে কোনো রকম ধর্মীয় চশমা ব্যবহার করে না। প্রতিটি নাগরিকের সমান সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কোনো ধর্ম দেখবে না—এটাই বাংলাদেশপন্থার মূল কথা। বাংলাদেশ একটি ৯০% মুসলমানের দেশ হতে পারে, কিন্তু সেই সংখ্যাধিক্যের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের মতো অন্য কোনো ধর্মের ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এ দেশের আইন ও সংবিধানের চোখে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমান অংশীদার। ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে সুযোগ দেওয়া বা কাউকে বঞ্চিত করার যে বৈষম্যমূলক নীতি পাকিস্তান লালন করে, বাংলাদেশপন্থা তার মুখে চুনকালি দিয়ে প্রতিটি মানুষের সমান নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়।

পাকিস্তানপন্থী নিজের ধর্মের মধ্যকার সংখ্যালঘুদের নীতি

সাম্প্রদায়িকতার শিকার কি শুধুমাত্র হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টানেরা ছিল? একদমই না।

পাকিস্তান সৃষ্টির সময় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে কারণেই স্যার মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ খানকে পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিল। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন দাবি তোলে যে আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করতে হবে এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান ক্রমান্বয়ে সেই উগ্রবাদীদের পক্ষেই গেছে। ১৯৫৩ সালে লাহোরসহ বিভিন্ন স্থানে আহমদিয়াবিরোধী দাঙ্গা ছড়িয়ে দিয়ে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে জুলফিকার আলী ভুট্টো তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করেন। এটাই নিজের ধর্মের মধ্যকার সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানপন্থা—ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের ধর্মেরই অন্য কোনো সেক্ট বা সাবসেক্টকে কাফের উপাধি দিয়ে হত্যা করা এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া।

স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলাদেশপন্থা হলো এর ঠিক উল্টো: বাংলাদেশপন্থা খুব স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বাস করে, কে কার ধর্ম কীভাবে পালন করবে, কে কোন ফেরকা বা মাজহাব মানবে—সেটা সম্পূর্ণ নাগরিকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার, সেখানে নাক গলানোর বা ফতোয়া দেওয়ার কোনো এক্তিয়ার রাষ্ট্রের নেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। এ দেশের মাটিতে সুন্নি, শিয়া, আহমদিয়া, সুফি ধারার মানুষ কিংবা যেকোনো মরমী ঘরানার মানুষ—সবাই কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ছাড়াই নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের চর্চা করতে পারেন। ৯২ শতাংশ মুসলিমের দেশ হওয়ার পরেও রাষ্ট্র এখানে কাউকেই ধর্মের ভেতরের ভিন্নমতের কারণে ‘কাফের’ তকমা দিয়ে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ রাখেনি। নিজের ধর্মের ভেতরের মানুষকেও শত্রু বানিয়ে দেওয়ার যে পাকিস্তানি উন্মাদনা, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হলো প্রকৃত বাংলাদেশপন্থা।

পাকিস্তানপন্থী ‘আশরাফি’ অর্থনৈতিক নীতি

তবে সাম্প্রদায়িকতার এই বিষ কি শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল? একদম না।

বিহার, ইউপি বা হায়দরাবাদ থেকে হিজরত করে যেসব মুসলমান পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, সেই ‘মুহাজির’রাই পাকিস্তান গঠনের পর রাষ্ট্রের রুলিং ক্লাস হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের অন্য সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে ‘উন্নত জাতের’ মুসলমান ভাবতেন, যাদের পরিভাষায় বলা হতো ‘আশরাফ’ মুসলমান। তাদের সমকক্ষ ছিল বড়জোর ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য, উর্দুভাষী খাজা নাজিমুদ্দিন। এদের রাজনীতিই ছিল নিজেদের ভোগ-বিলাস আর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কুৎসিত চক্রান্ত। যারা গণমানুষের কথা ভাবত, পাকিস্তানে রয়ে যাওয়া সকল জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়নের কথা বলত—তাদের সবাইকে এই রুলিং ক্লাস রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে মাইনাস করতে চেয়েছে।

পাকিস্তানি রুলিং ক্লাসের চোখে আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা ছিলাম “আত্রাফ” বা “আরজাল” (ছোটজাতের) মুসলমান। পাকিস্তান গঠন হবার পরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার লাইসেন্স ও পারমিট দেওয়া হতে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা আমাদের সেসব কোটা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র বরাবরই পক্ষ নেয় আশরাফ মুসলমানদের। “সৈয়দ”, “খান”সহ উর্দুভাষী তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের সেই সব লাইসেন্স ও পারমিট কোটা বিলিয়ে দেওয়া হয়। আমরা যেখানে দিন-রাত খেটে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, সেখানে তাদের জন্য বসে বসে খাওয়া আর নবাবী করার রাজকীয় ব্যবস্থা করা হয়।

শুধুমাত্র লাইসেন্স-পারমিট নয়, পাকিস্তানে যখন রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছিল, তখন সেটার একচেটিয়া সুযোগ পায় শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ‘আশরাফ গ্রুপ’ এবং তাদের পকেটে টাকার জোগান দেওয়া নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী। রাষ্ট্র নিজের ফান্ডে বিনিয়োগ করে ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে, চালিয়ে, লাভজনক করে এরপর এদের নামমাত্র মূল্যে মালিক বানিয়ে দিত। যার ওপরের স্তরে ছিল সেই কুখ্যাত ‘২২ পরিবার’, আর তার নিচে ছিল এ রকম আরও কয়েকটি লেয়ার।

অর্থনীতিতে এটাই ‘আশরাফ’ বনাম ‘আত্রাফ’ বৈষম্যের পাকিস্তানপন্থা—যেখানে ব্যাংক লোন, লাইসেন্সসহ রাষ্ট্রের সকল রিসোর্স ও সম্পদ কেবল অল্প কিছু রুলিং ক্লাসের পছন্দের মানুষের পেছনেই ব্যয় হবে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা ছোট আর্থিক সংগতি থেকে উঠে এসে আপনি কখনোই বড় কিছু করতে পারবেন না। পাকিস্তানে আজও এই কাঠামোই বিদ্যমান।

স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলাদেশপন্থা হলো এর ঠিক উল্টো: বাংলাদেশপন্থা এই কৃত্রিম ‘জাত-পাত’ আর কুৎসিত আশরাফি শৃঙ্খল ভেঙে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সুযোগের এক অভূতপূর্ব সমতা এনেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশে এসে আপনি বাস্তব চিত্রটা দেখলেই বুঝবেন ফারাক কাকে বলে। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রজন্মে এসে এ দেশে ভূমিহীন কৃষকের সন্তান থেকে শুরু করে একদম অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা অসংখ্য মানুষ আজ সৎ চেষ্টা ও মেধার জোরে বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি হতে পেরেছেন, শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাষ্ট্র এখানে কোনো নির্দিষ্ট ‘২২ পরিবার’ তৈরি করে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখেনি।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশপন্থা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতিটি দুয়ারকে সব মানুষের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এখানে কোনো বড় রাষ্ট্রীয় পদে বসার জন্য কারো পারিবারিক বংশমর্যাদা, এলিট কানেকশন বা ধর্মীয় পরিচয় দেখতে হয় না। এ দেশের যেকোনো ধর্মের বা যেকোনো সেক্টের মানুষ—তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা যেকোনো মাইনরিটি গোষ্ঠীর হোন না কেন—নিজেদের যোগ্যতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ও নীতি-নির্ধারণী পদে গিয়েছেন এবং যাচ্ছেন। আমরা আমাদের দেশের প্রধান বিচারপতি, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বা মন্ত্রী, ক্যাবিনেট সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সেনা-নৌ-বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, পুলিশের আইজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষতম পদগুলোতে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষকে সততা আর গৌরবের সাথে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। কোনো পদে যাওয়ার ক্ষেত্রেই অন্য ধর্মের বা সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের জন্য কোনো অদৃশ্য দেয়াল বা আইনি বাধা নেই। এই যে মেধার পরম মূল্যায়ন আর ধর্মীয় পরিচয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার সমান অধিকার দেওয়া—এটাই হলো সুষম ও মানবিক প্রগতির প্রতীক, এটাই হলো আসল বাংলাদেশপন্থা।

পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক অধিকার হরণ নীতি

এই এলিট বা রুলিং ক্লাসের ক্ষমতার লালসা এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা রাজনৈতিক অধিকার হরণের ক্ষেত্রে কোনো বড় নেতাকেও ছাড় দেয়নি। বরিশালের ছেলে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এদের সবার চেয়ে বড় নেতা ছিলেন। একই সময়ে তিনি একদিকে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি (১৯১৬–১৯২১) এবং অন্যদিকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। এই দুটি প্রধান ও বিপরীতমুখী রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে একই সাথে থাকার ঘটনা ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় অনন্য। তিনি ছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক। এত বড় নেতার সাথে পাকিস্তান কী আচরণ করেছে? শিক্ষায়, ব্যক্তিত্বে ও রাজনৈতিক উচ্চতায় যাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করে পাকিস্তান নিজেই ধন্য হতে পারত, সেই মহান নেতার একটি নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকেও ‘ভারতের দালাল’ ট্যাগ দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়।

উর্দুভাষী হওয়া সত্ত্বেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাঙালিদের পক্ষের খাঁটি রাজনীতিবিদ। সোহরাওয়ার্দী সাহেবও ওই রুলিং ক্লাসের তথাকথিত নেতাদের চেয়ে অনেক বড় নেতা ও সংগঠক ছিলেন। শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় তিনি তাদের চেয়ে বহুগুণ দক্ষ ছিলেন। ইনফ্যাক্ট, তাঁরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার কথা ছিল। কিন্তু রুলিং ক্লাস ক্ষমতার লোভে সোহরাওয়ার্দীকে প্রথমে পাকিস্তানে ঢুকতেই বাধা দেয়। তারপর কত রকম কাঠখড় পুড়িয়ে জীবনের শেষভাগে তিনি মাত্র একবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন।

শুধু এরাই নন, পাঞ্জাবের বড় নেতা মিয়াঁ ইফতিখারউদ্দিনের সাথেও একই আচরণ করেছিল পাকিস্তানের রুলিং ক্লাস। আর এদের কথা কী বলব—পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন জীবনের শেষ মুহূর্তে সাম্প্রদায়িকতার বিষ বুঝতে পেরে সেকুলারিজমের পক্ষে বলা শুরু করেছিলেন, তখন এই রুলিং ক্লাস প্রচ্ছন্নভাবে তাঁর চিকিৎসা না করিয়ে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর বোন ফাতিমা জিন্নাহ—যাকে এরা মুখে ‘কওমি মাতা’ বলত, তাঁর সাথে তারা কেমন আচরণ করেছিল? তাঁর নামেও শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান ‘ভারতের দালাল’ খেতাব জুড়ে দেয়।

এটাই পাকিস্তানপন্থার নামে রাজনৈতিক অধিকার হরণ—যেখানে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে জনগণের প্রিয় ও যোগ্য নেতাদের চরিত্র হনন করা হতো এবং অনায়াসে ‘দালাল’ তকমা দিয়ে রাজনীতি থেকে ছুড়ে ফেলা হতো।

পাকিস্তানপন্থী বৈষম্যমূলক ও অনগ্রসর নারীনীতি

একটি দেশ আসলে কতটা উন্নত বা অর্থনৈতিকভাবে কতটা এগোবে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সেই দেশের নারীরা অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছেন। সোজা সাপটা হিসাব—দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রেখে কোনো রাষ্ট্র কোনোদিন অর্থনৈতিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু পাকিস্তানপন্থী দর্শনের গোড়াতেই ছিল এক কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিক গলদ। তারা রাষ্ট্র চালনার নীতিতেই ধর্মীয় অনুশাসন আর পুরুষতান্ত্রিক সংস্কারকে এমনভাবে জুড়ে দিল, যাতে নারীরা সবসময় অচল এবং অর্থনৈতিকভাবে পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে তারা হয়ে রইল কেবলই ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’।

এই অনগ্রসর নীতির কারণে পাকিস্তানের অর্ধেক জনশক্তি আজ দেশের অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এর মাশুলও তারা দিচ্ছে—দেশটি আজ স্থায়ীভাবে একটা দেউলিয়া আর ঋণনির্ভর ভিখারির রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর ঠিক এর বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে যে অভাবনীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তার প্রধান কারণ আমাদের নারীরা। দুই দেশের বাস্তব চিত্রটা একটু মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন ফারাকটা কোথায়:

এবার একটু পাকিস্তানের নারীদের কর্মক্ষেত্রের দিকে তাকানো যাক। বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার খটমটে ডেটা না দেখলেও চলে, খালি চোখেই বোঝা যায় পাকিস্তানপন্থী সমাজ নারীকে কীভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছে। আজ এই ২০২৬ সালেও সে দেশে মাত্র চারভাগের একভাগ নারী ঘরের বাইরে কাজ করার সুযোগ পান। বাকি ৭৫ ভাগ নারীই দেশের অর্থনীতি বা জিডিপিতে কোনো অবদান রাখতে পারছেন না। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে ফতোয়া আর কঠোর পর্দার সংস্কৃতিকে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দেয়, সেখানে নারীদের ঘরের বাইরে এসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়াটাই একরকম অসম্ভব। আর আমাদের বাংলাদেশে চিত্রটা ঠিক উল্টো। এখানে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী আজ সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যুক্ত এবং দিন দিন এই সংখ্যাটা বাড়ছে। আমাদের এই যে টানা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এর আসল চালিকাশক্তিই হলেন এই নারীরা।

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন আর অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড হলো পোশাক শিল্প। একটু ভেবে দেখুন, এই মেগা ইন্ডাস্ট্রিতে যে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ দিন-রাত খাটছেন, তার মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই কিন্তু এ দেশের সাধারণ ঘরের নারী। গ্রাম-গঞ্জ থেকে উঠে আসা এই কোটি কোটি মেয়ে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, নিজেরা আয় করছেন। এই নারীদের উপার্জিত টাকাই আজ আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতকে সচল রেখেছে এবং আমাদের রিজার্ভের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানেও কিন্তু বিশাল কাপড়ের ব্যবসা বা টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি আছে। কিন্তু সেই একই সামাজিক ট্যাবু আর ধর্মীয় বেড়াজালের কারণে সেখানে কারখানায় নারী শ্রমিকদের দেখাই মেলে না। পুরো খাতটি পুরুষদের দখলে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে—পাকিস্তান তাদের অর্ধেক জনশক্তিকে বসিয়ে রেখে আজ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে কাঁদছে, আর বাংলাদেশ সেই জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই এক চরম অন্ধকার নীতি নিয়ে চলেছে। খাইবার পাখতুনখোয়া বা বেলুচিস্তানের মতো এলাকাগুলোতে উগ্রবাদীদের ভয় আর রাষ্ট্রীয় উদাসীনতায় মেয়েরা স্কুলেই যেতে পারে না। মেয়েদের শিক্ষার কথা বলায় খোদ পাকিস্তানের মাটিতেই মালালা ইউসুফজাইয়ের মতো নোবেলজয়ী কিশোরীকে গুলি খেতে হয়েছিল। ইউনিসেফের তথ্য বলছে, পাকিস্তানে এখনো প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি শিশু স্কুলের বাইরে, যার বেশিরভাগই কন্যাসন্তান। একটা শিক্ষিত মা ছাড়া যে একটা দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা অসম্ভব—এই সাধারণ অর্থনৈতিক সত্যটি পাকিস্তানপন্থা কোনোদিন বুঝতে চায়নি। তার ওপর আইনি শিথিলতার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের জোরপূর্বক বাল্যবিয়ে আর ধর্মান্তরকরণের ঘটনা তো ওদের রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। এই মেয়েরা সমাজ বা অর্থনীতির জন্য আজীবন অনুৎপাদনশীল এক বোঝা হয়েই থেকে যাচ্ছে।

আইনি বৈষম্যের কথা যদি বলি, পাকিস্তানের ইতিহাস ঘাঁটলে গা শিউরে ওঠে। জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে সে দেশে ‘হুদুদ অর্ডিন্যান্স’-এর মতো কুখ্যাত আইন করা হয়েছিল। যেখানে কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে, চারজন পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে না পারলে উল্টো সেই নারীকেই ব্যভিচারের অপরাধে চাবুক মারা বা পাথর ছুড়ে মারার শাস্তি দেওয়া হতো। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে নারীর সুরক্ষার বদলে তাকে অপরাধী বানানোর এমন মধ্যযুগীয় আইন তৈরি করে, তার চেয়ে খাঁটি পাকিস্তানপন্থা আর কী হতে পারে?

এই যে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা, শিক্ষা থেকে দূরে রাখা এবং পুরো সমাজ ও অর্থনীতিকে এক অন্ধকার পুরুষতান্ত্রিক খাদের দিকে ঠেলে দেওয়া—এটাই হলো পাকিস্তানপন্থী দেউলিয়া নারীনীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের স্বাধীনতার চেতনা আমাদের খুব সহজ একটা সত্য শিখিয়েছে—নারীকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রেখে কোনো জাতি কোনোদিন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তিটাই ছিল নারী-পুরুষের সমতা। আজ আমাদের নারীরা শুধু পোশাক কারখানাতেই কাজ করছেন না; তারা দেশের সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগ, কর্পোরেট ব্যবসা থেকে শুরু করে প্লেন চালানো—রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নারীকে ধর্মীয় শৃঙ্খলে আটকে রাখা কোনো বোঝা নয়, বরং তাকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করাই হলো আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

পাকিস্তানপন্থী পররাষ্ট্রনীতি

একটি জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য পরস্পরকে বেঁধে রাখার একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক দরকার হয়, যেটাকে আমরা জাতীয়তাবাদ বলি। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তো পৃথিবীর কোথাও জাতি গঠনে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। যারা পাকিস্তান তৈরি করেছিল, তাদের অন্য কোনো টেকসই জাতীয়তাবাদ তৈরি করার মতো ভিশন বা দূরদর্শিতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হিসেবে আবিষ্কার করে “ভারত-বিরোধিতা”। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু ভারত-বিরোধিতা দিয়ে জনগণকে সাময়িকভাবে একীভূত করা গেলেও তাদের প্রকৃত কোনো উন্নয়ন করা যায় না। এই নেতিবাচক বিরোধিতার জ্বালানির জোগান দিতে দিতে রাষ্ট্রের অধিকাংশ রিসোর্স ও সম্পদ ব্যয় হয়ে যায়। ফলে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আর কিছুই বাকি থাকে না। ঠিক সেটাই ঘটেছে পাকিস্তানে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর খুব দ্রুত সামরিক শাসকরা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর দেশটি এলিট-মোল্লা-মিলিটারি চক্রের শাসনের হাতে চিরদিনের জন্য বন্দি হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সিংহভাগ সম্পদ ব্যয় হয় পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে কৃত্রিম শত্রুতা বজায় রাখতে এবং মিলিটারির পেছনে। ফলে জনগণের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ সবসময়ই পেছনে পড়ে থাকে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারত-বিরোধিতার অন্ধ মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমরা প্রয়োজনে ঘাস খাব, তবুও পারমাণবিক বোমা বানাব।” বাস্তবে হয়েছেও তাই। এখন পাকিস্তানের এক হাতে পারমাণবিক অস্ত্র, আর অন্য হাতে রয়েছে ভিক্ষার থালা। তাদের নিজেদের শাসকরাই এখন আন্তর্জাতিক মহলে আক্ষেপ করে বলেন—”আমাদের এক হাতে পারমাণবিক বোমা, অন্য হাতে ভিক্ষার বাটি। আমি যে দেশেই যাই না কেন, তারা মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ঠিকই জানে যে সেই ভিখারি আবার এসেছে।”

টানা ২৩ বছর পাকিস্তান আমাদের সম্পদ লুটপাট করল। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমাদের চেনা দেশটাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিয়ে গেল। অন্যদিকে, পাকিস্তান কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের শুরু থেকেই পরাশক্তিদের কাছ থেকে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার সাহায্য পেয়েছে। সিয়াটো (SEATO) ও সেন্টো (CENTO) সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার পর তাদের বার্ষিক বৈদেশিক সাহায্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। আফগান যুদ্ধে সোভিয়েতবিরোধী সহযোগিতার জন্য তারা বছরে ১ বিলিয়ন ডলার করে পেয়েছে। আবার ৯/১১-এর পর আমেরিকার “অপারেশন এন্ডুরিং ফ্রিডম” বা “ওয়ার অন টেরর”-এর সহযোগী হতে গিয়ে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাহায্য পেয়েছে। এত টাকা অনুদান ও ঋণ পাওয়ার পরেও আজ কিন্তু পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের টাকার মান অনেক বেশি। আর দিন দিন পাকিস্তানি রুপির দাম ক্রমাগত কমছেই।

এটাই হলো পাকিস্তানপন্থী পররাষ্ট্রনীতির অবধারিত ফল। ভারত ও আফগানিস্তানের সাথে ক্রমাগত শত্রুতা ও যুদ্ধ জিইয়ে রাখতে গিয়ে পাকিস্তানকে যে পরিমাণ খরচ করতে হয়েছে, তাতে তাদের সামরিক ব্যয় জিডিপির (GDP) ৪ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের মতো একটি ভঙ্গুর আর্থ-সামাজিক অবস্থার দেশের জন্য এর চেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।

পাকিস্তানপন্থী সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত আগ্রাসন নীতি

পাকিস্তানপন্থার অন্যতম কুৎসিত রূপ ছিল সংখ্যাগুরু বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর আক্রমণ। ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে আমরাই ছিলাম পাকিস্তানের মূল চালিকাশক্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রায় ৫৪ থেকে ৫৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা ও লেখার মাধ্যম ছিল বাংলা। গণতান্ত্রিক ও গাণিতিক—উভয় নিয়মে যদি একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্ন আসত, তবে সেটি বাংলারই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উগ্র শাসকগোষ্ঠী তা না করে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা উর্দুকে পুরো দেশের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইল।

বাস্তবতায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা তো ছিলই, এর বাইরেও পাকিস্তানি এলিটরা মনে করত বাংলা হলো একটি “হিন্দুয়ানি ভাষা”। তাই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বাংলা ভাষা থেকে সংস্কৃত শব্দ ছেঁটে ফেলে আরবি-ফারসি শব্দ জোর করে ঢোকানোর চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি এক পর্যায়ে বাংলা হরফ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিয়ে উর্দুর মতো ‘নাস্তালিক’, আরবি কিংবা রোমান হরফে বাংলা লেখার একাধিক সরকারি প্রজেক্টও চালু করা হয়েছিল। আইয়ুব খানের আমলে রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে অমুসলিম সংস্কৃতি বলে তকমা দেওয়া হয়েছিল।

তবে পাকিস্তানপন্থার এই ভাষাগত আগ্রাসন কেবল বাঙালিদের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে তারা আক্ষরিক অর্থেই হত্যা করেছে। ১৯৫২ সালের দিকে পাকিস্তানের সামগ্রিক ভাষাভাষী জনসংখ্যার চিত্রটি যদি আমরা দেখি:

  • বাংলা: প্রায় ৫৪–৫৬%
  • পাঞ্জাবি: প্রায় ২৮–৩০%
  • সিন্ধি: প্রায় ৬–৭%
  • পশতু: প্রায় ৫–৬%
  • উর্দু (মাতৃভাষা): মাত্র ৩–৪%
  • অন্যান্য: প্রায় ২–৩%

এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে উর্দু কখনোই পাকিস্তানের জনগণের ভাষা ছিল না, তা ছিল কেবল শাসক গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া এক কৃত্রিম পরিচয়। নিজেদের তৈরি করা এই ‘উর্দুকেন্দ্রীক’ চাদর রক্ষা করতে গিয়ে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের বড় বড় আঞ্চলিক ভাষা—যেমন পাঞ্জাবি, সিন্ধি ও পশতু ভাষার স্বকীয়তা ও বিকাশকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়। পাঞ্জাবের বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষা হওয়া সত্ত্বেও পাঞ্জাবি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম বা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে কোনোদিন স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যার ফলে আজ পাকিস্তানের পাঞ্জাবিরা নিজেদের মাতৃভাষায় লিখতে বা পড়তে পারে না। সিন্ধি ভাষার সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ইতিহাস থাকার পরও সিন্ধি ভাষাভাষীদের ওপর উর্দুর আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সেখানে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার রূপ নেয়। খাইবার পাখতুনখোয়ার পশতু ভাষার ক্ষেত্রেও একই দমনমূলক নীতি ব্যবহার করা হয়েছে।

এই যে নিজের অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাকে অবজ্ঞা করা, আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা এবং একটি নির্দিষ্ট কৃত্রিম ভাষাকে ধর্মের দোহাই দিয়ে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা—এটাই হলো পাকিস্তানপন্থী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: নিজের মাতৃভাষার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রের প্রতিটি ভাষা ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক অধিকারকে শ্রদ্ধা জানানো, নিজস্ব সংস্কৃতির অবাধ চর্চা করা এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে সংস্কৃতির গলা টিপে না ধরা।

পাকিস্তানপন্থী ‘ভোটাধিকার হরণ’ ও অগণতান্ত্রিক নীতি

পাকিস্তান রাষ্ট্রটি জন্মলগ্ন থেকেই গণতন্ত্রকে চরম ভয় পেত। এর একমাত্র কারণ ছিল গাণিতিক বাস্তবতা—সুস্থ ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল থাকলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংখ্যাগুরু বাঙালিরাই বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে এবং কেন্দ্র শাসন করবে। এই বাঙালিভীতি থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রকে হত্যা করার একের পর এক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত শুরু করে। একটি স্বাধীন দেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর যেখানে দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়ন ও সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা, সেখানে তারা দীর্ঘ ৯ বছর (১৯৫৬ সাল পর্যন্ত) দেশের কোনো সংবিধানই তৈরি করতে দেয়নি, যাতে নির্বাচন এড়িয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা যায়।

শুধু তাই নয়, বাঙালিদের জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আইনগতভাবে খর্ব করতে তারা ১৯৫৫ সালে অত্যন্ত সুচতুরভাবে “ওয়ান ইউনিট” (এক ইউনিট) ব্যবস্থা চালু করে। এর মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের সবকটি প্রদেশকে এক করে পূর্ব পাকিস্তানের সমান আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়, যা ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ও জঘন্যতম অগণতান্ত্রিক জালিয়াতি।

ব্যালটের প্রতি তাদের এই তীব্র অনীহার প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে ১৯৫৪ সালে। পূর্ব বাংলার মানুষ যখন যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়ে ব্যালটের মাধ্যমে মুসলিম লীগকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল, তখন মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সেই নির্বাচিত সরকারকে সম্পূর্ণ অন্যায় ও অবৈধভাবে ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন জারি করা হলো। এরপর ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে জনগণের সরাসরি ভোটের অধিকার চিরতরে কেড়ে নেন। গণতন্ত্রকে উপহাস করতে তিনি ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা মৌলিক গণতন্ত্রের নামে ৮০ হাজার ইউনিয়ন কাউন্সিল মেম্বারদের দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এক অদ্ভুত প্রহসন চালু করলেন, যেখানে কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।

এরপর যখন আইয়ুব খানের পতন হলো, তখন আরেক সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (LFO)-এর মতো কিছু একতরফা আইনি শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়ে দেশে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাদের সমস্ত হিসাব নিকাশ উল্টে দিয়ে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে স্পষ্ট ও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর হাতে পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও, পাকিস্তানি রুলিং ক্লাস ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সিন্ডিকেট ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে বানচাল করতে নানা টালবাহানা শুরু করে। তারা অ্যাসেম্বলি বা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেয়। আর এই গণতান্ত্রিক রায়ের চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে পেলাম ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে—জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়ার বদলে তারা নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর কামান-ট্যাংক আর মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালাল।

এই যে সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে অস্বীকার করা, সংবিধান তৈরিতে বাধা দেওয়া, কৃত্রিম আইন বা ওয়ান ইউনিটের মাধ্যমে মানুষের প্রতিনিধিত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ব্যালটের জবাব বুলেট দিয়ে দেওয়া—এটাই হলো পাকিস্তানপন্থী অগণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার হরণ নীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হবে দেশের জনগণ; কোনো সামরিক জান্তা বা এলিট গোষ্ঠী নয়। জনগণের দেওয়া প্রতিটি ভোটের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা, জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রাখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই হলো স্বাধীনতার মূল দর্শন।

পাকিস্তানপন্থী বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি

একটা জাতিকে যদি আপনি চিরকালের জন্য পঙ্গু আর গোলাম বানিয়ে রাখতে চান, তবে তার সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো সেই জাতির শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ধ্বংস করে দেওয়া। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রথম থেকেই বাঙালিদের ওপর ঠিক এই ফর্মুলাটাই প্রয়োগ করতে চেয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় এবং কুখ্যাত প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ হলো ১৯৫৯ সালের ‘শরীফ শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্ট। এই কমিশনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল চরম বৈষম্য তৈরি করা। রিপোর্টে কোনো রকম লুকাছাপা না করে অত্যন্ত কড়া ভাষায় শিক্ষাকে সস্তা করার বিরোধিতা করা হয়েছিল। তাদের সাফ কথা ছিল—”শিক্ষা কোনো সস্তা জিনিস না যে চাইলেই সবাইকে বিলিয়ে দেওয়া যাবে; টাকা যার, শিক্ষা তার।” এই এক নীতি দিয়ে তারা আমাদের পূর্ব বাংলার গরিব আর মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই ১৯৬২ সালে এ দেশের ছাত্রসমাজ বুকের রক্ত দিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে, যা আমাদের ইতিহাসে ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলন’ নামে পরিচিত।

তবে পাকিস্তানপন্থী এই শিক্ষানীতির পেছনে উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্য বানানোই ছিল না, এর পেছনে লুকিয়ে ছিল আরও গভীর কিছু চক্রান্ত।

যেমন, তারা আমাদের ইতিহাস বিকৃত করে আমাদের মগজের ভেতর একটা মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিল। শরীফ কমিশনের পাঠ্যসূচি থেকে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি আর সংস্কৃতিকে এক ঝটকায় বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। তার বদলে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানি উগ্র জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের একপেশে পাঠ। পাঠ্যবই থেকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু প্রগতিশীল বাঙালি লেখক-সাহিত্যিকদের লেখা রাতারাতি মুছে ফেলা হয়। উদ্দেশ্যটা খুব পরিষ্কার ছিল—নতুন প্রজন্মের বাঙালিরা যাতে নিজেদের আসল পরিচয় ভুলে গিয়ে নিজেদের মনে মনে পাকিস্তানি গোলাম ভাবতে শুরু করে।

একই সাথে বাঙালিদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সঙ্কুচিত করে দেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কোর্স দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হলো, পাস করার নম্বরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো যাতে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা সহজে পাস করতে না পারে। এখানেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য জারি করা হলো ‘বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স’। এর মাধ্যমে উপাচার্যদের বানানো হলো স্বৈরাচারের হাতের পুতুল বা পাপেট। মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা আর প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির ওপর নেমে এলো কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

এর সাথে বাজেটের চরম আঞ্চলিক বৈষম্য তো ছিলই। শিক্ষা খাতের কেন্দ্রীয় বাজেটের সিংহভাগ টাকা ঢেলে দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানের আধুনিক সব স্কুল, ক্যাডেট কলেজ আর ল্যাবরেটরি বানানোর পেছনে। অথচ জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা মেজরিটি হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় নতুন একটা স্কুল বা কলেজ খোলার বাজেট পেতে পায়ের জুতো ক্ষয় হয়ে যেত। পূর্ব বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় ফান্ড আর অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত করে শুকিয়ে মারার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

এই যে শিক্ষাকে মুষ্টিমেয় ধনীর বিলাসের বস্তু বানানো, পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস বিকৃত করা, মুক্তবুদ্ধির গলায় ফাঁসি দেওয়া আর বাজেটে চরম বৈষম্য তৈরি করা—এটাই ছিল খাঁটি পাকিস্তানপন্থী বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের মূল দর্শনটাই ছিল পাকিস্তানপন্থার চাদরটা টেনে ছিঁড়ে ফেলা। স্বাধীনতার চেতনা আমাদের স্পষ্ট শিখিয়েছে—শিক্ষা কোনো বিক্রির পণ্য নয়, শিক্ষা হলো মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি বৈষম্যহীন, অবৈতনিক, বাধ্যতামূলক এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল একটা স্বাধীন দেশ সত্যিকারের উন্নত হতে পারে—এটাই হলো আমাদের শিক্ষাগত স্বাধীনতার মূল দর্শন।

পাকিস্তানপন্থী ‘ধর্ম ও ভারত-বিরোধিতা’কে হাতিয়ার করার নীতি

পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে চতুর এবং বিপজ্জনক কৌশল হলো ধর্ম আর এই “ভারত-বিরোধিতা”র জুজু। পাকিস্তানি রুলিং ক্লাসের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মূল ফর্মুলাই ছিল খুব সহজ—যেই তাদের অন্যায়, শোষণ কিংবা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে, তাকেই রাতারাতি হয় ‘ইসলামের শত্রু’ নয়তো ‘ভারতের দালাল’ বানিয়ে দাও। এই দুটো তকমা ব্যবহার করে তারা মূলত শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে তীব্র ঘৃণা তৈরি করত। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ওপর যেকোনো ধরণের অত্যাচার ও নির্যাতন চালালে সাধারণ মানুষ সেটাকে অন্যায় মনে না করে উল্টো একটা সামাজিক বৈধতা দেয়।

আমাদের ইতিহাসের পাতাগুলো একটু ওল্টালেই এই নীতির কুৎসিত রূপটি একদম পরিষ্কার হয়ে যায়।

যেমন ধরুন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সময় কী করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যখন পূর্ব বাংলার মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টকে বিপুল ভোটে জয়ী করল, তখন তাদের ঠেকাতে শাসক গোষ্ঠী অপপ্রচার শুরু করল যে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসা মানেই নাকি ইসলাম বিপন্ন হওয়া এবং ভারতের আধিপত্য কায়েম হওয়া। এমনকি ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির বাঁচার দাবি ‘ছয় দফা’ পেশ করলেন, তখন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান একে সরাসরি “ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত” এবং “ইসলামী রাষ্ট্র ভাঙার ষড়যন্ত্র” বলে সাধারণ মানুষের সামনে হাজির করেছিলেন।

এই রাজনীতির চূড়ান্ত ও সবচেয়ে নৃশংস রূপ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর, রাজাকারের দল এই ধর্ম আর ভারত-বিরোধিতাকে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রধান অস্ত্র বানিয়েছিল। তারা ফতোয়া দিয়েছিল যে বাঙালিরা নাকি প্রকৃত মুসলমানই নয়, তারা হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি পালন করে এবং ভারতের দালালি করে। এই ভয়ংকর বয়ান ছড়িয়ে দিয়েই তারা এ দেশে তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করার মতো জঘন্যতম অপরাধকে নিজেদের সমর্থকদের চোখে ‘জিহাদ’ হিসেবে জায়েজ করেছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে এ দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যার পেছনেও যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে এরা সবাই নাকি ‘ইসলামের শত্রু’ আর ‘ভারতের চর’।

শুধু যে আমাদের পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে তারা এই চাল চেলেছে, তা কিন্তু নয়। খোদ পশ্চিম পাকিস্তানেও যখনই কোনো গোষ্ঠী নিজেদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলেছে—সেটা বেলুচিস্তানের আদিবাসী হোক কিংবা সিন্ধুর প্রগতিশীল নেতারা—তাদের সবাইকে রাতারাতি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর পেইড এজেন্ট বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, চরম দুর্নীতি আর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ব্যর্থতা থেকে সাধারণ জনগণের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা।

এই যে নিজের ক্ষমতা আর লুটপাটকে টিকিয়ে রাখতে পবিত্র ধর্মকে বর্ম বানানো, যেকোনো যৌক্তিক ও প্রগতিশীল দাবিকে ভিনদেশের চক্রান্ত বলে চালিয়ে দেওয়া এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর রাষ্ট্রীয় জুলুমের সামাজিক সম্মতি তৈরি করা—এটাই হলো পাকিস্তানপন্থী ‘ধর্ম ও ভারত-বিরোধিতা’কে হাতিয়ার করার কুৎসিত নীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: স্বাধীনতার চেতনা আমাদের শেখায় কোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেম কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশ্নবিদ্ধ না করা। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো নাগরিকের অধিকার আছে সরকারের ভুল নীতির সমালোচনা করার, নিজের অধিকারের দাবি তোলার। ধর্মের পবিত্রতাকে রাজনৈতিক নোংরামিতে ব্যবহার না করে এবং কোনো কাল্পনিক জুজু না দেখিয়ে, যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা।

পাকিস্তানপন্থী ‘সব সংকটের সামরিক সমাধান’ বনাম বাংলাদেশের ‘রাজনৈতিক সমাধান’ নীতি

পাকিস্তানপন্থী রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম প্রধান একটা কুৎসিত বৈশিষ্ট্য হলো—যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা আঞ্চলিক অধিকারের দাবিকে বুলেটের জোরে ঠান্ডা করে দেওয়া। পাকিস্তান রাষ্ট্রটার জন্ম তো আসলে লড়াই-সংগ্রামের কোনো সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়নি, এর জন্ম আর বেড়ে ওঠাটাই হয়েছে আমলা আর মিলিটারির বুটের তলায়। ফলে যখনই পূর্ব বাংলা, বেলুচিস্তান, সিন্ধু কিংবা খাইবার পাখতুনখোয়ার মানুষ নিজেদের ন্যায্য অধিকার, স্বায়ত্তশাসন কিংবা নিজেদের খনিজ সম্পদের হিসেব চেয়েছে—পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই আলোচনার টেবিলে বসে তার কোনো রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার মানসিকতা দেখায়নি। তাদের কাছে প্রতিটি সংকটের একমাত্র এবং শেষ ওষুধ ছিল “বন্দুকের নল” আর “সামরিক অপারেশন”।

খোদ নিজের দেশের নাগরিকদেরই শত্রুপক্ষ মনে করে তাদের ওপর বারবার নিজেদের সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে সব প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়াই হলো পাকিস্তানপন্থার মূল ভিত্তি।

এর সবচেয়ে বড় আর দীর্ঘমেয়াদী নির্মমতার শিকার হলো বেলুচিস্তানের মানুষ। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই বেলুচ জনগণ তাদের নিজেদের মাটির খনিজ সম্পদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধিকার চেয়ে আসছে। কিন্তু পাকিস্তান ১৯৪৮ সাল থেকেই সেখানে আলোচনার বদলে একের পর এক রক্তাক্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে গেছে। ১৯৫৮, ১৯৭৩ আর ২০০৫ সালেও সেখানে বড় ধরনের মিলিটারি ক্র্যাকডাউন করা হয়। নবাব আকবর বুগতির মতো একজন বয়োবৃদ্ধ ও প্রবীণ বেলুচ নেতাকে আলোচনার টেবিলে না ডেকে, ২০০৬ সালে সামরিক বাহিনীর বোমায় ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। আজ পর্যন্ত বেলুচিস্তানে নির্বিচারে মানুষকে গুম করা আর ক্রসফায়ারে দেওয়ার মাধ্যমে এই বন্দুকের নীতিই জারি রাখা হয়েছে।

আমাদের নিজেদের ইতিহাসটার কথাই ধরুন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমরা বাঙালিরা যখন ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক রায় দিলাম, তখন সেই ম্যান্ডেটকে সম্মান জানানোর পরিবর্তে পাকিস্তানি রুলিং ক্লাস আলোচনার নামে শুধু নাটক আর সময়ক্ষেপণ করল। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে তারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ট্যাংক, কামান আর মেশিনগান নিয়ে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালির ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটা নিরেট রাজনৈতিক সংকটের সমাধান তারা করতে চাইল তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা আর কোটি কোটি মানুষকে ঘরছাড়া করার মাধ্যমে।

এমনকি আশির দশকে যখন জেনারেল জিয়ার সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সিন্ধুর মানুষ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য রাস্তায় নামল, তখনও তারা একই কাজ করল। সিন্ধুর গ্রামীণ জনপদগুলোতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক আর গানশিপ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে গুলি করে মারল এবং পুরো আন্দোলনকে বুলেটের জোরে স্তব্ধ করে দিল।

নিজের দেশের মানচিত্রের ভেতরেই নিজের নাগরিকদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া, ভিন্নমতাবলম্বীদের বিমান থেকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া আর রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সব সমাধান বন্দুকে খোঁজা—এটাই হলো কুখ্যাত পাকিস্তানপন্থী সামরিক দমন নীতি।

স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলাদেশের নীতি হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির মূল দর্শন হলো—যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক সংকটের সমাধান কখনো বন্দুকের নলে হতে পারে না, তা হতে হবে টেবিলে বসে মুখোমুখি “রাজনৈতিক আলোচনার” মাধ্যমে।

এর সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং বাস্তব উদাহরণ হলো ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’। পাহাড়ে যখন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটা সশস্ত্র সংঘাত চলছিল, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিন্তু পাকিস্তানের মতো সেখানে বিমান হামলা বা চিরুনি অভিযান চালিয়ে পুরো জনপদ ছারখার করে দেওয়ার অন্ধ নীতি নেয়নি। তৎকালীন সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বে রাষ্ট্র ‘টেবিল টক’ বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথ বেছে নেয় এবং কোনো তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা ছাড়াই এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নিজের ভূখণ্ডের সংকটকে বুলেটের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংলাপ, সমঝোতা এবং অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাধান করা—এটাই হলো আমাদের বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

পাকিস্তানপন্থী ‘পরাজীবী ও রাষ্ট্রগ্রাসী’ সামরিক নীতি

পাকিস্তানপন্থার সবচেয়ে বড় অভিশাপ আর চিরস্থায়ী দুর্যোগের নাম হলো তাদের কুখ্যাত সামরিক নীতি। পাকিস্তান আসলেই এমন একটা অদ্ভুত আর পঙ্গু রাষ্ট্র, যার সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ঠাট্টা করে বলেন—”দুনিয়ার সব দেশের একটা সেনাবাহিনী থাকে, আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটা আস্ত দেশ আছে!” এই পাকিস্তানপন্থী দর্শনে রাষ্ট্রের সবকিছুই আবর্তিত হয় মিলিটারির স্বার্থকে কেন্দ্র করে। তারা যে শুধু দেশের সিংহভাগ জাতীয় সম্পদ আর বাজেট একচেটিয়া গ্রাস করে বসে আছে তা-ই নয়; দেশের অর্থনীতি, বড় বড় ব্যবসা, আবাসন খাত, এমনকি সাধারণ মানুষের আটার মিল থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সেক্টর পর্যন্ত সবকিছু নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে। গবেষক আয়েশা সিদ্দিকার বিখ্যাত বই ‘Milbus’ পড়লে চোখ কপালে ওঠার দশা হয়। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আজ কোনো সাধারণ ডিফেন্স ফোর্স নয়, তারা আসলে সে দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক করপোরেট সাম্রাজ্য।

একটা পেশাদার সেনাবাহিনীর যেখানে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার কথা, সেখানে পাকিস্তানপন্থী সামরিক নীতি তাদের বানিয়েছে একচেটিয়া ব্যবসায়ী আর লুণ্ঠনকারী।

মিলিটারির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে সে দেশে ‘ফৌজি ফাউন্ডেশন’, ‘আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’, ‘বাহরিয়া ফাউন্ডেশন’ আর ‘শাহীন ফাউন্ডেশন’-এর মতো বিশাল সব ট্রাস্ট চলে, যার আন্ডারে প্রায় ৫০টিরও বেশি মেগা কোম্পানি রয়েছে। আসকারি ব্যাংক, ফৌজি সিমেন্ট, ফৌজি সার, দামি দামি রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট, চিনিকল, কর্নফ্লেক্সের ফ্যাক্টরি, এমনকি সাধারণ মানুষের রান্নার গ্যাসের এজেন্সির ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করে ইউনিফর্ম পরা জেনারেলরা। দেশের মোট জাতীয় সম্পদের একটা বিশাল অংশ সাধারণ জনগণের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে এই এলিট মিলিটারি গোষ্ঠী নিজেদের বিলাসবহুল জীবনের পেছনে ওড়ানোটাকে তাদের জন্মগত অধিকার মনে করে।

আরেকটু বাস্তব চিত্র দেখুন—যেখানে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ তীব্র মুদ্রাস্ফীতি আর চরম অর্থনৈতিক সংকটে আটা-চিনির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মারামারি করে, সেখানেও কিন্তু মিলিটারির পকেট কাটার সাহস কারও নেই। পাকিস্তানের সামরিক বাজেট দিন দিন আকাশচুম্বী করা হচ্ছে, যার কারণে শিক্ষা আর স্বাস্থ্য খাতের বাজেট সংকুচিত হতে হতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দেশের সাধারণ মানুষ না খেয়ে মরলেও মিলিটারির বিলাসের বাজেটে কোনো কাটছাঁট চলে না।

সবচেয়ে কুৎসিত দিক হলো, নিজেদের টিকে থাকার ডলারের জোগানের জন্য তাদের এই সেনাবাহিনী আবার বিদেশের ভাড়া খাটে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজপরিবারের সিকিউরিটি দিতে তারা নিয়মিত ‘ভাড়াটে সৈনিক’ হিসেবে কাজ করেছে। এর চেয়েও ভয়ংকর হলো, তারা নিজেদের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে (যেমন ভারত আর আফগানিস্তানে) ছায়াযুদ্ধ চালানোর জন্য লস্কর-ই-তৈয়বা বা হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি আর লালন-পালন করেছে। আমেরিকার কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফান্ড পাওয়ার লোভে তারা যে ডাবল গেম খেলেছে, তা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্যই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরই তৈরি করা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো আজ খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রকেই ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করছে।

একটা স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী যখন দেশের সীমান্ত রক্ষার বদলে নিজের দেশের মানুষের রক্ত চোষে, আটা-সিমেন্টের ব্যবসা করে ধনাঢ্য এলিট শ্রেণিতে পরিণত হয় এবং ডলারের লোভে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়—তার চেয়ে বড় জাতীয় আপদ আর স্থায়ী দুর্যোগ একটা জাতির জন্য আর কিছুই হতে পারে না।

স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলাদেশের নীতি হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের স্বাধীনতার চেতনা আমাদের খুব শক্তভাবে শিখিয়েছে—সেনাবাহিনী কখনো দেশের শাসক বা ব্যবসায়ী হতে পারে না। সেনাবাহিনী থাকবে সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক সরকারের অধীনস্থ এবং তাদের একমাত্র দায়িত্ব হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীকে ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি বা তারা বাজেট গ্রাস করে রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে না। রাষ্ট্র পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সা ব্যয় হয় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পেছনে; কোনো নির্দিষ্ট সামরিক এলিট গোষ্ঠীর পকেট ভরার জন্য নয়।

পাকিস্তানপন্থী ‘অখণ্ড বিচারহীনতা ও জবাবদিহিহীন’ শাসন নীতি

যেকোনো সভ্য দেশের টিকে থাকা আর এগিয়ে যাওয়ার মূল শর্তই হলো আইনের শাসন আর অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার। কিন্তু পাকিস্তানপন্থী রাষ্ট্রকাঠামোর গোড়াতেই একটা মস্ত বড় গলদ রয়ে গেছে, আর সেটা হলো এর “প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি”। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানে একটা অলিখিত নিয়ম চলে আসছে—আপনি যদি শক্তিশালী বা এলিট শ্রেণির কেউ হন, তবে আপনার অপরাধের কোনো বিচার এই জিন্দেগিতে হবে না।

এর চেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ আর কী হতে পারে যে, পাকিস্তানের ইতিহাসে চার-চারজন সামরিক স্বৈরশাসক—আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক আর পারভেজ মোশাররফ—দেশের সংবিধানকে বুটের তলায় পিষে একনায়কের মতো ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এদের কাউকেই কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। পারভেজ মোশাররফের নামে আদালতে নামমাত্র মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র তাকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার ব্যবস্থা করে দেয়।

শুধু তা-ই নয়, ১৯৭১ সালে আমাদের ওপর যে ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হলো, তার মূল কারিগর জেনারেল নিয়াজী বা টিক্কা খানের মতো কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা তো দূরের কথা, পাকিস্তান তাদের মরদেহে ফুল দিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করেছে। এমনকি খোদ পাকিস্তানের মাটিতে লিয়াকত আলী খান কিংবা বেনজীর ভুট্টোর মতো জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীদের যখন ভরদুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়, তখনও তাদের রাষ্ট্র আসল খুনিদের খুঁজে পায় না বা খোঁজার ইচ্ছাই দেখায় না। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা খুনিদের আড়াল করে রাখাই হলো পাকিস্তানপন্থার মূল চরিত্র।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কিন্তু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কালো আইন ভেঙে দীর্ঘ সময় পর হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করেছে। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। অপরাধী বা খুনিরা রাজনৈতিকভাবে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, এ দেশের মাটিতে তাদের বিচার হবেই—এই যে আইনি ও সামাজিক নিশ্চয়তা, এটাই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা। এই জবাবদিহিতা আর বিচারের সংস্কৃতিই একটা সমাজকে ভেতর থেকে সুশৃঙ্খল আর স্থিতিশীল রাখে, যা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে আজ পর্যন্ত তৈরিই হতে পারেনি।

 

পাকিস্তানপন্থী ‘ক্ষতিগ্রস্ত ও দেউলিয়া কর নীতি’ (Tax Evasion Culture)

যেকোনো স্বাধীন দেশের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হলো তার অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বা ট্যাক্স। কিন্তু পাকিস্তানপন্থী অর্থনৈতিক দর্শনের একটা বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে দেশের প্রভাবশালী সামন্ত প্রভু বা বড় বড় জমিদার, শিল্পপতি আর উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়াটাকে তাদের এক ধরণের অলিখিত জন্মগত অধিকার মনে করে।

এর চেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ আর কী হতে পারে—পাকিস্তানের জাতীয় আয়ের একটা বিশাল অংশ আসে কিন্তু তাদের কৃষি খাত থেকে। অথচ পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বা নীতি নির্ধারণে যারা বসে আছেন, তাদের সিংহভাগই হলেন বিশাল বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক বা কুখ্যাত সব ‘জমিদার’। তারা নিজেদের পকেট বাঁচাতে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের কৃষি আয়ের ওপর কোনো ধরণের কার্যকর ট্যাক্স বসাতে দেননি। ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ কোনোমতে আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স দেয়।

একটা দেশ চালাতে যে পরিমাণ নিজস্ব টাকা দরকার, তা না থাকায় পাকিস্তান দিন দিন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিভিন্ন বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে। চড়া সুদে ঋণ আর ভিক্ষা করতে করতে আজ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়েও পাকিস্তান বিশ্ব ইতিহাসে এক লজ্জাজনক রেকর্ড গড়েছে—তারা এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার, প্রায় ২৩ বার আইএমএফ-এর কাছে ঋণের জন্য আবেদন করা এক দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। নিজের দেশের সম্পদশালীদের আড়াল করে পুরো রাষ্ট্রকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দেওয়াই হলো পাকিস্তানপন্থী কর নীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ কিন্তু সামন্তবাদের সেই পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে নিজের রাজস্ব খাতকে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র-বৃহৎ ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দেয় বলেই আজ আমরা আমাদের মেগা প্রজেক্টগুলো—যেমন আমাদের গর্বের পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল—সম্পূর্ণ নিজেদের টাকায় তৈরি করতে পারছি। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তি বা সংস্থার কাছে ভিক্ষার বাটি নিয়ে প্রতিনিয়ত লাইন দেয় না, বরং নিজের উপার্জনে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। জনগণকে ফাঁকি না দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করে তোলাই হলো আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

 

পাকিস্তানপন্থী ‘বিদেশি শক্তির লেজুড়বৃত্তি ও সার্বভৌমত্ব বিক্রেতা’ নীতি

পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কখনোই নিজের আত্মপরিচয় বা ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারেনি। তাদের শাসকদের ক্ষমতার লোভ আর মিলিটারির স্বার্থ এতই তীব্র যে, তা সামলাতে তারা জন্মলগ্ন থেকেই কোনো না কোনো পরাশক্তির কাছে দেশের সার্বভৌমত্বকে বন্ধক রেখে এসেছে।

এর বাস্তব উদাহরণ দেখতে আমাদের খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় পাকিস্তান আমেরিকার স্বার্থে ‘ফ্রন্টলাইন স্টেট’ বা এক ধরণের অন্ধ অনুদাসের নীতি গ্রহণ করে। মার্কিনীদের খুশী করে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আর অনুদান ঠিকই পেয়েছিল, কিন্তু তার বিনিময়ে দেশের ভেতরে আমদানি করেছিল ধর্মীয় উগ্রবাদ, কালাশনিকভ সংস্কৃতি আর হিরোইনের এক কুৎসিত নেশা। মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আফগান যুদ্ধে জড়িয়ে তারা নিজেদের সাজানো গোছানো দেশটাকে একটা স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে ছেড়েছে। আর এখনকার সময়ে এসে তারা আমেরিকার হাত ছেড়ে পা দিয়েছে চীনের ‘ঋণের ফাঁদে’। চীনের তথাকথিত ‘সিপেক’ প্রজেক্টের চক্করে পড়ে পাকিস্তানের গ্বাদার বন্দরসহ তাদের বিশাল একটা অঞ্চল আজ কার্যত চীনের অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। নিজেদের সামান্য স্বার্থে পুরো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিদেশিদের কাছে বেচে দেওয়াই হলো পাকিস্তানপন্থী পররাষ্ট্রনীতি।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশের জন্য যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে গেছেন, তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—”সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।” বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির অন্ধ দাসত্ব বা লেজুড়বৃত্তি করার জন্য স্বাধীন হয়নি। কোনো দেশের সামরিক জোটে পা না দিয়ে, নিজেদের আত্মসম্মান বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে নিজের দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় করাই হলো আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করে নিজের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখাই হলো আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

 

পাকিস্তানপন্থী ‘প্রতিভা অবমূল্যায়ন ও মেধা পাচার’ নীতি (Brain Drain)

যেসব দেশ মেধার মূল্যায়ন করতে জানে না, তারা সামাজিকভাবে দেউলিয়া আর অন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। পাকিস্তানপন্থার মূল ট্র্যাজেডিই হলো—সেখানে মানুষের যোগ্যতা বা মেধার চেয়ে ‘পারিবারিক পরিচয়’, ‘সামরিক কানেকশন’ আর ‘ধর্মীয় অন্ধ আনুগত্য’কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। মেধার বদলে চাটুকারিতাকে লালন করাই এই ব্যবস্থার আসল রূপ।

এর চেয়ে বড় এবং লজ্জাজনক বাস্তব উদাহরণ আর কী হতে পারে—পাকিস্তানের একমাত্র নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ড. আবদুস সালামকে শুধুমাত্র তাঁর আহমদিয়া পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্র চরম অপমান করেছে, কাফের তকমা দিয়েছে এবং এক পর্যায়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। তাঁর মেধার কদর করা তো দূরের কথা, তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর কবরের ফলকে যেখানে লেখা হয়েছিল ‘প্রথম মুসলিম নোবেলজয়ী’, সেখান থেকে রাষ্ট্র আইনি নির্দেশ দিয়ে ‘মুসলিম’ শব্দটা পর্যন্ত মুছে ফেলেছিল! নিজের দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাকে এমন কুৎসিতভাবে অপমান করাই হলো পাকিস্তানপন্থা। দেশের ভেতরে এই উগ্রবাদ, চরম অসহিষ্ণুতা আর অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণে প্রতি বছর পাকিস্তানের লাখ লাখ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং আইটি বিশেষজ্ঞ দেশ ছেড়ে ইউরোপ-আমালিকায় পালিয়ে যাচ্ছেন। মেধা ধরে রাখার বা স্বাধীনভাবে কাজ করার ন্যূনতম কোনো পরিবেশই সেখানে নেই।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: মেধা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে একটা সমতার সমাজ গড়ে তোলাই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি মেধার মূল্যায়ন করতে জানে। আজ আমাদের তরুণদের স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আইনি ও আর্থিক সুবিধা এবং নিত্যনতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা ধরণের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা যাতে তাদের মেধাকে দেশের কাজেই ব্যবহার করার সুযোগ পায়, সেই দরজা আজ খুলে দেওয়া হয়েছে। মেধার অবমূল্যায়ন করে সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং প্রতিভাকে বিকশিত করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হলো আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

প্রতিটি বিষয়ে ধর্মকে টেনে আনা এবং রাষ্ট্রের গতিশীলতা নষ্ট করার নীতি

রাষ্ট্র আসলে কোনো আকাশ থেকে পড়া অলৌকিক জিনিস নয়; এটি হলো একটি সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অত্যন্ত ডাইনামিক বা গতিশীল একটি প্রতিষ্ঠান। সমাজ যত বদলায়, মানুষের চিন্তাভাবনা যত আধুনিক হয়, রাষ্ট্রের আইন, নীতি আর নিয়মকানুনকেও যুগের প্রয়োজনে ততটাই বদলাতে হয়। রাষ্ট্রকে কোনো একটা নির্দিষ্ট আদিম নিয়মের ফ্রেমে চিরকালের জন্য বেঁধে রাখা যায় না। বর্তমান যুগে এসে যখনই কোনো রাষ্ট্র তার প্রতিটি আধুনিক সিদ্ধান্ত, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনা বা অর্থনৈতিক পলিসির মাঝখানে শত শত বছরের পুরনো ধর্মীয় আইনকে টেনে এনে দাঁড় করায়, সেই দেশ কোনোভাবেই আর পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারে না।

কিন্তু পাকিস্তানপন্থার মূল ভিত্তিটাই হলো এই গতিশীলতাকে অস্বীকার করা। সেখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক—প্রতিটি বিষয়ে জোর করে ধর্মকে টেনে আনা হয়। সবচেয়ে কুৎসিত ব্যাপার হলো, ধর্মের এই ব্যবহার কিন্তু সাধারণ মানুষের কল্যাণে হয় না; উগ্র মোল্লা আর রুলিং ক্লাস নিজেদের ক্ষমতা ও লুটপাটকে টিকিয়ে রাখতে যখন যেভাবে সুবিধা, ধর্মের সেই রকম যাচ্ছেতাই ব্যাখ্যা দাঁড় করায়।

এর বাস্তব ফলাফল আজ আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কার। একটা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা কীভাবে চলবে, একটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বা ট্যাক্স পলিসি কেমন হবে—সেটা ঠিক হওয়ার কথা আধুনিক অর্থনীতি আর বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু পাকিস্তানে প্রতিটা জায়গায় ‘শরিয়া আইন’ বা ধর্মীয় বিধিনিষেধের জুজু তৈরি করে রাখা হয়েছে। ফলে না তারা পেরেছে একটা আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে, না পেরেছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যাংকিং বা বাণিজ্য ব্যবস্থা সচল রাখতে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার চেয়ে সেখানে প্রাধান্য পায় কোন বিষয়ে ফতোয়া জারি করা দরকার।

সংস্কৃতি বা সামাজিক আচরণের কথা তো বলাই বাহুল্য—বিনোদন, সিনেমা, নাটক থেকে শুরু করে মানুষের ব্যক্তিগত পোশাক-আশাকের স্বাধীনতা পর্যন্ত সবকিছুকে ধর্মের এক元ীয় চশমা দিয়ে মাপা হয়। রুলিং ক্লাস খুব ভালো করেই জানে, সাধারণ মানুষকে যদি অন্ধ আর হুজুগে বানিয়ে রাখা যায়, তবে নিজেদের দেউলিয়াত্ব আর চুরির হিসাব কোনোদিন দিতে হবে না। তাই তারা রাষ্ট্রের প্রতিটা সংকটে ব্যর্থ হলেই অবলীলায় এক টুকরো ধর্মের বর্ম সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

স্বাধীনতার চেতনা হলো এর ঠিক উল্টো: আমাদের স্বাধীনতার চেতনা আমাদের শিখিয়েছে—রাষ্ট্র চলবে নাগরিকের ইহজাগতিক কল্যাণ, যুক্তি, বিজ্ঞান আর আধুনিক আইনের ভিত্তিতে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা, রাষ্ট্র পরিচালনা করার ম্যানুয়াল বা গাইডবই নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তৈরিই হয়েছিল এই ডাইনামিক বা গতিশীল চিন্তাকে ধারণ করে। যুগের প্রয়োজনে আমাদের সংবিধানে পরিবর্তন এসেছে, নারীনীতি আধুনিক হয়েছে, কুসংস্কারের শেকল ভেঙে বিজ্ঞানের আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রকে ধর্মীয় বেড়াজালে আটকে রেখে স্থবির করে দেওয়া নয়, বরং একটি সেক্যুলার ও মুক্তচিন্তার সমাজ তৈরি করে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত প্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হলো আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনা।

 

শেষ কথা: চেতনা যখন বর্ম বনাম চেতনা যখন চালিকাশক্তি

খুব সাদামাটাভাবে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের একজন হয়ে আমি যেভাবে বিষয়টিকে বুঝি বা অনুধাবন করতে চাই, তা অত্যন্ত সহজ—আমার কাছে এই ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রটিই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাংলাদেশের সুখে সুখী হওয়া আর দেশের দুঃখে ব্যথিত হওয়াই এই চেতনার প্রথম শর্ত। পাকিস্তানের সেই কুৎসিত শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াইকে মনে-প্রাণে স্বীকার করা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের পৈশাচিক ভূমিকাকে আজীবন ঘৃণা করার নামই স্বাধীনতার চেতনা। এই সবুজের বুকে লাল সূর্যের পতাকাকে ভালোবেসে, এর মান-মর্যাদা বিশ্বের দরবারে সমুন্নত রাখার আমৃত্যু শপথের নামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

তাই যারা আজকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবার কী জিনিস?’ বলে ব্যঙ্গাত্মক কুতর্ক করেন, তারা আসলে প্রকারান্তরে একাত্তরের সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ও তাদের দোসরদের মনস্তাত্ত্বিক উত্তরসূরি। এই চেতনা বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিত বা অতি-শিক্ষিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; বইয়ের পাতা মুখস্থ করারও কিছু নেই। এই চেতনা মিশে থাকে মানুষের অস্থি-মজ্জায়, সৎ ও দেশপ্রেমিক রক্তের মাঝে। যে রক্ত কখনো নিজের জাতির সাথে বেইমানি করা শেখায় না, অন্যায়ের কাছে মাথা নত হতে দেয় না, দুর্নীতিবাজদের ক্ষমা করতে শেখায় না এবং দেশের প্রতিটি সাফল্যকে বাঁকা চোখে দেখে বিষোদ্গার করতে প্ররোচিত করে না। যে রক্ত কোনো দ্বিধা ছাড়াই রাজাকারকে ‘রাজাকার’ বলার সাহস জোগায়, সেটাই আসলে স্বাধীনতার চেতনা।

লড়াকু মানুষের স্বপ্ন ও আজকের রূঢ় বাস্তবতা

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যারা ভাষা, স্বাধিকার ও দেশকে মুক্ত করার জন্য জীবন দিয়েছিলেন, লড়াই করেছিলেন, তাদের সিংহভাগই ছিলেন এ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ চাকুরিজীবী। তাদের চোখে স্বপ্ন ছিল একটাই—একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও শোষণমুক্ত দেশ; যেখানে কাজের অভাব হবে না, খাদ্যের সংকট থাকবে না, সন্তানের সুশিক্ষার জন্য মা-بابাকে হাহাকার করতে হবে না। যেখানে থাকবে না কোনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ, থাকবে না কোনো ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। সেই সাধারণ লড়াকু মানুষদের স্বপ্নকে নিজের বুকে লালন করার নামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার করেও আজ আমাদের নিজেদের ভেতরের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হচ্ছে। একদল মানুষ স্বাধীন দেশের অন্ন ধ্বংস করেও এখনো মনে মনে পাকিস্তানের সেই ‘চাঁদ-তারা’ পতাকাকে লালন করে। তারা সচেতনভাবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে নিজেদের জন্মের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার সুগভীর চক্রান্তে লিপ্ত। “পুরোনো ইতিহাস ভুলে যাও, অতীতকে আঁকড়ে ধরে সামনে যাওয়া যায় না”—এমন সব চটকদার ও বিভ্রান্তিকর ডায়ালগ দিয়ে তারা আজ সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করে বেড়াচ্ছে। এটিই হলো সুপরিকল্পিত স্বাধীনতাবিরোধী এজেন্ডা।

লেখার শুরুতে যে কথাটি বলেছিলাম—আজকের বাংলাদেশে অনেকেই চাদরের মতো ‘স্বাধীনতার চেতনা’ গায়ে জড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু তাদের যাপিত জীবন ও চিন্তাভাবনা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে তারা আসলে ভেতরে ভেতরে অবিকল এক একজন ‘পাকিস্তানপন্থী’। ধর্মের নামে বিভেদ তৈরি করা, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চড়াও হওয়া, ক্ষমতার জোরে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের ‘আশরাফি লুণ্ঠন’ কায়েম করা—এসবই তো পাকিস্তানপন্থা!

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি তৈরিই হয়েছিল পাকিস্তানের এই প্রতিটি অন্যায়ের বিপরীত মেরু হিসেবে। তাই স্বাধীনতার চেতনা কোনো মুখের স্লোগান বা মুখস্থ ভাষণ নয়; এটি হলো পাকিস্তানপন্থার প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের যাপিত জীবনে এক একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আমরা যখন সিস্টেমের গলদগুলো চিনব এবং পাকিস্তানপন্থার এই প্রেতাত্মাদের চিহ্নিত করতে পারব, তখনই কেবল আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারব।

যখন আমরা দেখি, মসজিদের মিম্বর ব্যবহার করে ঘাতক-দালালদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া চাওয়া হয় অথচ স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাখা হয় সুচতুর আড়ালে; যখন দেখি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আঘাত করা হয় আর আমরা নাগরিক সমাজ নির্বিকার চিত্তে তা চেয়ে চেয়ে দেখি—তখন বুঝতে হবে আমরা ক্রমান্বয়ে চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি। ভুল ইতিহাস আর কুতর্কের ডালপালা ছড়িয়ে যখন এ দেশের জন্ম ইতিহাসকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলে, আর আমরা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলি “দেশে হচ্ছেটা কী?”—সেটি আসলে দেশের প্রতি এক ধরণের চরম অপরাধ।

কুতর্কের রাজনীতি ও পরিকল্পিত মেধাশূন্যতা

১৬ই ডিসেম্বর (বিজয় দিবস) আর ২৬শে মার্চ (স্বাধীনতা দিবস)—এই দুটি ঐতিহাসিক দিবস এর মাহাত্ম্য ও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ তথাকথিত একদল শিক্ষিত ও সচেতন মানুষও এই দুটি দিবসের গুরুত্ব নিয়ে কুতর্ক জুড়ে দেন। ২৬শে মার্চকে তারা একক ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন এই যুক্তিতে যে, অন্য দেশে তো একটিই জাতীয় দিবস থাকে! তারা ভুলে যান, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস কতটা রক্তক্ষয়ী এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে। এই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে একসময় হয়তো এই চক্রটি ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের গুরুত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা শুরু করবে।

একাত্তরের পুরো নয়টি মাস ধরে এ দেশে যেভাবে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল এই দেশটাকে চিরতরে মেধাশূন্য করে দেওয়া। আজকের সমাজে যে ভালো শিক্ষক, দূরদর্শী রাজনীতিক, সৎ সাংবাদিক বা কালজয়ী সাহিত্যিকের অভাব—তা কিন্তু সেই সুপরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডেরই সুদূরপ্রসারী ফল। এমনকি আমার দৃষ্টিতে, একজন দূরদর্শী কৃষকও একজন বুদ্ধিজীবী; কারণ তিনি তাঁর মেধা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মাটির বুক থেকে সোনার ফসল ফলিয়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। অথচ দুঃখের বিষয়, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে আমরা যতটা কাড়াকাড়ি করি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারী ও মূল পরিকল্পনাকারীদের সঠিক তালিকা প্রণয়নে আমরা ততটাই এলোমেলো। শত্রুপক্ষ এগোচ্ছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে, আর আমরা পিছিয়ে পড়ছি নিজেদের ভেতরের হিংসা, দ্বেষ আর খণ্ড-বিখণ্ড বিভক্তির কারণে।

মুক্তির উপায়: সম্মিলিত নাগরিক উদ্যোগ

ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার এই কুৎসিত অপরাজনীতি ও বিভ্রান্তিকে রুখে দিতে হলে কেবল সরকারের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সম্মিলিত নাগরিক উদ্যোগ। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি দিবস এর সঠিক তাৎপর্য ও দলিল নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং এই অবিকৃত ইতিহাসকে প্রতিটি প্রজন্মের মগজে ও মননে গেঁথে দিতে হবে।

১৯৭১ সালে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না, কোনো নেটওয়ার্কিং সুবিধা ছিল না। তা সত্ত্বেও কীভাবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার গোটা বাঙালি জাতি একই সমান্তরালে, একই চেতনার ডাকে ঘর ছেড়েছিল? কারণ, সেই ডাকটি ছিল সত্য, ন্যায় ও আত্মপরিচয়ের। আজ আমাদের আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ইতিহাসের সেই সত্য পাঠকে প্রতিটি নাগরিকের কাছে সহজলভ্য ও অবশ্যপাঠ্য করে তুলতে হবে। একজন সাধারণ কৃষক মুক্তিযোদ্ধার লড়াইয়ের গল্প থেকে শুরু করে ২৫শে মার্চের আগে ও পরের বুদ্ধিজীবী হত্যার সম্পূর্ণ খতিয়ান তুলে আনতে হবে নতুনদের সামনে।

ইতিহাস বিকৃতির এই দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্টকে ঠেকাতে হলে সচেতন, দেশপ্রেমিক নাগরিক ও রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক সম্মিলন প্রয়োজন। তবেই ছদ্মবেশী পাকিস্তানপন্থার চাদর ছিঁড়ে ফেলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ও শাশ্বত চেতনাকে রক্ষা করতে পারব।