বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের পটভূমিতে রচিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কালজয়ী সৃষ্টি হলো ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’। এই কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং সেই ‘অমর কবিতা’ শোনার জন্য অপেক্ষমাণ লাখো জনতার ব্যাকুলতা, উদ্দীপনা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির চিত্র অসামান্য কাব্যিক সুষমায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো |
| কবির নাম | নির্মলেন্দু গুণ |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | চাষাভুষার কাব্য |
| প্রকাশের বছর | ১৯৮১ |
| কবিতার ধরন | দেশপ্রেমমূলক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কবিতা (Patriotic, Historical and Political Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো – সম্পূর্ণ কবিতা
একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে কখন আসবে কবি?
এই শিশুপার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না
তাহলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তাহলে কেমন ছিল শিশু পার্কে বেঞ্চে বৃক্ষে ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?
জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত। তাই দেখি – কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ……।
হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশুপার্কের রঙ্গিন দোলনায় দোল খেতে খেতে – তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প
সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান- এসবের কিছুই ছিলনা,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সে দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল – দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে।
কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক।
হাতের মুঠোয় মৃত্যূ, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত – করুণ কেরাণী – নারী – বৃদ্ধ – বেশ্যা – ভবঘুরে
আর তোমাদের মতো শিশু – পাতা কুড়ানীরা দল বেঁধে।
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের : কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে – জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুন ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূয্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ইতিহাসের বিকৃতি রোধ ও আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা:
“জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত / কালো হাত। … আমি তোমাদের কথা ভেবে / লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।”— ১৯৭৫ সালের পর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি যখন ৭ই মার্চের প্রকৃত ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছিল, তখন কবি আগামী প্রজন্মের অনাগত শিশুদের জন্য সেই মহান বিকেলের সত্য ইতিহাস পরম মমতায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
- গণমানুষের জাগরণ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা:
“কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে / এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক … আর তোমাদের মতো শিশু পাতা-কুড়ানিরা দল বেঁধে।”— ৭ই মার্চের জনসমুদ্রে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ নয়; বরং কৃষক, শ্রমিক, কেরানি, নারী, ভবঘুরে থেকে শুরু করে পাতা-কুড়ানি শিশুরাও স্বাধীনতার স্বপ্ন চোখে নিয়ে ছুটে এসেছিল। এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির স্বতঃস্ফূর্ত এক মহা-জাগরণ।
- রাজনীতির মহাকবি ও তাঁর অমর কবিতা:
“গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি: / ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, / এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'”— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এখানে একজন ‘কবি’ এবং তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে একটি ‘অমর কবিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেই বজ্রকণ্ঠের ঘোষণার মাধ্যমেই মূলত ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বাঙালির প্রাণের ও অধিকারের শব্দে পরিণত হয়।
উৎস
স্বাধীনতা শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো – কবিতার প্রেক্ষাপট
এ বিষয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন – ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি মঞ্চের সামনে থেকে শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি একটি পত্রিকার জন্য রিপোর্ট লিখতে সেখানে গিয়েছিলাম। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ইতিহাসবিকৃত হওয়া শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাকে এমনভাবে নিয়ে আসা হয়, যেন জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন! তখন আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য কবিতাটি লেখার তাগিদ অনুভব করি।
আসলে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল একটি কবিতা। এই ভাষণটি কাব্যসমৃদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সাপ্তাহিক ‘টাইমস’ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ‘পয়েট অব পলিটিকস’ শিরোনামে একটি প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল। এমনকি মার্কিনরাও এই ভাষণ স্টাডি করে তার মধ্যে কবিতার সন্ধান পেয়েছিল। ভাষণটি স্বয়ং একটি কবিতা হওয়ায় তা নিয়ে কবিরা খুব বেশি কোনো কবিতা লেখেননি। এই ভাষণে ১০৩টি লাইন আছে। ১৯ মিনিট দৈর্ঘ্য। ভাষণটি তিনি এমন চমৎকারভাবে দিয়েছিলেন, প্রথমেই ‘ভায়েরা আমার’ বলে যে সম্বোধন করলেন, মনে হলো, যেন হাজার বছরের বাঙালির যে ভালোবাসার তৃষ্ণা এবং যে প্রত্যয় নির্ভরতা, যার স্বপ্ন দেখেছে সে, সেই নেতা এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছেন। ১০ লাখ লোক একসঙ্গে লাফিয়ে উঠছিল। সব মানুষ যেন আনন্দে উত্তেজনায় একাকার। তাদের নেতার উপস্থিতিতে নিজেদের শক্তির প্রদর্শন করছিল তারা। এটি একটি অবিস্মরণীয় ভাষণ।


