স্বাধীন বাংলাদেশ – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

স্বাধীন বাংলাদেশ – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : অনেক দিন ধরেই আমরা বাংলাদেশের স্বায়ত্বশাসন দাবি করে আসছি। কিন্তু আমাদের কোন কথাতেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা কান দেওয়া প্রয়োজন মনে করেননি। চিরকাল চেষ্টা করেছে আমাদের দাবিয়ে রাখতে। ফলে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকে শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানআজ সমৃদ্ধ, আর আমরা ভিখারী।

গত নির্বাচনে আমরা দল প্রাদেশিক আইন সভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাখ করেছে। জাতীয় পরিষদেও আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই সিদ্ধান্তকে পশ্চিম পাকিস্তানী জঙ্গি শাষকরা কোন যুক্তির দ্বারা নয়, কেবল মাত্র গায়ের জোড়ে পাল্টে দেবার চেষ্টা করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে সাড়ে সাত কোটি মানুষের উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য আমি আমার ন্যায্য অধিকার বলে এই মহান দেশের শাসনভার নিজের হাতে গ্রহণ করলাম।

বাংলাদেশের শাসনভার আমার স্বহস্তে গ্রহণ করার অর্থ বাংলাদেশের মুক্তি। আমি মনে করি, ইসলামাবাদ সরকারের এই অবস্থা মেনে নেওয়া উচিৎ। নির্বানের পরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়।

আমি সারাবিশ্বের স্বাধীনতা প্রেমিকদের কাছে এবং স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করেছেন, বিশ্বের সেই সকল মানুষের সমর্থন কামনা করছি। যারা ষড়যন্ত্র করে শক্তির দ্বারা আমাদের শাসন করতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের জনগণ নঙ্ঘবদ্ধভাবে দৃঢ়কার সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়ে কিভাবে স্বাধীনতা রক্ষা হয় তার প্রমান রেখেছেন। বাংলাদেশের মানুষের এই স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে কিছুতেই দমন করা যাবে না।

আমাদের পদানত করা যাবে না; কারণ, প্রয়োজন হলে আমরা মরণকে বরণ করতে প্রস্তুত। কারণ আমরা নিশ্চিত হতে চাই যে আমাদের বংশধররা মর্যাদার সঙ্গে এক স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক জীবন যাপন করতে পারবে।

বাংলাদেশের প্রতিটি নর-নারী ও শিশু উন্নত শিরে দাঁড়াতে পারছেন। যাঁরা ভেবেছিলেন চরম শক্তি প্রয়োগের দ্বারা আমাদের দাবিয়ে রাখা যাবে, তারা ভুল করেছেন। আজ বাংলাদেশের সকল স্তরের মানুষ-অফিসের কর্মী, কারখানার শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, সবাই নির্দ্বিধায় এটা প্রমান করেছেন যে, আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তারা মৃত্যুবরণে প্রস্তুত।

আজ সমগ্র দেশবাসী তাঁদের নঙ্কল্পে ঐক্যবদ্ধ; তাঁরা জানাচ্ছেন, সামরিক শাসনের কাছে তারা নতি স্বীকার করবেন না। অতএব আমি সকলের কাছে আবেদন জানাই, বিশেষ করে যাদের কাছে সর্বশেষ সামরিক হুকুম জারি করা হয়েছে, তারা যেন ভীতি প্রদর্শনের কাছে নত না হন। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ তাঁদের পেছনে রয়েছে। আমি বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের সকল কাজকর্মে সুষ্টভাবে সমাধানের উদ্দেশ্যে পঁয়ত্রিশটি নির্দেশনামা জারি করছি। প্রত্যেককে এই নির্দেশগুলো মেনে চলতে হবে। কেউ একে অমান্য করতে পারবে না; করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

এ দেশের আইনসঙ্গত শাসনকর্তা হিসেবে আমি নির্দেশ দিচ্ছি:

* সারা বাংলাদেশের সেক্রেটারিয়েট, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের অফিস, স্বয়ংশাসিত সংস্থা সমূহ, প্রধান বিচারালয় ও অন্যান্য বিচারালয় এখনকার মতই ধর্মঘট চলবে।

* বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধু থাকবে।

* ডেপুটি কমিশনার ও সাব ডিভিশনাল অফিসাররা কোন অফিস না খুলেই আইন শৃংখলা রক্ষার এবং এইসব নির্দেশ পালন করার জন্য যে সব উন্নয়ন মূলক কাজকর্মের প্রয়োজন সেসব সমেত অন্যান্য কর্তব্য সম্পন্ন করবেন।

* কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগ সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ করবেন।

* পুলিশ আইন-শৃংখলা রক্ষার কর্তব্য সম্পাদন করবেন। যদি প্রয়োজন হয় তবে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য গ্রহণ করবেন।

* জেল রক্ষী ও জেলের অফিসাররা সক্রিয় থাকবেন।

* আনসাররা তাদের কর্তব্য করে যাবেন।

* পোর্ট কর্তৃপক্ষ সর্বদা সক্রিয় থাকবেন, যাতে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকে। তবে পোর্ট কর্তৃপক্ষের কেবলমাত্র সেই শ্রেণীর অফিসাররা কাজ করবেন, সুষ্ঠভাবে জাহাজ চলাচলে যাদের প্রয়োজন। শুধু জনগণকে দমনের জন্য ব্যবহার্য সৈন্যদল ও অস্ত্রশস্ত্র সমবেত করার জন্য কোন সহযোগিতা করা হবে না। সমস্ত জাহাজ বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্য বহণকারী জাহাজ থাকে মাল খালাস যাতে তাড়াতাড়ি হয় সেই চেষ্টা পুরোদমে করতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের প্রাপ্য এবং জাহাজের বন্দর, প্রবেশের জন্য দেয় অর্থ আদায় করবেন।

* বন্দরে প্রবেশকারী সমস্ত জাহাজ থেকে দ্রুত মাল খালাস করতে হবে। শুল্ক বিভাগের প্রয়োজনীয় শাখা এই ব্যাপারে কাজ করবে, মাল খালাসের অনুমতি দেবে। তার আগে যে পরিমান শুল্ক ধার্য হবে, সেটা ইষ্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশন অথবা ইষ্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডে একটি বিশেষ একাউন্ট খুলে জমা দিতে হবে। এই একাউন্ট আওয়ামী লীগের নির্দেশ অনুযায়ী শুল্ক বিভাগের কাউন্টার অপারেট করবেন। এই আদায়কৃত অর্থ কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে জমা করা হবে না।

* রেলওয়ে সক্রিয় থাকবে; কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের শুধুমাত্র সেই অফিস যা রেল চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তাই খোলা থাকবে। জনগণকে দমনের জন্য সৈন্যবাহিনী বা আনসার আনার ব্যাপারে কোন সহযোগিতা করা হবে না। বন্দর থেকে দেশের মধ্যে খাদ্যশস্য চলারলের জন্য রেলওয়ের ওয়াগন সরবরাহকে সবচেয়ে জরুরী বলে গণ্য করতে হবে।

* অর্ন্তদেশীয় নদী কেন্দ্রীক বন্দর সুষ্ঠুরূপে চালু রাখার জন্য ই পি এস সি এবং অন্তর্দেশীয় নদী পরিবহন এবং টি ডব্লিউটি এর প্রয়োজনীয় স্বল্প সংখ্যক কর্মচারী কাজ করবেন, কিন্তু জনগণের দমনের উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনী ও অস্ত্র শস্ত্র সংগ্রহে কোন সহযোগিতা করা যাবে না।

* শুধু বাংলাদেশের চিঠিপত্র, টেলিগ্রাম ও মনি অর্ডার বিলি করার জন্য ডাক ও তার বিভাগে কাজ করবে। বিদেশী মেল সার্ভিস এবং সর্বশ্রেণীর বিদেশী টেলিগ্রাম সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে সরাসরি পাঠানো যেতে পারে। ইন্টার উইং টেলিপ্রিন্টার চ্যানেল তিনটে থেকে চারটে পর্যন্ত অর্থাৎ এক ঘন্টার জন্য খোলা থাকবে, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, ও বৃহস্পতিবার শুধুমাত্র পঁচিশ নং নির্দেশ অনুযায়ি বিভিন্ন বার্তা যাতে ব্যাঙ্কগুলি টেলিপ্রিন্টারে পাঠাতে ও গ্রহণ করতে পারবে।

* কেবলমাত্র স্থানীয় ও বাংলাদেশের আন্তজেলা ট্রাঙ্ক টেলিফোন চালু থাকবে। মেরামতি ও টেলিফোন কার্যকরি রাখার প্রয়োজনীয় বিভাগ কাজ করবে।

* রেডিও টেলিভিশন ও সংবাদ পত্র চালু থাকবে এবং জনগণের আন্দোলন সম্পর্কে যাবতীয় বিবৃতি ও সংবাদের সম্পূর্ণ বিবরণ দিবে। অন্যথায় যাঁরা এইসব জায়গায় কাজ করেন, তাঁরা সহযোগিতা করবেন না।

* সমস্ত হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্বাস্থ্য আবর্জনা পরিস্কার সংক্রান্ত কাজ; জেল হাসপাতাল টি বি ক্লিনিক ও কলেরা রিসার্স ইন্সটিটিউট চালু থাকবে। মেডিকেল ষ্টোর চালু থাকবে এবং সমস্ত হাসপাতালে মফস্বল শহরের হাসপাতালে, গ্রামের হাসপাতালে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঔষধ ও প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ বজায় রাখতে হবে।

* ই পি ডবুলু-ডি এর সেইসব বিভাগ চালু থাকবে, যা মেরামতি ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষনের কাজ সমেত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দরকার।

* গ্যাস ও জল সরবরাহের কাজ চালু থাকবে এবং এই সম্পর্কিত মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।

* ইটখোলার জন্য ও অন্যান্য প্রয়োজনে কয়লা সরবরাহ করা হবে।

* সর্বাপেক্ষা জরুরী ভিত্তিতে খাদ্যশস্য আমদানী, সরবরাহ, গুদামজাত করা ও চলাচল অব্যাহতত থাকবে। এই কাজের জন্য ওয়াগণ, বজরা, ট্রাক প্রভৃতি সমেত পরিবহনের সমস্ত সুযোগ সর্বাপেক্ষা জরুরী ভিত্তিতে করতে হবে।

* বিদ্যুৎ চালিত পাম্প ও অন্যান্য কারিগরি যন্ত্র ও জিনিসের চলাচল, বিতরণ, মাঠে বসানের ও চালানো, তৎসহ তৈল, জ্বালানী, টুলস ও প্লান্টসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যবস্থা চালু থাকবে।

* পূর্ব পাকিস্তানকো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক, সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য অনুমোদিত কেন্দ্র, থানা, কন্ট্রোল কো-অপারেটিভ অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য সমবায় প্রতিষ্ঠান চালু থাকবে।

* এখানে উল্লেখিত উদ্দেশ্যে ই-পি-এ-ডি-সির প্রয়োজনীয় বিভাগ চালু থাকতে পারে।

* এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য ব্যাঙ্ক বন্যাকবলিত এলাকায় সুদ ছাড়া টাকা এবং কৃষকদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ঋণ দেবে।

* আলু কিনে গুদামজাত করার জন্য এ-ডি-বি-পি দ্রুত টাকার ব্যবস্থা করবে।

* ই-পি-ডবলু, এ-পি-ডি-এ এবং অন্যান্য সংস্থার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নগর রক্ষার কাজকে বিস্তৃত করা, তৎসহ কারিগরি যন্ত্র এবং ড্রেজার চালানো ও মেরামত, মালপত্র খালাস ও চলাচল, সম্পর্কীত জরুরী কাজ অতি দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারী সংস্থা অথবা সংশ্লষ্টি স্বয়ং শাসিত সংস্থাই পূর্বের মতো কন্ট্রাকটরদের টাকা দিবে।

* সরকারী স্বয়ংশাসিত সংস্থা ও আধা-সরকারী সংস্থা সমূহের অধীনস্ত সমস্ত উন্নয়ন ও নির্মানকার্য এবং তৎসহ বিদেশী সাহায্যে রাস্তা ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ অতি দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারী সংস্থা অথবা স্বয়ং শাসিত সংস্থাই পূর্বের মতো কন্ট্রাকটরদের টাকা দিবে। এরাই চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বাড়ি তৈরীর ও অন্যান্য মালপত্র সরবরাহ সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিবে।

* বেসরকারী বাণিজ্য ও শিল্প সংস্থাগুলি পূর্বেও মতই স্বাভাবিকভাবে কাজ কর্ম চালিয়ে যাবে।

* রিক্সা, বাস, ট্যাক্সি, বেবী ট্যাক্সি প্রভৃতি চালু রাখতে হবে।

* ব্যাঙ্কসমূহ প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে খোলা থাকবে। তবে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও যাতে পাচার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

* লবন কর আদায় চলবে না।

* শ্রমিকরা কাজে যোগদান করবেন না। তবে ত্রিশ তারিখে গিয়ে বেতন নিয়ে আসবে।

* প্রত্যেক ভবন শীর্ষে কালো পতাকা উড়াতে হবে।

 

সংগ্রহ-মুজিবুরের রচনা সংগ্রহ পৃষ্ঠা ১৩১

মন্তব্য করুন