হামদ্ গীত : স্রষ্টার মহিমা ও প্রশংসার সুর | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ইসলামি সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের এক অতি পরিচিত এবং আধ্যাত্মিক শাখার নাম ‘হামদ্’। আরবি শব্দ ‘হামদ্’ (حَمْد) এর আভিধানিক অর্থ হলো প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা গুণকীর্তন। যখন কোনো সঙ্গীত বা কবিতায় কেবলমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার মহিমা, তাঁর অসীম ক্ষমতা এবং দয়ার গুণকীর্তন করা হয়, তখন তাকে হামদ্ বলা হয়। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং মুমিনের হৃদয়ে ইবাদতের এক গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

হামদ্ গীত : স্রষ্টার মহিমা ও প্রশংসার সুর

হামদ্-এর ইতিহাস ও উৎপত্তি

হামদ্-এর মূল প্রোথিত রয়েছে পবিত্র কুরআনের প্রথম সূরায়, যেখানে আল্লাহ নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) শব্দবন্ধ দিয়ে। ঐতিহাসিকভাবে এর বিস্তার অত্যন্ত প্রাচীন:

প্রাথমিক যুগ:

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে সাহাবিরা বিভিন্ন কবিতার ছন্দে আল্লাহর প্রশংসা করতেন। যদিও তখন বর্তমানের মতো বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিল না, কিন্তু ছান্দসিক আবৃত্তি বা ‘নাশীদ’-এর ধারা বিদ্যমান ছিল।

ফারসি ও সুফি সাহিত্য:

মধ্যযুগে ফারসি সাহিত্যে হামদ্-এর এক বিশাল বিপ্লব ঘটে। শেখ সাদী, মাওলানা রুমি এবং হাফিজের মতো বিশ্বখ্যাত কবিরা তাঁদের কাব্যগ্রন্থের সূচনা করতেন আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে। সুফি সাধকদের হাত ধরে এটি একটি আধ্যাত্মিক গীতধারা হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়।

বাংলা সাহিত্যে হামদ্:

বাংলা ভাষায় হামদ্-এর চর্চায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর রচিত হামদ্গুলো (যেমন: “আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি কারো ভয়”) আজও বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে আছে। নজরুল ছাড়াও গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ এবং মতিউর রহমান মল্লিক এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

হামদ্ ও গজলের পার্থক্য: একটি জরুরি ব্যাখ্যা

বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে একটি সাধারণ ভ্রান্তি আছে যে, তারা যে কোনো ইসলামি সঙ্গীতকেই ‘গজল’ বলে অভিহিত করেন। প্রকৃতপক্ষে, হামদ্ গজলের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে, তবে সব গজল হামদ্ নয়।

গজল হলো একটি ‘কাঠামো’ (Form):

গজল মূলত একটি কাব্যিক আঙ্গিক। একটি নির্দিষ্ট ছন্দে যখন ৫ থেকে ১৫টি স্বাধীন দ্বিপদী বা শের লেখা হয়, তখন তাকে গজল বলে। এই কাঠামোতে কবি যেমন স্রষ্টার কথা লিখতে পারেন, তেমনি পার্থিব প্রেম বা বিরহের কথাও লিখতে পারেন। গজল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন “গজল সম্পর্কে বিস্তারিত“।

হামদ্ হলো একটি ‘বিষয়বস্তু’ (Content):

বিষয়বস্তু যখনই কেবলমাত্র আল্লাহর প্রশংসা হয়, তখনই তাকে হামদ্ বলা হয়। কবি যখন গজলের কাঠামোতে আল্লাহর প্রশংসা লেখেন, তখন তাকে বলা হয় ‘হামদিয়া গজল’। কিন্তু গজলের বিষয়বস্তু যদি হয় পার্থিব প্রেম বা প্রিয়তমার রূপের বর্ণনা, তবে তা গজল ঠিকই থাকবে, কিন্তু হামদ্ হবে না।

সহজ কথায়, গজল হলো একটি পাত্র, আর হামদ্ হলো সেই পাত্রের ভেতরের মধু। আপনি যদি সেই পাত্রে মধু (আল্লাহর প্রশংসা) রাখেন, তবে তা হামদ্। কিন্তু সেই পাত্রে যদি অন্য কিছু (পার্থিব প্রেম) রাখেন, তবে তা গজলই থাকবে কিন্তু হামদ্ হবে না।

হামদ্-এর বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব

১. একত্ববাদ: হামদ্-এর প্রধান লক্ষ্য হলো আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ) প্রকাশ করা।

২. বিনয় ও সমর্পণ: এই গানে দাসের পক্ষ থেকে প্রভুর কাছে ক্ষমা ও দয়া ভিক্ষার আকুতি থাকে।

৩. শিল্পশৈলী: হামদ্ সাধারণত ধীর লয়ের এবং গুরুগম্ভীর হয়। এটি গাওয়ার সময় আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য বজায় রাখতে হয়।

৪. পার্থক্য: হামদ্ কেবলমাত্র আল্লাহর প্রশংসার জন্য, আর রাসূল (সা)-এর প্রশংসাসূচক গানকে বলা হয় ‘নাত’

হামদ্ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য উৎস। এটি একজন মানুষকে তাঁর স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত করে এবং আত্মিক পরিশুদ্ধিতে সহায়তা করে। আধুনিক যুগেও বিভিন্ন ভাষায় হামদ্-এর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে স্রষ্টার প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার আকুতি চিরন্তন।

হামদ্ রচনার ইতিহাস অনেক প্রাচীন এবং এটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি শাখা। যুগে যুগে অনেক কালজয়ী কবি ও সাধক আল্লাহর প্রশংসায় নিজেদের কলম ধরেছেন। নিচে কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত হামদ্ রচয়িতা এবং তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ রচনার তালিকা দেওয়া হলো:

১. শেখ সাদী (রহ.)

পারস্যের বিশ্ববিখ্যাত কবি শেখ সাদী তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ ‘গুলিস্তাঁ’ এবং ‘বুস্তাঁ’-র শুরুতে অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের হামদ্ রচনা করেছেন।

বিখ্যাত রচনা: “বনামে পরওয়ারদেগারে আলম…”

উদ্ধৃতি: > “কারীমা ব-বখশায় বর হালে মা,

কে হস্তম আসীরে কমন্দে হাওয়া।”

(হে করুণাময়, আমাদের অবস্থার ওপর দয়া করো; কারণ আমরা আমাদের প্রবৃত্তির জালে বন্দী।)

২. মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.)

মরমী কবি রুমির ‘মসনবী শরীফ’-এর পরতে পরতে আল্লাহর মহিমা ও তাঁর প্রতি গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বিখ্যাত রচনা: মসনবী শরীফের সূচনা সঙ্গীত।

ভাবার্থ: তিনি স্রষ্টাকে বাঁশির সেই মূল সুরের সাথে তুলনা করেছেন যা তার আসল উৎস (আল্লাহ) থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে বিলাপ করছে।

৩. আল্লামা ইকবাল

উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ইকবাল তাঁর কবিতায় আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরতের অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন।

বিখ্যাত রচনা: ‘শিকওয়া’ (Shikwa)‘জওয়াব-এ-শিকওয়া’-র শুরুতে আল্লাহর দরবারে আরজি।

৪. কাজী নজরুল ইসলাম (বাংলা)

বাংলা সাহিত্যে হামদ্-এর প্রকৃত জোয়ার এনেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ইসলামি সঙ্গীতের যে বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করেছেন তার বড় অংশই হামদ্।

বিখ্যাত রচনা:

“আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি কারো ভয়”

“তোমারে চিনি না মোরা, তোমারেই চিনি না”

আরও দেখুন: