হাসনাত আবদুল হাই প্রসঙ্গে: বুদ্ধিজীবী বনাম তীব্র ঘৃণার রাজনীতি । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

একটি জাতির মগজ ধোলাই করে তাকে পঙ্গু করে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার ইতিহাস বিকৃতি আর বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ডটা ভেঙে দেওয়া। যুগে যুগে এই কাজটিই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করে এসেছে একদল মুখোশধারী ছদ্মবেশী সুশীল। এদের চেনা রূপটা যেমন ভয়ঙ্কর, এদের কলমের বিষাক্ত ছোবলও তেমনি নির্মম। সম্প্রতি হাসনাত আবদুল হাই-এর একটি লেখায় ইতিহাসের তেমনি এক নগ্ন ও বিকৃত রূপ দেখে একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজের ক্ষোভ আর আত্মমর্যাদাবোধ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বুদ্ধিজীবী শব্দের যে পবিত্র রূপ আমাদের হৃদয়ে চেনা, তার বিপরীতে এদের মতো সুবিধাবাদীদের সুবিধাবাদী চরিত্র যে কতটা নোংরা হতে পারে, তা নিয়েই আমার এই ক্ষোভ, ঘৃণা আর প্রতিবাদের অবাধ্য প্রতিক্রিয়া।

হাসনাত আবদুল হাই প্রসঙ্গে: বুদ্ধিজীবী বনাম তীব্র ঘৃণার রাজনীতি

১. স্বজন হারানোর বেদনা বনাম এক তীব্র ঘৃণা

‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটা যখনই আমার কানে আসে, তখনই সবার আগে মায়াবী এক শ্রদ্ধায় মাথায় ভেসে ওঠে ১৪ই ডিসেম্বরের সেই কালো দিনটি। আমরা বাঙালিরা সেদিন যে কতটা অভিভাবকহীন হয়েছিলাম, কী পরিমাণ স্বজন আর দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হারিয়েছিলাম—সেই বেদনা আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি। তাই আজকেও যখন আমি কোনো সত্যিকারের বুদ্ধিজীবীর মুখের দিকে তাকাই, আমার সেই দেখার দৃষ্টিটা কিন্তু সাধারণ কোনো মানুষের মতো থাকে না; তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ নেয়।

সেখানে মায়ের দিকে তাকানোর মতো এক অকুণ্ঠ ভালোবাসা থাকে, নিজের সন্তানের দিকে তাকানোর মতো এক অদ্ভুত স্নেহ থাকে, আর আমার দাদুর দিকে যেভাবে তাকাতাম—ঠিক তেমনি এক অতল শ্রদ্ধা লুকিয়ে থাকে। আমার সবসময় মনে হয়, আমার স্ত্রী, সন্তান আর ভাই-বোনের মতোই এই দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আমাদের পরম স্বজন। তাঁদের সংস্পর্শে এলে আমি আত্মিক সুখ পাই, এক ধরণের নিরাপত্তা অনুভব করি। তাঁদের লেখা বই বা কলামগুলো আমি একজন প্রেমিকের চিঠির মতোই গভীর আবেগ নিয়ে লাইনের পর লাইন পড়ি। তাই তাঁদেরকে যখন সুবিধাবাদী কোনো চক্র গালি দেয়, তখন নিজের কোনো আপন মানুষের নামে কুৎসা শোনার মতোই বুকে তীব্র আঘাত পাই। তাঁদের অনেকেই হয়তো বহু বছর আগে দেহত্যাগ করেছেন, কিন্তু আমার স্মৃতিতে তাঁরা আজও ভীষণ জীবন্ত। জীবনের যেকোনো ভালো সময়ে আমি এখনও চোখ বন্ধ করলে দেখি—তাঁরা হাসিমুখে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, কখনও বা দূর দিগন্তে হেঁটে যাচ্ছেন।

কিন্তু, সেই শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবীদের কারও চেহারা যখন ছদ্মবেশী ‘হাসনাত আবদুল হাই’-এর মতো রূপ নেয়, তখন আমার ভেতরের ঘৃণার পরিমাণটাও ঠিক সমপরিমাণ তীব্র আর ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে! এদের কুৎসিত মগজের অপচ্ছায়া যদি কখনো গায়ে লাগে, তবে সাবান দিয়ে পুরো গা ধুয়ে পবিত্র হতে ইচ্ছে করে। যেকোনোভাবে এদের কোনো লেখা যদি ভুলে পড়েও ফেলি, তবে প্রাণপণে তা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে ইচ্ছে করে। এই হাসনাতদের চেহারার দিকে তাকালে আমি আসলে একাত্তরের কসাই কাদের মোল্লাকে দেখতে পাই। এদের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের মুখচ্ছবিতে আমি স্রেফ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে দেখি। আর এদের আইনি উকিলদের মুখে ভেসে ওঠে একাত্তরের ঘাতকদের ডিফেন্ড করা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের প্রতিচ্ছবি। এরা দেখতে মানুষের মতো হলেও এদের আসল রূপটি একজন হিংস্র হায়েনার মতো, লকলকে জিভ বের করা কোনো ভয়ঙ্কর বিষাক্ত প্রাণীর মতো—যা দেখলে শুধু তীব্র ঘৃণাই আসে না, অপমানে আর ভয়ে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

২. সামরিক অপশাসনের বিষবৃক্ষ এবং আগামীর লড়াই

বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে দীর্ঘ বহু বছর ধরে চলা সামরিক অপশাসন আর স্বৈরশাসনের বিষাক্ত ফল হলো এই হাসনাত আবদুল হাই টাইপের তথাকথিত ‘সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী’। আমাদের সেলেব্রিটি অগ্রজদের একটি বড় অংশই হয়তো এই নোংরা ব্যবসার অংশীদার, নয়তো এর নির্মম শিকার। এই ঘরের শত্রু বিভীষণরা কিন্তু একা নয়; এরা যে সমাজকে কলুষিত করার মতো এমন ধৃষ্টতা দেখায়, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও না। এটি মূলত আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সচেতন রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সুগভীর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের ক্ষুদ্র এক প্রকাশ মাত্র।

রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে একটা নোংরা আর ঘৃণিত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা, ত্যাগী রাজনীতিবিদদের প্রতি জনমনে চরম অশ্রদ্ধা তৈরি করা এবং এ দেশের মাটি ও মানুষের আসল জননেতাদের চরিত্রহনন করে পচিয়ে দেওয়া—এ এক দীর্ঘদিনের ভয়ানক নীল নকশা। আর এই কাজটিই হাসনাতদের মতো সুশীলদের দিয়ে করানো হয়েছে, যাতে তোমাদের আর আমাদেরকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা যায়। কিন্তু এই সুবিধাবাদীরা ভুলে গেছে যে বাঙালি সব সইতে পারলেও ইতিহাস বিকৃতি সয় না। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই কোনো একদিন এ দেশের লড়াকু তরুণ প্রজন্ম এদের এই পাপের হিসাব সুদে-আসলে বুঝিয়ে দেবে।

তবে একটা জিনিস দেখে এখন সত্যিই খুব ভালো লাগছে—আজকের সমাজ আর চুপ করে নেই। অনেকেই এখন এই ধরণের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও রাজপথে সচেতনভাবে কথা বলছেন, প্রতিবাদ করছেন। অথচ আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগেও এই ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনায় মানুষ এত দলমত নির্বিশেষে তীব্র প্রতিবাদ করার সাহস পেত না। নিশ্চয়ই সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া আমাদের অধিকার আদায়ের লড়াইগুলো সমাজের ভেতরের অনেক কিছুকে এক ঝটকায় বদলে দিয়েছে। প্রতিবাদের এই নতুন হাওয়া আগামী দিনে সমাজের আরও অনেক আবর্জনা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবে।

সব অন্ধকারের বুকেই আলোর বীজ লুকিয়ে থাকে। তাই আমি এখনো আশার বুক বেঁধে রাখি। অন্ধকারের মাঝেও তীব্র বিশ্বাসের এক একটি আলোর দীপ জ্বেলে রাখি। জয় আমাদের হবেই!

আরও দেখুন: