ভয়াল ২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ও ছবি । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

আজ রক্তাক্ত ও ভয়াল ২১শে আগস্ট। ২০০৪ সালের এই তপ্ত বিকেলে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যে নারকীয় উল্লাস মেতে উঠেছিল, তার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেতে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশে চালিত এক সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড। এই বর্বরোচিত হামলার একমাত্র ও মূল উদ্দেশ্য ছিল—আওয়ামী লীগের পতাকাবাহী, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা।

নেতাকর্মীদের নিজেদের জীবন বাজি রেখে তৈরি করা মানব-ঢালের (Human Shield) কারণে শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও, ঘাতকদের আর্জেস গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হয়ে যান মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন তাজা প্রাণ। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ৩০০-র বেশি মানুষ।

 

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হলে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে ছুটতে দেখা যায়
২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হলে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে ছুটতে দেখা যায়

 

Table of Contents

ভয়াল ২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ও ছবি

২১শে আগস্ট হামলার গভীর রাজনৈতিক পটভূমি উদ্দেশ্য

২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত উন্মাদনা ছিল না। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঠান্ডা মাথায় ছক কষা, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদে তৈরি এক সুগভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ। এই হামলার পটভূমি এবং নেপথ্যের উদ্দেশ্যগুলো এতটাই কুৎসিত ও সুদূরপ্রসারী ছিল যে, তা বোঝার জন্য তৎকালীন বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির অন্ধকার গতিপ্রকৃতিকে ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা
ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা
পটভূমি: ২০০১-পরবর্তী উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের ‘রাষ্ট্রীয় মডেলে’ রূপান্তর

২০০১ সালের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এক অন্ধকার চোরাগলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার রাত থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় এক নজিরবিহীন ও পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার রাজত্ব।

জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ
জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ
১. রাষ্ট্রীয় মদদে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বিরোধী দল দমন

জোট সরকার ক্ষমতায় বসার পর পরই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু (বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী) এবং মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর। ভোলা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাটসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে বর্বর সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, তা ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ভীতিপ্রদর্শন করে দেশছাড়া করার কৌশল। একই সাথে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকীকরণ করে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে।

ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা
ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা
২. ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র: ‘হাওয়া ভবন’ ও উগ্রবাদের অভয়ারণ্য

তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে এক অভিনব শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যেখানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার এক সমান্তরাল কেন্দ্র, যা ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিচালনায় এই হাওয়া ভবনই হয়ে ওঠে দেশের অঘোষিত ‘পাওয়ার হাউস’।

এই ভবনের ছায়াতলে বসেই তৎকালীন পাকিস্তানের গোয়েন্দা মডেলকে অনুকরণ করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল ধারাকে উপড়ে ফেলার ছক কষা হয়। যার ফলশ্রুতিতে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (HUJI), জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (JMB) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (JMJB) মতো উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো রাতারাতি দেশজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করার অভয়ারণ্য পেয়ে যায়। রাজশাহী ও নওগাঁর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কুখ্যাত ‘বাংলা ভাই’ যখন প্রকাশ্যে রাষ্ট্রীয় পুলিশের পাহারায় তান্ডব চালাচ্ছিল, তখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একে গণমাধ্যমের ‘বানানো গল্প’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ছিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই
ছিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই
৩. রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (DGFI-NSI) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কুৎসিত আঁতাত

ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায়টি তৈরি হয় তখন, যখন দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা—ডিজিএফআই (DGFI) এবং এনএসআই (NSI)-এর একটি বড় প্রভাবশালী অংশকে এই উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই সংস্থাগুলো জঙ্গিদের অর্থ, অস্ত্র এবং সবচেয়ে বড় কথা ‘রাষ্ট্রীয় প্রটেকশন’ বা অভয়দান করতে শুরু করে।

এই কুখ্যাত আঁতাতের মাধ্যমেই একের পর এক ঘটতে থাকে:

  • দেশের বিশিষ্ট প্রগতিশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা।
  • খুলনা, যশোর ও সিলেটে উদীচী ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর বোমা হামলা।
  • বিচার বিভাগের ওপর একযোগে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে বিচারক হত্যা।
  • সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর প্রকাশ্য গ্রেনেড হামলা।

 

২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলায় একটি অবিস্ফোরিত বোমা
২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলায় একটি অবিস্ফোরিত বোমা

 

৪. দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিরোধ এবং খুনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশ যখন দ্রুত একটি ব্যর্থ ও উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছিল, তখন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত রাজপথ কাঁপানো তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। একের পর এক সমাবেশ ও লং-মার্চের মাধ্যমে সরকারের এই ফ্যাসিবাদের রূপটি বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচন করতে শুরু করেন শেখ হাসিনা।

যখন জোট সরকার দেখল যে—জেলে পুরে, মামলা দিয়ে বা পুলিশি নির্যাতন চালিয়েও শেখ হাসিনাকে দমানো যাচ্ছে না এবং দিন দিন তার পেছনে জনস্রোত বেড়েই চলেছে, তখনই তাকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত ও নৃশংসতম সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। পরবর্তীতে গ্রেফতার হওয়া এবং ফাঁসি হওয়া হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানের একাধিক জবানবন্দীতে এই সত্যটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুফতি হান্নান স্বীকার করে যে, হাওয়া ভবনে তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ কেবিনেটের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সরাসরি সবুজ সংকেত ও উপস্থিতিতেই শেখ হাসিনাকে হত্যার এই পৈশাচিক নীল নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

২১ আগস্ট ২০০৪ - হামলায় ব্যবহৃত আরজেএস বা আর্জেস (Arges) গ্রেনেড
২১ আগস্ট ২০০৪ – হামলায় ব্যবহৃত আরজেএস বা আর্জেস (Arges) গ্রেনেড
২১শে আগস্ট হামলার মূল উদ্দেশ্য

ঘাতকদের এই গ্রেনেড হামলার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল সুনির্দিষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী। এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার চেষ্টা ছিল না, এটি ছিল একটি আদর্শ ও একটি পুরো রাজনৈতিক প্রজন্মকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার মহাপ্রকল্প।

[টার্গেট: শেখ হাসিনা] ➔ [নেতৃত্বশূন্য বাংলাদেশ] ➔ [আওয়ামী লীগের চিরতরে বিলুপ্তি]
১. নেতৃত্বশূন্য বাংলাদেশ: শেখ হাসিনাকে চিরতরে স্তব্ধ করা

হামলার প্রধান ও একমাত্র মূল ‘টার্গেট’ ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ঘাতকরা খুব ভালো করেই জানত, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগকে যিনি চার দশক ধরে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন, তিনি হলেন শেখ হাসিনা। তিনিই বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির একমাত্র শেষ বাতিঘর। তাকে যদি একটি জনাকীর্ণ সমাবেশে শত শত মানুষের সামনে গ্রেনেড ছুড়ে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে যাবে। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো—বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবধারার একটি উগ্র ও মৌলবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পথকে নিষ্কণ্টক করা।

২. আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষ থিঙ্ক-ট্যাংককে নামচিহ্নহীন করা

ঘাতকদের পরিকল্পনা কেবল শেখ হাসিনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা ট্রাকে তৈরি উন্মুক্ত মঞ্চটি লক্ষ্য করে একসঙ্গে ডজনখানেক সামরিক গ্রেডের ‘আর্জেস-৮৪’ গ্রেনেড ছুড়েছিল এই উদ্দেশ্যে, যেন শেখ হাসিনাকে ঘিরে থাকা দলের পুরো শীর্ষ নেতৃত্ব এক নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগের তৎকালীন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, থিঙ্ক-ট্যাংক এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের একসাথে হত্যা করে দলটিকে এমন এক নেতৃত্বহীন সংকটের অতলে তলিয়ে দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল, যেখান থেকে আগামী ৫০ বছরেও যেন আওয়ামী লীগ আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। মূল উদ্দেশ্য ছিল—দলটিকে মাঠপর্যায়ে এতটাই অভিভাবকহীন ও আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলা, যাতে কর্মীরা ভয়ে রাজনীতি ছেড়ে দেয় এবং দলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়।

 

হাওয়া ভবন
হাওয়া ভবন

 

হামলার সুনিপুণ প্রস্তুতি এবংহাওয়া ভবনমিন্টু রোডকানেকশন

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত সরকার এবং রাষ্ট্রের জানমাল রক্ষার দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে নিজেদেরই দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার নৃশংস ষড়যন্ত্রে মেতে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং শিউরে ওঠার মতো উদাহরণ হলো ২১শে আগস্ট হামলার এই প্রস্তুতি পর্ব। এটি কোনো সাধারণ অপরাধীদের গোপন বৈঠক ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে বসে, করদাতার টাকায় চলা সরকারি বাসভবনে বসে আঁকা এক সুনিপুণ ও পৈশাচিক খুনের নকশা।

[হাওয়া ভবন: রাজনৈতিক সবুজ সংকেত ও মাস্টারপ্ল্যান] 
                     ⬇
[মিন্টু রোড: সরকারি বাসভবনে গোপন বৈঠক ও গ্রেনেড হস্তান্তর] 
                     ⬇
[রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা: ঘাতকদের অভয়দান ও নিরাপদ পলায়নের রুট তৈরি]
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
১. হাওয়া ভবনের মাস্টারপ্ল্যান: ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্রে খুনের ব্লু-প্রিন্ট

২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বনানীর ১৩ নম্বর রোডের একটি বিলাসবহুল বাড়ি—’হাওয়া ভবন’—হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের অঘোষিত শাসনকেন্দ্র। সেখানেই নির্ধারিত হতো দেশের নীতি, ব্যবসা এবং রাজনৈতিক ভাগ্য। আর সেখানেই প্রথম আলো ফেলার চেষ্টা করা হয় শেখ হাসিনাকে চিরতরে স্তব্ধ করার এই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে।

২০০৪ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে হাওয়া ভবনে একটি অত্যন্ত গোপন কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের আড়ালে যে বিভীষিকা লুকিয়ে ছিল, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা তৎকালীন যুবনেতা ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সেই বৈঠকে একে একে উপস্থিত হন:

  • স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর (যাঁর কাজ ছিল দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা)
  • জামায়াত নেতা ও পরবর্তীতে প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
  • প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী
  • জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি মেজর (অব.) হুদা এবং মেজর (অব.) নূর।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাথে একই টেবিলে বসানো হয়েছিল হরকাতুল জিহাদ (HUJI) আল ইসলামীর শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান এবং শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলকে।

বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল একটাই—কীভাবে এবং কোথায় শেখ হাসিনাকে হত্যা করা যায়। জঙ্গিরা যখন জানায় যে, উন্মুক্ত রাস্তায় বা সাধারণ জনসভায় সরাসরি গুলি করে শেখ হাসিনাকে মারা কঠিন, কারণ তাঁর চারপাশে সবসময় নেতাকর্মীদের এক অভেদ্য দেয়াল থাকে; তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সামরিক গ্রেডের ভারী গ্রেনেড ব্যবহারের। ঠিক হয়, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের আগামী বড় সমাবেশেই এই হামলা চালানো হবে, যেন ভিড়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে মিশন শেষ করা যায়। তারেক রহমান জঙ্গিদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনাদের কোনো ভয় নেই, যা যা লজিস্টিক সাপোর্ট লাগবে, সব বাবর ভাই এবং হারিছ ভাই দেখে রাখবেন।” এই একটি বাক্যেই রাষ্ট্রের সবুজ সংকেত পেয়ে যায় ঘাতক দল।

২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড পরে
২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড পরে
২. মিন্টু রোডের গোপন বৈঠক: সরকারি বাসভবনে ডেথ-ওয়ারেন্ট ও গ্রেনেড হস্তান্তর

হাওয়া ভবনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর, পুরো অপারেশনকে মাঠপর্যায়ে সফল করার জন্য পরবর্তী সমন্বয় ও কার্যনির্বাহী সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে। যে মিন্টু রোডকে বলা হতো দেশের ভিভিআইপি এবং মন্ত্রীদের সবচেয়ে নিরাপদ ও সংরক্ষিত এলাকা, সেই এলাকার একটি বাড়িই হয়ে উঠেছিল রক্তের হোলি খেলার মূল সরবরাহ কেন্দ্র।

এই মিটিংগুলোতে লুৎফুজ্জামান বাবর স্বয়ং উপস্থিত থেকে অপারেশনের খুঁটিনাটি তদারকি করেন। শেখ হাসিনাকে মারার জন্য যে অস্ত্র বেছে নেওয়া হয়েছিল, তা কোনো সাধারণ ককটেল বা দেশীয় বোমা ছিল না। সেগুলো ছিল পাকিস্তানে উৎপাদিত এবং সে দেশের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর হাত ঘুরে চোরাপথে বাংলাদেশে আসা অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ‘আর্জেস-৮৪’ (Arges-84) গ্রেনেড। এই গ্রেনেডগুলো মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের বাঙ্কার উড়িয়ে দেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। এর একটিমাত্র বিস্ফোরণ কয়েকশ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা মানুষের শরীরকে স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা করে দিতে সক্ষম।

মিন্টু রোডের সেই বাসভনে বসেই লুৎফুজ্জামান বাবর এবং তৎকালীন ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা জঙ্গি মুফতি হান্নান ও তার দলের হাতে এই মারাত্মক গ্রেনেডগুলো তুলে দেন। উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই, কুখ্যাত জঙ্গি মাওলানা তাজউদ্দিন এই গ্রেনেডগুলো বহন করে নিয়ে আসে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন অনেকেই
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন অনেকেই
৩. রাষ্ট্রীয় অভয়দান: যখন রক্ষকই সেজেছিল ভক্ষক

গ্রেনেডগুলো হাতে তুলে দেওয়ার পর জঙ্গিদের মনে তখনও একটা ভয় ছিল—দিনের আলোয় ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় এত বড় হামলার পর তারা পালাবে কীভাবে? পুলিশ বা ডিবি যদি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, তবে তো তারা ধরা পড়ে যাবে।

ঠিক এই জায়গায় এসে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি ধারণ করে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সেখানে উপস্থিত গোয়েন্দা প্রধানরা জঙ্গিদের অভয় দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনারা শুধু আপনাদের কাজ শেষ করবেন। হামলা হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ বা অন্য কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আপনাদের পথ আটকাবে না। বরং এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হবে, যাতে আপনারা খুব সহজেই চোখের পলকে ভিড়ের মিশে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন।”

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই, ২১শে আগস্টের সেই সমাবেশে সাধারণত যে ধরনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়। আশেপাশের বহুতল ভবনগুলোর ছাদে যেখানে সবসময় পুলিশের স্নাইপার বা সেন্ট্রি থাকার কথা, সেদিন রহস্যজনকভাবে সেই ছাদগুলো খালি রাখা হয়েছিল—যাতে ঘাতকরা অনায়াসে ছাদে উঠে ট্রাকে থাকা শেখ হাসিনার ওপর নিশানা ঠিক করে গ্রেনেড ছুড়তে পারে। রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পরেই, ঘাতক জঙ্গিরা নিশ্চিন্ত মনে ২০শে আগস্ট রাতে ঢাকার বিভিন্ন মেসে বসে গ্রেনেডগুলোর পিন খোলার শেষ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।

 

২১ আগস্ট ২০০৪ - গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য
২১ আগস্ট ২০০৪ – গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য

 

 

সেই রক্তক্ষয়ী বিকেলের নারকীয় দৃশ্য (২১শে আগস্টের দিন যা ঘটেছিল)

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ছিল এক তপ্ত, ভ্যাপসা গরমের শনিবার। চারদিকের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। উদ্দেশ্য ছিল—দেশজুড়ে চলমান সন্ত্রাস, উগ্রবাদ এবং সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো।

ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দুপুরের পর থেকেই মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। কোনো স্থায়ী বা রাজকীয় মঞ্চ ছিল না; ফুটপাতের ওপর একটি সাধারণ খোলা ট্রাককে কাঠের তক্তা দিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিকেল ৪টা বাজতেই চারপাশের রাস্তা, গলির মুখ, এমনকি ফুটপাতও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বিকেল ৫টার ঠিক কিছুটা আগে সমাবেশস্থলে এসে পৌঁছান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ট্রাকে নির্মিত সেই উন্মুক্ত মঞ্চে ওঠার সাথে সাথে চারদিক থেকে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। মঞ্চে তাকে ঘিরে এক ধরণের স্বতঃস্ফূর্ত মানব-বেষ্টনী তৈরি করে রেখেছিলেন দলের শীর্ষ নেতারা। আর ঠিক ট্রাকের নিচে, পিচঢালা রাস্তার ওপর বসা ও দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন আওয়ামী লীগের শত শত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, যাঁদের সামনের সারিতেই ছিলেন ক্লান্তিহীন নারী নেত্রী আইভি রহমান। মঞ্চের ঠিক নিচ থেকে হুড়োহুড়ি করে ছবি তুলছিলেন বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের ফটো সাংবাদিকরা। কেউ জানত না, এই চেনা চেনা উৎসবমুখর কোলাহলই আর কয়েক মিনিট পর এক জীবন্ত নরকে পরিণত হতে যাচ্ছে।

২১ আগস্ট ২০০৪ - গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঠিক আগ মূহুর্তে তোলা ছবি
২১ আগস্ট ২০০৪ – গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঠিক আগ মূহুর্তে তোলা ছবি
৫টা ২২ মিনিট: একটি বাক্য, একটি মুহূর্ত এবং মহাপ্রলয়

শেখ হাসিনা তাঁর প্রায় ২০ মিনিটের ওজস্বী বক্তব্য শেষ করেন। বিকেল তখন ঠিক ৫টা ২২ মিনিট। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে হাত নেড়ে মাইক্রোফোনটি মাত্রই টেবিলের ওপর রাখতে যাবেন এবং ট্রাক থেকে নামার প্রস্তুতি নেবেন—ঠিক সেই মুহূর্তেই থমকে যায় পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস।

কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো পড়তে শুরু করে জলপাই রঙের লোহার গোলক। চারপাশের বহুতল ভবনগুলোর ছাদ থেকে ঘাতকরা নিখুঁত নিশানায় ছুড়তে শুরু করে সামরিক গ্রেডের মারাত্মক ধ্বংসাত্মক ‘আর্জেস-৮৪’ গ্রেনেড।

[বিকেল ৫:২২ — বক্তব্য শেষ] 
            ⬇
[প্রথম গ্রেনেড বিস্ফোরণ: চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার]
            ⬇
[টানা ১৩টি আর্জেস গ্রেনেড: মানবদেহের ছিন্নভিন্ন রূপ]
            ⬇
[বুলেটপ্রুফ গাড়িতে হামলা ও দেহরক্ষী মাহবুবের আত্মত্যাগ]
            ⬇
[রক্তের ওপর পুলিশের টিয়ারশেল ও নারকীয় লাঠিচার্জ]
            ⬇
[মৃত্যুপুরী: আর্তনাদ ও মাংস পোড়া গন্ধ]

বধির করে দেওয়া প্রচণ্ড এক শব্দে প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয় ঠিক ট্রাকের বাম পাশে। মুহূর্তের মধ্যে কান ফাটানো শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং ঘন কালো, ঝাঁঝালো সালফারের ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। প্রথম বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলানোর আগেই, ঘাতকরা একের পর এক, সুনিপুণ ধারাবাহিকতায় মোট ১৩টি গ্রেনেড ছুড়ে মারে। পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ তখন যেন এক বিধ্বংসী যুদ্ধক্ষেত্র।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা মানব-ঢাল তৈরি করে রক্ষা করেন শেখ হাসিনাকে
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা মানব-ঢাল তৈরি করে রক্ষা করেন শেখ হাসিনাকে
মানব-ঢাল: রক্তের অক্ষরে লেখা এক অলৌকিক জীবন

গ্রেনেডের প্রথম বিকট শব্দ শোনার সাথে সাথেই ট্রাকে থাকা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করেননি। তাঁরা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন। তৈরি হয় এক অবিস্মরণীয় এবং অভেদ্য ‘মানব-ঢাল’ (Human Shield)।

গ্রেনেডের ঝাঁকে ঝাঁকে বিষাক্ত স্প্লিন্টার চারদিকের বাতাস চিড়ে এসে বিঁধতে থাকে মোহাম্মদ হানিফসহ অন্য নেতাদের পিঠে, মাথায় ও শরীরে। নেতাদের গা বেয়ে পড়া তাজা রক্তে ভিজে যায় শেখ হাসিনার শাড়ি। একের পর এক গ্রেনেড এসে ট্রাকের গায়ে লাগছিল আর পুরো ট্রাকটি প্রচণ্ড শক্তিতে দুলছিল। ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া, কিন্তু এই বিশ্বস্ত নেতাদের ভালোবাসার দেয়াল ভেদ করে একটি স্প্লিন্টারও শেখ হাসিনার শরীর স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান, তবে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন তাঁর বাম কানের স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি।

২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলা
২১ আগস্ট ২০০৪ গ্রেনেড হামলা
পিচঢালা রাস্তায় জীবন্ত জাহান্নাম

যখন ট্রাকের ওপর নেতারা রক্তে ভাসছেন, তখন ট্রাকের নিচের পিচঢালা রাস্তাটি রূপান্তরিত হয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানায়। আর্জেস গ্রেনেডের ভেতরে থাকা হাজার হাজার ক্ষুদ্র লোহার টুকরো বা স্প্লিন্টার মানুষের হাড়, মাংস আর চামড়া কেটে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।

চোখের পলকে শত শত মানুষের হাত, পা, আঙুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়তে থাকে। নারী নেত্রী আইভি রহমান দুই পা প্রায় সম্পূর্ণ হারানো অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়েছিলেন রক্তের ওপর। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল মানুষের মরণ-আর্তনাদ, গগণবিদারী চিৎকার, কান্নাকাটি আর রক্ত ও পোড়া মাংসের এক বীভৎস গন্ধে। যারা একটু আগে স্লোগান দিচ্ছিল, তারা অনেকেই তখন নিথর দেহ, আর যারা বেঁচে ছিল তারা যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। জুতো, স্যান্ডেল আর ব্যানার-ফেস্টুন ভেসে যাচ্ছিল রক্তের নদীতে।

২১ আগস্ট ২০০৪ - এভাবেই নেতাকর্মীরা ঘিরে রেখেছিলেন শেখ হাসিনাকে
২১ আগস্ট ২০০৪ – এভাবেই নেতাকর্মীরা ঘিরে রেখেছিলেন শেখ হাসিনাকে
শেষ চেষ্টা: বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও ল্যান্স করপোরাল মাহবুবের আত্মত্যাগ

গ্রেনেডের তান্ডব শেষ হতে না হতেই, নেতারা কোনোমতে শেখ হাসিনাকে টেনে তুলে ট্রাক থেকে নামিয়ে তাঁর বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ গাড়িটির দিকে নিয়ে যান। ঘাতকরা যখন বুঝতে পারে গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনা মারা যাননি, তখন তারা চারপাশ থেকে গাড়িটি লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে কুৎসিতভাবে ব্রাশফায়ার শুরু করে।

গাড়ির সামনের ও পাশের কাচে একের পর এক বুলেট এসে আঘাত করতে থাকে। কিন্তু বুলেটপ্রুফ কাচ ভেদ করতে না পেরে বুলেটগুলো ছিটকে যায়। ঠিক এই চরম মুহূর্তে, যখন গাড়িটি মাত্র স্টার্ট দিয়ে চলে যাবে, তখন ঘাতকদের ছোঁড়া বুলেটের সামনে নিজের বুক পেতে দাঁড়িয়ে যান শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত ও নির্ভীক ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান। ঘাতকদের নির্মম বুলেট তাঁর বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর নেত্রীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনেন। গাড়িটি যখন ধোঁয়া আর লাশের স্তূপ মাড়িয়ে সুধাসদনের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, তখনও পেছনে পড়ে ছিল এক রক্তাক্ত মৃত্যুপুরী, যার ক্ষত আজও প্রতিটি বাংলাদেশীর হৃদয়কে নাড়া দেয়।

২১ আগস্ট ২০০৪ - গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য
২১ আগস্ট ২০০৪ – গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য

 

ভয়াল সেই হামলায় নিহত ও আহতদের তালিকা

এই নারকীয় হামলায় ঘটনাস্থলেই এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন দেশপ্রেমিক নেতাকর্মী নিহত হন।

নিহতদের তালিকা:

১. আইভি রহমান (মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী)

২. ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান (শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী)

৩. রফিকুল ইসলাম ওরফে আদা চাচা (আওয়ামী লীগের কর্মী)

৪. মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হানিফ (জাতীয় শ্রমিক লীগ নেতা)

৫. মোশতাক আহমেদ সেন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা)

৬. রতন শিকদার

৭. হাসিনা মমতাজ রিনা

৮. রিজিয়া বেগম

৯. সুফিয়া বেগম

১০. লিটন মুনশি

১১. আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী

১২. আবুল কালাম আজাদ

১৩. আব্বাস উদ্দিন শিকদার

১৪. আতিক সরকার

১৫. মামুন মৃধা

১৬. নাসির উদ্দিন সরদার

১৭. আবুল কাশেম

১৮. বেলাল হোসেন

১৯. আব্দুর রহিম

২০. আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম

২১. জাহেদ আলী

২২. মোতালেব হোসেন

২৩. মোমেন আলী

২৪. ইসহাক মিয়া

আহতদের দীর্ঘস্থায়ী মানবেতর জীবন:

গ্রেনেড হামলায় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মাথায় ও শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে পরবর্তীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আজও প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ তাদের শরীরে ঘাতকদের ছোঁড়া গ্রেনেডের বিষাক্ত স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে, কেউ হারিয়েছেন চোখ, কেউবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। একটু আবহাওয়া পরিবর্তন হলেই বা শীত এলে এই স্প্লিন্টারগুলোর তীব্র ব্যথায় তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।

 

২১ আগস্ট ২০০৪ - গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য
২১ আগস্ট ২০০৪ – গ্রেনেড হামলার পরের দৃশ্য

 

হামলা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা চিকিৎসা সেবা নিয়ে টালবাহানা

একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর যে কোনো সভ্য দেশের সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হয়—আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো, অপরাধীদের ধরার জন্য চারদিক অবরুদ্ধ করা এবং ঘটনাস্থলের সমস্ত আলামত যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা। কিন্তু ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও প্রশাসনের আচরণে মানবতার ন্যূনতম কোনো লেশমাত্র ছিল না। সেটি কোনো অদক্ষতা ছিল না, বরং তা ছিল আহতদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এবং ঘাতকদের বাঁচানোর এক নিষ্ঠুর প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।

১. রক্তের ওপর টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ: ঘাতকদের রক্ষায় পুলিশ বাহিনী

গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঠিক পর পরই যখন পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ধোঁয়া, রক্ত আর ছিন্নভিন্ন মানুষের আর্তনাদে এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছিল, তখন বেঁচে যাওয়া অক্ষত নেতাকর্মীরা নিজেদের পরনের জামা, শাড়ি আর ব্যানার ছিঁড়ে আহতদের ক্ষতস্থান বাঁধার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন চারদিকে শত শত মানুষ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখন ত্রাতার ভূমিকায় না এসে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণ করে এক চরম নৃশংস রূপ।

[নারকীয় বিস্ফোরণ] ➔ [উদ্ধারকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ] ➔ [মুহুর্মুহু টিয়ারশেল নিক্ষেপ] ➔ [ঘাতকদের নিরাপদ প্রস্থান] ➔ [পানির গাড়ি দিয়ে আলামত ধ্বংস]

আহতদের উদ্ধার করতে আসা সাধারণ মানুষ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই অতর্কিতে লাঠিচার্জ শুরু করে। একই সাথে চারদিক থেকে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল (কাঁদানে গ্যাস) নিক্ষেপ করা হয়। এই পৈশাচিক আচরণের পেছনে ছিল দুটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় গোপন এজেন্ডা:

ঘাতকদের পালানোর সেফ প্যাসেজ:

টিয়ারশেলের তীব্র ঝাঁঝালো ধোঁয়া এবং লাঠিচার্জের ফলে সমাবেশস্থলে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও অন্ধকারের সৃষ্টি হয়। এর সুযোগ নিয়ে আশেপাশের ভবনের ছাদে থাকা খুনি জঙ্গিরা কোনো বাধা ছাড়াই অতি সহজে জনাকীর্ণ এলাকা থেকে ভিড়ের মধ্যে মিশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

আলামত চিরতরে মুছে ফেলা:

টিয়ারশেল ব্যবহারের পর পরই তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের অলিখিত নির্দেশে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পানির গাড়ি এনে পুরো ঘটনাস্থল পৈশাচিক দ্রুততায় ধুয়ে ফেলা হয়। রাসায়নিক কণা, স্প্লিন্টার, রক্তের দাগ, ঘাতকদের ফেলে যাওয়া স্যান্ডেল ও অবিস্ফোরিত গ্রেনেডের অবশিষ্টাংশ—যা একটি ফেয়ার ইনভেস্টিগেশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান ছিল—তা পানির তীব্র স্রোতে ড্রেনে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষক সাজে, আলামত ধ্বংসের এমন প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ ইতিহাসে বিরল।

২. সরকারি হাসপাতালে অমানবিকতা: চিকিৎসার দরজায় যখন রাজনীতির তালা

রক্তক্ষরণে ছটফট করতে থাকা শত শত নেতাকর্মীকে যখন রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি কিংবা কাঁধে করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে অপেক্ষা করছিল আরও এক পৈশাচিক অধ্যায়।

তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের কঠোর ও অলিখিত নির্দেশনা ছিল—আহতদের যেন কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা বা জরুরি সেবা দেওয়া না হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো দেশের শীর্ষ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটগুলো প্রায় বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। যে চিকিৎসকেরা মানবতার খাতিরে এগিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, তাঁদের ওপর ওপর মহল থেকে তীব্র পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করা হয়।

স্ট্রেচার ও ওষুধের কৃত্রিম সংকট:

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর গুরুতর জখম রোগীদের জন্য একটা স্ট্রেচার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ট্রলিবিরোধী এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্ট্রেচারের অভাবে মেঝেতে, বারান্দায়, এমনকি ধুলোবালির ওপর কাতরাচ্ছিলেন আইভি রহমানের মতো সিনিয়র নেতারা। হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছিল—কোনো জরুরি ওষুধ, গজ, ব্যান্ডেজ বা অ্যানেস্থেশিয়ার ইনজেকশন স্টকে নেই।

রক্তের ব্যাগ নিয়ে টালবাহানা:

স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শরীরগুলো থেকে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছিল। জরুরি রক্তের প্রয়োজনে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। চিকিৎসকেরা রোগীদের ফাইল নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন, যেন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই আহতরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

৩. জীবন বাঁচানোর আকুতি এবং বেসরকারি ক্লিনিকের মানবিকতা

সরকারি হাসপাতালের এই চরম অবহেলা আর অমানবিকতা দেখে ক্ষুব্ধ ও নিরুপায় নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নেন আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু ততক্ষণে অনেকের শরীর থেকে এত বেশি রক্তক্ষরণ হয়ে গিয়েছিল যে, মাঝপথেই অনেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাধ্য হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শত শত মুমূর্ষু রোগীকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, ল্যাবএইড, বাংলাদেশ মেডিকেল এবং ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন মাঝারি ও ছোট বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স এবং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। চিকিৎসকেরা গভীর রাত পর্যন্ত না ঘুমিয়ে শত শত মানুষের শরীর থেকে হাজার হাজার স্প্লিন্টার বের করার অস্ত্রোপচার করেন। সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিতে শুরু করে।

একদিকে রাষ্ট্র যখন তার নিজের নাগরিকদেরই রক্তে ভেজা শরীরগুলোকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছিল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মানবিকতা তখন অনেককে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। ২১শে আগস্টের সেই রাতটি কেবল গ্রেনেডের বিষাক্ত স্প্লিন্টারের জন্যই দীর্ঘ ছিল না, বরং তা ছিল একটি রাষ্ট্রের তার নিজের জনগণের সাথে করা সবচেয়ে কুৎসিত ও অমানবিক বিশ্বাসঘাতকতার রাত।

 

২১ আগস্ট ২০০৪ - হামলায় অল্পের জন্যে বেঁচে যান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা
২১ আগস্ট ২০০৪ – হামলায় অল্পের জন্যে বেঁচে যান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা

 

বিচারের নামে রাষ্ট্রীয় প্রহসন এবং ইতিহাসের জঘন্যতমজর্জ মিয়া নাটক

২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিতে যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক বা সভ্য দেশের ইতিহাসে কল্পনাও করা যায় না। প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করতে এবং বিশ্ববাসীর চোখকে ধুলো দিতে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সমস্ত শক্তি—আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিচার বিভাগীয় ক্ষমতার এক কুৎসিত অপব্যবহার করেছিল।

[ঘটনাস্থল ধুয়ে ফেলা] ➔ [তাজা গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আলামত ধ্বংস] ➔ [পাতানো এক সদস্যের তদন্ত কমিটি]
                                                                  ⬇
[সিআইডি-র সাজানো 'জর্জ মিয়া' স্ক্রিপ্ট] ➔ [পরিবারকে মাসোহারা ও হুমকি] ➔ [গণমাধ্যমে সত্য উন্মোচন]
১. সামরিক কায়দায় আলামত ও অবিস্ফোরিত গ্রেনেড ধ্বংস

হামলার পর দিন, অর্থাৎ ২২শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে অলৌকিকভাবে অক্ষত ও অবিস্ফোরিত অবস্থায় কয়েকটি তাজা ‘আর্জেস-৮৪’ গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। একটি নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের জন্য এই তাজা গ্রেনেডগুলো ছিল সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান। কারণ, এর গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, ব্যাচ নম্বর এবং এর ভেতরের বিস্ফোরকের রাসায়নিক পরীক্ষা করে খুব সহজেই বের করা সম্ভব ছিল এগুলো পৃথিবীর কোন দেশ থেকে, কোন চোরাপথে বাংলাদেশে এসেছে এবং কারা এর আসল ক্রেতা।

কিন্তু সিআইডি এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতের কোনো অনুমতি না নিয়ে, কোনো ধরণের ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা না করিয়ে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তৎকালীন সামরিক বাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে ডেকে পাঠায়। ঢাকার পিলখানা এবং ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে গভীর গর্ত খুঁড়ে সেই অমূল্য আলামতগুলো ফুটিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—এই গ্রেনেডের সাথে পাকিস্তানের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই জঙ্গি তাজউদ্দিনের যে সরাসরি কানেকশন ছিল, তার সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।

বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পাতানো তদন্ত কমিটি
বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পাতানো তদন্ত কমিটি
২. বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পাতানো তদন্ত কমিটি

বিশ্বব্যাপী এবং দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার দেশবাসীকে শান্ত করতে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে নিয়ে এক সদস্যের একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটির প্রধান ছিলেন বিচারপতি জয়নুল আবেদীন।

এই তদন্ত কমিটি কোনো পেশাদার গোয়েন্দা বা অপরাধ বিজ্ঞানীর সাহায্য ছাড়াই, কোনো অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় এক চঞ্চল্যকর ও হাস্যকর রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেয়। সেই রিপোর্টে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে দাবি করা হয় যে—বাংলাদেশের ভেতরের কোনো জঙ্গি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই হামলার সাথে জড়িত নয়, বরং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এই হামলা চালিয়েছে এবং হামলাকারীরা ঘটনার পরেই সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে পালিয়ে গেছে! এই মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রিপোর্টটি ছিল মূলত আসল খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্লিনচিট দেওয়ার একটি নির্লজ্জ চেষ্টা।

৩. ইতিহাসের জঘন্যতম চাল: ‘জর্জ মিয়া’ নাটকের নেপথ্য বিভীষিকা

যখন ইন্টারপোল এবং এফবিআই (FBI)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লোকদেখানো তদন্তে এনেও সত্যকে চেপে রাখা যাচ্ছিল না, তখন ২০০৫ সালের জুন মাসে সিআইডির তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা (যাদের মধ্যে রুহুল আমিন, আবদুর রশীদ এবং মুন্সী আতিকুর রহমান অন্যতম) এক কুখ্যাত ও মানবতাহীন চিত্রনাট্য তৈরি করেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জর্জ মিয়া নাটক’ নামে পরিচিত।

জর্জ মিয়া
জর্জ মিয়া

কে এই জর্জ মিয়া?

নোয়াখালীর সেনবাগ এলাকার এক অত্যন্ত সাধারণ, হতদরিদ্র ও ভবঘুরে যুবক ছিলেন জর্জ মিয়া। ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে ছোটখাটো কাজ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। অপরাধ জগতের কোনো বড় গ্যাংস্টার বা রাজনৈতিক উগ্রবাদের সাথে দূর-দূরান্তেও তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। সিআইডি এই নিরীহ যুবককে তুলে এনে মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ে এক অন্ধকার সেলে আটকে রাখে।

জবানবন্দি আদায়ের নামে পৈশাচিক মানসিক নির্যাতন

জর্জ মিয়াকে একটি কাল্পনিক এবং সাজানো স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করার জন্য দিনরাত চাপ দেওয়া হতে থাকে। তাঁকে বলা হয়, যদি সে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে না বলে যে—”আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন এবং তানভীরুল ইসলাম জয়ের নির্দেশে আমি ও আমার দল ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছি”, তবে তাঁকে ক্রসফায়ারে দিয়ে মেরে ফেলা হবে।

একদিকে মৃত্যুর ভয়, অন্যদিকে তাঁর অতি দরিদ্র পরিবারকে বাঁচানোর লোভ দেখানো হয়। সিআইডির কর্মকর্তারা জর্জ মিয়ার মায়ের সাথে যোগাযোগ করে প্রতি মাসে ক্যাশ টাকা বা মাসোহারা দেওয়া শুরু করে, যেন তাঁর মা এই বিষয়ে মুখ না খোলেন। একজন নিরুপায়, রাষ্ট্রহীন মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সিআইডি ২০০৫ সালের ২৬শে জুন আদালতে জর্জ মিয়ার একটি ভুয়া ও সাজানো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করায়।

৪. পাপ কখনো চাপা থাকে না: গণমাধ্যমের সাহসী ভূমিকা

তৎকালীন সরকার ও সিআইডি যখন ভাবছিল যে তারা সফলভাবে ২১শে আগস্টের ফাইলটি বন্ধ করে দিতে পেরেছে, ঠিক তখনই দেশের সাহসী ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে এই সাজানো নাটকের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়।

গণমাধ্যমকর্মীরা নোয়াখালীতে জর্জ মিয়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মায়ের ইন্টারভিউ নেন এবং সিআইডির দেওয়া সেই গোপন মাসোহারার টাকা ও মানিঅর্ডার রসিদের প্রমাণ হাতেনাতে ক্যামেরার সামনে নিয়ে আসেন। বেরিয়ে আসে যে, কীভাবে একজন সম্পূর্ণ নির্দোষ মানুষকে জোর করে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার আসামী সাজানো হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টগুলো যখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করে, তখন বিশ্ববাসীর সামনে তৎকালীন সরকারের সততা ও নৈতিকতার দেয়াল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র যে নিজেই ঘাতক চক্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং বিচার ব্যবস্থা নিয়ে মকারি বা তামাশা করছে—তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্দোষ জর্জ মিয়াকে পরবর্তীতে চার বছর বিনা অপরাধে জেল খেটে ২০০৯ সালে খালাস পেতে হয়েছিল, যা আজও আমাদের বিচার ব্যবস্থার এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।

২১ আগস্ট ২০০৪ - হামলায় ব্যবহৃত আরজেএস বা আর্জেস (Arges) গ্রেনেড
২১ আগস্ট ২০০৪ – হামলায় ব্যবহৃত আরজেএস বা আর্জেস (Arges) গ্রেনেড

 

অধিকতর তদন্ত, ঐতিহাসিক রায় এবং ন্যায়বিচার

২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যে মামলাটিকে ‘জর্থ মিয়া নাটক’ আর পাতানো তদন্তের কুয়াশায় ঢেকে রাখা হয়েছিল, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই কুয়াশা কাটতে শুরু করে। সিআইডির নতুন এবং সৎ কর্মকর্তাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় মামলার জট খোলার। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে এই তদন্ত আরও গতি পায় এবং একটি সম্পূর্ণ পেশাদার ‘অধিকতর তদন্ত’ (Further Investigation) শুরু হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই হামলার শিকড় অনেক গভীরে। তারা কেবল মাঠপর্যায়ের খুনিদের নয়, বরং পর্দার আড়ালের মাস্টারমাইন্ডদের খুঁজে বের করার মিশন হাতে নেন। এই পর্যায়ে এসে গ্রেপ্তার করা হয় হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানকে। রিমান্ডে এবং আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মুফতি হান্নান একের পর এক যে জবানবন্দি দিতে শুরু করে, তা শুনে খোদ তদন্ত কর্মকর্তারা শিউরে উঠেছিলেন। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য, মার্কিন সংস্থা এফবিআই (FBI) এবং ইন্টারপোলের সংগৃহীত ডিজিটাল এভিডেন্সের সাথে মুফতি হান্নানের জবানবন্দি হুবহু মিলে যায়।

তদন্তে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রমাণিত হয় যে, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী অংশ ছিল এই হামলার মূল স্পন্সর ও পরিকল্পনাকারী। পাকিস্তানি সামরিক গ্রেডের আর্জেস গ্রেনেডগুলো কীভাবে ট্রাকে করে এনে উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় রাখা হয়েছিল এবং সেখান থেকে লুৎফুজ্জামান বাবরের অভয়ে খুনিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব ডায়েরির পাতার মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিআইডির চার্জশিটে। ২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিটের মাধ্যমে মামলার পরিধি বাড়িয়ে রাষ্ট্রের সেই সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আসামী শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায় এবং এক দীর্ঘশ্বাসের অবসান

হামলার পর থেকে দীর্ঘ ১৪টি বছর কেটে যায়। এই ১৪ বছরে কত মা তাঁর সন্তানের বিচার না দেখেই কবরে চলে গেছেন, আইভি রহমানের স্বামী জিল্লুর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও চোখের জল মুছতে মুছতে দুনিয়া ছেড়েছেন, আর শত শত মানুষ শরীরে বিষাক্ত স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিলেন।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—২০১৮ সালের ১০ই অক্টোবর। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এক জনাকীর্ণ আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায় দেওয়ার সময় বিজ্ঞ আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেন, এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধ ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের লজিস্টিক, প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সহায়তার এক জঘন্য ও অপবিত্র অপব্যবহার, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রকাশ্য দিবালোকে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্বশূন্য করে ধ্বংস করে দেওয়া।

আদালতের সেই রায়ে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামীদের যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. সর্বোচ্চ শাস্তি: মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) ও অর্থদণ্ড

হামলার প্রত্যক্ষ পরিকল্পনাকারী, লজিস্টিক সহায়তাদাতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকারী শীর্ষ ১৯ জন আসামীকে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ‘ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড’ কার্যকর করার আদেশ দেন। একই সাথে তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়। এই তালিকায় ছিলেন:

  • তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, যিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থেকে খুনিদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
  • তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, যাঁর সরকারি বাসভবনে বসে গ্রেনেড সরবরাহ করা হয়েছিল।
  • হরকাতুল জিহাদের (HUJI) প্রধান মুফতি আব্দুল হান্নান (অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এই মামলা থেকে পরবর্তীতে বাদ যান) এবং জঙ্গি নেতা শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলসহ ১৯ জন উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী।

 

মুফতি আব্দুল হান্নান
মুফতি আব্দুল হান্নান

 

২. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড

হামলার নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা এবং ষড়যন্ত্রের মূল কুশীলবদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ আরও ১৯ জন আসামীকে আদালত আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং আর্থিক জরিমানা করেন। এই তালিকায় ছিলেন:

  • বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবনে’ বসে খুনের মূল ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল।
  • তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেছিলেন।
  • তৎকালীন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।
  • জঙ্গি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন (আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই, যিনি পাকিস্তান পালিয়ে যান) এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

 

আবদুস সালাম পিন্টু
আবদুস সালাম পিন্টু

 

৩. বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড (রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন)

ঘটনার পর আলামত ধ্বংস করা, ঘাতকদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং ‘জর্জ মিয়া নাটক’ সাজিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার অপরাধে তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদে (যেমন ২ বছর থেকে শুরু করে ৫ বছর পর্যন্ত) সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই তালিকায় ছিলেন সাবেক আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ এসপি এস এম রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান এবং সাবেক ডিআইজি ও এনএসআই-ডিজিএফআইয়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

হারিছ চৌধুরী
হারিছ চৌধুরী
একটি ঐতিহাসিক সত্য ও মানবিক বিচার

২০১৮ সালের এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্তির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। এই রায় কেবল অপরাধীদের শাস্তিই দেয়নি, বরং প্রমাণ করেছে যে—রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসে, সরকারি গাড়ি-বাড়িতে বসে নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর গ্রেনেড হামলা চালিয়ে পার পাওয়া যায় না। সময়ের ব্যবধানে সত্যের জয় হবেই।

তবে এই রায়ের পরেও ২১শে আগস্টের সেই অভিশপ্ত বিকেলের ট্র্যাজেডি শেষ হয়ে যায়নি। যারা সেদিন চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তাঁদের শূন্যতা যেমন পূরণ হওয়ার নয়, তেমনি আজও যারা পঙ্গু শরীরে হুইলচেয়ারে বসে কিংবা বিছানায় শুয়ে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় ছটফট করেন, তাঁদের জন্য ২১শে আগস্টের সেই নারকীয় বিকেলটি আজও থামেনি। এই রায় সেই নিভৃত যন্ত্রণাকাতর মানুষগুলোর কান্নার কিছুটা হলেও উপশম দিয়েছে, কারণ তারা মরার আগে অন্তত দেখে যেতে পেরেছেন যে—রাষ্ট্রের খাতায় খুনিরা শেষ পর্যন্ত ‘খুনি’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে।

২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ছবি:

 

 

 

রক্তক্ষয়ী ক্ষত ও কলঙ্কমুক্তির দীর্ঘশ্বাস

২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের সেই তপ্ত বিকেলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একমুঠো বারুদ আর রক্তের দাগ রেখে যায়নি, বরং তা আমাদের রাষ্ট্রাচার ও রাজনীতির বুকে এক গভীর, স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কিছু মানুষের অন্ধ ক্ষমতা লিপ্সা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যে কতটা পৈশাচিক রূপ নিতে পারে—২১শে আগস্ট তার এক জীবন্ত দলিল। সেদিন ঘাতকদের ছোঁড়া আর্জেস গ্রেনেডগুলো শুধু জননেত্রী শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে ধ্বংস করতে চায়নি; বরং তা আঘাত করেছিল বাংলাদেশের বহুমাত্রিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের মূল মূলে।

নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত ভালোবাসার তৈরি সেই ‘মানব-ঢাল’ হয়তো সেদিন শেখ হাসিনাকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু ২৪টি তাজা প্রাণের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া এবং শত শত মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ করার যে মানবিক ট্র্যাজেডি, তার কোনো বিকল্প বা সান্ত্বনা আজও নেই। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তদন্তের নামে প্রহসন, ‘জর্জ মিয়া’ নাটকের মতো কুৎসিত রাষ্ট্রীয় তামাশা এবং সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার সব রকম চেষ্টা পেরিয়ে ২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক রায় অন্তত এইটুকু প্রমাণ করেছে যে—ক্ষমতার দম্ভে সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও, চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। রক্ষক যখন ভক্ষক সাজে, তখন প্রকৃতির আদালতেই হোক আর পৃথিবীর আদালতেই হোক, একদিন তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হয়।

২১শে আগস্টের বিচার ও রায় আমাদের বিচারিক ইতিহাসে এক বড় স্বস্তির নাম হলেও, এই ট্র্যাজেডির ক্ষত কিন্তু আজও শুকায়নি। আজও যখন কোনো এক বর্ষার মেঘলা দিনে কিংবা শীতের রাতে শত শত মানুষের শরীরে লুকিয়ে থাকা ঘাতকের স্প্লিন্টারগুলো তীব্র ব্যথায় খামচে ধরে, তখন হুইলচেয়ারে বসা কোনো বাবা কিংবা বিছানায় ছটফট করা কোনো বোন নীরবে চোখের জল ফেলেন। এই রায় হয়তো অপরাধীদের দণ্ড দিয়েছে, কিন্তু এই যে আজীবন বয়ে বেড়ানো পঙ্গুত্ব আর স্বজন হারানোর আকুল কান্না—তার কোনো উপশম কি কোনো আদালত দিতে পারে? ২১শে আগস্টের আসল শিক্ষা এখানেই—রাজনীতিতে মতাদর্শের ভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্রকে খুনি বানানোর এই অন্ধকার খেলা যেন এই বাংলার মাটিতে আর কোনোদিন, কোনো পক্ষের মাধ্যমেই ফিরে না আসে। তবেই সার্থক হবে সেদিন নিজের বুক পেতে দেওয়া ল্যান্স করপোরাল মাহবুব আর আইভি রহমানসহ ২৪ জন শহীদের আত্মত্যাগ।