সঙ্গীতে সপ্তক | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পৃথিবী’ কবিতায় লিখেছিলেন— “দেবতার মন্ত্র উঠছে আকাশে বাতাসে অরণ্যে, দিনে রাত্রে, উদাত্ত অনুদাত্ত মন্দ্রস্বরে।” কবিগুরুর এই যে ‘উদাত্ত, অনুদাত্ত ও মন্দ্রস্বর’—সহজ কথায় এটাই কিন্তু সঙ্গীতের তিনটি মূল সপ্তক। গানের এই বিশাল দুনিয়ায় সুরের যে জটিল কারুকাজ আমরা শুনি, তার আসল বুনিয়াদ লুকিয়ে আছে এই সপ্তকের ভেতর।

নাম শুনেই বোঝা যায় ‘সপ্তক’ শব্দের মানে হলো সাতের সমাহার। সঙ্গীতের নিয়মে, নির্দিষ্ট সাতটি শুদ্ধ সুর বা স্বরের সেটকে একসাথে সপ্তক বলা হয়। তবে এই সাতটি চেনা সুরের আড়ালে আরও পাঁচটি চেনা-অচেনা সুর লুকিয়ে থাকে, যা ছাড়া একটা সপ্তক কখনোই পূর্ণতা পায় না।

সঙ্গীতে সপ্তক

সপ্তক

সপ্তক আসলে কীভাবে তৈরি হয়?

একটা সাধারণ সপ্তক মূলত আমাদের চেনা সাতটি শুদ্ধ স্বর— সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি—নিয়েই তৈরি। কিন্তু সঙ্গীতের গাণিতিক হিসেবে এই সাতটি ঘরের আশেপাশে আরও ৫টি স্বর উঁকিঝুঁকি মারে:

  • ৪টি কোমল স্বর: রে, গা, ধা, নি (এদের সুর স্বাভাবিকের চেয়ে একটু নিচু হয়)
  • ১টি কড়ি স্বর: মা (এর সুর স্বাভাবিকের চেয়ে একটু চড়া হয়)

তার মানে, ৭টি খাঁটি বা শুদ্ধ স্বর আর ৫টি বিকৃত (কোমল ও কড়ি) স্বর—সব মিলিয়ে মোট ১২টি স্বরের মেলবন্ধনে তৈরি হয় একটা আস্ত সপ্তক। ওয়েস্টার্ন মিউজিকে বা পশ্চিমা সঙ্গীতে একেই সবাই ‘অক্টেভ’ (Octave) নামে চেনে।

সপ্তক কত রকমের হয়?

আমরা সচরাচর যে গান-বাজনা শুনি বা ঘরে যে হারমোনিয়াম দেখি, তাতে মূলত ৩টি সপ্তকের খেলা চলে। সুরটা কতটা ভারী বা কতটা চড়া—তার ওপর ভিত্তি করেই এই ভাগগুলো করা হয়েছে:

১. মন্দ্র সপ্তক (Lower Octave):

এটা হলো সপ্তকের একেবারে নিচের তলা বা খাদের অংশ। এখানকার সুরগুলো খুব গম্ভীর, ভারী আর শান্ত হয়। স্বরলিপিতে চেনার সহজ উপায় হলো, এই স্বরগুলোর নিচে একটা করে ফুটকি বা বিন্দু থাকে (যেমন: স়)।

২. মধ্য সপ্তক (Middle Octave): আমাদের সাধারণ গায়কি বা বাজনার মূল চারণভূমি হলো এই মাঝখানের ঘরটি। এর সুরগুলো একদম নরমাল বা স্বাভাবিক স্কেলে থাকে। স্বরলিপিতে এর জন্য আলাদা কোনো সাইন বা চিহ্নের দরকার হয় না।

৩. তার সপ্তক (Upper Octave): এটা হলো চড়া বা হাই নোটের সপ্তক। এর সুরগুলো বেশ তীক্ষ্ণ, চঞ্চল আর জোরালো হয়। স্বরলিপিতে এই স্বরগুলোর মাথার ওপর একটা বিন্দু দিয়ে এদের আলাদা করা হয় (যেমন: সঁ)।

ক্ষমতার বাইরে আরও দুটি সপ্তক

সেতার, সরোদ কিংবা পিয়ানোর মতো বড় আর প্রফেশনাল বাদ্যযন্ত্রে এই ৩টি চেনা সপ্তকের বাইরে আরও দুটি বিশেষ সপ্তকের দেখা মেলে:

  • অতি-মন্দ্র সপ্তক: মন্দ্র সপ্তকের চেয়েও নিচু আর কলিজা কাঁপানো গম্ভীর সুর।
  • অতি-তার সপ্তক: তার সপ্তকের চেয়েও উঁচুর, যা কান ফুঁড়ে যাওয়ার মতো তীক্ষ্ণ।

তবে সাধারণ মানুষের গলা কিংবা ছোটখাটো বাদ্যযন্ত্রে এই দুটির ব্যবহার নেই বললেই চলে। বড়সড় গ্র্যান্ড পিয়ানো বা কনসার্ট সেতার ছাড়া এই দুটি সপ্তকের ছোঁয়া পাওয়া সত্যি অসম্ভব।

একনজরে সপ্তকের হিসাব-নিকাশ

  • মন্দ্র সপ্তক: সুরের প্রকৃতি গম্ভীর ও ভারী। চেনার উপায়— স্বরের নিচে বিন্দু ( . )
  • মধ্য সপ্তক: সুরের প্রকৃতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল। চেনার উপায়— কোনো বাড়তি চিহ্ন নেই।
  • তার সপ্তক: সুরের প্রকৃতি চড়া ও তীক্ষ্ণ। চেনার উপায়— স্বরের উপরে বিন্দু ( ˙ )

সপ্তক বিষয়ে আরও পড়ুন:

Leave a Comment