আমার হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় (১৬ জুন ১৯২০- ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শৈশবের দুপুরগুলোর কথা মনে পড়লেই কানে ভেসে আসে একটা অদ্ভুত শব্দ—এলপি রেকর্ডের সেই চিরচেনা ‘পিট-পিট’ আওয়াজ। হেমন্ত মুখার্জীর (১৬ জুন ১৯২০- ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) গান যেহেতু বেশিরভাগ এলপি থেকেই টেপে রেকর্ড হতো, তাই টেপে শুনলেও একই শব্দ পেতাম। আর সেই যান্ত্রিক শব্দের আড়াল ভেদ করে যে ভরাট, গম্ভীর ও মায়াবী কণ্ঠস্বরটি মুর্হুর্তে ভূবন ভরিয়ে দিত, তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আমার বেড়ে ওঠা, আমার কৈশোরের আবেগ আর সঙ্গীতের প্রথম পাঠ—সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে এই একটি নাম।

তখন সঙ্গীতের প্রায় কিছুই বুঝতাম না, শুধু বুঝতাম এক অদ্ভুত জাদুকরী গানের যাদু। এমন এক কণ্ঠ, যা শুনলে মনে হতো কোনো এক অদৃশ্য আশ্রয় আমাকে ঘিরে আছে। কিংবদন্তি সুরকার সলিল চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন, “হেমন্তের কণ্ঠ হলো ঈশ্বরের কণ্ঠ (Voice of God)।” বড় হওয়ার পর যখন এই উক্তিটি পড়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল, এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু হতে পারে না। বিধাতা যেন নিজের হাতে তাঁর গলায় সুরের ওম মেখে দিয়েছিলেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের ব্যাপ্তি বিশাল, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ভালোলাগার জায়গাটা দখল করে আছে সলিল চৌধুরী ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী জুটি। সলিল চৌধুরীর সুরের যে বৈচিত্র্য—কখনও পশ্চিমা সিম্ফনির ছোঁয়া, কখনও বা গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ—তা হেমন্তের গলায় এসে যেন পূর্ণতা পেত। সলিল চৌধুরী জানতেন হেমন্তের গলার ‘রেঞ্জ’ বা পাল্লা কতটুকু, আর হেমন্ত জানতেন সলিল কী চাইছেন। এই দুজনের রসায়ন কেবল গান সৃষ্টি করেনি, সৃষ্টি করেছিল ইতিহাস।

আমার জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়, যা আমার সঙ্গীত শোনার বোধকেই বদলে দিয়েছিল। কিশোর বয়সে পাঠ্যবইয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ‘রানার’ পড়েছিলাম। কবিতাটি পড়ার সময় রানারের জীবনের দুঃখ-কষ্ট আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল ঠিকই, মনে একটা বিষণ্ণতাও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু চোখ দিয়ে জল পড়েনি। মনে হয়েছিল, এটি একটি শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের বর্ণনা মাত্র।

কিন্তু সেই ধারণার আমূল পরিবর্তন হলো যেদিন সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘রানার’ গানটি শুনলাম।

রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে / রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে…”

গানের শুরুতে সেই দ্রুত লয়, আর তার সাথে হেমন্তের সেই উদাত্ত গলা—মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে উঠল এক দিগন্তবিস্তৃত অন্ধকার পথ। মনে হলো আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, পিঠে সংবাদের বোঝা নিয়ে এক ক্লান্ত মানুষ ছুটে চলেছে। গানের কথাগুলো যখন সুর হয়ে কানে বাজল—কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে / শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে—তখন অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে গেল শরীরে।

আর তারপর সেই লাইনগুলো—এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও / এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ…”—হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এই কথাগুলো গাওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠে যে কি হাহাকার আর দরদ ঢেলে দিয়েছিলেন, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। বইয়ের পাতায় যা ছিল শুধুই কালো অক্ষরে লেখা কিছু শব্দ, হেমন্তের গলায় তা হয়ে উঠল জীবন্ত এক ট্র্যাজেডি। সেদিন গানটি শুনতে শুনতে আমি কেঁদেছিলাম। রানারের ক্লান্তি, তার না-বলা বেদনা, প্রিয়তমার জন্য তার আকুতি—সব যেন আমার নিজের কষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, সুর আর কণ্ঠের জাদুতে শব্দের প্রাণ কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়। পরের কয়েকদিন বারবার মনে আসতো “রানার রানার কি হবে এ বোঝা বয়ে, কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে”…আর কণ্ট বন্ধ হয়ে আসতো।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বিশেষত্বই ছিল এই—তিনি যখন গাইতেন, তখন মনে হতো তিনি গান গাইছেন না, তিনি গল্প বলছেন। খুব কাছের কোনো মানুষ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে মনের কথাগুলো বলে যাচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠে কোনো বাহুল্য ছিল না, ছিল না ওস্তাদিয়ানার অহেতুক আস্ফালন। ছিল কেবল এক আকাশ সততা আর গাম্ভীর্য।

 

হেমন্ত মুখার্জীর আমার প্রিয় সব গান :

Leave a Comment