বাংলার মাটির পরতে পরতে কেমন যেন একটা উদাসী হাহাকার মিশে আছে। এ মাটির মানুষ যেমন হাসতে জানে, তার চেয়েও বুক উজার করে কাঁদতে জানে। আর এই কান্নার সবচেয়ে খাঁটি, গীতিময় রূপটার নামই হলো—‘জারি গান’। এটি কেবল নিছক কোনো গান নয়; এটি আসলে বাঙালির হৃদয়ের গহীন গোপন ক্ষত আর কারবালার সেই মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর ঝরে পড়া রক্তের এক মহাকাব্যিক সুরশালা।
‘অসুরের সুরলোকযাত্রা’ সিরিজের এই পর্বে আমরা ডুব দেব সেই বিষাদের সমুদ্রে, যেখানে মানুষের চোখের জল আর কণ্ঠের সুর এক হয়ে বুক চাপড়ে কাঁদে।

জারি গান
নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না
‘জারি’ শব্দটা কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ নয়; এটি এসেছে ফারসি থেকে। এর আভিধানিক অর্থ হলো—বিলাপ, ক্রন্দন বা বুক ফাটানো শোক প্রকাশ করা।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৭শ শতকের দিকে বাংলায় এই গানের ধারাটি ডালপালা মেলতে শুরু করে। মহররম মাস এলে কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের (রা.) সপরিবারে শাহাদাতবরণের সেই মর্মান্তিক কাহিনীকে স্মরণ করতেই এই গীতশৈলীর জন্ম।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? আরবের সেই মরুভূমির তপ্ত ইতিহাসকে বাংলার লোককবিরা নিজেদের ঘরের সুতোর মতো এমন নিপুণভাবে বুনেছেন, যার ফলে জারি গান আজ আর বিদেশি কোনো গল্প নয়—তা হয়ে উঠেছে একেবারে খাঁটি বাঙালি লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরিবেশনারীতি: যখন যুদ্ধ আর হাহাকার এক মঞ্চে নামে
ইসলামের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে বাংলায় যত লোকনাট্যের ধারা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে জারি গান বোধহয় সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং একই সাথে সবচেয়ে জমকালো। এর পরিবেশনা যেমন বীরত্বের তেজে ভরা, তেমনই তা চোখ ভিজিয়ে দেওয়ার মতো করুণ।
সেই চেনা বয়াতি আর দোহারের দল: জারি গান কখনো একা একা গাওয়া যায় না, এটি পুরোপুরি একটা দলগত আর্ট ফর্ম। দলের মূল কাণ্ডারি বা প্রধান গায়ককে আমরা বলি ‘বয়াতি’ বা ‘মূল গায়েন’। আর তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে যে সহকারীদের দল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের নাম ‘দোহার’ বা ‘পালি’।
পায়ের তাল আর হাতের রুমাল: জারি গানে এক সময় তুমুল বীরত্বব্যঞ্জক নৃত্যের চল ছিল। এখনো গ্রামীণ আসরগুলোতে হাতে লাল-নীল রুমাল কিংবা লাঠি নিয়ে একদল মানুষ বৃত্তাকারে ঘোরে। তাদের পায়ের নিখুঁত তালের সাথে যখন ঢোল, খঞ্জনি আর মন্দিরা বেজে ওঠে, তখন এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি হয়। সুরের মধ্যে যেমন থাকে কারবালার তৃষ্ণার্ত হাহাকার, তেমনই যুদ্ধের বর্ণনায় বয়াতির কণ্ঠে ভর করে এক ওজস্বী তেজ।
মার্সিয়া আর বুক চাপড়ানোর শব্দ: গানের প্রতিটি অন্তরা বা কলি যখন শেষ হয়, তখন বয়াতি একটু জিরিয়ে নেন। আর ঠিক তখনই দোহাররা সমস্বরে ‘ধুয়ো’ ধরে বুক চাপড়ে এক ঘোরলাগা শোকাতুর পরিবেশ তৈরি করে। সেই সমবেত কান্নার আওয়াজ শুনলে মনে হয়, শত বছর আগের কারবালার সেই ট্র্যাজেডি যেন আজই চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
কারবালা ছাড়িয়ে মানুষের জীবনের গল্পে
সময়ের চাকা যত ঘুরেছে, জারি গান কিন্তু শুধু কারবালার ওই একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেনি। বাংলার লোককবিরা ছিলেন বড্ড খামখেয়ালি আর সমাজসচেতন। তারা এই জারির সুরের ভেতরের শক্তিটাকে টের পেয়েছিলেন। তাই ধীরে ধীরে এর মধ্যে ঢুকে পড়ল সমাজের নানা অসঙ্গতি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, লৌকিক-অলৌকিক কিচ্ছা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়াবলী।
এমনকি কোথাও কোথাও কবিগানের মতো দুই দলের বয়াতিদের মধ্যে ধারালো তর্কমূলক ‘জারির লড়াই’ বা ‘ধাঁধার জারি’র আসরও বসতে শুরু করল। অঞ্চলভেদেও এর রূপ বদলেছে; ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা আর ফরিদপুর অঞ্চলের জারির সুরে রয়েছে মাটির নিজস্ব আলাদা আলাদা সুবাস।
অস্তিত্বের সংকট: মহররমের চাঁদ কি আজও কাঁদে?
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামবাংলার হাটে-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে সামিয়ানা টাঙিয়ে সারা রাত ধরে জারি গানের আসর বসত। হ্যারিকেনের আলোয় হাজার হাজার মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে শুনত সেই সুর। আজ আধুনিক ডিজিটাল বিনোদন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর ফেসবুক স্ক্রলিংয়ের ভিড়ে সেই আসরগুলো অনেকটাই ম্লান, মলিন। সংরক্ষণ আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক গুণী বয়াতি আজ হারিয়ে গেছেন।
কিন্তু জারি গান তো এই বাংলার শেকড়ের সুর, একে কি অত সহজে মুছে ফেলা যায়? আজও যখন মেঘলা আকাশে মহররমের চাঁদ ওঠে, পল্লী বাংলার কোনো এক নিভৃত জনপদে বুক চেরা দীর্ঘশ্বাসে বেজে ওঠে— “হায় হোসেন! হায় হোসেন!”
জারি গান আমাদের একটা বড় সত্য শেখায়—কীভাবে জীবনের চরমতম শোক আর বিয়োগান্তক ইতিহাসকেও পরম মমতায় সুরের মালা বানিয়ে বুকে আগলে রাখা যায়। এই ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিড়ে আমাদের এই অতি মানবিক, মাটির গন্ধমাখা লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বেরই স্বার্থে বড্ড প্রয়োজন।
আরও দেখুন:
