রাগ রাগেশ্রী ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ প্রাচীন এবং খাম্বাজ অঙ্গের রাগগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয়। এর আরেকটি বহুল প্রচলিত নাম হলো ‘রাগেশ্বরী’। এই রাগে পঞ্চম (প) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত। সংগীতে ‘পঞ্চম’ বা ‘পা’ হলো এমন এক স্বর যা সুরকে একটা সোজা অবলম্বন দেয়। যখনই কোনো রাগে এই পঞ্চমকে ছেঁটে ফেলা হয়, তখন সুরের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর গভীর ব্যাকুলতা তৈরি হয়। এছাড়া এর আরোহে ঋষভ (রে) বর্জিত থাকে, যা একে আরও বেশি বক্র ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতির কথা বললে, কালজয়ী ‘মুঘল-এ-আজম’ চলচ্চিত্রে ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ সাহেবের কণ্ঠে গাওয়া সেই বিখ্যাত গান—“শুভ দিন আয়ো রাজ দুলারা…” এই রাগেশ্রী রাগেরই এক অনবদ্য এবং শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। গানটি শুনলেই বোঝা যায় কীভাবে এই রাগটি একই সাথে রাজকীয় আভিজাত্য এবং শান্ত মন ভালো করা এক তৃপ্তি বয়ে আনে।
রাগ রাগেশ্রী
রাগের ব্যাকরণ
খুব সহজ করে রাগেশ্রীর ব্যাকরণ বা শাস্ত্রীয় নিয়মগুলো নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো:
- অন্যান্য নাম: রাগেশ্বরী, রাগেশ্রি।
- ঠাট: খাম্বাজ।
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা গ ম ধ নি সঁ (নোটেশন: স গ, ম ধ, ন র্স — এখানে আরোহের ‘নি’ শুদ্ধ)।
- অবরোহ: সঁ নি ধ ম গ রে সা (নোটেশন: র্স ণ ধ, ম গ, র স — এখানে অবরোহের ‘নি’ কোমল)।
- বাদী স্বর: গান্ধার (গ)।
- সমবাদী স্বর: নিষাদ (নি)।
- (অনেকের মতে বাদী-সমবাদী যথাক্রমে মধ্যম ও ষড়জ অথবা নিষাদ ও গান্ধার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (প) বর্জিত। অবরোহে কেবল পঞ্চম (প) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: আরোহে শুদ্ধ নিষাদ এবং অবরোহে কোমল নিষাদের প্রয়োগ হয় (তবে কোনো কোনো ঘরানায় কেবল কোমল নিষাদ ব্যবহারের চলও আছে)। বাকি স্বরগুলো (রে, গ, ম, ধ) শুদ্ধ রূপে ব্যবহৃত হয়।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর, মধুর এবং রোমান্টিক (শৃঙ্গার ও শান্ত রস প্রধান)।
- চলন: ধ্ ণ্ স গ ম, ধ ন ধ ম গ, র স (পকড় বা রাগের চাবিকাঠি)।
রাগেশ্রী রাগের সবচেয়ে চমৎকার অলংকার হলো এর দুই প্রকার নিষাদের (নি) ব্যবহার। আরোহের গতিতে যখন সুর উপরের দিকে ধাবিত হয়, তখন শুদ্ধ নিষাদ (নি) ব্যবহার করে সরাসরি তার সপ্তকের ষড়জে (সঁ) গিয়ে থিতু হওয়া হয় (যেমন: ম ধ নি সঁ)। কিন্তু অবরোহের সময় যখন সুর নিচের দিকে নামতে থাকে, তখন অবধারিতভাবে কোমল নিষাদ (ণ) ছুঁয়ে নামতে হয় (যেমন: সঁ ণ ধ ম)।
তবে কোনো কোনো ঘরানায় (যেমন জৌনপুরী বা গুয়ালিওর) মন্দ্র সপ্তকে (নিচু স্বরে) উদার উদারভাবে কোমল নিষাদের আন্দোলন করা হয় (ধ্ ণ্ সা), যা রাগের গাম্ভীর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সংগীতে পঞ্চম স্বরকে বলা হয় ‘স্থির’ বা ‘অটল’ স্বর। রাগেশ্রীতে এই পঞ্চমকে সম্পূর্ণ বর্জন করার ফলে সুরের কাঠামোতে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়। মধ্যম (ম) থেকে সরাসরি ধৈবতে (ম -> ধ) যাওয়ার এই যে দীর্ঘ লাফ (Skip), এটি শ্রোতার অবচেতন মনে এক ধরণের শূন্যতা, অপেক্ষা এবং তীব্র আকুলতার জন্ম দেয়। এই কারণে রাগেশ্রী শান্ত প্রকৃতির রাগ হলেও এর ভেতর এক প্রচ্ছন্ন বিরহী ভাব কাজ করে।
রাগেশ্রী রাগকে চেনার জন্য এবং অন্য রাগ থেকে একে আলাদা করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্বরগুচ্ছ বারবার ব্যবহার করা হয়। এর প্রধান স্বরসঙ্গতিগুলো হলো:
সা গা ম ধ: এটি রাগের মূল ভিত্তি। এখানে ঋষভকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গান্ধার থেকে মধ্যম হয়ে ধৈবতে যাওয়া হয়।ম ধ ণ ধ ম: কোমল নিষাদকে ছুঁয়ে ধৈবতে ফিরে এসে মধ্যমে স্থায়িত্ব নেওয়া।ম গ রে সা: অবরোহের সময় ঋষভ (রে) খুবই দুর্বল বা ‘অল্প’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে গান্ধার থেকে ঋষভ হয়ে যখন ষড়জে আসা হয়, তখন ঋষভকে খুব মৃদুভাবে স্পর্শ করা হয়, কোনো ঝাঁকুনি দেওয়া হয় না।
ভাতখন্ডে পদ্ধতি অনুযায়ী রাগেশ্রীর বাদী স্বর গান্ধার (গ) এবং সমবাদী স্বর নিষাদ (নি)। যেহেতু গান্ধার (বাদী) একটি গম্ভীর স্বর, তাই মধ্য সপ্তকে এই রাগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি খোলতাই হয়।
তবে ইন্দোর বা আগ্রা ঘরানার অনেক পণ্ডিত মনে করেন, এই রাগের চলনে মধ্যম (ম) এবং ষড়জ (সা)-এর গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। তাঁদের মতে, সা-ম এবং ম-সা এর এই মেলবন্ধন রাগটিকে একধরণের ‘মাধুর্যপূর্ণ স্থিরতা’ দেয়।
গান গাওয়ার সময় যে স্বরগুলোতে শিল্পী বেশিক্ষণ অবস্থান করেন বা বিশ্রাম নেন, সেগুলোকে ন্যাস স্বর বলে। রাগেশ্রীর ন্যাস স্বরগুলো হলো—ষড়জ (সা), গান্ধার (গ), এবং মধ্যম (ম)। বিশেষ করে মধ্যম স্বরে এসে যখন দীর্ঘ মীড় বা আন্দোলন করা হয়, তখন রাগেশ্রীর আসল রূপটি প্রস্ফুটিত হয়।
রাগেশ্রী রাগের গান বাজনা:
আর শাস্ত্র না কপচে চলুনএই রাগে কিছু গানবাজনা শুনে নেয়া যাক।
নজরুলের গানে রাগেশ্রী:
- কার অনুরাগে শ্রী-মুখ উজ্জ্বল
- সংসারেরি দোলনাতে মা ঘুম পাড়িয়ে
- হে প্রবল দর্পহারী কৃষ্ণ-মুরারি
- চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না (এই গানটিতে পিলুর মিশ্রন রয়েছে, তাই একে রাগেশ্রী-পিলু বলাই ভালো)।
- তব ঐ দু’টি চঞ্চল আঁখি (মিশ্র রাগেশ্রী)
রাগেশ্রী সম্পর্কিত রাগের তালিকা
রাগেশ্রীর চলন ও স্বরের সাথে মিল রয়েছে এমন কিছু রাগের তালিকা ও তাদের সম্পর্ক নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ বাগেশ্রী: বাঘেশ্রীতে কোমল গান্ধার ব্যবহৃত হয়, কিন্তু রাগেশ্রীতে গান্ধার সবসময় শুদ্ধ।
- রাগ খাম্বাজ: একই ঠাটের রাগ হলেও খাম্বাজে সাতটি স্বরই সরলভাবে লাগে, কিন্তু রাগেশ্রীতে পঞ্চম বর্জিত হওয়ায় এর চলন আলাদা।
- রাগ কালাশ্রী: কালাশ্রী মূলত রাগেশ্রী এবং কলাবতী রাগের মিশ্রণে তৈরি একটি আধুনিক রাগ।
- রাগ মালগুঞ্জী: এই রাগে রাগেশ্রীর ছায়া স্পষ্ট, তবে এতে শুদ্ধ ও কোমল—উভয় গান্ধারই দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হয়।
রাগ রাগেশ্রী হলো সুরের এমন এক নিঝুম রাত যেখানে কোনো কোলাহল নেই। পঞ্চম বর্জিত এই রাগের মায়াবী চলন যখন মন্দ্র আর মধ্য সপ্তকে ঘোরাফেরা করে, তখন শ্রোতা এক পরম শান্তিতে চোখ বুজে ফেলেন। কাঁচা হাতের কাজ এই রাগের মেজাজ নষ্ট করে দিতে পারে, তাই রাগেশ্রী ফোটাতে প্রয়োজন এক বুক ধৈর্য আর স্বরের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ থেকে শুরু করে আজকের যুগের গুণী শিল্পীরা যখনই এই রাগের আলাপ ধরেন, তখনই চারপাশের বাতাস যেন এক অদ্ভুত মায়ায় ভারী হয়ে ওঠে।
টিউটোরিয়াল:
যেকোন রাগের স্বরের চলেফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বরমালিকা বা সারগাম-গীত শোনা দরকার। স্বর মলালিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষনগীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। লক্ষনগীতের মাধ্যমে খুব সহজে রাগের লক্ষনগুলো ফুটিয়ে তোলা যায়। লক্ষনগীত ছোট খেয়াল প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে অনেক গুলো আছে। একটু খোঁজাখুজি করলে পেয়ে যাবেন। স্যাম্পল হিসেবে নিচের দুটো লিংক দেয়া হল।
১. NCERT OFFICIAL বাগেশ্রী রাগের টিউটোরিয়াল ।
তথ্যসূত্র (Sources)
নিবন্ধটির তথ্যাদি অত্যন্ত যত্ন সহকারে নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:
১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
২. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।
৪. মুঘল-এ-আজম (চলচ্চিত্রের শাস্ত্রীয় সংগীত আর্কাইভ) — ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ-র রাগ বিশ্লেষণ।
আরও দেখুন:
