আমরাও চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ শব্দটি এখন একটি বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক পরিভাষা। বিশেষ করে বিএনপি এই দাবিকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই দাবির বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট এবং প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এটি অনেকাংশেই একটি কৌশলগত অবস্থান, যার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট।

১. ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’: দাবি না কৌশল?

একটি রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে, প্রার্থী দেয়, প্রচারণা চালায়—তখন একইসঙ্গে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ দাবি করা একটি স্ববিরোধী অবস্থান তৈরি করে। যদি নির্বাচন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে অংশগ্রহণ কেন? আর যদি অংশগ্রহণ করা যায়, তাহলে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলার ভিত্তি কোথায়?

এই দ্বৈত অবস্থান রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হয়—যেখানে ফলাফল অনুকূলে না হলে আগাম অজুহাত প্রস্তুত রাখা হয়।

২. সহিংস রাজনীতি ও নৈতিক প্রশ্ন

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়—রাজনৈতিক সহিংসতা।

জামায়াত-বিএনপি জোটের আন্দোলনের সময় সংঘটিত পেট্রোলবোমা হামলায় বহু সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহিংসতার অংশ। তিন মাসব্যাপী অবরোধে পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর এই ধরনের সহিংসতা ঘটে, সেখানে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর দাবি কতটা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য? একটি সমতাভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবেশের পূর্বশর্তই হলো—ভয়মুক্ত ও সহিংসতামুক্ত সমাজ।

৩. নির্বাচনী ইতিহাস: অতীতের প্রমাণ

বিএনপির আমলে অনুষ্ঠিত মাগুরা এবং ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে ভোট কারচুপির উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। ২০০৩ সালের রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। রাত ৮টা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী এগিয়ে থাকার পর হঠাৎ করে তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনাগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং দেখায়—ক্ষমতায় থাকলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর দাবি তখন অনুপস্থিত ছিল।

৪. সমসাময়িক বাস্তবতা: ফলাফল ও দাবি

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের আমলে ১১টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে ৯টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন।

এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—যদি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকে, তাহলে এই ধারাবাহিক বিজয় কীভাবে সম্ভব? আর যদি এই নির্বাচনে জয় সম্ভব হয়, তাহলে একই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলা কি যুক্তিসঙ্গত?

৫. দ্বৈত রাজনৈতিক আচরণ

এখানে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা দেখা যায়:

  • জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয় না—কারণ ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয়—এবং সেখানে জয়লাভও করা হয়
  • নির্বাচনের আগে অভিযোগ, নির্বাচনের পরে বিজয় দাবি

এই আচরণ একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কৌশলকে নির্দেশ করে, যেখানে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ একটি নীতিগত অবস্থান নয়, বরং পরিস্থিতিভিত্তিক একটি হাতিয়ার।

৬. বাস্তব লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেমন হওয়া উচিত?

প্রকৃত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কোনো স্লোগান নয়—এটি একটি বাস্তব অবস্থা, যা নিশ্চিত করতে হয় রাজনৈতিক আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সত্যিকারের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মানে—

  • রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান
  • ভোটারদের নিরাপদ অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা
  • নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
  • এবং ফলাফলকে মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি

আমরা সাধারণ মানুষ তাই শুধু কথার ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নয়— বাস্তবের একটি সমান, নিরাপদ এবং বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ চাই। কারণ গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু কোনো রাজনৈতিক দল নয়— গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হলো জনগণ।

Leave a Comment