বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কাল এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। উন্নয়নের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও এই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল পরিকল্পিতভাবে লাভজনক শিল্পকারখানা বন্ধ করা, লুটপাট এবং দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের শিল্প খাতকে পঙ্গু করে দেওয়া। নিম্নে সেই দুঃশাসনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. আদমজী জুট মিল: বাঙালির গর্বকে এক নিমেষে বিনাশ
বাংলার পাটের সোনালী ইতিহাসের প্রতীক ছিল নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিল। এটি কেবল এশিয়াই নয়, বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০০২ সালের ৩০ জুন কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছাড়াই এই বিশাল শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কর্মহীন ২৫ হাজার শ্রমিক: আদমজী বন্ধের ফলে সরাসরি ২৫ হাজার শ্রমিক তাদের জীবিকা হারান এবং পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়ন: অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর পাটকলকে সুবিধা করে দিতেই সুপরিকল্পিতভাবে এই লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছিল।
২. পরিকল্পিত ‘বিরাষ্ট্রীয়করণ’ ও লুটেরা নীতি
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে ‘বিরাষ্ট্রীয়করণ’ বা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের নামে সরকারি সম্পদ পানির দরে দলীয় সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
লুটেরাদের হাতে কারখানা: অনেক মিল-কারখানা লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে লোকসানি দেখিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে লিজ বা বিক্রি করা হয়। পরবর্তীতে দেখা গেছে, এসব কারখানার জমি ও যন্ত্রাংশ বিক্রি করে লবিস্টরা হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
উৎপাদন বন্ধ: অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারখানাগুলো বেসরকারি মালিকানায় যাওয়ার পর নতুন মালিকরা উৎপাদন চালু না করে আবাসন বা অন্য কাজে জমি ব্যবহার শুরু করে।
৩. পাট ও বস্ত্র খাতের চরম বিপর্যয়
এক সময় যে পাটকে ‘সোনালী আঁশ’ বলা হতো, জোট সরকারের আমলে তা অভিশাপে পরিণত হয়। আদমজী ছাড়াও পাবনা, যশোর ও খুলনার বহু পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। বস্ত্র ও চিনি কলগুলোতেও তালা ঝোলানো হয়।
পাবনা সুগার মিল ও চিনি শিল্প: উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান কৃষিভিত্তিক শিল্প হওয়া সত্ত্বেও চিনি কলগুলোকে আধুনিকায়ন না করে অবহেলার মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
বস্ত্র কল: দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সরকারি সুতি কলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার তাঁত শ্রমিক পথে বসেন।
৪. বিদ্যুৎ সংকট ও শিল্পে অচলাবস্থা
শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিদ্যুৎ। কিন্তু জোট আমলে ‘হাওয়া ভবন’-এর নজিরবিহীন লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ার বদলে কমে গিয়েছিল।
লোডশেডিং ও উৎপাদন ঘাটতি: ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের চালু থাকা বেসরকারি কল-কারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। সচল শিল্পগুলোর চাকাও তখন স্থবির হয়ে পড়ে।
টংজীর বিসিক শিল্পনগরী: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে টংজী, সাভার ও চট্টগ্রামের বিসিক শিল্পনগরীর শত শত ছোট-বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
৫. শ্রমিক আন্দোলন ও নিষ্ঠুর দমনপীড়ন
রুটি-রুজির দাবিতে যখন শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছে, তখন বিএনপি-জামাত সরকার সংলাপের বদলে বন্দুকের ভাষা বেছে নিয়েছিল।
গুলি করে শ্রমিক হত্যা: আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কাঞ্চন ব্রিজ ও ডেমরায় শ্রমিকদের রক্তাক্ত লাশের মিছিল আজও ভুক্তভোগীদের মনে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
শ্রমিক ইউনিয়ন ধ্বংস: শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভেঙে দিয়ে সেখানে দলীয় সশস্ত্র ক্যাডারদের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
ধ্বংস বনাম পুনর্গঠন
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সেই ৫ বছর ছিল বাংলাদেশের শিল্পায়নের পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা। তারা কেবল মিল-কারখানা বন্ধ করেনি, বরং লাখ লাখ পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিয়েছিল। বিপরীতে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কারখানা পুনরায় চালু করেছে এবং নতুন নতুন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EZ) গড়ে তুলে শিল্প খাতকে আবার চাঙ্গা করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিল্প ধ্বংসকারী শক্তি কখনই দেশের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। সমৃদ্ধ বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে সেই দুঃশাসনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা আজ সময়ের দাবি।
