আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সেক্যুলারিজম – কি, কেন, কিভাবে?

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং সেক্যুলারিজম নিয়ে ইদানীং আবার নতুন করে বিতর্ক উসকে দেওয়া হয়েছে। আমি খুব হতাশার সাথে লক্ষ্য করছি যে, আমাদের অনেক সহযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সুপরিকল্পিত অপপ্রচারে আক্রান্ত হচ্ছেন। যথাযথ তাত্ত্বিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে তাদের যুক্তির মোকাবিলা করতে পারছেন না এবং বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

মনে রাখা প্রয়োজন, প্রগতিশীল রাজনীতি করতে হলে এই জাতীয় মৌলিক বিষয়গুলোতে একেবারে স্পষ্ট ধারণা থাকার কোনো বিকল্প নেই। আমি ইতিপূর্বে এই বিষয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক ছোট ছোট লেখা নিয়মিত লিখেছি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এবার একটি দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধ লিখলাম।

Table of Contents

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা

আশা করছি, এই লেখাটি পাঠকের সামনে স্পষ্ট করবে—ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং সেক্যুলারিজম আসলে কী? এর ঐতিহাসিক উৎস কোথায়? ইসলামের দর্শনের সাথে এর সম্পর্ক কেমন? আমাদের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত অসাম্প্রদায়িক নীতির সাথে এর সংযোগ কোথায়?

আমি বিশেষ করে আমাদের রাজনীতির সাথে যুক্ত তরুণ প্রজন্মকে বলব—লেখাটি কয়েকবার গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে। রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাম্প্রদায়িক আক্রমণ রুখতে হলে এই তাত্ত্বিক স্বচ্ছতা আপনাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা কি?

প্রয়াত ধর্মতত্ত্ববিদ ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ধর্মনিরপেক্ষতার বিশ্লেষণ করে বলেন:

‘ধর্ম নিরপেক্ষতার দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত ধর্মকে সব রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ন্যায়বিচার, প্রশাসন, অর্থ ও রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিধানগুলো বাতিল, অচল বা প্রয়োগ অযোগ্য বলে বিশ্বাস করা। প্রথম বিষয়টি ইসলাম নির্দেশিত ও ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি ও দ্বিতীয় বিষয়টি ইসলামি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও কুফর।’ (ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ)।

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বলা প্রথম “দিক”টির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো “ধর্মীয় স্বাধীনতা”র সীমা নির্ধারণ। অর্থাৎ, আপনি কোরআন ও হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে সমাজের প্রচলিত আচার ও আইনের সীমা অতিক্রম করতে পারবেন কি না। বিষয়টি বুঝতে কিছু উদাহরণ দেখা যাক:

সামাজিক ও আইনি উদাহরণ

১. আমাদের সামাজিক সৌজন্য হলো—সনাতন ধর্মের কাউকে দাওয়াত দিলে গরুর মাংস পরিবেশন না করা। একইভাবে কোনো অমুসলিম ব্যক্তি তার মুসলিম বন্ধুকে দাওয়াত দিলে শুকরের মাংস এড়িয়ে চলেন। এখানে মুসলিম হিসেবে আপনার ‘হালাল স্বাধীনতা’কে সামাজিক সম্প্রীতির স্বার্থে কিছুটা সংকুচিত করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় বা আইনিভাবে এখানে সীমানা কোনটি নির্ধারিত হবে?

২. বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তি ব্যক্তিগত জীবনে শরিয়ার সব বিধান মানেন না। অনেকে জুয়া খেলেন, মদ্যপান করেন বা জেনায় লিপ্ত হন। রাষ্ট্রীয় অনুমতিতে জুয়া বৈধ, লাইসেন্স নিয়ে মদ্যপান করা যায় এবং কোনো পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে জেনাতেও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু “আমর বিল মা’রূফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার” (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) পালন করতে গিয়ে আপনি যদি এগুলো খুঁজে বের করে বাধা দিতে চান, তবে রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক রীতি ক্ষুণ্ণ হবে। আবার বাধা দিতে না পারায় আপনি অভিযোগ করতে পারেন যে আপনার ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এখানে সীমানা কোনটি নির্ধারিত হবে?

চরম পর্যায়ের উদাহরণ

কারো কথা শুনে আপনার মনে হতে পারে যে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে কটূক্তি করছেন। এমনকি সঠিক প্রেক্ষাপট না জানার কারণে কেউ যদি হাদিসের উদ্ধৃতিও দেয়, আপনার কাছে তা কটূক্তি মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্পষ্ট হাদিস আছে: “মান সাব্বা নাবিয়ান ফাক্বতুলুহু”। এখন আপনি যদি উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করা নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে আপনি দাবি করতে পারেন যে আপনার ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। অন্যদিকে, আপনি বা আপনার কথা শুনে এই আমল কেউ করলে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হবে। এখানে সীমানা কোনটি নির্ধারিত হবে?

সুতরাং, ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরের প্রথম অপশনটি বাস্তবায়ন করতে গেলেও সেখানে একটি নিরপেক্ষ বা সেকুলার আইন দিয়ে “ধর্মীয় স্বাধীনতা”র সীমা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের বিশ্বাস বনাম সামাজিক চুক্তি

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটির সীমাবদ্ধতা হলো—তিনি ধরে নিচ্ছেন রাষ্ট্রের ‘বিশ্বাস’ করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্র একটি চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের কোনো প্রাণ নেই, নফস বা আত্মা নেই। রাষ্ট্র মূলত একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract)। প্রয়োজন হলে সেই চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা যায়; এমনকি চুক্তি ভেঙে দিয়ে নতুন চুক্তিও করা সম্ভব (যেটি আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে করেছি)।

রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো বিশ্বাস থাকে না, থাকার প্রয়োজনও নেই। রাষ্ট্রের কাজ সবার বিশ্বাসকে শান্তিপূর্ণভাবে ধারণ (Accommodate) করা, কারো বিশ্বাসে নিজে বিশ্বাসী হওয়া নয়।

তাহলে কি করতে হবে?

কার্যকরভাবে রাষ্ট্র চালাতে গেলে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হবে প্রতিটি ধর্ম বা মতের (সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু) মানুষের সহাবস্থানের জন্য সবার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সীমা নির্ধারণ করে একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রণয়ন করা। রাষ্ট্র বিশ্বাসের কারণে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেবে না বা বঞ্চিত করবে না। এটি নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাসের কাঠামোর মধ্যে থাকা চলবে না। রাষ্ট্রের নিজের চরিত্র যদি কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়, তবে তার আচরণ ‘জুডিশিয়াস’ বা ন্যায়বিচারমূলক হতে পারে না। বিচারকের আসন থেকে রাষ্ট্রকে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হতে হলে তাকে নিরপেক্ষ হতে হয়। আর আমার কাছে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা ঠিক এটাই।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সেক্যুলারিজম - কি, কেন, কিভাবে?

 

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা: পশ্চিমা ধারণার সাথে পার্থক্য ও স্বরূপ

উৎস ও আবিষ্কারের ভিন্নতা

পশ্চিমের ‘সেকুলারিজম’ এবং আমাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র উৎস, প্রেক্ষাপট ও অর্থ এক নয়। পশ্চিমা গণতন্ত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মহীনতা নয়। তবে কিছু গোষ্ঠী দুরভিসন্ধি নিয়ে একে কমিউনিজমের ‘ধর্মহীনতা’ হিসেবে প্রচার করতে চায়, যা একটি স্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা। পশ্চিমের সেকুলারিজমের সাথে আমাদের কিছু মিল থাকলেও, ধর্মহীনতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ধারকগণ চক্রান্ত করেই সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চান যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মের বিনাশ।

পশ্চিমা সেকুলারিজম: সংঘাত থেকে জন্ম

পশ্চিমা বিশ্বে এই ধারণার উদ্ভব হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী ও যৌক্তিক প্রয়োজনে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা ও চার্চের (ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান) দ্বন্দ্বে ব্যাপক অন্যায়-অবিচার হয়েছে। ইউরোপ দেখেছে, কীভাবে ধর্মীয় পাদ্রিগণ ক্ষমতার সাথে মিশে ধর্মকে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার বানাতেন। এতে ধর্মের পবিত্রতা যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে অন্যায্য কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

অতীতের সেই ধর্মযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র ও চার্চের সংঘাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সম্পূর্ণ আলাদা করার তত্ত্ব প্রদান করেন। ডিকশনারির ভাষায় যার অর্থ: ‘The belief that religion should not be involved in the organization of society, education, etc.’ পশ্চিমে ধর্ম দিয়ে অত্যাচার বেশি হয়েছে বলেই তারা রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদ নিয়ে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও সচেতন।

ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট: একটি স্বাভাবিক জীবনধারা

আমাদের এই ভারত উপমহাদেশে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কোনো আমদানিকৃত তত্ত্ব নয়, বরং এটি হাজার বছরের একটি প্রাকৃতিক সামাজিক কাঠামো। আমাদের সমাজ আদিকাল থেকেই বহুমাত্রিক ও সহনশীল ছিল বলেই একে আলাদা করে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন পড়েনি। হাজার বছর ধরে এখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ একসাথে বসবাস করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত মানুষ এই জনপদেই আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।

সম্ভবত এই সহজ ও স্বাভাবিক সহাবস্থানের কারণেই এই ধারণা প্রকাশের জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো পারিভাষিক শব্দ আগে তৈরি হয়নি। আধুনিককালে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে আমরা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ব্যবহার করছি বটে, তবে এর মূল স্পিরিট আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। আমরা পশ্চিমাদের মতো ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে অতটা কঠোর নই, কারণ আমাদের এখানে ধর্ম রাষ্ট্রকে গ্রাস করার চেয়ে সমাজকে সংহতি প্রদানে বেশি ভূমিকা রেখেছে।

বিভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা

কমিউনিজমের ‘ধর্মহীনতা’র (Atheism/Irreligion) সাথে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি আমাদের দেশের কমিউনিস্ট দলগুলোও রাজনৈতিকভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে ‘ধর্মহীন’ নয়।

পশ্চিমা সেকুলারিজম যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্মের ‘বিচ্ছেদ’ (Separation) নিশ্চিত করে, আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা সেখানে সব ধর্মের ‘সহাবস্থান’ (Co-existence) নিশ্চিত করে। রাষ্ট্র এখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের পক্ষ নেবে না, কিন্তু নাগরিকদের ধর্ম পালনের অধিকারকে সম্মান জানাবে। এই মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে পারলে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিদ্যমান অনেক রাজনৈতিক চক্রান্ত ও বিভ্রান্তির অবসান সম্ভব।

 

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কি কেবল সংখ্যালঘুদের জন্য জরুরি?

একটি ভুল ধারণা ও তার বাস্তবতা

অনেকেই মনে করেন, অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামো কেবল হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের মতো সংখ্যালঘুদের রক্ষার কবচ। কিন্তু সত্য হলো, মুসলিমদের জান-মাল ও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটি আরও বেশি জরুরি। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো রাষ্ট্রে ধর্মের রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক আধিপত্য নিরঙ্কুশ হয়েছে এবং অন্য ধর্মের মানুষ নিঃশেষ হয়েছে, তখনই মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন ফেরকা বা উপদলে বিভক্ত হয়ে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত

পাকিস্তান এর একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে তথাকথিত ‘নিজের ফেরকার ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার নেশায় মুসলমানরা অন্য ফেরকার মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। জেহাদের নামে খোদ মসজিদের ভেতরে বোমা মারতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করছে না। যারা ভাবেন আমাদের দেশে ফেরকাগত সমস্যা নেই, তাদের অনুরোধ করব বিভিন্ন ঘরানার আলেমদের লেখা বইগুলো একবার পড়ে দেখতে। সেখানে তাকালে কয়েকটি ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

১. পরস্পরকে কাফের ঘোষণা: প্রায় সব ফেরকার কিতাবেই অন্য ফেরকাকে ‘কাফের’ বা ‘বাতিল’ ঘোষণা করে রাখা হয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কখন এই ঘৃণাগুলো জনসমক্ষে বড় আকারে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

২. রাজনীতির সস্তা পুঁজি: সাম্প্রদায়িক রাজনীতি হলো সবচেয়ে কম পুঁজির এবং লাভজনক রাজনৈতিক ব্যবসা। এই ব্যবসার লোভে যারা একবার পড়েছে, তারা শান্ত হয়ে বসে থাকবে না। তারা প্রতিনিয়ত আপনার মধ্যে এক বিষাক্ত ‘সেন্স অফ কমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীচেতনা তৈরি করবে, যার মাধ্যমে আপনি শিখবেন—আপনার গ্রুপ কোনটি আর আপনার ‘শত্রু’ কারা।

৩. দ্রুত পোলারাইজেশন: ফেরকা বা উপদলের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলতে খুব বেশি সময় লাগে না। দু-চারটি হত্যাকাণ্ড, মসজিদ-মাদ্রাসায় আক্রমণ বা কিছু গুজবই যথেষ্ট। দেখবেন, কোনো ফাঁকে আপনি নিজেই লাঠি হাতে নিজ গোষ্ঠীর হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন।

রাষ্ট্র বনাম পরকাল: একটি সতর্কবার্তা:

প্রিয় ভাই ও বোন, মনে রাখবেন—রাষ্ট্র আপনাকে বেহেশতে নিয়ে যাবে না, এমনকি সে পথে এগিয়েও দেবে না। পবিত্র কুরআনের সূরা লোকমানে মহান আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন:

“তোমাদের সবার সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি মাত্র প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই সমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” (৩১:২৮)

পরকালে আপনার বিচার হবে একজন ব্যক্তি হিসেবে, আপনার নিজস্ব পাপ-পুণ্য আর আমল দিয়ে। তথাকথিত ‘ইসলামিক রাষ্ট্রের’ নাগরিক হওয়ার কারণে সেখানে কোনো ‘ডিসকাউন্ট’ বা বিশেষ ছাড় মিলবে না। কিন্তু ধর্মীয় উন্মাদনায় লিপ্ত হয়ে আপনি যে রক্তপাত বা পাপ করবেন, তার হিসেব হবে পাই পাই করে।

উপসংহার আপনার কাছে কোনো একটি বিষয় ‘ইসলামিক ইসলামিক’ মনে হচ্ছে বলেই সেটি ইসলামের অংশ হতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় ধর্মীয় আবেগের ছদ্মবেশে শয়তানের ‘ওয়াসওয়াসা’ বা কুমন্ত্রণা কাজ করতে পারে। এই মোহের বশবর্তী হয়ে পা বাড়ালে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই হারানোর প্রবল ঝুঁকি থাকে। তাই একটি ন্যায়বিচারক ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রকাঠামোই পারে আমাদের এই আত্মঘাতী সংঘাত থেকে রক্ষা করতে।

ইসলামিক রাস্ট্র্র কি আদৌ ইসলামিক?

অনেকেই আবেগের বশবর্তী হয়ে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন, কিন্তু এর শাস্ত্রীয় ও ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

১. মহান আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ ও দলিলের অভাব

ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর (নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত) প্রতিটি বিষয়ে কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। এমনকি উত্তরাধিকার আইন বা পারিবারিক কলহ মীমাংসার মতো সামাজিক বিষয়েও মহান আল্লাহ বিস্তারিত আয়াত নাজিল করেছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো কোরআনে ‘রাষ্ট্র’ (State) বা ‘সরকার’ (Government) গঠনের কোনো সরাসরি আদেশ বা সুনির্দিষ্ট কাঠামো দেওয়া হয়নি। মহান আল্লাহ কোথাও বলেননি যে, “তোমরা একটি রাষ্ট্র গঠন করো এবং অমুক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচন করো।”

‘উলিল আমর’ বিতর্ক

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলেমগণ ‘উলিল আমর’ (কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি) সম্পর্কিত আয়াত বা ন্যায়বিচারের আয়াতগুলো দিয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আয়াতগুলো মূলত ‘সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাধারণ নীতিমালা’ (Principles of Social Justice); এগুলো কোনোভাবেই আধুনিক অর্থ প্রযুক্ত ‘রাষ্ট্র গঠনের সরাসরি আদেশ’ বা ‘সরকার পরিচালনার কারিগরি পদ্ধতি’ নয়।

কেন এগুলো সরকার পরিচালনার নীতি নয়?

সরকার পরিচালনা একটি প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া (Technical Process), যা সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়। অন্যদিকে, কোরআনের নির্দেশগুলো হলো শাশ্বত নৈতিক মূল্যবোধ। যেমন: ‘আমানত রক্ষা করা’ বা ‘ন্যায়বিচার করা’—এগুলো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য প্রযোজ্য নৈতিক গুণাবলি। একজন সাধারণ নাগরিক তার প্রতিবেশীর সাথে যেভাবে ন্যায়বিচার করবেন, একজন শাসককেও একইভাবে ইনসাফ কায়েম করতে বলা হয়েছে। এটি ব্যক্তির চরিত্রের মানদণ্ড, কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্লু-প্রিন্ট নয়।

স্পষ্ট রূপরেখার অভাব ও ধর্মের অবস্থান

যদি রাষ্ট্র গঠন বা একটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ধর্মের কোনো অবিচ্ছেদ্য অংশ (Integral Part) হতো, তবে মহান আল্লাহ অবশ্যই কোরআনে এর একটি স্পষ্ট রূপরেখা, সীমানা এবং নেতা নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি দান করতেন। যেহেতু কোরআন এসব প্রশাসনিক বিষয়ে নীরব থেকে কেবল ‘ইনসাফ’ ও ‘পরামর্শ’ (শুরা)-এর মতো মানবিক গুণের কথা বলেছে, সেহেতু বোঝা যায় যে রাষ্ট্র গঠন একটি জাগতিক ও বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, যা মানুষ তার প্রয়োজনে তৈরি করে নেয়। একে ‘ঐশ্বরিক নির্দেশ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া প্রকারান্তরে ধর্মের ওপর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।

 

২. আল্লাহর নির্দেশনাহীন ‘ইসলামীকরণ’ ও ধর্মের সীমা

ইসলামি শরিয়তের একটি মৌলিক উসুল বা মূলনীতি হলো—ইবাদতের ক্ষেত্রে যা অনুমোদিত নয় তা বর্জনীয় বা ‘বিদআত’, আর দুনিয়াবি কার্যাবলীর ক্ষেত্রে যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয় তার সবই বৈধ। এই মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র মূলত একটি মানবিক বিবর্তন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন (Administrative Necessity), কোনো আধ্যাত্মিক ইবাদত নয়। নামাজ বা হজের মতো বিষয়গুলো যেভাবে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পালনের আদেশ দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তেমন কোনো একক ‘ঐশ্বরিক ছক’ মহান আল্লাহ প্রদান করেননি। সুতরাং, যে প্রশাসনিক কাঠামোটি মূলত মানুষের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে উদ্ভূত, তাকে ‘আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ’ বলে প্রচার করা কেবল তাত্ত্বিক ভুল নয়, বরং তা ধর্মীয় সততার চরম পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ইনসাফ কায়েমের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক মডেল বা ‘স্টেট মেকানিজম’ বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

এই দাবির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় খোদ খিলাফতে রাশেদার আমল থেকেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের প্রথম চার খলিফার নির্বাচনের পদ্ধতিটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তা প্রতিবারই ছিল ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময়। প্রথম খলিফা নির্বাচিত হয়েছিলেন সকিফায় পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে, দ্বিতীয় খলিফাকে মনোনীত করা হয়েছিল, তৃতীয় খলিফাকে নির্বাচন করা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে এবং চতুর্থ খলিফাকে সরাসরি জনদাবির মুখে নির্বাচিত করা হয়েছিল। এই চার ধরনের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র গঠন বা নেতা নির্বাচন কোনো অপরিবর্তনীয় ধর্মীয় বিধি নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ জাগতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যদি রাষ্ট্র গঠন কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় ‘অর্ডার’ হতো, তবে সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই একটি একক ও ঐশ্বরিক পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। অতএব, আধুনিক যুগের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করা প্রকারান্তরে মহান আল্লাহর নির্দেশের ওপর নিজস্ব ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়ারই নামান্তর।

৩. বর্তমান বিশ্বে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’-এর অনুপস্থিতি: একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ

আমি যখন ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ বানাতে উন্মুখ মুমিন ভাইদের দিকে তাকাই, তখন আমার মনে এই প্রশ্নটি খুব জাগতিকভাবেই আসে—বর্তমানে পৃথিবীতে ৫৭টি মুসলিম প্রধান দেশ থাকা সত্ত্বেও একটিও কেন আদর্শিক উদাহরণ হতে পারল না? যদি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ গঠন ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতো, তবে অন্তত একটি জনপদে তো তার সফল ও ইনসাফপূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখতে পেতাম। কিন্তু বাস্তবতা এর উল্টো।

কোরআনিক মডেলের অনুপস্থিতি

আজকের মানচিত্রে এমন একটি দেশও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে শতভাগ কোরআনিক ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত আছে। অধিকাংশ মুসলিম প্রধান দেশে শাসনের ভিত্তি হিসেবে হয় বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র, না হয় স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র অথবা নামমাত্র শরিয়া আইন চলছে। এই তথাকথিত শরিয়া বা ইসলামি তকমাটি প্রায়ই দেখা যায় কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে বা প্রতিপক্ষকে দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে। পবিত্র কোরআনের মূল নির্যাস যেখানে ‘আদল’ বা ইনসাফ, সেখানে এই রাষ্ট্রগুলোতে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন প্রায়ই উপেক্ষিত। ফলে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ নামধারী এই দেশগুলো প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

ফেরকাগত বিভাজন ও নিরাপত্তার সংকট

বর্তমান এই রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—একই ধর্মের বিভিন্ন উপদল বা ফেরকার মানুষের জান-মাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে না পারা। পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়। সেখানে এক ফেরকা বা গোষ্ঠী যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন অন্য ফেরকার মুসলিমরা চরম নিগ্রহের শিকার হয়। ভিন্ন মতাদর্শের মসজিদ বা মাদ্রাসায় হামলা, এমনকি সাধারণ ইবাদতকারীদের ওপর আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ এখনকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই ফেরকাগত পোলারাইজেশন আমাকে এটাই বুঝিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র যখন নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আবদ্ধ করে ফেলে, তখন সে আর সবার জন্য ‘জুডিশিয়াস’ বা ন্যায়বিচারক থাকতে পারে না। যার ফলে, ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হওয়ার দাবিদার এই দেশগুলো খোদ মুসলমানদেরই একটি বড় অংশের জন্য আজ মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছে।

সুতরাং, যে ব্যবস্থাটি খোদ মুসলিমদেরই নিরাপত্তা দিতে পারছে না এবং যেখানে কোরআনের ইনসাফের চেয়ে গোষ্ঠীতন্ত্র বড় হয়ে উঠেছে, তাকে আমি কোন যুক্তিতে ‘ইসলামিক’ বলব? এই তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্রগুলো আসলে ধর্মের সেবার চেয়ে ধর্মকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবেই বেশি ব্যবহার করছে।

 

৪. মদিনা কি আদৌ ‘রাষ্ট্র’ ছিল? ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ

যারা ইসলামিক রাষ্ট্রের উদাহরণ দিতে গিয়ে বারবার মদিনার নাম আনেন, তাদের আমি বলব—এই তুলনাটি নিছক একটি রাজনৈতিক বিলাসিতা এবং এক ধরনের ঐতিহাসিক প্রতারণা। আধুনিক ‘জাতিরাষ্ট্র’ (Nation-state) ধারণাটি পৃথিবীর বুকে এসেছে মাত্র ২০০ বছর আগে। এর আগে রাষ্ট্র বলতে যা বোঝাত, তা আজকের এরোপ্লেনের মতোই অস্তিত্বহীন ছিল।

মদিনা ছিল একটি ‘সংঘ’ বা ‘সামাজিক চুক্তি’

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা আধুনিক অর্থ কোনো ‘স্টেট’ ছিল না; বরং সেটি ছিল একটি ‘সংঘ’ বা বিভিন্ন গোত্রের মিলিত একটি জোট। ‘মদিনা সনদ’ ছিল সেই সংঘের একটি লিখিত চুক্তি বা সংবিধান। যারা একে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ বলে চালাতে চান, তাদের মনে করিয়ে দেই—মদিনা সনদ চরিত্রগতভাবে ছিল আধুনিক অর্থে অনেকটা ‘সেকুলার’। কারণ, এই সনদ অনুযায়ী মদিনার প্রতিটি গোত্র (মুসলিম, ইহুদি বা পৌত্তলিক) তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন ও প্রথা অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করত। সেখানে সবার ওপর এককভাবে ‘ইসলামিক আইন’ চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং মদিনা ছিল একটি বহুত্ববাদী সমাজ, যেখানে রাষ্ট্র নয়—ব্যক্তি ও গোত্রই ছিল আইনের প্রধান ধারক। সুতরাং, সেই প্রাক-আধুনিক ‘কনফেডারেশন’কে আজকের বর্ডার-ঘেরা আধুনিক রাষ্ট্রের মডেলে ফেলে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ দাবি করা ইতিহাসকে অস্বীকার করারই নামান্তর।

এ পর্ব শেষ করার আগে বলবো – কোনো একটি ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক কাঠামো আপনার কাছে একটু ‘ইসলামিক ইসলামিক’ ফিলিংস দেয় বলেই সেটাকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় আমাদের এই আবেগ শয়তানের ‘ওয়াসওয়াসা’ বা কুমন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়। যার ফলে হিতে বিপরীত হতে পারে—হারিয়ে যেতে পারে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সেক্যুলারিজম - কি, কেন, কিভাবে?

 

পশ্চিমা সেক্যুলারিজম বনাম বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা :

১. অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের স্বরূপ

বাংলাদেশের একটি প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবসায়ী-গোষ্ঠী পশ্চিমা ডিকশনারির ‘সেকুলারিজম’ শব্দটিকে অত্যন্ত কৌশলে ‘ধর্মহীনতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো দেশের সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিভ্রান্ত করা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মূলনীতিকে আক্রমণ করা। এই আক্রমণের ধারাবাহিকতায় তারা স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী এবং প্রথম সংবিধান প্রণেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকেও বারবার ‘ধর্মবিরোধী’ বলে কুৎসা রটিয়েছে।

এই ষড়যন্ত্র কেবল অতীতের বিষয় নয়, বরং তা আজও সমানভাবে চলমান। এর লক্ষ্য হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার এই দেশীয় ও মানবিক রূপরেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, এই ষড়যন্ত্রকারীরা মানুষের অবচেতন মনের ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নিতেই থাকবে।

২. পশ্চিমা সেক্যুলারিজম বনাম বঙ্গবন্ধুর রূপরেখা

ষড়যন্ত্রকারীরা জানে, কিন্তু জনসমক্ষে স্বীকার করে না যে, বঙ্গবন্ধু পশ্চিমা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যান্ত্রিক মতাদর্শকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের উদ্ভব হয়েছিল রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে, যেখানে রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা একটি জরুরী বিষয় ছিল। সেখানে রাষ্ট্র সচেতন ভাবে ধর্মবিষয়ক যেকোনো বিষয়কে এড়িয়ে চলে বা নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার যে নতুন অর্থ ও রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, তা পশ্চিমা সংজ্ঞার মতো নয়।

বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা হলো—‘সকল ধর্মের সুরক্ষা ও সমান স্বাধীনতা’। তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, কোনো মানুষ যেন তার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের কারণে রাষ্ট্রের কাছে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। পশ্চিমা মডেলে রাষ্ট্র যেখানে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে হাত ধুয়ে ফেলে, বঙ্গবন্ধুর মডেলে রাষ্ট্র সেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র এখানে বাধা তো দেবেই না, বরং প্রতিটি নাগরিক যেন নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে এবং পূর্ণ উদ্যমে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে, তার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। এই দর্শনই আজ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য এক অনন্য রক্ষা কবচ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধুর এই রূপরেখা বিশ্বব্যাপী এখনকার প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে জরুরি।

৩. অসাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক পথচলা

একটি চরম মিথ্যা ও অপপ্রচার করা হয় যে, স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেনি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধের বহু আগে ১৯৫৫ সালেই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছিলেন। এটি কোনো হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি দীর্ঘকাল বাংলার মানুষের অন্তর অধ্যয়ন করে বুঝেছিলেন যে, ধর্মের নামে রাজনীতি শোষণের হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। এ বিষয়ে একজন সহকর্মীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “এখনো সময় আসেনি, সময়মতো সার্বজনীন করা হবে।” বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি আন্দোলন ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা।

তিনি জানতেন, এই ভূখণ্ডে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় ঘৃণা মূলত পশ্চিমারাই আমদানি করেছিল। তারা তাদের শাসন ও শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করতে ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতি প্রয়োগ করেছে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে সেই সাম্প্রদায়িক বিষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক সত্যের একনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন বলেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তিনি এর বিকল্প নিয়ে ভেবেছেন।

৪. পাকিস্তানে র অভিজ্ঞতা ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার

বঙ্গবন্ধু দেখলেন, নতুন গঠিত পাকিস্তানে ইসলামের আদর্শ বা ইনসাফ বাস্তবায়নের বদলে ইসলামকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর চরম প্রতারণা ও শোষণ চালানো হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী যখনই কোনো অন্যায় করেছে, তখনই তারা ইসলামের দোহাই দিয়ে জনগণকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে। একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে রাষ্ট্রের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

যেহেতু এ দেশের মানুষের ওপর ধর্মের প্রভাব প্রবল, তাই তিনি ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার পশ্চিমা পথে না গিয়ে ধর্মের অপব্যবহার রোধের পথে হাঁটেন। তিনি চাইলেন রাষ্ট্র যেন কোনো নির্দিষ্ট ফেরকা বা মতের পক্ষে লাঠিয়াল হিসেবে কাজ না করে। এই চিন্তা থেকেই তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশের নতুন সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে যুক্ত করেন।

৫. মুসলিমদের সুরক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার অপরিহার্যতা

কুচক্রীরা একটি ভয়ংকর অপপ্রচার করে যে—ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের অধিকারের জন্য দরকার। এটি মূলত মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার একটি বড় চাল। বাস্তবতা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজন অমুসলিমদের চেয়ে মুসলিমদের জান-মাল রক্ষার জন্যই বেশি। মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন ফেরকা ও উপদলের বিভক্তি এবং তাদের মধ্যকার অসহিষ্ণুতা বঙ্গবন্ধু খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখব এক ফেরকার আলেম অন্য ফেরকার আলেমকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়ে রেখেছেন। এমনকি একে অপরকে ‘কাবিলে গারদানজানি’ বা গলা কেটে হত্যার যোগ্য হিসেবেও ফতোয়া প্রচার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় যদি রাষ্ট্র কোনো একটি নির্দিষ্ট ফেরকার বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় বিশ্বাস’ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে বাকি মুসলিমরা সেই রাষ্ট্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হবে। মসজিদ-মাদ্রাসায় হামলা ও ফতোয়াবাজি তখন আইনি বৈধতা পেয়ে যাবে। পাকিস্তান আজ এর জ্বলন্ত ও নিকৃষ্ট প্রমাণ। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা যেন নিজেদের মধ্যে রক্তপাত না করে এবং নিজ নিজ ফেরকা অনুযায়ী শান্তিতে ইবাদত করতে পারে, সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সবচেয়ে বেশি জরুরি।

৬. ইসলামের স্বর্ণযুগ ও পতনের শিক্ষা

বঙ্গবন্ধু মুসলিম সাম্রাজ্যের ইতিহাসে গভীর অভিনিবেশ সহকারে লক্ষ করেছিলেন যে, খেলাফতের স্বর্ণযুগের মূলে ছিল উদারতা ও ভিন্নমতের প্রতি পরম সহিষ্ণুতা। বিশেষ করে আব্বাসীয় খেলাফতের (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী সময়কে যখন ‘ইসলামের স্বর্ণযুগ’ বলা হয়, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোটি কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ছকে বন্দি ছিল না।

সেই খেলাফতের প্রশাসনিক উচ্চপদে কেবল মুসলমানরাই ছিলেন না; বরং অমুসলিম খ্রিস্টান, ইহুদি ও পারসিক পণ্ডিতরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। খলিফা আল-মানসুর ও আল-মামুনের সময়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র, যেখানে গ্রিক, ভারতীয় ও পারসিক জ্ঞানকে আরবে অনুবাদ করা হয়েছিল। এই উদারতার কারণেই তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অভাবনীয় জোয়ার এসেছিল।

ইতিহাসের এক বাঁকে যখন মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর গায়কির (যেমন মুতাজিলা মতবাদ) বদলে চরম রক্ষণশীল ‘আশারীয়’ (Ash’arism) ঘরানার প্রভাব বাড়তে শুরু করল, তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। আল-গাজ্জালির পরবর্তী সময়ে যখন যুক্তি ও বিজ্ঞানকে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হলো, তখন থেকেই মুসলিম বিশ্বের সৃজনশীলতা স্তিমিত হতে থাকে। এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামিই মূলত সেই বিশাল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক সত্য জানতেন যে, রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট গোঁড়া বিশ্বাসের পক্ষ নেয়, তখন সে তার সৃজনশীলতা ও ন্যায়বিচার করার ক্ষমতা—উভয়ই হারায়।

বঙ্গবন্ধু জানতেন, মহান আল্লাহ যা নির্দেশ করেননি (রাষ্ট্র গঠন বা নির্দিষ্ট শাসন পদ্ধতি), তাকে ‘আল্লাহর নির্দেশ’ বলে চালানো এক ধরনের কবিরা গুনাহ। পরকালে বিচার হবে ব্যক্তিগত আমলের ভিত্তিতে, কোনো ‘ইসলামিক রাষ্ট্রের’ নাগরিক পরিচয়ে কেউ ডিসকাউন্ট পাবে না। রাষ্ট্র মূলত একটি প্রশাসনিক চুক্তি (Social Contract), এর কোনো ‘নফস’ বা ‘বিশ্বাস’ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ইনসাফ করা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

৭. আমাদের প্রতিরক্ষা প্রাচীর

বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের রক্ষা কবচ। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে এবং উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছাতে হলে বঙ্গবন্ধুর এই মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক আদর্শকে ধারণ করার কোনো বিকল্প নেই। এটি সঠিক না থাকলে আমরা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হব, আমাদের উন্নয়ন থমকে যাবে এবং আমরা এক অন্ধকার ফেরকাগত সংঘাতের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমাদের প্রকৃত প্রতিরক্ষা প্রাচীর; যা আমাদের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।


সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর,
তথ্য প্রযুক্তিবিদ, দক্ষতা উদ্যোক্তা, মধ্যপন্থি মুসলিম, মধ্যবাম রাজনৈতিক কর্মী, আইএসপি সেটআপ ম্যানুয়ালের লেখক ও গুরুকুল প্রমুখ।