এই সাধারণ গণিত কেন বুঝে না আমাদের বুদ্ধিজীবীরা!

বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে—দেশের একটি বড় অংশের বুদ্ধিজীবী বা তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাদের ভাষ্যে, এই দুই দলের দ্বন্দ্ব কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাস্তবতা কি এতটাই সরল, নাকি এই বিশ্লেষণ নিজেই একটি গুরুতর সরলীকরণ?

এই প্রসঙ্গে আহমদ ছফার একটি মন্তব্য বারবার ফিরে আসে—“বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন হত না।” এই উক্তি কেবল একটি তির্যক মন্তব্য নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক মনোভাবের প্রতিফলন—যেখানে সিদ্ধান্তহীনতা, অতিরিক্ত আপসকামিতা এবং বাস্তবতার কঠিন সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কাজ করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের একটি প্রবণতা আবারও সক্রিয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে একই রাজনৈতিক সমীকরণে ফেলে বলা হচ্ছে—“দুই পক্ষই ক্ষমতার জন্য লড়ছে।” কিন্তু এই বক্তব্যের ভেতরে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে—সব রাজনৈতিক লড়াই কি একই প্রকৃতির? সব দ্বন্দ্ব কি কেবল ক্ষমতার জন্য, নাকি কিছু দ্বন্দ্ব আদর্শগত, ঐতিহাসিক এবং নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—মুক্তিযুদ্ধ এই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস এবং বিচার—এসবের সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে যে কলঙ্কমোচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক দায় পূরণের অংশ। এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু এটিকে কেবল ‘ক্ষমতার রাজনীতি’ বলে অভিহিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।

অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাদের ‘রাজবন্দী’ হিসেবে অভিহিত করে বা তাদের মুক্তির দাবি তোলে, তখন সেটি নিছক রাজনৈতিক কৌশল নয়—এটি একটি আদর্শগত অবস্থান, যার সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস সরাসরি জড়িত।

এই দুই ধরনের অবস্থানকে এক করে দেখার প্রবণতা—অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির প্রতি সহনশীল বা সমর্থনশীল রাজনীতিকে একই কাতারে ফেলা—একটি গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করার ঝুঁকিও তৈরি করে।

রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ এতে আদর্শ, ইতিহাস, নৈতিকতা এবং জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নগুলো আড়াল হয়ে যায়। সব রাজনৈতিক সংঘাত একরকম নয়; কিছু সংঘাত রাষ্ট্রের ভিত্তি ও মূল্যবোধের প্রশ্নে নির্ধারিত হয়।

সুতরাং প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে— এই সাধারণ গণিত কেন বুঝতে ব্যর্থ হন আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী?

সমস্যা কি তারা বোঝেন না? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতাকে সরল করে দেখানোর একটি প্রবণতা কাজ করছে?

যে রাষ্ট্রের জন্মই একটি আদর্শিক সংগ্রামের মাধ্যমে, সেখানে সেই আদর্শকে পাশ কাটিয়ে সবকিছুকে ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা—এটি কেবল বিশ্লেষণের দুর্বলতা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার শামিল।

কারণ দিনশেষে, সব লড়াই এক নয়। কিছু লড়াই ক্ষমতার জন্য, আর কিছু লড়াই ইতিহাস, পরিচয় এবং আদর্শের জন্য।

Leave a Comment