মওলানা আবুল কালাম আজাদ আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং মিশালি শাকসিয়্যাত বা আদর্শ ব্যক্তিত্বের একজন। যেসব মহীয়ান ব্যক্তিত্বের চেতনা ও ‘ফিকর’-এর ওপর ভিত্তি করে আমার জীবনবোধের দালান নির্মিত হয়েছে, মওলানা আজাদ তাঁদের মধ্যে ‘সরে-ফেহরিস্ত’ বা তালিকার শীর্ষে। একজন নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম হয়েও কীভাবে কুসংস্কারমুক্ত, ‘রওশন-খেয়াল’ (উদারমনা), এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া যায়—তিনি তার এক ‘বেনজির’ (অনন্য) উদাহরণ। একজন মুসলিম হিসেবে আমার আত্মপরিচয় কী হবে, কিংবা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমার ‘ফারায়েজ’ বা দায়িত্ব কতটুকু, সে বিষয়ে তাঁর দর্শন আমাকে প্রতিনিয়ত ‘রাহনুমা’ই (পথপ্রদর্শন) করে।
আমি নিজে তাঁর থেকে ‘ইস্তিলাফ’ বা অনুপ্রেরণা পাই এবং আজকের মুসলিম তরুণদেরও ‘নসিহত’ করি—যদি নিজের শিকড় এবং আধুনিকতার ‘ইমতিজাজ’ বা মেলবন্ধন বুঝতে চাও, তবে এই মানুষটিকে জানো। আমি চাই আমার প্রিয় মানুষরা তাঁর এই ‘ইলমি’ মহিমা সম্পর্কে জানুন। আগে আমি ‘আসুন আলাপ করিয়ে দিই’ শিরোনামে প্রিয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লিখতাম; সেই ‘সিলসিলা’ বা সিরিজের শুরু হয়েছিল তাঁকে নিয়েই।
আজ সেই লেখাটি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। এই লেখার ভাষা কিছুটা উর্দু, ফারসি ও আরবি ঘরানার হবে; কারণ আমি এই লেখাটি শুরু করেছিলাম আমার মাদ্রাসায় পড়া তালিব (ছাত্র) দের জন্য। এই লেখনীর মাধ্যমে যদি আপনারা এই ‘ইস্তিলাহ’ বা পারিভাষিক শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হন, তবে তাঁর দর্শন ও সাহিত্য পাঠের পরবর্তী সফরটি আপনাদের জন্য অনেক বেশি ‘সহজ-ও-রাওয়াঁ’ (সাবলীল) হয়ে উঠবে।
একটি জরুরি ‘কাইফিয়্যাত’ বা নিবেদন:
এখানে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করতে চাই—উর্দু, ফারসি বা আরবি, কোনো ভাষাকেই আমি তথাকথিত ‘ইসলামি ভাষা’ মনে করি না। এগুলো মানব সভ্যতার হাজার বছরের বিবর্তিত এক একটি ভাষা মাত্র। তাই এই লেখায় ব্যবহৃত পরিভাষাগুলোকে বাংলা ভাষার ‘ইসলামিকরণ’ বা কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণতার প্রচেষ্টা বলে মনে করবেন না। বরং এগুলোকে মওলানা আজাদের ব্যবহৃত সেই ধ্রুপদী ‘লুগাত’ (শব্দকোষ)-এর সাথে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে গ্রহণ করবেন।

আমার মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
অনেকে আমাদের সার্টিফিকেট নিয়ে সন্তোষ্ট না। তারা মওলানা আজাদের ‘ইলমি’ ও সিয়াসি (রাজনৈতিক) উচ্চতা অনুধাবন করতে ইসলামিক স্কলারদের সার্টিফিকেট চান। তাদের জন্য সমসাময়িক জগতবিখ্যাত ইসলামিক মনীষীদের দৃষ্টিতে তাঁর ‘শাকসিয়্যাত‘ বা ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন দেখে নেন:
- আল্লামা ইকবালের মতে, পুরো উপমহাদেশে কেবল আবুল কালামই ‘মুজতাহিদানাহ্’ (মৌলিক গবেষণামূলক) মর্যাদার যোগ্য ছিলেন।
- মওলানা জাফর আলী খাঁ-র মতে, গবেষণায় (ইজতিহাদ) আবুল কালাম আজাদের স্থান ছিল অনন্য। তিনি একটি কবিতায় বলেন: “গবেষণার জগতে পূর্বসূরীদের পথ হারিয়ে গেছে; তোমার যদি এই পথের সন্ধান চাই, তবে আবুল কালামকে জিজ্ঞেস করো।”
- মওলানা সৈয়দ মওদুদীর মতে, আবুল কালাম এবং ইকবাল ছিলেন এই যুগের শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্ক।
- মওলানা হাসরাত মোহানির মতে, গদ্য ও বক্তৃতায় আবুল কালাম আজাদের কোনো সমকক্ষ ছিল না। তিনি কাব্যিক ভাষায় বলেন: “যবে থেকে দেখেছি আবুল কালামের গদ্য, হাসরাতের পদ্যে আর স্বাদ রইল না।”
- আল্লামা সৈয়দ সুলাইমান নদভী বলেন: “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তরুণ মুসলমানদের মধ্যে পবিত্র কুরআনের প্রতি আগ্রহ মওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘আল-হিলাল’ এবং ‘আল-বালাগ’ সৃষ্টি করেছিল।”
- আগা শোরিশ কাশ্মীরি মওলানা আজাদের মৃত্যুতে একটি জগৎবিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন, যার শুরুটা ছিল এমন: “কেমন এক প্রলয়ংকারী দুর্ঘটনা, যে চোখে জল আছে কিন্তু মোছার আঁচল নেই; জমিনের উজ্জ্বলতা চলে গেছে, দিগন্তে আজ সূর্য নেই।”

মওলানার জন্ম
মওলানা আজাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ‘দাস্তান’ কোনো নাটকীয় উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। তাঁর ‘ইসমে-গিরানি’ বা প্রকৃত নাম ছিল আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ [ مولانا ابوالکلام محی الدین احمد آزاد ]। ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পবিত্র মক্কা নগরীতে তিনি ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন দিল্লির উচ্চবংশীয় আলেম ও ‘সাহেবে-ইলম’ (লেখাপড়া জানা লোক)। ১৮৫৭ সালের সেই ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের ‘আশুব-ও-ফিতনা’ বা ডামাডোলের সময় তাঁর পিতা মওলানা খায়েরউদ্দীন হিজরত করে মক্কায় চলে যান। সেখানে এক সম্ভ্রান্ত আরবীয় ‘খানদান’-এ তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। মওলানার ধমনীতে তাই প্রবাহিত হয়েছিল দিল্লি ও আরবের আভিজাত্যের এক সংমিশ্রণ।
আজাদের শৈশব কেটেছে এক ধরণের অদ্ভুত ‘উজলাত’ বা নিভৃত একাকীত্বে। ১৮৯০ সালে তাঁর পিতা সপরিবারে মক্কা থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং এখানেই স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। মওলানার বয়স যখন মাত্র ১১-১২ বছর, অর্থাৎ ১৮৯৯ সালের দিকে, তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় মা এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন। শৈশবেই মাতৃহারা হওয়ার এই ‘সালামা’ (দুর্ঘটনা) বা বিচ্ছেদ তাঁর সংবেদনশীল হৃদয়ে এক গভীর রেখাপাত করেছিল। মাতৃবিয়োগের সেই শোক এবং বাবার কঠোর শাসনাধীন জীবন—সব মিলিয়ে তাঁর ‘আহদ-এ-তিফলি’ (শৈশব) ছিল অন্যান্য সাধারণ বালকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ।

প্রথা ভাঙা শিক্ষা
মওলানা আজাদের ‘শাকসিয়্যাত’ বা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত পরিবেশে। তাঁর পরিবার ছিল অতিমাত্রায় ‘রক্ষণশীল’ এবং আভিজাত্যমণ্ডিত। পিতা মওলানা খায়েরউদ্দীন কেবল একজন আলেম ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘পীর’ এবং ‘সাহেবে-তরজ’ (এক বিশেষ রীতির অধিকারী) কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ শিক্ষক। তৎকালীন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্কুল কিংবা প্রথাগত মাদ্রাসা—কোনোটির ‘নেসাব’ (পাঠ্যক্রম)-এর ওপরই তাঁর আস্থা ছিল না। তিনি মনে করতেন, বাইরের শিক্ষকরা হয়তো তাঁর সন্তানকে সঠিক ‘আকিদা’ (বিশ্বাস) বা উচ্চতর ‘মা’রিফাত’ (আধ্যাত্মিক জ্ঞান) দিতে সক্ষম হবেন না। তাই আজাদের ‘তালিম’ শুরু হয় বাড়িতেই, বাবার কঠোর তদারকিতে।
আজাদকে পড়ানোর জন্য তিনি যে কাউকে নিযুক্ত করতেন না। কোনো ওস্তাদকে নিয়োগ দেওয়ার আগে খায়েরউদ্দীন সাহেব নিজে তাঁর পাণ্ডিত্য এবং ‘আখলাক’ (চারিত্রিক গুণাবলী) কঠোরভাবে পরীক্ষা করতেন। শিক্ষককে কেবল ‘কিতাবি’ বা বই-পড়ুয়া হলে চলত না, বিষয়ের ওপর থাকতে হতো পূর্ণ ‘উবুর’ (দখল)। এমনকি ওস্তাদ নির্বাচনের পরও বাবার কড়া নজরদারি থাকত যে ঠিক কী ‘সবক’ (পাঠ) দেওয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা নিজেই ছিলেন প্রধান শিক্ষক। খুব ভোরে ছেলেকে ঘুম থেকে তুলতেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিজেই পাঠদান করতেন। গণিত বা জ্যামিতির মতো কিছু বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক থাকলেও, তাঁদের ওপর বাবার সজাগ ‘মুহাসাবা’ (জবাবদিহিতা) ও তদারকি থাকত।
বাবার এই কঠোর ‘তারবিয়াত’-এর একটি ইতিবাচক দিক ছিল। সাধারণত যে ‘দরসে নিজামি’ শেষ করতে একজন ছাত্রের ১০-১২ বছর লাগত, মেধাবী আজাদ বাবার নিবিড় পরিচর্যায় এবং বিজ্ঞ ওস্তাদদের অধীনে মাত্র ১৫-১৬ বছর বয়সেই তা থেকে ‘ফারেক-উত-তহসিল’ (পাঠ সমাপনকারী) হয়েছিলেন। তবে এই অকালপক্বতার একটি চড়া মূল্যও দিতে হয়েছিল তাঁকে। মওলানা আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে আক্ষেপ করে বলেছেন যে, বাবার এই কঠোর শাসনের কারণে শৈশবে তিনি সমবয়সীদের সাথে খেলার সুযোগটুকুও পাননি। তাঁর পুরোটা সময় কাটত ওস্তাদদের ঘেরাটোপে। সম্ভবত এই রুদ্ধশ্বাস পরিবেশই তাঁর ভেতরে এক ধরণের বিদ্রোহ বা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ‘জজবা’ (আবেগ) তৈরি করেছিল, যার রেশ ধরে তিনি পরবর্তীকালে নিজের ছদ্মনাম রেখেছিলেন ‘আজাদ’।
আরবি মাতৃভাষা হওয়ায় ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচীন দর্শনে তাঁর বুৎপত্তি ছিল ‘খোদাদাদ’ (ঈশ্বরপ্রদত্ত)। কিন্তু আজাদের ‘জাস্টজু’ বা জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অদম্য। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও নিজের অসামান্য ধীশক্তি আর ব্যক্তিগত অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি এবং এমনকি ইংরেজি ভাষাতেও ‘কামাল’ (পূর্ণতা) অর্জন করেন। যখন সমবয়সী কিশোররা খেলাধুলায় মগ্ন, আজাদ তখন বিশ্ব ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে ‘মুতালা’য়া’ (গভীর অধ্যয়ন)-এ ডুবে থাকতেন। এই স্বশিক্ষিত হওয়ার জেদই তাঁকে পরবর্তীকালে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘দানিশওয়ারে-বেনজির’ (অনন্য মনীষী) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

সাংবাদিকতা ও বিপ্লবী জীবন
মওলানা আজাদের ‘সহাফত’ বা সাংবাদিকতা কেবল পেশা ছিল না, তা ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াই। ১৯১২ সালে প্রকাশিত তাঁর ঐতিহাসিক পত্রিকা ‘আল-হিলাল’ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক বজ্রনিনাদ। মওলানার লেখনী ছিল এতটাই তেজস্বী যে, তৎকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁকে ‘Dangerous Person’ (বিপজ্জনক ব্যক্তি) হিসেবে চিহ্নিত করে। ব্রিটিশ সরকার মনে করত, তাঁর প্রতিটি নিবন্ধ বা ‘মাজমুন’ সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে উস্কে দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে ‘প্রেস অ্যাক্ট’-এর অজুহাতে ‘আল-হিলাল’ বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু আজাদের অদম্য ‘রূহ’ দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না; তিনি ১৯১৫ সালে শুরু করেন নতুন পত্রিকা ‘আল-বালাগ’। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে ব্রিটিশরা ১৯১৬ সালে তাঁকে কলকাতা থেকে বহিষ্কার করে এবং রাঁচিতে চার বছরের জন্য নজরবন্দি বা ‘ইন্টারনমেন্ট’ করে রাখে।
একজন প্রথাগত আলেম হওয়া সত্ত্বেও তিনি যেভাবে ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে এক অখণ্ড জাতীয়তাবাদের কথা বলতেন, তা তৎকালীন অনেক রক্ষণশীল মুসলিম নেতার কাছে ‘ইফরাত-পসন্দি‘ বা চরমপন্থা হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু আজাদ ছিলেন তাঁর তওহীদি আদর্শে পাহাড়ের মতো অটল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশদের ‘বিভেদ ও শাসন’ (Divide and Rule) নীতির বিপরীতে হিন্দু-মুসলিম এক শক্তিশালী ‘ইত্তেহাদ’ বা ঐক্য গড়ে তোলা অপরিহার্য। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ‘তাকরির’-এ তিনি মুসলিম সমাজকে এই শিক্ষাই দিয়েছিলেন যে— নিজ সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা অর্জন করা অনেক বড় ইবাদত।
তিনি শুধু সাংবাদিক ছিলেন না, বরং এক সশস্ত্র বিপ্লবীর ছদ্মবেশেও কাজ করেছেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি সাধারণ মুসলিম জনমতের বিপরীতে অবস্থান নেন এবং অরবিন্দ ঘোষ ও শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর মতো হিন্দু বিপ্লবীদের সাথে গভীর ‘আশনাই’ বা সখ্যতা গড়ে তোলেন। ১৯০৮ সালে ইরাক, সিরিয়া, মিশর, তুরস্ক ও ফ্রান্স ভ্রমণকালে সেখানকার যুব সমাজের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনা দেখে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। বিশেষ করে কামাল আতাতুর্কের সংস্কারবাদী চিন্তা এবং স্যার সৈয়দ আহমদের জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রতি তাঁর এক ধরণের ‘অনুরক্তি’ তৈরি হয়।
১৯৩১ সালের ‘ধারাসন সত্যাগ্রহ’-এর সময় তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি মনে করতেন, জাতিগত বৈষম্য উসকে দিয়ে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ন্যায্য দাবিগুলোকে উপেক্ষা করছে। ধর্মের পরিবর্তে রাজনীতিতে তিনি একজন নিখাদ ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিস্ট’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। জাতীয় স্বার্থের আগে সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে বড় করে দেখায় তিনি সমকালীন অনেক মুসলিম রাজনীতিকের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর এই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সব ধরণের সাম্প্রদায়িক দেয়াল ভেঙে দিতে প্রস্তুত ছিলেন।

‘ইমামুল হিন্দ’ ও আধুনিক চিন্তাচেতনা
মওলানা আজাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর যে সত্তাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে, তা হলো তাঁর ‘ইলমি’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরতা। উপমহাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাঁকে কেবল নেতা নয়, বরং পরম শ্রদ্ধার সাথে ‘ইমামুল হিন্দ’ হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। তাঁর এই ‘রওশন-খেয়ালি’ বা আধুনিক মনন তাঁকে সমসাময়িক অন্য সব আলেম থেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মওলানার এই আধুনিকতার মূলে ছিল তাঁর ‘আজাদ’ বা মুক্ত চিন্তা। তিনি যখন তাঁর কালজয়ী তাফসির ‘তরজুমানুল কুরআন’ রচনা শুরু করেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মকে কেবল রীতিনীতি বা আচার-সর্বস্বতার মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে একে এক চিরকালীন জীবনদর্শন বা ‘হিকমাত’ হিসেবে তুলে ধরা। পীর পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অন্ধ অনুকরণ বা ‘তাকলিদ’-এর পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা কুসংস্কার ও ‘বিদা’আত’-এর বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন সংগ্রাম আজও তরুণ প্রজন্মের জন্য এক শ্রেষ্ঠ ‘রাহনুমা’ই’।
তবে আজাদের এই ‘ইলমি’ সফর মোটেও মসৃণ ছিল না। তৎকালীন আলেম সমাজের একটি বড় অংশ তাঁর এই আধুনিক ব্যাখ্যাকে সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে দেওবন্দ ঘরানার অনেক আলেম এবং ঐতিহ্যবাদী উলামায়ে কেরাম তাঁর রাজনীতির সমর্থক হলেও তাঁর অনেক ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে ‘ইখতিলাফ’ (মতপার্থক্য) রাখতেন। পক্ষান্তরে, মওলানা শিবলী নোমানীর মতো আধুনিকমনা পণ্ডিতরা আজাদের এই ‘তাজদাদ’ বা অভিনবত্বকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। শিবলী নোমানী তো তাঁর ক্ষুরধার মেধা দেখে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, কিশোর আজাদকে দেখে তিনি প্রথমদিকে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে এই অল্পবয়সী ছেলেটির কলম থেকেই এমন গভীর তাত্ত্বিক লেখা বের হওয়া সম্ভব!
মওলানার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল তাঁর ‘মুজতাহিদানাহ’ (গবেষণামূলক) দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি প্রচলিত প্রথা ভেঙে যখন কুরআনের মূল বার্তার ওপর জোর দিলেন, তখন কিছু রক্ষণশীল আলেম তাঁকে ‘বিপথগামী’ হিসেবেও প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আজাদের পাণ্ডিত্য ছিল এতটাই ‘মুদাল্লাল’ (প্রমাণসিদ্ধ) যে, তর্কে তাঁকে পরাস্ত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক মুসলিম সমাজের, যারা একদিকে থাকবে দ্বীনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ এবং অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে ‘কামাল’ (পূর্ণতা) অর্জনকারী।
মওলানা আজাদের এই ‘শাকসিয়্যাত’ আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত ইসলামি শিক্ষা কখনো আধুনিকতার বিরোধী নয়। তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক এই উচ্চতা বা ‘ইলমি ইস্তাদাদ’ তাঁকে কেবল ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং আধুনিক মুসলিম রেনেসাঁর এক অগ্রদূত বা ‘মুজাদ্দিদ’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।

মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি
মওলানা আজাদের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল যেমন ত্যাগী, তেমনি বৈপ্লবিক। ১৯১৯ সালে যখন ব্রিটিশ সরকার দমনমূলক ‘রাওলাট আইন’ প্রবর্তন করে, তখন এর প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আহ্বানে মওলানা আজাদ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। এই সময় থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেকে মেলে ধরেন এবং খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কান্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন।
গান্ধীজির সাথে তাঁর এই আদর্শিক বন্ধন ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। ১৯২০ সালে দীর্ঘ কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আরও শক্তিশালীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ‘ইলমি’ গভীরতা কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, ১৯২৩ সালে দিল্লির বিশেষ অধিবেশনে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কংগ্রেসের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তিনিই হলেন সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি।
গান্ধীজি এবং জওহরলাল নেহেরুর সাথে মওলানার সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার। বিশেষ করে গান্ধীজি মওলানাকে তাঁর নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে একজন বিশ্বস্ত ‘রাহনুমা’ বা পথপ্রদর্শক মনে করতেন। মওলানা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, একটি অখণ্ড ভারতই পারে সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষা করতে। ১৯৩১ সালের লবণা সত্যাগ্রহের অংশ হিসেবে ‘ধারাসন সত্যাগ্রহ’ থেকে শুরু করে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অগ্নিপরীক্ষায় তিনি ছিলেন এক নির্ভীক সেনানী।
তিনি মনে করতেন, ভারতের মুক্তি কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর মধ্যে নয়, বরং হিন্দু-মুসলিমদের আত্মিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের মধ্যে নিহিত। তাঁর এই ‘ফিকর’ বা চিন্তাধারা তাঁকে কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, বরং আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শত প্রতিকূলতা আর দীর্ঘ কারাবাসও তাঁর অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ও আদর্শ থেকে তাঁকে এক বিন্দু বিচ্যুত করতে পারেনি।

সাহিত্যের জাদুকর, সংগীতের সমঝদার ও শিল্পী
মওলানা আজাদ কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চদরের শিল্পী। তাঁর সাহিত্যিক শৈলী ছিল অনন্য—যাতে ধ্রুপদী উর্দু গদ্যের আভিজাত্যের সাথে আরবি ও ফারসি ভাষার অলঙ্কার এমনভাবে মিশে থাকত যে, পাঠক তাঁর গদ্যের ‘সেহর’ বা জাদুতে আচ্ছন্ন হতে বাধ্য। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘গুবারে খাতির’ বইটির পাতা উল্টালে মনে হয় কোনো এক নির্মল ঝরনাধারার পাশে বসে তাঁর হৃদয়ের একান্ত আলাপ শুনছি। এতে তিনি কেবল রাজনীতি নয়, বরং চা পান, চড়ুই পাখির আনাগোনা এবং জীবনের গভীর দর্শন নিয়ে যে ‘ইনশাইয়া’ বা গদ্যগুলো লিখেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
আর তাঁর সংগীত অনুরাগের কথা তো আলাদা করে বলতেই হয়। আমাদের অনেকের কাছেই এটি বিস্ময়কর যে, একজন প্রথাগত আলেম হওয়া সত্ত্বেও মওলানা শাস্ত্রীয় সংগীতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি কেবল সংগীতের তাত্ত্বিক সমঝদার ছিলেন না, বরং চমৎকার ‘সেতার’ বাজাতে পারতেন। শৈশবে বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে তাঁর এই সংগীত শিক্ষা ছিল এক লুকানো বিপ্লবের মতো। তাঁর সেই আভিজাত্যময় রুচি ও সংগীতের বর্ণনা যখন প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী জিয়া মহিউদ্দিনের কণ্ঠে শুনি, তখন মওলানার সেই শৈল্পিক ‘শাকসিয়্যাত’ চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
একজন আলেম হয়েও শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই যে উদার ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি, এটাই তাঁকে আমার চোখে এক প্রকৃত ‘আধুনিক মানুষ’ করে তুলেছে। তিনি মনে করতেন, স্রষ্টার সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝার জন্য কেবল কিতাব নয়, বরং সুর ও সুন্দরের ‘আশনা’ই’ (পরিচয়) থাকা প্রয়োজন। তাঁর এই শৈল্পিক বোধই তাঁকে অন্য সব সমসাময়িক নেতাদের চেয়ে আলাদা ও বর্ণিল করে রেখেছে।
শুনুন:
দেশভাগের যন্ত্রণা ও সেই নির্ভীক ভবিষ্যবাণী:
ভারত বিভক্তির সময় যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষবাষ্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন যে মানুষটি অখণ্ডতার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন মওলানা আজাদ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। ১৯৪৭ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন দিল্লির মুসলমানরা আতঙ্কিত হয়ে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছিল, তখন দিল্লির জামে মসজিদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মওলানা এক ঐতিহাসিক ‘তাকরির’ বা ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই আর্তনাদ আজও ইতিহাসের আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি চিৎকার করে মুসলিমদের বলেছিলেন—
“আজ তোমাদের ভয় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই জামে মসজিদের মিনারগুলো তোমাদের কাছে জানতে চাইছে—তোমরা কি তোমাদের ইতিহাসের পাতাগুলো হারিয়ে ফেলেছ? এই যমুনা নদীর তীরে তোমাদের কাফেলা অজু করেছিল। আজ তোমরা এই মাটিকে পর ভাবছ? ফিরে এসো, এই মাটি তোমাদের, এই দেশ তোমাদের।”
মওলানা কেবল আবেগ দিয়ে কথা বলেননি, বরং তাঁর ছিল এক অতিপ্রাকৃত দূরদর্শিতা। পাকিস্তান সৃষ্টি নিয়ে তিনি যে সব ‘পেশিনগোয়ি’ বা ভবিষ্যবাণী করেছিলেন—আজ ইতিহাসের পাতায় তার প্রতিটি অক্ষর সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৪৬ সালে লাহোরের বিখ্যাত সাংবাদিক শোরিশ কাশ্মীরি-কে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তানের পরিণতি নিয়ে প্রধানত ৮টি বড় দাগে ভবিষ্যবাণী করেছিলেন (মোট ১৩ টি)। ইতিহাসের পাতায় এই ভবিষ্যবাণীগুলো অত্যন্ত নির্ভুল ও বিস্ময়কর বলে বিবেচিত। নিচে সেই ৮ টির তুলে ধরলাম:
১. সামরিক একনায়কতন্ত্রের উত্থান
মওলানা বলেছিলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি দীর্ঘ সময় গণতান্ত্রিক পথে চলতে পারবে না। সেখানে অচিরেই সামরিক একনায়কতন্ত্র বা মিলিটারী ডিক্টেটরশিপ জেঁকে বসবে। তিনি মনে করেছিলেন, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে।
২. পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা (বাংলাদেশ সৃষ্টি)
এটি ছিল তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী ভবিষ্যবাণী। তিনি বলেছিলেন, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এক হয়ে থাকতে পারবে না। ভাষাগত বিরোধ, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং সাংস্কৃতিক অমিল এক সময় পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। ১৯৪৬ সালেই তিনি বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তান বেশিদিন পশ্চিমের সাথে থাকবে না।”
৩. ভারতের মুসলিমদের ভবিষ্যৎ সংকট
মওলানা আশঙ্কা করেছিলেন যে, পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে ভারতের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে এতিম এবং ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে। ভারতের হিন্দু-মুসলিম ভারসাম্যে ফাটল ধরবে এবং ভারতের মুসলিমরা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতায় ভুগবে।
৪. কাশ্মীর সমস্যার অন্তহীন জট
তিনি ভবিষ্যবাণী করেছিলেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সর্বদা ভারতের সাথে বৈরী সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে অন্তহীন সংঘাত চলতে থাকবে। এই শত্রুতার ফলে পাকিস্তান তার বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হবে, যা সাধারণ মানুষের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
৫. আন্তর্জাতিক শক্তির ক্রীড়নক হওয়া
মওলানা বলেছিলেন, পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক শক্তির (তৎকালীন প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও পশ্চিমাবিশ্ব) দাবার ঘুঁটি বা ‘পাবলিক ক্লায়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিঘ্নিত হবে।
৬. অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও প্রাদেশিক বিবাদ
তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলামের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হলেও পাকিস্তানের ভেতরে জাতিগত ও প্রাদেশিক সংঘাত (পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচদের মধ্যে) তীব্রতর হবে। প্রাদেশিক সংকীর্ণতা এক সময় জাতীয় সংহতিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
৭. সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ ও ধর্মের অপব্যবহার
মওলানা আশঙ্কা করেছিলেন যে, পাকিস্তানের অযোগ্য নেতারা তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে বারবার ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন। এর ফলে রাষ্ট্রে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা বাড়বে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
৮. মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব লাভের ব্যর্থতা
তৎকালীন মুসলিম লিগ নেতাদের দাবি ছিল পাকিস্তান হবে মুসলিম বিশ্বের নেতা। মওলানা এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, মুসলিম দেশগুলোর নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ আলাদা। পাকিস্তান কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে আরব বিশ্ব বা অন্যান্য মুসলিম দেশের নেতা হতে পারবে না।
মওলানা আজাদের এই ভবিষ্যবাণীগুলো আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে করা হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রতিটি শব্দ ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি তাঁর ‘মুকাশাফা’ (অন্তর্দৃষ্টি) দিয়ে যা দেখেছিলেন, তা আজ ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা।

স্বাধীন ভারতের শিক্ষার স্থপতি ও জাতীয় শিক্ষা দিবস
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজকের আধুনিক ভারতের উচ্চশিক্ষার যে মজবুত ভিত্তি আমরা দেখি—ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (IIT), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)—এসবই তাঁর দূরদর্শী চিন্তার ফসল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা, যা হবে অবৈতনিক এবং সবার জন্য সমান।
তাঁর এই অবদানকে স্মরণ করেই প্রতি বছর ১১ নভেম্বর তাঁর জন্মদিনে ভারতজুড়ে পালন করা হয় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’। ১৯৯২ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বিদায়
১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এই মহামানব আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অমর আদর্শ। আমার কাছে মওলানা আবুল কালাম আজাদ মানেই হলো—অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটল থাকা এবং সবসময় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে মানবতার গান গাওয়া।
বন্ধুরা, আসুন আমরা তাঁর জীবন থেকে শিখি। শিখি কীভাবে ধর্মকে আঁকড়ে ধরেও একজন শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক ও আধুনিক মানুষ হওয়া যায়। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
“হক মাগফিরাত করে, আজব আজাদ মর্দ থা”
(আল্লাহ তাঁর ওপর রহমত করুন, অদ্ভুত এক স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন তিনি!)
আরও দেখুন:
