ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে আজ কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলতে চাই। আমাদের দেশে যখন কোনো নতুন কনসেপ্ট বা সম্ভাবনা তৈরি হয়, একদল সুযোগসন্ধানী মানুষ সেটিকে খুব দ্রুত ‘ফানুস’ বানিয়ে ফেলার ব্যবসায় নেমে পড়ে। উদ্যোক্তা উন্নয়ন আর ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আমার দীর্ঘ এক দশকের পথচলার অভিজ্ঞতা তেমনই কিছু তেতো স্মৃতিতে ঠাসা।
প্রথম হ্যাকাথনের সেই অন্তঃসারশূন্য চকমক
সেই শুরুর দিককার কথা। প্রথম হ্যাকাথনে প্রতিযোগীদের জড়ো করার দায়িত্ব নিয়েছিল ‘প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ’ (Projuktite Bangladesh)। সভাপতি হিসেবে আমি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছি। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করেছি। তরুণদের মাঝে কী এক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল সেদিন!
পাঁচতারা হোটেলে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন হলো। তরুণ তুর্কীরা চমৎকার সব প্রজেক্ট আর উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে হাজির হলো। আমি ভীষণ আশাবাদী ছিলাম—ভেবেছিলাম এত বড় বড় প্রতিষ্ঠান আর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (NGO) সম্পৃক্ততায় এসব মেধাবী তরুণ নিশ্চয়ই বড় কোনো স্পন্সর পাবে। তাদের আইডিয়াগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
কিন্তু দুই বছর পর এক সমন্বয় সভায় গিয়ে যখন খোঁজ নিলাম, তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা! জানতে পারলাম, সেসব প্রজেক্টের একটিও কোনো বিনিয়োগ বা স্পন্সর পায়নি। পুরো আয়োজনটি আসলে অন্যান্য চটকদার উন্নয়ন প্রজেক্টের মতোই—স্বপ্নময়, কিন্তু অন্তঃসারশূন্য এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট। মাঝখান থেকে কিছু ‘টাউট’ আর মধ্যস্বত্বভোগীর সামান্য আয়-রোজগার হয়েছে মাত্র। আর আমরা যারা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছি, আমি আর আমার ছোট ভাই নাহিদুল ইসলাম রুবেল—আমাদেরকে সাধারণ নেতা-কর্মীদের কাছে গালমন্দ শুনতে হলো যে কেন আমরা তাদের এমন এক অকেজো প্রজেক্টে যুক্ত করেছিলাম।
আউটসোর্সিং ও ‘ক্লিক’ বাণিজ্যের সেই তিক্ততা
ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং বিষয়টি জনপ্রিয় করার জন্য আমি আর আমার সহযোদ্ধারা নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে সারা দেশে প্রচার চালিয়েছি। কিন্তু বিষয়টি জনপ্রিয় হতে না হতেই দেখলাম একদল অসাধু চক্র পুরো কনসেপ্টটি ভাঙিয়ে ময়লার দামে বেচা শুরু করেছে। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মহৎ এই পেশাকে তারা ‘মাল্টি লেভেল ক্লিক মার্কেটিং’-এর ঠগবাজি ব্যবসায় রূপান্তর করলো। সাধারণ মানুষের সাথে এই প্রতারণা দেখে নিজেদের ক্রেডিবিলিটি রক্ষার দায়েই আবার সেই কনসেপ্টের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করতে বাধ্য হলাম। এই অভিজ্ঞতাটি ছিল অনেকটা নিজের ফেলা থুথু নিজেই চেটে খাওয়ার মতো অসহ্য ও তিক্ত।
উদ্যোক্তা উন্নয়নের ‘ফানুস’ ব্যবসা
২০০৮ সাল থেকে উদ্যোক্তা ক্যাম্পেইন নিয়ে আমরা মাঠে আছি। সারা দেশে উদ্যোক্তা সমাবেশ, কর্মশালা, উৎসব আর সম্মাননার পেছনে আমরা আমাদের কর্মীদের নিজের পকেটের অর্থ ব্যয় করেছি। তরুণদের ট্রেড লাইসেন্স করানোর সহজীকরণে আন্দোলন করেছি, যুব উন্নয়নের কর্মকর্তাদের সাথে দর কষাকষি করেছি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখলাম, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কনসেপ্টটাও সেই আউটসোর্সিংয়ের মতো ‘ফানুসের দোকানে’ পরিণত হচ্ছে। অলিতে-গলিতে গজিয়ে উঠতে শুরু করলো ‘উদ্যোক্তা বিশেষজ্ঞ’ তৈরির কারখানা।
প্রথমে ভেবেছিলাম ভালো জিনিস যত বেশি হবে তত মঙ্গল। কিন্তু বাস্তবতা হলো পুরো উল্টো। দেখলাম:
- উদ্যোক্তা তৈরির নামে নেটওয়ার্ক হচ্ছে, কিন্তু তার দায়বদ্ধতা কেউ নিচ্ছে না।
- আইডিয়া কম্পিটিশন হচ্ছে, কিন্তু সেই আইডিয়ায় বিনিয়োগ করার মতো কোনো স্পন্সর নেই।
- একটি প্রতিযোগিতার মঞ্চ সাজাতে লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, অথচ শ্রেষ্ঠ বিজয়ী তরুণকে ১০ টাকার বিনিয়োগ সহায়তা দেওয়ার মানসিকতা কারও নেই।
- সেমিনার আর মালা বদলের বাহার আছে, কিন্তু কর্মশালায় শেখানোর মতো কোনো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ বক্তা নেই।
তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ছুটছে, আর তাদের সেই স্বপ্ন আর হাজিরাকে বিক্রি করে মুনাফা কামাই করছে একদল ‘উদ্যোক্তাজীবী’—যাদের নিজেদের জীবনে একটিও সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগের উদাহরণ নেই।
তরুণদের প্রতি বিশেষ সতর্কবার্তা
এসব নেতিবাচক কথা বলা সহজ নয়, বিশেষ করে আমি যে কনসেপ্টে নিজে বিশ্বাস করি। কিন্তু চুপ করে থাকাটাও এখন অপরাধ। তাই তরুণ ভাই-বোনদের বলব—উদ্যোক্তা বিষয়ক যেকোনো প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের আগে সেই উদ্যোগের লক্ষ্য, ব্যাকগ্রাউন্ড এবং এর সাথে জড়িত মানুষগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিন। তা না হলে আপনার মূল্যবান সময় আর উদ্দীপনা দুটোই নষ্ট হবে।
শুনতে হয়তো রূঢ় লাগবে, তবুও কিছু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি:
১. যিনি জীবনে নিজে একটিও সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেননি, তিনি আপনাকে উদ্যোক্তা হওয়ার কী শেখাবেন?
২. যার নিজের কোনো সাকসেস স্টোরি নেই, তিনি আপনাকে সফলতার চাবিকাঠি কোন মুখে বলবেন?
৩. যিনি জীবনে কখনো ব্যর্থ হয়ে শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়াননি, তিনি আপনাকে প্রতিকূলতা মোকাবিলার ফর্মুলা কীভাবে দেবেন?
৪. যিনি নিজের এক টাকা কখনো অন্যের ব্যবসায় ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেননি, তিনি আপনাকে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ বা বিনিয়োগের কী জ্ঞান দেবেন?
উদ্যোক্তা হওয়া মানে কেবল আবেগ নয়, এটি একটি কঠিন যুদ্ধের নাম। তাই এই যুদ্ধে নামার আগে প্রকৃত যোদ্ধার পরামর্শ নিন, চটকদার ‘উদ্যোক্তাজীবী’দের বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (বিআইআইসি)
আরও দেখুন: