১৯৭১ সালে পরাজিত পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী—আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান এবং তাদের এদেশীয় দোসর ঘাতক রাজাকার ও গোলাম আজম গংরা—স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকেই এদেশের মুক্তিকামী মানুষকে কলঙ্কিত করার হীন চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের অপপ্রচারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ‘রুশ-ভারতের দালাল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া। আজ পাঁচ দশক পরেও সেই পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের চোখে আওয়ামী লীগ বা প্রগতিশীল বাংলাদেশিরা ‘ভারতের দালাল’। এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো—পাকিস্তান এবং তাদের এদেশীয় দালালেরা আজও বিশ্বাস করতে পারে না যে বাঙালি জাতি নিজ বীরত্বে স্বাধীন হতে পারে; তারা মনে করে এটি কেবলই ভারতের ‘ষড়যন্ত্র’।
পাকিস্তানের দালাল রা কেন অন্যদের ‘ভারতের দালাল’ বলে?
দালালি করলে তো পাকিস্তানেরই করা যেত
যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘ দুই দশকের লড়াই-সংগ্রাম এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন মানচিত্র উপহার দিল, তারা কেন অন্য দেশের দালালি করবে? আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধু যদি কেবল ক্ষমতার মোহে ‘দালালি’ করতে চাইতেন, তবে তারা তো পাকিস্তানের সাথে আপোষ করেই ক্ষমতার ভাগ নিতে পারতেন। কিন্তু তারা ক্ষমতার চেয়ে দেশের মুক্তিকে বড় করে দেখেছিলেন। মূলত বাংলাদেশে ‘ভারতের দালাল’ বলে বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই; এটি একটি রাজনৈতিক মিথ বা অপপ্রচার। এদেশে যদি কোনো চিহ্নিত এবং প্রমাণিত দালালি থেকে থাকে, তবে সেটি ছিল পাকিস্তানের। আর সেই পরাজিত শক্তিই আজ নিজেদের অপরাধ ঢাকতে দেশপ্রেমিকদের গায়ে ‘ভারতীয় দালাল’ তকমা সেঁটে দেয়।
মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার: দালালি কার রক্তে?
১৯৭১ সালে যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তারা ‘দেশপ্রেমিক’। যারা দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেবা করেছে, তারা ‘দালাল ও রাজাকার’। রাজাকার গোষ্ঠী হচ্ছে একটি দেশবিরোধী প্রতিষ্ঠিত সত্তা। এই রাজাকারের পরবর্তী প্রজন্ম আজও এদেশের মাটিতে বসবাস করে এবং অদ্ভুত এক ‘স্টকহোম সিনড্রোমে’ ভোগে। তারা পাকিস্তানের বিজয়ে উল্লাসিত হয় এবং বাংলাদেশের অগ্রগতিতে ব্যথিত হয়। নিজেদের এই প্রকাশ্য দালালিকে আড়াল করার জন্যই তারা একটি কাল্পনিক ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’ বা পাল্টা পক্ষ তৈরি করেছে। তারা চায় দেশপ্রেমিকদের বিতর্কিত করতে, যাতে তাদের ‘রাজাকার’ পরিচয়টি গৌণ হয়ে যায়।
উন্নয়ন বনাম সদমা: দালালদের মনস্তত্ত্ব
বর্তমান বিশ্বে প্রায় প্রতিটি আর্থ-সামাজিক সূচকে (Human Development Index) বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। যখন আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করে, তখন এই পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের হৃদয়ে ‘সদমা’ বা তীব্র রক্তক্ষরণ হয়। তারা হন্যে হয়ে গুগল সার্চ করে অন্তত এমন একটি সূচক খুঁজে পেতে চায় যেখানে পাকিস্তান এগিয়ে আছে, যাতে তারা তাদের আদি প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে। এটি কেবল দালালি নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক বিকৃতি।
সত্য কথা হলো, ১৯৭১ সালে যারা দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, তারাই ছিল প্রকৃত দালাল। তাদের উত্তরসূরিরা আজও সেই পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারেনি। তাই বাংলাদেশের স্বার্থে কথা বলা প্রতিটি মানুষকে তারা ‘ভারতের দালাল’ বলে গালি দেয়। প্রকৃতপক্ষে, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে তারা ‘বাংলাদেশপন্থী’। আর যারা বাংলাদেশকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের স্বপ্নে বিভোর থাকে, তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত ‘প্রমাণিত দালাল’।
পাকিস্তানের সমর্থকদের ‘ভারত ভীতি’ ও গণহত্যার অস্বীকৃতি
বাংলাদেশে একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান—আপনি যখনই পাকিস্তানের কোনো অন্যায় বা ঐতিহাসিক অপরাধ নিয়ে কথা বলবেন, অমনি একদল মানুষ সেখানে ভারতের প্রসঙ্গ টেনে আনবে। বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হোক বা না হোক, পাকিস্তানের যেকোনো নেতিবাচক আলোচনার বিপরীতে ভারতকে দাঁড় করানোই তাদের প্রধান প্রতিরক্ষা কৌশল। অথচ তারা এই সহজ সত্যটি বুঝতে চায় না যে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে পাকিস্তানের অপরাধের সাথে অন্য কোনো দেশের তুলনা চলে না।
পাকিস্তান: এক অদ্বিতীয় ঘাতকের নাম
পাকিস্তানই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র দেশ, যারা এই জনপদের ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, দুই লক্ষ মা-বোনের ওপর পৈশাকিক নির্যাতন চালিয়েছে। পাকিস্তান সেই রাষ্ট্র, যারা ‘ইসলাম রক্ষার’ দোহাই দিয়ে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমানকে হত্যা করার কলঙ্ক তিলক পরে আছে। যারা আজ পাকিস্তানকে জাস্টিফাই বা বৈধতা দিতে অন্য দেশের নাম টেনে আনে, তারা আসলে মানসিকভাবে বাংলাদেশি নয়; তারা বাংলাদেশে আটকে থাকা পাকিস্তানি সত্তা।
একজন পাকিস্তানি ভাবে – আমি তোমকে সাচ্চা মুসলিম বানানোর জন্য ধর্ষণ করেছি, আমি তোমাকে সাচ্চা মুসলিম বানানোর জন্য কতল করেছি। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় মুসলিম গণহত্যা কোথায় আছে? এত বড় গণহত্যার নজির কোথায় আছে? হিন্দু দেখলে সাথে সাথে মেরে ফেলার নজির কোথায় আছে?
ইসলামের নামে জালিমশাহী
পাকিস্তান রাষ্ট্র নামের যে জালিম মেশিনারিজ ১৯৭১ সালে গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের যারা আজও সমর্থন করে, তারা মূলত ইসলামের মূল চেতনারই পরিপন্থী। মহান আল্লাহ কাউকে অমুসলিম ঘোষণা করার অনুমতি আমাকে দেননি, তাই পারি না। কিন্তু সত্য এই যে, ইসলামের নামে মুসলিম নিধনকারী ওই জালিমদের সমর্থন করা ইসলামের সুমহান ইনসাফের নীতির চরম অবমাননা।
বাবর আজম ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক মানস
সম্প্রতি পাকিস্তানি ক্রিকেটার বাবর আজমের একটি বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তার কথাটি স্রেফ খেলাধুলা নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক। তিনি যখন বাংলাদেশে নিজেদের সমর্থক দেখে উল্লাস প্রকাশ করেন, তখন তিনি মূলত পাকিস্তানের সেই পুরোনো আধিপত্যবাদী চিন্তারই প্রতিফলন ঘটান। পাকিস্তান আজও বিশ্বাস করে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবলই একটি ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের বিদ্রোহ। তাদের ধারণা, অধিকাংশ ‘সাচ্চা মুসলিম’ স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। বাবর আজমের মতো ক্রিকেটাররা যখন বাংলাদেশে সমর্থক দেখেন, তারা মনে করেন তাদের সেই পুরোনো ন্যারেটিভ আজও টিকে আছে। তারা এই সমর্থকদের ‘পা চাটা দাসে’র চেয়ে বেশি কোনো মর্যাদা দেয় না।
স্টকহোম সিনড্রোম ও আমাদের ব্যর্থতা
একজন পাকিস্তানি ঐতিহাসিকভাবে এমন এক শ্রেষ্ঠত্বমন্যতায় ভোগে যে সে মনে করে—তোমাকে ‘সাচ্চা মুসলিম’ বানানোর জন্যই সে ধর্ষণ করেছে, তোমাকে ধর্মের পথে আনার জন্যই সে কতল করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মের নামে এমন নারকীয় গণহত্যার নজির আর কোথাও নেই। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে আজও এই জল্লাদদের সমর্থক খুঁজে পাওয়া যায়। এটিই হচ্ছে ‘স্টকহোম সিনড্রোম’—যেখানে নির্যাতিত ব্যক্তি নিজের অবচেতন মনে নির্যাতনকারীর প্রতিই ভালোবাসা বা টান অনুভব করে।
দোষটা আমাদেরই। আমরা স্বাধীন দেশে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি যে—বাংলাদেশি হয়ে পাকিস্তানের দালালি করা কেবল রাজনৈতিক ভুল নয়, বরং এটি একটি নৈতিক মহাপাপ। ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা এই নারকীয় হত্যা ও ধর্ষণের গ্লানি ভুলে পা চাটা কুকুরের মতো মর্যাদা চায়, তারা জাতির এক অভিশপ্ত অংশ। আমাদের এই উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে একদিন হয়তো এই সুসংগঠিত গণহত্যাকেও অস্বীকার করা হবে। আজকের প্রজন্মকে এই দালালি রাজনীতির শেকড় উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করতে হবে।
তবে এদের মধ্যে বুড়াগুলো কৌশলী তারা সরাসরি মুখে বলে না বা লেখে না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের, যারা না জানে পাকিস্তান কি, খায় না মাথায় দেয়, তাদের দিয়ে মূলত এসব সামনে আনে। কিছু স্যাম্পল ইনবক্সে পাঠিয়েছে এক ছোট ভাই। ওয়েবে উঠিয়ে রাখলাম:



