শীত ঋতুসংগীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শীত ঋতু প্রকৃতির এক নীরব ও গভীর সময়। কুয়াশা ঢাকা ভোর, নরম রোদে ভেজা দুপুর, আর দীর্ঘ নিস্তব্ধ রাত—সব মিলিয়ে শীত যেন এক ধরনের ধ্যানমগ্নতার আবহ তৈরি করে। প্রকৃতি এই ঋতুতে অনেকটা স্থির হয়ে আসে; বাতাসে থাকে শীতলতা, আকাশে থাকে স্বচ্ছতা, আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি। এই আবহ মানুষের মনকেও অনেক সময় অন্তর্মুখী করে তোলে। ফলে শীতকালীন সঙ্গীতেও দেখা যায় এক ধরনের গাম্ভীর্য, ধীরতা এবং আত্মমগ্নতার সুর।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শীতের সঙ্গে মানানসই কিছু বিশেষ রাগ রয়েছে, যেগুলোর সুরে থাকে গভীর ধ্যান, বিরহের আবেগ এবং আধ্যাত্মিকতার অনুভব। এসব রাগ সাধারণত গম্ভীর স্বভাবের এবং ধীর লয়ে পরিবেশিত হলে তাদের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রধান রাগসমূহ:

শ্রী, মালকোষ, দরবারী কানাড়া, শিবরঞ্জিনী।

রাগ শ্রী শীতের সন্ধ্যা বা গোধূলি সময়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর সুরে আছে এক ধরনের গম্ভীর ও পবিত্র আবহ, যা অনেকটা সন্ধ্যার নিস্তব্ধ মন্দিরের পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই রাগ শ্রোতার মনে আনে ধ্যানমগ্নতা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি।

মালকোষ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম গম্ভীর ও গভীর রাগ। রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে এই রাগের সুর যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। মালকোষের সুরে রয়েছে এক ধরনের ধীর, অন্ধকারময় সৌন্দর্য—যা শীতের দীর্ঘ রাতের গভীরতার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়।

দরবারী কানাড়া রাগটির আবহ আরও বেশি গম্ভীর ও রাজসিক। মুঘল দরবারে এই রাগের পরিবেশনার ঐতিহ্য ছিল বলে এর নাম দরবারী। এর সুরে আছে গভীর আবেগ, দীর্ঘ আলাপ এবং এক ধরনের বিষণ্ণ মহিমা, যা শীতের নিস্তব্ধ রাতকে যেন আরও গাঢ় করে তোলে।

শিবরঞ্জিনী তুলনামূলকভাবে সহজ কিন্তু অত্যন্ত আবেগপূর্ণ একটি রাগ। এর সুরে বিরহ, স্মৃতি এবং অন্তরের আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি প্রবলভাবে প্রকাশ পায়। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর বা নিঃশব্দ সন্ধ্যায় এই রাগের সুর শুনলে মনে হয় যেন দূরের কোনো স্মৃতি ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে।

সংগীতের আবহ:

শীতের সঙ্গীতে সাধারণত থাকে ধীর লয়, গভীর সুর এবং দীর্ঘ আলাপের প্রবণতা। এতে প্রকাশ পায় মানুষের অন্তর্মুখী চিন্তা, বিরহের মৃদু ব্যথা এবং আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য। কুয়াশা ঢাকা ভোর, ঠান্ডা বাতাসে নিস্তব্ধ গ্রাম কিংবা দীর্ঘ শীতের রাত—এই সব অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়েই শীতের রাগগুলো তার পূর্ণ সৌন্দর্যে প্রস্ফুটিত হয়।

 

তুলনামূলকভাবে শীত নিয়ে গানে কাজ হয়েছে কম। তবুও কিছু গান আমাদের উষ্ণতার সঙ্গী।

 

অন্য কিছু গান:

শীতের হাওয়া

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান এটি। তাঁর তুলনা যে তিনিই, এই শীতের গানটিও সেই উজ্জ্বল উদাহরণ।

পৌষ এলো গো

কাজী নজরুল ইসলামের এই গানেও শীতের অপূর্ব বর্ণনা উঠে এসেছে।

শিশির ভেজানো রাতে

ভুপেন হাজারিকার এই গানে মূলত শীতের কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। এই গান যেন শীতের দুর্ভোগে বিপন্ন মানুষের কথাই বলেছে।

পৌষের কাছাকাছি

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ও প্রভাস দে’র সুরে এই গান গেয়েছিলেন মান্না দে। সেই থেকে এই গান শীতকালের।

শীতের সকালে

গানটি উইনিং ব্যান্ড এর । তাঁদের অচেনা শহরে শিরোনামের অ্যালবামে এই গান স্থান পেয়েছিল। জনপ্রিয় গানের তালিকাতেও আছে শীতকালিন এই গান।

শীত পড়েছে

রাজীব আহমেদের কথা ও শ্রী প্রীতমের সুরে আসিফ আকবর গেয়েছেন এই শীতকালীন গান। গানে শীতের বর্ণনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

শীতের বনে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি  হতে সংগ্রহীত)

(সংস্করণ ১ – মান্না দে / Version 1 – Manna Dey)

শীত কেন্দ্রিক এই গান লিখেছেন সেজুল হোসেন, নিজের সুরে গেয়েছেন লুৎফর হাসান। আমজাদ হোসেনের সঙ্গীতে এই গানে আরও কণ্ঠ দিয়েছেন লুইপা।

শীত নিয়ে আরও অনেক গান আছে। আপাতত এখানকার কিছু গানে শীত খুঁজে নেয়া যাক।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment