পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে সারা পৃথিবীর ফলের ঝুড়ি

গত মাসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের অফিসগুলোতে ‘স্মার্ট কর্নার’ উদ্বোধন আর কর্মীসভা করার জন্য আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলো সফর করছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন কবির বিন আনোয়ার ভাই। উনার কৃষি আর কৃষকের প্রতি ভালোবাসাটা একদম ভেতর থেকে আসে, উনার অসীম আগ্রহ এই বিষয়ে। তো, দিনের ধকল শেষে রাতে যখন আমরা সবাই আড্ডায় বসলাম, স্বাভাবিকভাবেই আলাপের মোড় ঘুরে গেল আমাদের পাহাড়ের কৃষি সম্ভাবনার দিকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে সারা পৃথিবীর ফলের ঝুড়ি (Fruit Basket of The World)

পৃথিবীর ফলের ঝুড়ি

সেই আড্ডার আলাপ থেকেই একটা দারুণ উপলব্ধি উঠে এলো। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি এতটাই উর্বর আর বৈচিত্র্যময় যে, এখানে শুধু আমাদের চেনা ফলই নয়, বরং পৃথিবীর প্রায় সব প্রজাতির ফল ফলানো সম্ভব। এমনকি আপনি যদি ঠিকঠাক মতো চেষ্টা করেন, তবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফল ‘হোয়াইট জুয়েল স্ট্রবেরি’ কিংবা জাপানের সেই বিখ্যাত ‘মিয়াজাকি আম’ (সূর্যডিম)—সবই এই পাহাড়ে ফলানো সম্ভব।

অনাবাদী পাহাড় যখন বৈশ্বিক সম্পদের উৎস

পাহাড়ে মাইলের পর মাইল যে পরিমাণ জমি এখনো অনাবাদী পড়ে আছে কিংবা নামমাত্র চাষাবাদ হচ্ছে, সেগুলোকে যদি একটা মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনা যায়, তবে শুধু বাংলাদেশ নয়—পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে উঠতে পারে গোটা পৃথিবীর ফলের ঝুড়ি (Fruit Basket of the World)। মাত্র ১০ বছরের একটা পরিকল্পিত উদ্যোগে ওই পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চেহারা এবং মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব।

তবে এর জন্য সবচেয়ে আগে দরকার একটা সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ, স্থানীয় নেতৃত্ব আর জনপ্রতিনিধিদের এক টেবিলে বসে একটা টেকসই ‘মডেল’ ঠিক করতে হবে। সবাই যখন এই ভাবনায় ঐক্যমত হবেন, তখন জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি সরকারের কাছে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা যাবে।

কীভাবে শুরু করা যায়?

  • সরকারি প্রাথমিক সহায়তা: শুরুতেই তো পাহাড়ের প্রান্তিক চাষীদের পক্ষে বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তাই একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নত জাতের চারা, আধুনিক কৃষি উপকরণ এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের হাই-টেক প্রশিক্ষণ সরাসরি তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।
  • ‘দেখাদেখি চাষ’ মডেল: প্রথম বছর ফসল তোলার পর যখন প্রথমবার বাজারে ফল বিক্রি করে একটা বড় অংকের টাকা চাষীদের হাতে আসবে, তখন আর তাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। সেই উপার্জিত পুঁজি দিয়ে জমির মালিকরা নিজেরাই পরবর্তী চাষের খরচ চালিয়ে নিতে পারবেন। আমাদের দেশে ‘দেখাদেখি চাষ, দেখাদেখি বাস’ মডেলটা দারুণ কাজ করে। এক প্রতিবেশীর পকেটে টাকা আসতে দেখলে পুরো গ্রাম এমনিতেই কোমর বেঁধে সেই চাষে নেমে পড়বে।
  • সংরক্ষণ ও লজিস্টিকস: ফল যেহেতু পচনশীল পণ্য, তাই এর সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগে পাহাড়ে কিছু অত্যাধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার তৈরি করে দেওয়া প্রয়োজন। আর এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক পরিষদগুলোকে, যাতে স্থানীয় মানুষেরা এর সরাসরি সুফল পান।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দূরদর্শী চিন্তার মানুষ এবং কৃষির উন্নয়নে যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান, তাতে এই ধরণের কোনো পরিকল্পিত প্রজেক্ট উনার সামনে নিয়ে গেলে তিনি এক কথায় সানন্দে রাজি হয়ে যাবেন।

টাকা কিংবা সদিচ্ছার কোনো অভাব এখানে হবে না; অভাব শুধু একটা সুসংগঠিত উদ্যোগের। আর সেই উদ্যোগটা পাহাড়ের সব স্তরের জনগণকে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বার্থেই নিতে হবে। চলুন, পাহাড়ের এই সবুজ সম্ভাবনাকে সত্যি সত্যি সোনা বানানোর স্বপ্নটা আমরা ছড়াতে শুরু করি।