কুশলীবাসা গ্রাম – ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ৯নং চাঁদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম হলো কুশলীবাসা। কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর মহৎ কর্ম যখন সমাজ তথা বৃহত্তর জনতার কল্যাণে নিবেদিত হয়, তখনই তা জাতীয় ঐতিহ্যে রূপ নেয়। কুশলীবাসা গ্রামের গুটিকয়েক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি এবং পরিবার তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে এই গ্রামটিকে তেমনই এক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

কুশলীবাসা গ্রাম

 

কুশলীবাসা গ্রাম

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও খন্দকার পরিবার:

কুশলীবাসা গ্রামের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী খন্দকার পরিবার। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আনুমানিক ১৭২৫ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের কোনো এক সম্ভ্রান্ত গোত্র থেকে প্রথম পুরুষ হিসেবে খন্দকার বদরুদ্দীন শাহ (যিনি শিক্ষক হিসেবে ‘শাহ’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন) এই অঞ্চলে আগমন করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এই বংশের দশম (১০ম) পুরুষের ধারা অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিবারের ৭ম পুরুষ মরহুম আলহাজ্ব খন্দকার তমিজউদ্দিন গ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান ছাড়াও গ্রামের কেন্দ্রীয় কবরস্থান তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরি ৮ম পুরুষের চার ভাই—প্রয়াত শহীদ খন্দকার মঞ্জুর আলিম, মরহুম আলহাজ্ব অধ্যক্ষ খন্দকার মঞ্জুর কাদের, প্রকৌশলী কে এম আব্দুস সালাম এবং প্রকৌশলী কে এম হাফিজুর রহমান গ্রামের পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে নেতৃত্ব দেন।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 কুশলীবাসা গ্রাম - ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গ্রামের রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সমাজকর্মী শহীদ খন্দকার মঞ্জুর আলিম ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গ্রামবাসীর জন্য খাদ্যের যোগান দিতে কুষ্টিয়া শহরে যান। সেখানে তিনি বিহারীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তার মৃতদেহটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি তার লেখনী ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও সমাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 কুশলীবাসা গ্রাম - ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

 

শিক্ষা ও সমাজসেবা: কুশলীবাসা গ্রামের শিক্ষা বিস্তারে মরহুম আলহাজ্ব অধ্যক্ষ খন্দকার মঞ্জুর কাদের এবং তার পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য।

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: ১৯২৯ সালে মরহুম শাহজাহান খন্দকার ও খন্দকার পরিবারের প্রচেষ্টায় ‘কুশলীবাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় (যেখানে মরহুম তেজারত বিশ্বাস জমি দান করেন) এবং খন্দকার পরিবারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ‘কুশলীবাসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • মাদ্রাসা স্থাপন: ১৯৮৭ সালে ২২ এপ্রিল মরহুম আলহাজ্ব খন্দকার মঞ্জুর কাদেরের মাতা মরহুমা বিবি আছিয়া খাতুন ইন্তেকাল করেন। মায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি ভাইদের সহযোগিতায় ১৯৮৮ সালে ‘বিবি আছিয়া খাতুন বালিকা আলিম মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • সামাজিক উন্নয়ন: অধ্যক্ষ মঞ্জুর কাদের ছাত্রজীবনেই ‘হিলফুল ফুজুল’ সংগঠনের মাধ্যমে সমাজসেবা শুরু করেন। সত্তরের দশকে তিনি গ্রামবাসীকে চিঠি লেখায় উদ্বুদ্ধ করেন এবং তার প্রচেষ্টায় কুশলীবাসায় একটি পোস্ট অফিস (পোস্ট কোড-৭০০০) প্রতিষ্ঠিত হয়। আশির দশকে নদীগর্ভে প্রধান সড়ক বিলীন হয়ে গেলে, তিনি ও তার পরিবার নিজেদের জমি দান করে গ্রামবাসীর চলাচলের জন্য নতুন সড়ক নির্মাণ করে দেন।

আধুনিক স্থাপত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান:

গ্রামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। প্রকৌশলী কে এম হাফিজুর রহমানের নিপুণ ডিজাইন ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদটি নতুন ও দৃষ্টিনন্দন রূপে গড়ে উঠেছে। এছাড়া ছাগলা পাড়া মসজিদসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও এই পরিবারের ভূমিকা রয়েছে।

কুশলীবাসার কৃতি সন্তান ও সমাজসেবকবৃন্দ:

গ্রামের সার্বিক উন্নয়নে দলমত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে সকল আদর্শবান ব্যক্তি (প্রয়াত ও বর্তমান) নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের নামের তালিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  • মরহুম আলহাজ্ব খন্দকার তমিজউদ্দিন
  • মরহুম শাহজাহান খন্দকার
  • মরহুম খন্দকার আবদুল গফুর
  • মরহুম আলহাজ্ব খন্দকার আফছার উদ্দিন
  • মরহুম খন্দকার মখছেদ উদ্দিন
  • মরহুম আলহাজ্ব ডাঃ মোঃ শাহাদাত হোসেন
  • মরহুম পীরজাদা খন্দকার ইমদাদুল হক
  • মরহুম ইসহাক আলী মোল্লা
  • শ্রী জিতেন মাষ্টার
  • মরহুম আলহাজ্ব অধ্যক্ষ খন্দকার মঞ্জুর কাদের
  • মরহুম অধ্যক্ষ খন্দকার নুরুজ্জামান
  • খন্দকার আমিনূর রশিদ আমোদ
  • আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার কে এম আব্দুস সালাম
  • আলহাজ্ব ড. খন্দকার রাশেদুল হক
  • মরহুম শরিফুল ইসলাম টিপু
  • ডাঃ কে এম দিদারুল ইসলাম
  • ইঞ্জিনিয়ার আরিফ উদ্দিন মোল্লা
  • ইঞ্জিনিয়ার মোঃ তোরাব আলী খাঁন
  • ইঞ্জিনিয়ার কে এম হাফিজুর রহমান
  • খ ম কবিরুল ইসলাম
  • ডাঃ মোঃ আফজাল হোসেন সেখ
  • খন্দকার বদিউজ্জামান
  • মোঃ গোলাম মোস্তফা ফরিদ
  • মোঃ ওয়াজ আলী মোল্লা
  • পীরজাদা খন্দকার ফজলুল হক
  • মোঃ আক্কেল আলী সেখ
  • মরহুম আলহাজ্ব মোঃ মোফাজ্জল হোসেন
  • মোঃ আওলাদ আলী বিশ্বাস
  • মোঃ মোসলেম উদ্দিন সেখ
  • মরহুম মোঃ মোকাদ্দেস হোসেন
  • মরহুম হাতেম আলী বিশ্বাস
  • ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান আলী সেখ
  • সেখ মোঃ মাজেদুর রহমান
  • খন্দকার আবুল কাসেম
  • মোঃ সাজেদুর রহমান সেখ
  • মোঃ আফতাব আলী সেখ
  • মোঃ আবুজুফর মোল্লা
  • ডাঃ মোঃ আরাফুজ্জামান লিপ্টন
  • মোঃ ফারুক হোসেন
  • মোঃ শহীদুল ইসলাম শহীদ
  • মোঃ রবিউল ইসলাম
  • মোঃ আফজাল হোসেন
  • কে এম রবিউল ইসলাম মিঠু

কুশলীবাসা গ্রামটি তার কৃতি সন্তানদের হাত ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কুষ্টিয়া জেলার বুকে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পূর্বপুরুষদের এই ত্যাগের মহিমা ও উন্নয়নের ধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত ধরে অব্যাহত থাকবে—এটাই গ্রামবাসীর প্রত্যাশা।

আরও দেখুন: